T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

‘কবীরের দোঁহা’ অনুবাদ হল ইংরেজিতে
ইভলিনের সহায়তায় ‘ওয়ান হানড্রেড পোয়েমস্ অফ কবীর’ অনুবাদ করলেন রবীন্দ্রনাথ

ক্ষিতিমোহন সেনের কবীর সংগ্রহ থেকে অজিতকুমার চক্রবর্তীর করা ইংরেজি অনুবাদের খসড়া অবলম্বনে ইভলীনের সহায়তায় ‘ওয়ান হানড্রেড পোয়েমস্ অফ কবীর’ [১৯১৪] গ্রন্থ প্রকাশ করেন রবীন্দ্রনাথ। ইভলীন তাঁকে চিঠিতে জানান:
“উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে আছি, কবে কবীরের কবিতাগুলির সম্পাদনার কাজে হাত দিতে পারব। এই কাজটার ভার যে আপনি আমার উপর দিচ্ছেন এজন্য আমি কৃতজ্ঞ”
“mo ko kahāṉ ḍhūṉṛo bande” – রবীন্দ্রনাথ কবীর-এর এই দোঁহা অনুবাদ করে লিখলেন:
O servant, where dost thou seek Me?
Lo! I am beside thee.
I am neither in temple nor in mosque: I am neither in Kaaba nor in Kailash:…
হে দাস, তুমি আমাকে কোথায় খুঁজছ?
আমি তোমার পাশে আছি।
আমি মন্দিরে নই, মসজিদেও নই: আমি কাবাতেও নই, কৈলাসেও নই।…
One Hundred Poems by Kabir – এর ভূমিকায় ইভলিন আণ্ডারহিল লিখলেন: “কবিরের গানের এই সংস্করণটি প্রধানত শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা, যাঁর রহস্যময় প্রতিভার প্রবণতা তাঁকে তৈরি করে — যারা এই কবিতাগুলো পড়বেন তারা দেখতে পাবেন — কবির দৃষ্টি ও চিন্তার এক অদ্ভুত সহানুভূতিশীল ব্যাখ্যাকারী”…
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হয় তখন তাঁর বয়স ৩২, এবং অতীন্দ্রিয়বাদ বিষয়ে প্রথিতযশা লেখিকা। সাক্ষাতের আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর মিষ্টিসিজম্ বইটি পড়ে ফেলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয় শ্রীমতী সিনক্লেয়ার-এর নিমন্ত্রণে, লন্ডনে, ২ অক্টোবর ১৯১২ তারিখে। সিনক্লেয়ার একটি তারিখহীন পত্রে রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন:
“২ অক্টোবর আমার সামান্য নৈশাহারের আয়োজনে আপনি আসতে রাজি হয়েছেন, এতে আমি যে কি খুশি হয়েছি বলা যায় না। মিসেস স্টুয়ার্ট মূর (‘ইভলিন আন্ডারহিল’) আপনার সঙ্গে দেখা হবার আশায় বিশেষ উৎসাহ নিয়ে অপেক্ষা করে আছেন। আমাকে বললেন, আপনি যে ওঁর বইটা পড়েছেন এ কথা শোনার পর থেকে উনি মরমে মরে আছেন”…
খৃষ্টীয় মরমিয়াবাদ ও ধর্মাচারণ বিষয়ে ইভলীন আন্ডারহীল বিংশ শতকের প্রথমার্ধের বিখ্যাত লেখিকা। লণ্ডনের কিংস কলেজের স্নাতক এবং পরে কলেজের অধ্যাপক-সদস্য ইভলীন আন্ডারহীল একাধারে ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক। ১৯১১ সালে তাঁর বই মিষ্টিসিজম্ প্রকাশিত হবার পর থেকে লেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আলডুস হ্যাক্সলির দ্য পার্সোনাল ফিলসফি [১৯৪৬] প্রকাশের আগে পর্যন্ত মরমিয়াবাদ বিষয়ে ইভলিন আন্ডারহীলই ছিলেন ইউরোপের বিখ্যাততম লেখক। ১৯০৭ সালে তিনি ব্যারিষ্টার হিউবার্ট মূর-কে বিবাহ করেন, কিন্তু নাম বদল করেননি, প্রাকবিবাহ নামেই গ্রন্থজগতে পরিচিত থেকে যান।
সিনক্লেয়ারের চিঠি পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ওই দিনই জগদানন্দ রায়কে লিখছেন: “আজ মিস সিনক্লেয়ারের ওখানে আমার ডিনারের নিমন্ত্রণ আছে। সেখানে Mysticism বইখানির রচয়িত্রী Evelyn Underhill এর সঙ্গে আমার দেখা হবে। শুনেছি উনি খুব ক্ষমতাশালিনী বিদুষী”। রবীন্দ্রনাথই ভারতীয় মরমিয়াবাদ [mysticism] সম্বন্ধে আলোচনা-প্রসঙ্গে পাউণ্ডকে কবীরের কথা বলেছিলেন; আর তাতেই উৎসাহিত হয়ে কবীর ও হিন্দি ভাষা সম্পর্কে সম্পুর্ণ অজ্ঞ এজরা পাউণ্ড ক্ষিতিমোহন সেন-কৃত বাংলা অনুবাদের কালীমোহন ঘোষ-কৃত ‘crib’ অবলম্বনে দশটি দোঁহার ইংরেজি অনুবাদ প্রস্তুত করেন এবং সেগুলি Jun-1913 সংখ্যা ‘মডার্ন রিভিউ’-তে ‘Certain Poems of Kabir/Translated by Kali Mohan Ghose and Ezra Pound/From the Edition of Mr. Khiti Mohan Sen’ শিরোনামে মুদ্রিত হয়। অধ্যাপক সৌরিন্দ্র মিত্র অনুমান করেছেন, “এতে ভীত হয়ে রবীন্দ্রনাথ অজিতকুমার চক্রবর্তীকে দিয়ে কবীরের দোঁহা অনুবাদ করিয়ে তার ব্যাপক সংস্কার করে ইভলিন আণ্ডারহিলের সহায়তায় ও ভূমিকা সহ One Hundred Poems of Kabir [1914] প্রকাশ করেন”।
আর সেইসময় ইভলিন দায়িত্বটা পেয়ে এত খুশি হয়েছিলেন, তা বোঝা যায় তাঁর ১৯ আগষ্ট [৩ ভাদ্র] ১৯১৩ তারিখের চিঠি থেকে:
প্রিয় মি. টেগোর, আপনার চিঠিটি পেয়ে বেশ ভালো লাগল; তবে সেই সঙ্গে দুঃখিত হলাম জেনে, যে আপনি ভারতবর্ষে ফিরে যাবার আগে হয়তো আমাদের আর দেখা হবে না। … কবীর সম্পর্কে বলি, এই কাজটায় সাহায্য করবার সুযোগ পেয়ে আমি যে কত খুশি ও কী রকম গর্বিত বোধ করছি তা আপনি জানেন; কিন্তু দায়িত্বটা বড্ড বেশি – … প্রায় ৫০টার মতো কবিতা আমি সংশোধন করেছি, সেগুলির বিষয়ে আপনার মতামত জানতে উৎকন্ঠিত হয়ে আছি। … আপনি যদি লন্ডন ছাড়বার আগে ওগুলি দেখবার সময় পান, যদি একটা টাইপ করা কপি সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, আমি এক্ষুনি আপনাকে আমার পান্ডুলিপি পাঠিয়ে দিতে পারি, সঙ্গে কিছু প্রশ্নও। … কত কথা আপনাকে বলার ছিল – কিন্তু আর তো সম্ভব হবে না – এবারের বসন্তে আপনার সহৃদয়তা, আপনার বন্ধুতা যে আমার কাছে কতখানি হয়ে উঠেছিল, এবং এখন থেকে তাই থাকবে। … প্লিজ – সঙ্গে যদি থাকে, আপনার একটা ফটো আমাকে পাঠাবেন – ভুলে যাবেন না তো? আমার অত্যন্ত মুল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে ওটি – বিশেষ করে যদি আপনি ওর উপরে আপনার নাম সাক্ষর করে দেন। …”
ইংল্যান্ডের বিখ্যাত দ্য নেশন পত্রিকায় ‘অ্যান ইন্ডিয়ান মিষ্টিক’ নামে গীতাঞ্জলির-র আলোচনা করেছিলেন, আলোচনাটি প্রকাশিত হয় ১৬ নভেম্বর ১৯১২। সেখানে ইভলীন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনা করেছেন বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মরমিয়া সাধককবিদের:
“… তাঁর এই পরাদৃষ্টি (Vision) শ্রেষ্ঠ মরমিয়া কবিদের সঙ্গে তুলনীয়। তাঁদের লেখায় – প্রাচ্যে হোক, পাশ্চাত্যে হোক – সেই সৌরভটি পাওয়া যায়। সুফী জালালুদ্দিন রুমি, ফ্রান্সেস্কান জ্যাপোন দ্য টোডি, সংযমী অথচ তীব্রতাময় কার্মেলাইট সেইন্ট জন অফ দ্য ক্রস। … এঁদের এই অতিক্ষুদ্র তালিকাটিতে এবার আরেকটি নাম যোগ করতে হবে, বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।…
পরের বছর ৭ই মে রবীন্দ্রনাথ লণ্ডনে লেডি ফ্লাওয়ারের বাড়িতে ‘রাজা’-র অনুবাদ পাঠ করেন – অনুষ্ঠানের বিবরণ দিয়ে কালীমোহন লিখছেন: “৭ই মে—রাত্রি ৮টার সময় ২৬নং গিলবার্ট স্ট্রীটে Lady Flower-এর বাড়ীতে রাজার অনুবাদ পাঠ করিলেন। … উচ্চারণ, পড়ার ধরণ অতি চমৎকার। ঠিক যেন বাংলাই পড়ছেন। … কবির পড়ার ভঙ্গি তাদের খুব ভাল লেগেছে।…আমার খুব ভাল লাগছিল।
Evelyn Underhill [Mrs. Stuart Moore] সম্ভবত শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন তিনি 9 May রবীন্দ্রনাথকে লেখেন: “… আপনার লেখা নাটকটি আপনি পড়লেন কাল রাত্রে – এ জিনিস শুনতে পাওয়া একটা বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার”…
‘Saturday’ [? 10 May] Evelyn Underhill লিখছেন: “সোমবার বিকেলে আপনার সঙ্গে দেখা হবে বলে আমি উন্মুখ হয়ে আছি। সেন্ট পলস্-এর ডীন আসতে পারেন – তিনিও আপনার সঙ্গে পরিচিত হতে উৎসুক। আপনার কাছে যদি ‘রাজা’-র একটি বাড়তি পাণ্ডুলিপি থাকে সেটি কি অনুগ্রহ করে আমার পড়বার জন্য নিয়ে আসতে পারেন”?… দুটি প্রস্তাবই রবীন্দ্রনাথেক টেনে আনার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
২ জ্যৈষ্ঠ [শুক্র 16 May] রবীন্দ্রনাথ 50, Campden Hil Square-এ ইভলিন আণ্ডারহিলের বাড়ি গিয়ে তাঁকে না পেয়ে ফিরে আসেন; আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করে 18 May ইভলিন তাঁকে লেখেন: “…আপনি যদি আগামী ২৮শে বুধবার আমাদের বাড়িতে নৈশাহার গ্রহণ করেন তাহলে আমাদের দুজনেরই খুব ভাল লাগবে। কোনো পার্টি নয় – শুধু আমরা ক’জন”।…
অজিতকুমারও কবীরের পরিচিতি-বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছিলেন, সেটি তিনি ইভলিনকে প্রেরণ করে অজিতকুমারকে লেখেন: “তিনি এই বইয়ের একটা ভূমিকা লিখবেন তাই তাঁর পক্ষে এ লেখা আবশ্যক হবে—এর জন্যেই এতদিন অপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর ভূমিকা সুদ্ধ বের হলে এ বইয়ের আদর হবে —এই জন্যে একটু দেরি হলেও সেটা স্বীকার করতে হবে”।
রবীন্দ্রনাথ ইভলিনকে পরপর দুটি চিঠি লেখেন, প্রত্যুত্তরে ২২ আগষ্ট ৮২টি কবিতার পাণ্ডুলিপি [? টাইপ-কপি] পাঠিয়ে ইভলিন আবার জানান, শরৎ-শেষের আগে তাঁর ভূমিকা ও টীকা লেখা সম্পুর্ণ হবে না। অথচ 1 Sept. [সোম ১৬ ভাদ্র] পরদিন তাঁকে চা-পানের আমন্ত্রণ জানিয়ে লেখেন: লেখন: ‘The M.S. of the Introduction to Kabir I’d asked my typist to return to you direct & hope that it will reach you at Chelsa before you sail.’ রবীন্দ্রনাথ 3 Sept. লণ্ডন ত্যাগ করেন।
কবীর বিষয়ে তাঁর এই প্রস্তাবিত প্রবন্ধটি – ‘মরমিয়া তাঁতি কবীর’ – প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারি ১৯১৪ সংখ্যা কনটেম্পোরারি রিভিউ-তে।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়ের ঘটনা ইভলীন আন্ডারহীলের অন্তর্জীবনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সে বিষয় নিয়ে লিখেছেনও একটি চিঠিতে, – “… যেসব জিনিসকে আমি গুরুত্ব দিই, কিন্তু যার সম্বন্ধে আমি এত কম জানি – সেই সব ব্যাপারে যিনি গুরুস্থানীয়, এইরকম একজন মানুষের সঙ্গে এই প্রথম পরিচয় হওয়ায় অভিভূত হয়ে আছি আমি। … গুরু তাঁর শিষ্যকে এমন কিছু দেন যা শিষ্যের পক্ষে অন্য কোনোভাবে আহরণ করা সম্ভব নয়। যেন, যে ভাষা আমি শুধু বর্ণপরিচয় পর্যন্ত জানি, সেই ভাষায় কাউকে নিখুঁতভাবে কথা বলতে শুনেছি”।…
শেষ জীবনে অবশ্য ইভলীন আন্ডারহীলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আর খুব যোগাযোগ ছিল না। উভয়েই শেষ জীবনে অসুস্থ হয়েছিলেন, বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে মর্মান্তিকভাবে ক্ষু্ব্ধ হয়েছিলেন; মৃত্যুতেও তাঁদের মধ্যে সময়ের ব্যবধান অল্পই – ইভলীন মারা যান ১৯৪১ সালের ১৫ জুন, রবীন্দ্রনাথ ৭ আগষ্ট।
ঋণ: রবিজীবনী – প্রশান্ত কুমার পাল। রবীন্দ্রসূত্রে বিদেশিরা – সমীর সেনগুপ্ত।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!