আজকের লেখায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত
রবীন্দ্রনাথের ‘দেশনায়ক’ নেতাজী
সুভাষচন্দ্র দেশত্যাগ করেছিলেন আফগানিস্তানের পথে জানুয়ারির [১৯৪১] মাঝামাঝি [১৬ই জানুয়ারি] আর রবীন্দ্রনাথ আসন্ন মৃত্যুর কয়েকমাস আগে [১৫-২২শে মে, ১৯৪১] ‘বদনাম’ বলে একটি ছোটগল্প লিখলেন যেখানে দেখা যাচ্ছে বিপ্লবী অনিল তাৎপর্যপূর্ণভাবে আফগানিস্তান পেরোচ্ছেন – বলছেন, ‘আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাঁধন কি তোদের আছে!’ … এই গান অনেক বার গেয়েছি, আবার গাইব, তার পরে চলব আফগানিস্থানের রাস্তা দিয়ে, যেমন করে হোক পথ করে নেব। আপনাদের সঙ্গে এই আমার কথা রইল। আর পনেরো দিন পরে খবরের কাগজে বড়ো বড়ো অক্ষরে বের হবে, অনিল বিপ্লবী পলাতক। আজ প্রণাম হই।’…. সুভাষচন্দ্রকে রবীন্দ্রনাথের এর চেয়ে বড় ট্রিবিউট বা অভিনন্দন আর কি হতে পারে?
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রথম চিঠি:
সেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের কখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, কখন তাঁদের মধ্যে পত্র বিনিময় শুরু হয় সঠিক ভাবে জানা না গেলেও সুভাষচন্দ্রের বয়স যখন পনেরো, কটকের রাভেনশ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র, রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গ টেনে বিলেতে তাঁর মেজদা শরৎচন্দ্র বসুকে লিখছেন, “সেখানে বাংলার ঋষি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্বন্ধে আপনি হয়ত অনেক কিছু পড়িবেন ও শুনিতে পাইবেন। তাহার সম্বন্ধে পড়িয়া ও বিদেশিরা তাঁহাকে যে সম্মান দেখাইয়াছে তাহা জানিয়া আমরা সকলে এত গৌরব অনুভব করি যে তাহাতে সাময়িকভাবে হইলেও আমার বাংলা ও ভারতের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধেও আশান্বিত হই।” [সমগ্র রচনাবলী সুভাষচন্দ্র বসু। প্রথম খণ্ড। সম্পাদনা শিশির কুমার বসু। আনন্দ পাবলিশার্স। সংস্করণ ১৯৮০।]
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ:
যতদূর জানা যায় ১৯১৪ সাল নাগাদ সুভাষচন্দ্র একদল ছাত্র নিয়ে শান্তিনিকেতনে গিয়ে কবির সাথে সাক্ষাৎ করেন। সেদিন তিনি ছাত্রদের কর্তব্য বা করণীয় বিষয় সম্পর্কে কবির কাছে উপদেশ চান। কবি সেদিন তাঁদের পল্লী-উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করবার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তরুণ সুভাষচন্দ্র ও তাঁর বন্ধুদের এ উপদেশ ঠিক মনঃপুত হয়নি, – অর্থাৎ তার তাৎপর্য সেদিন তাঁরা ঠিক উপলব্ধি করতে পারেননি, একথা সুভাষচন্দ্র স্বয়ং পরে বলেছেন। শ্রীনিকেতনের স্থায়ী শিল্প ভান্ডার উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, “নানা রূপ ভাবধারার সংঘাত তখন দেশে চলিতেছিল। কবির নিকট হইতেও কবিজনোচিত উদ্দীপনাময়ী বাণীই তাঁহারা প্রত্যাশা করিয়াছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলিলেন শুধু গ্রামসংগঠনের কথা – এই নীরস কথা শুনিয়া সেই তরুণ বয়সে তাঁহারা মোটেই প্রীত হন নাই”।
রবীন্দ্রনাথের ছাত্রশাসনতন্ত্র:
এর প্রায় দু-বছর পরে প্রেসিডেন্সী কলেজের জনৈক ভারত বিদ্বেষী ইংরাজ অধ্যাপক ওটেন-সাহেবকে (Prof. E.F.Oaten) সেখানকার ছাত্রদের দ্বারা প্রহার করার ফলে যে গোলমালের সৃষ্টি হয়, তার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ সুভাষচন্দ্রকে কলেজ থেকে বহিস্কার করেন।
এই ঘটনাটি উপলক্ষ করেই রবীন্দ্রনাথ এইসময় ‘ছাত্রশাসনতন্ত্র’ প্রবন্ধটি রচনা করেন। কবিতার একটি কপি বাংলার তদানীন্তন গভর্ণর লর্ড কার-মাইকেল-এর কাছে পাঠিয়ে দেন এই আশায় যে, কী ভয়কংর আত্মাবমাননা ও অপমানজনক ব্যবহার করার ফলে ছাত্ররা এই রকম আচরণ করতে প্ররোচিত হয়েছিল, এই কথাটাই সকলকে বোঝাবার জন্য কবি সেদিন খোলাখুলি ছাত্রদের পক্ষ সমর্থন করে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ:
সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ ঘটে ভারতগামী জাহাজে। রবীন্দ্রনাথ তখন ইউরোপ ও আমেরিকা সফর করে দেশে ফিরছেন। এই ফেরার পথে জাহাজেই অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়। শোনা যায়, কবিই নাকি সুভাষচন্দ্রকে গান্ধীজীর কাছে নির্দেশ গ্রহণ করবার পরামর্শ দেন। সুভাষচন্দ্র ও গান্ধীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিলেন। বোম্বাই বন্দরে অবতরণ করে ঐ দিনই (১৬ই জুলাই, ১৯২১) অপরাহ্নে সুভাষচন্দ্র গান্ধীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গান্ধীজী তাঁকে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর নির্দেশানুযায়ী কাজ করবার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
অসহযোগ আন্দোলন – রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্র বিতর্ক
১৯২১ সালের ১০ই ডিসেম্বর দেশবন্ধু, মৌলানা আজাদ, সুভাষচন্দ্র ও আরও কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হলেন। বন্দী হবার পর জেল থেকেই তিনি তাঁর সভাপতির ভাষণটি লিখে পাঠান এবং এই ভাষণেও অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের তীব্র সমলোচনা করে তিনি লিখলেন, “আমাদের চরম লক্ষ্য স্বাধীনতা, কেননা জাতীয় ধারার অনুযায়ী করিয়া আমরা আমাদের স্বাতন্ত্র ফুটাইয়া তুলিবার এবং জাতির ভাগ্য গঠন করিবার অধিকার দাবী করিতেছি। আমরা চাইনা, ইহাতে পাশ্চাত্যের আরোপিত অনুষ্ঠানগুলি আমাদের প্রতিবন্ধকতা করে, অথবা পাশ্চাত্য সভ্যতা তাহার শিক্ষা দ্বারা আমাদিগকে উদভ্রান্ত করিয়া তুলে। এইখানে আমি ভারতের কবি রবীন্দ্রনাথের বাণী শুনিতে পাইতেছি, তাহা আমায় বাধা দিয়া বলিতেছে, ‘পাশ্চাত্যের সভ্যতা আজ আমাদের দ্বারে অতিথি হইয়া আসিয়াছে, আমরা কি আতিথেয়তা ভুলিয়া গিয়া তাহাকে বিমুখ করিব; আমরা কি স্বীকার করিব না যে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সম্মেলনেই জগতের মুক্তি নিহিত রহিয়াছে”।
সরস্বতী পূজা – রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্র বিতর্ক
কিন্তু ১৯২৮ সালে সিটি কলেজের ছাত্রাবাসে সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ সুভাষচন্দ্রের প্রতি প্রচন্ডভাবে রুষ্ট হন। ব্রাহ্মদের পরিচালিত এই শিক্ষা প্রতষ্ঠানে মূর্তিপূজা ছিল নিষিদ্ধ। ছাত্রদের একাংশ এই নিয়ম লঙ্ঘন করে পুজো করলে কলেজ পরিচালন কতৃপক্ষ তাদের জরিমানা করে। ছাত্রদের সমর্থনে এগিয়ে আসেন সুভাষচন্দ্র, যা আদৌ রবীন্দ্রনাথের মনোঃপুত হয়নি।
৯ই আগষ্ট রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এক চিঠি লিখে তিনি তাঁর ক্ষোভ ও বিরক্তি প্রকাশ করেন, “সুভাষ বোস অত্যন্ত বাড়াবাড়ি করতে বসেছে। এত মিথ্যা, এত কপটতা, এত অন্যায় জেদ। ও লোকটার পরে শ্রদ্ধা একেবারেই চলে গেছে”।
এর কিছুদিন পরে ১৮ই জানুয়ারি [১৯২৯] রবীন্দ্রনাথ আরও একটি চিঠি লেখেন। প্রাপক দিলীপ কুমার রায়।
“সিটি কলেজের ব্যাপারে আমি বেশ করেই দেখেছি সে ঝুটো। সে আপনাকে ও অন্যকে ঠকাতেই চেয়েছে – উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য। সে উদ্দেশ্য যাই হোক, তবে ভিতরকার এই মিথ্যা ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে যখন থেকে সুভাষ বাহিরের দিকে নিজেকে স্ফীত করে দেখতে ও দেখাতে চেয়েছে। সমস্ত দলের উপর মস্ত কর্তৃত্ব করার লোভ তাঁকে পেয়ে বসেছে”।…
ভালোবাসা – রবীন্দ্রনাথের কবিতা
তবে রবীন্দ্রনাথের কবিতা যে তাঁর ভালো লাগে তাই নয় অনেক সময়ে তিনি নিজের ভাব প্রকাশের জন্য তাঁর কবিতারও আশ্রয় নিয়েছেন।
বন্ধু দিলীপ কুমার রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তিনি মাঝেমাঝেই আবৃত্তি করতেন
এসেছে সে এক দিন
লক্ষ পরানে শঙ্কা না জানে
না রাখে কাহারো ঋণ।
জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য,
চিত্ত ভাবনাহীন।
১৯২৫ সালের ১২ই আগষ্ট মান্দালয় জেল থেকে শরৎচন্দ্রকে লেখেন, “এখানে না এলে বুঝতুম না সোনার বাংলাকে কত ভালবাসি। আমার সময়ে সময়ে মনে হয় বোধ হয় রবিবাবু কারারুদ্ধ অবস্থা কল্পনা করে লিখেছিলেন –
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি”॥
উৎকন্ঠা – রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতায় টেলিগ্রাম
১৯৩০ সালে ২৩শে জানুয়ারি সুভাষচন্দ্রের ৯ মাস কারাদণ্ড হয়। ২৩শে সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ তখনও রাশিয়ায়। রাশিয়া ভ্রমণের পর কবি আমেরিকা যান [৯ই অক্টোবর]। এই আমেরিকা ভ্রমণ কালে কবি নিউ-হ্যাভেন এ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন [১৯শে অক্টোবর]। রয়টারের মাধ্যমে তারে-বেতারে এ খবর প্রচারিত হল। সুভাষচন্দ্র তখন কলকাতায়। কবির গুরুতর অসুস্থতার সংবাদে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে কলকাতাবাসীর পক্ষ থেকে আমেরিকায় কবিকে তার করলেন [২২শে অক্টোবর: কলকাতা]
“City of Calcutta anxious about your illness. On behalf of the citizens, I wish speedy recovery and safe return home”.
কয়েকদিন পর কবি একটু সুস্থ হয়ে উঠলে সুভাষচন্দ্রকে একটি জবাবী তার করলেন [৩রা নভেম্বর], –
‘ধন্যবাদ, পূর্বাপেক্ষা অনেকটা ভালো আছি। ইতি রবীন্দ্রনাথ’।
জুজুৎসু শিক্ষা – রবীন্দ্রনাথের অনুরোধ
তারপর বসন্ত উৎসবের সময় কবি কলকাতায় এসেছেন। বসন্ত উৎসবের পর কলকাতায় ‘নবীন’ গীতিনাটিকাটি মঞ্চস্থ করা এবং সেই সাথে তাগাগাকি এবং তাঁর শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সেখানে জুজুৎসুর ক্রীড়া-কসরৎ দেখাবার ব্যবস্থা করা হয়।
প্রসঙ্গত বলা দরকার ১৯২৯ সালে কবি কানাডা থেকে ফেরার পথে কবি জাপানে গিয়ে জুজুৎসু ও জুডোর ক্রীড়া-কসরৎ দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হন। জাপান থেকে ফেরার সময় তাকাগাকি সান্নামে জাপানের এক প্রখ্যাত জুজুৎসু-বীরকে শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের জুজুৎসু শিক্ষা দেওয়ার জন্য আনবার ব্যবস্থা করে আসেন।
কিন্তু তাকাগাকির মত গুণী মানুষকে ধরে রাখা বা জুজুৎসু শিক্ষা প্রসারের ব্যাপারে কিছু করা গেল না, এ চিন্তা তাঁর মনে ক্ষণে ক্ষণে কাঁটার মত বিঁধছিল। কয়েকদিন পর তাকাগাকিকে কলকাতায় রাখার ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়ে কবি সুভাষচন্দ্রকে এক চিঠি লিখলেন, –
কল্যণীয়েষু
তোমার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্ঠা করেছিলুম, তুমি তখন দূরে গিয়েছিলে। তুমি জানো বহু অর্থ ব্যয় করে জাপানের একজন সুবিখ্যাত জুজৎসুবিদকে আনিয়েছিলুম। দেশে বারেবারে যে দুঃসহ উপদ্রব চলছিল তাই স্মরণ করে আমি এই দুঃসাহসে প্রবৃত্ত হয়েছিলাম। মনে আশা ছিল দেশের লোক সকৃতজ্ঞ চিত্তে আমার দায়িত্ব লাঘব করে এই দুর্লভ সুযোগ গ্রহণ করবে। দুই বছরের মেয়াদ আগামী অক্টোবরে পূর্ণ হবে। … এখন এই লোকটিকে তোমাদের পৌর শিক্ষা বিভাগে নিযুক্ত করবার কোনও সম্ভাবনা হতে পারে কিনা আমাকে জানিয়ো। যদি সম্ভব না হয় তাহলে একে জাপানে ফিরে পাঠাবার ব্যবস্থা করে দেবো।
আমার নববর্ষের আশীর্বাদ গ্রহণ করো।
ইতি ৩।৪ বৈশাখ ১৩৩৮
শুভাকাঙ্খি
(স্বাঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কিন্তু সুভাষচন্দ্রের পক্ষে কবির অনুরোধ রাখা সম্ভব হয়নি, কারণ ইতিমধ্যে মেয়র পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়।
বন্যাপ্লাবনে – রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র
১৯৩১ সালের ২৮-৩১ জুলাই উত্তর ও পূর্ব বঙ্গে এক ভয়াবহ বন্যাপ্লাবনে দেশের লোকের দুঃখ ও দুরবস্থা অবর্ণনীয় হয়ে উঠল। বহু লোক প্রাণ হারাল – কত যে ঘর-বাড়ি, ধানসম্পদ, শস্যক্ষেত ও গবাদি পশু নিহত হল তার আর ইয়ত্তা নেই।
রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতেনে। বন্যাপ্লাবনের খবরে খুবই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। ইতিমধ্যে কংগ্রেস ফ্লাড রিলিফ কমিটির পক্ষে জ্ঞানাঞ্জন নিয়োগী মশায় কবিকে এতে সাহায্য ও সহযোগিতা করবার আহ্বান জানিয়ে টেলিগ্রাম করেছিলেন, –
“Devastating flood East & North Bengal; suffering breaks all past records; immediate extensive help imperative; Pls. send your mite Subhas Bose or Bidhan Roy”
জবাবে কবি সঙ্গে সঙ্গে এক তারবার্তায় জানালেন (২০শে আগষ্ট):
“Our Institution raising flood relief funds which will be forwarded soon with my own contribution. – Tagore”
সুভাষচন্দ্র কবিকে কংগ্রেস রিলিফ কমিটির সভাপতির পদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালেন। ৩রা সেপ্টেম্বর বি.পি.সি. ফ্লাড রিলিফ কমিটির সভাপতিত্ব করতে সম্মতি জানিয়ে তিনি সুভাষচন্দ্রের কাছে [কংগ্রেসের নামে] চিঠি লিখে পাঠালেন, –
With Reference to your letter of date, if my being President of Your Relief Committee would be of any help in your good work would give me a great pleasure. You may issue appeals for funds, at your discretion in my name as such president.
Your’s Truly
Sd/- Rabindranath Tagore
পরদিন তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে এই তহবিল দান করার আবেদন জানিয়ে কবিতার আকারে কয়েক ছত্র লিখে সুভাষচন্দ্রের কাছে পাঠিয়েছিলেন। ৬ই সেপ্টেম্বর সুভাষচন্দ্র তা Liberty পত্রিকায় প্রকাশ করে লিখলেন,
“Dr. Rabindranath Tagore, who has kindly consented to become the President of the Bengal Congress Flood and Famine Relief Committee has addressed the following Appeal to the people,-
“অন্নহারা গৃহহারা চায় ঊর্ধ্বপানে,
ডাকে ভগবানে।
যে দেশে সে ভগবান মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে
সাড়া দেন বীর্যরূপে দুঃখে কষ্টে ভয়ে,
সে দেশের দৈন্য হবে ক্ষয়,
হবে তার জয়”।
ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল রচনা। কবিকে সুভাষচন্দ্রের চিঠি।
সুভাষচন্দ্র আবার গ্রেপ্তার। এবার গ্রেপ্তারের কিছুকাল পরে সুভাষচন্দ্র জেলখানায় খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই অবস্থায় ইংরেজ সরকার কতটা বাধ্য হয়েই তাঁকে ইউরোপে যাওয়ার উপদেশ দিলেন। এই সময়ই তিনি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজীর কাছে তার বিদেশে পরিচয় পত্র দেবার জন্য অনুরোধ জানান। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সেই সময় তাঁকে একটি ছোট্ট পরিচয় পত্র লিখে পাঠিয়েছিলেন। ১৮ই ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩, কবি জোড়াসাঁকো বাড়ি থেকে সুভাষচন্দ্রের জন্য পরিচয় পত্রে লিখে দেন, –
My friend Subhas Chandra Bose is going for his treatment. I earnestly hope my friends will be kind to him and help him. Sd/- Rabindranath Tagore
কিন্তু এই ধরণের পরিচয় পত্র সুভাষচন্দ্রের ঠিক মনঃপুত হয়নি, – এ ‘যেন অনুরোধ রক্ষার জন্য লেখা’। এ পরিচয় পত্রের তিনি যে সদ্ব্যবহার করেননি, এ কথা তিনি স্বয়ং কবিকে পরে লিখেছিলেন।
যাই-ই হোক, এর কয়েকদিন পরই সুভাষচন্দ্র ভিয়েনায় পৌঁছালেন (৮ই মার্চ, ১৯৩৩)। ভিয়েনাতে তিনি বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসাধীনে থেকে অচিরেই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেন। এর অনতিকাল পরেই তিনি তাঁর সুবিখ্যাত ‘The Indian Struggle’ গ্রন্থটি রচনা শুরু করেন। গ্রন্থ রচনা শেষ হবার মুখে তিনি ভিয়েনা থেকে রবীন্দ্রনাথকে একটা চিঠি লেখেন (৩রা আগষ্ট, ১৯৩৪)।
পরম শ্রদ্ধাস্পদেষু,
একটা বিশেষ কারণে আপনাকে বিরক্ত করিতেছি, আশাকরি তজ্জন্য আমাকে ক্ষমা করিবেন। লন্ডনে জনৈক প্রকাশকের অনুরোধে আমি এখন একটি পুস্তক লিখিতেছি। পুস্তকের বিষয় ‘The Indian Struggle, 1920-34’। প্রকাশকের নাম – Wishart and Company, 9 John Street, Adelphi, London, W. C. 2। আগষ্ট মাসের মধ্যেই আমার লেখা শেষ হইবে এবং অক্টোবরের মধ্যে বই প্রকাশিত হইবে। যে সময় Joint Select Committee’র রিপোর্ট সাধারণের অবগতির জন্য প্রকাশিত হইবে। পুস্তকের গোড়ায় ‘Historical Background’ শীর্ষক এক অধ্যায় থাকিবে এবং একেবারে শেষে ‘Coming Events’ শীর্ষক এক অধ্যায় থাকিবে। … আমি এখন চাই কোনও বিশিষ্ট লেখকের কাছ থেকে আমার পুস্তকের জন্য সূচনা বা Foreward.।
আমি নিজে খুব সুখী ও সন্তুষ্ট হইব যদি Benard Shaw-এর লেখনি থেকে কয়েকটি ছত্র পাই। এ বিষয়ে হয়ত আপনি সাহায্য করিতে পারিবেন। আপনি যদি Benard Shaw মহাশয়কে এ বিষয়ে লিখিতে পারেন তাহা হইলে বড় উপকৃত হইব। তবে আপনি যদি কোনও প্রকার সংকোচ বা অনিচ্ছা বোধ করেন তাহা হইলে আমি আপনাকে অনুরোধ করিতে চাই না। এবং আপনি যদি লেখা স্থির করেন, তাহা হইলে এমন ভাবে অনুরোধ করিয়া লিখিবেন যাতে প্রকৃতপক্ষে কিছু কাজ হয়। কেবল আমার অনুরোধ রক্ষার জন্য লিখিয়া কোনো লাভ নাই। আমি যখন ইউরোপে আসি, আপনি তখন অনুগ্রহ করিয়া Romain Rolland মহাশয়কে আমার সম্বন্ধে পত্র দিয়াছিলেন কিন্তু সে পরিচয় পত্র যেন অনুরোধ রক্ষার জন্য লেখা। সুতরাং সে পত্রের আমি সদ্বব্যহার করিতে পারি নাই এবং নিজেই Rolland মহাশয়ের সহিত পত্র ব্যবহার আরম্ভ করি। Benard Shaw মহাশয় বোধ হয় আমার সম্বন্ধে কিছুই জানেন না সুতরাং তাঁহাকে ভালো করিয়া লেখা দরকার হইবে।
আমি ভরসা করি যে আমার পুস্তকের আদর হইবে, কারণ প্রকাশক মহাশয় আমার সহিত Advance Contract করিয়াছেন এবং Royalty’র টাকা লইয়া আমি লেখা আরম্ভ করিয়াছি।
Benard Shaw ব্যতীত আর একজনের কাছ থেকে Foreward পাইলেও হইতে পারে – H G Wells. Rolland মহাশয়ের কথা আমার মনে হইয়াছিল কিন্তু তিনি প্রচণ্ড রকমের ‘গান্ধীভক্ত’, অথচ আমি তাহা নহি এবং তাঁহাকে সেকথা আমি জানাইয়াছি। সুতরাং Rolland মহাশয় যে আমার পুস্তকের সূচনা লিখিতে রাজি হইবেন সে আশা আমি করিতে পারিনা। Benard Shaw বা Wells মহাশয় মহাত্মাজী সম্বন্ধে উচ্চ ধারণা পোষণ করেন কিন্তু তাঁহারা অন্ধভক্ত নন – সুতরাং তাঁহারা হয়ত রাজি হইতে পারেন। আপনার কথাও আমার মনে হইয়াছিল কিন্তু আমি জানি না আপনি রাজনীতি-বিষয়ক পুস্তকের জন্য কিছু লিখিতে ইচ্ছুক হইবেন কি না তদ্ব্যাতীত, আপনি নিজে সম্প্রতি মহাত্মাজীর অন্ধভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন – অন্ততঃপক্ষে আপনার লেখা পাঠ করিলে সেরূপ ধারণা মানুষ পোষণ করিতে পারে। এরূপ অবস্থায় মহাত্মাজীর সমালোচনা আপনি বরদাস্ত করিতে পারিবেন কি না আমি জানি না। আমার পুস্তকটা হইবে, – an objective study of the Indian Movement from the standpoint of an Indian Nationalist”.।
Benard Shaw মহাশয়ের ঠিকানা, – 4 Witehall Court, London, S W. 1. – আপনি ইচ্ছা করিলে তাঁহাকে লিখিতে পারেন অথবা চিঠিটা আমার নিকট পাঠাইতে পারেন। আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ প্রনাম গ্রহণ করিবেন।
ইতি
আপনার অনুগত
সুভাষচন্দ্র বসু
রবীন্দ্রনাথকে এই ধরণের চিঠি লেখা একমাত্র বোধহয় সুভাষচন্দ্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল। সুভাষচন্দ্র সুভাষচন্দ্রই। এই অনুরোধ রক্ষার ব্যাপারে তাঁর অক্ষমতার কথা জানিয়ে জবাব দিয়ে কবি লিখেছিলেন, –
“স্নেহভাজনেষু
Benard Shaw-কে আমি ভালোমতো জানি; তোমার বইয়ের পূর্বভাষণ লেখবার জন্যে তাঁকে অনুরোধ করতে আমি সাহস করি নে। করলেও ফল হবে না এই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তোমার পাণ্ডুলিপিখানির এক কপি তুমি নিজেই তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেখতে পার। এতদিনে সংবাদপত্রযোগে নিশ্চয়ই তোমার পরিচয় পেয়েছেন।
এই উপলক্ষে একটা কথা তোমাকে বলা আবশ্যিক বোধ করি। মহাত্মা গান্ধী অতি অল্পকালের মধ্যে সমস্ত ভারতবর্ষের মনকে এক যুগ থেকে আর এক যুগে নিয়ে যেতে পেরেচেন। কেবল একদল রাষ্ট্রনৈতিকের নয় সমস্ত সমস্ত জনসাধারণের মনকে তিনি বিচলিত করতে পেরেচেন – আজ পর্যন্ত আর কেউ তা পারেনি। এর পূর্বে ভারতবর্ষের এখানে ওখানে ইংরেজি শিক্ষিতদের মধ্যে দুর্বল রকমের রাষ্ট্রনৈতিক সুড়সুড়ি লেগে ছিল মাত্র। মহাত্মাজীর চরিত্রের মধ্যে এই একটা প্রবল নৈতিকশক্তিকে ভক্তি যদি না করতে পারি তবে সেইটেকেই বলব ‘অন্ধতা’। অথচ তাঁর সঙ্গে আমার স্বভাবের বুদ্ধির ও সংকল্পের বৈপিরত্য অত্যন্ত প্রবল। মনের দিকে কল্পনার দিকে ব্যবহারের দিকে তিনি আর আমি সম্পুর্ণ বিভিন্ন শ্রেণীর জীব। কোনো কোনো বিষয়ে তিনি দেশের ক্ষতি করেছেন – কিন্তু দেশের নির্জীব চিত্তে হঠাৎ যে বল এনে দিয়েচেন একদিন সেটা সমস্ত ক্ষতিকে উত্তীর্ণ হয়ে টিঁকে থাকবে। আমরা কেউই সমস্ত দেশকে এই প্রাণশক্তি দিইনি।
ইতি তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
‘বন্দেমাতরম্’ সঙ্গীত বিতর্ক: সুভাষচন্দ্রের সম্মতি
১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ‘বন্দেমাতরম্’ সংগীতকে উপলক্ষ করে খুবই বিতর্ক উঠল একে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া যাবে কিনা। স্মরণে রাখা দরকার ১৮৯৬ সালে কলকাতা কংগ্রেসের অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথই সর্বপ্রথম বন্দেমাতরম্ গানটি সুর সংযোগ করে গিয়েছিলেন। মুসলমানদের মূল বক্তব্য এই যে, এই গানে সুস্পষ্টভাবে হিন্দু পৌত্তলিক দেবী দুর্গার স্তব আছে (যথা – “ত্বং হি দূর্গা দশপ্রহরণধারিণী” ইত্যাদি); দ্বিতীয়ত এই গান বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’-এ বর্ণিত মুসলিম বিদ্বেষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং এই কারণেই এটি জাতীয় সঙ্গীত হতে পারেনা। অপরপক্ষে বাঙালি হিন্দুদের মূল বক্তব্য হল এই যে, ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি ও গানটি অর্ধশতাব্দীকাল ধরে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করেছে এবং এরই জন্য সহস্র সহস্র মানুষ এতকাল কারা-বরণ ও দুঃখ নির্যাতন ভোগ করেছে। এ গান স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাই এই গানটিই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে মর্যাদা পাবার অধিকারী।
যাই হোক, ‘বন্দেমাতরম্’ সঙ্গীত বিতর্কের ব্যাপারটি কবি খুব বাস্তব ও ভাবাবেগহীন দৃষ্টিতে বিচার করবার চেষ্ঠা করে সুভাষচন্দ্রকে লেখেন,
সুহৃদ্বর,
বন্দেমাতরম গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দূর্গার স্তব একথা এতই সুস্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক চলে না। অবশ্য বঙ্কিম এই গানে বাংলা দেশের সঙ্গে দূর্গাকে একাত্ম করে দেখিয়েছেন, কিন্তু স্বদেশের এই দশভূজামূর্তিরূপের যে পূজা সে কোনো মুসলমান স্বীকার করে নিতে পারে না। এবারের পূজা সংখ্যার বহু সাময়িক পত্রেই দূর্গাপূজার প্রসঙ্গে বন্দে মাতরম্ গানের শ্লোকাংশ উদ্ধৃত করে দিয়েছে – সহজেই দূর্গার স্তব রূপে একে গ্রহণ করেছে। আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাহিত্যের বই, তার মধ্যে এই গানের সুসংগতি আছে। কিন্তু যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষে সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীনভাবে সংগত হতেই পারে না। বাংলাদেশের একদল মুসলমানের মধ্যে যখন অযথা গোঁড়ামির জেদ দেখতে পাই তখন সেটা আমাদের পক্ষে অসহ্য হয়। তাদের অনুকরণ করে আমরাও যখন অন্যায় আবদার নিয়ে জেদ ধরি তখন সেটা আমাদের পক্ষে লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে। বস্তুতঃ এতে আমাদের পরাভব।…
এখনও ডাক্তারদের চিকিৎসাধীনে আছি। – নিস্কৃতি পাই নি, শরীরও যথোচিত কর্মক্ষম হয় নি।
ইতি – ১৯।১০।৩৭ তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মোট কথা সরকারি চাকরিতে হিন্দু মুসলমানের ভাগবাঁটোয়ারা, হিন্দিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ এবং ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত বিতর্ক – এর কোনটিই সুভাষচন্দ্র সংকীর্ণ বাঙালি হিন্দুর দৃষ্টিতে বিচার করেননি। এই প্রসঙ্গে সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হিসেবে ‘সুভাষচন্দ্র ও নেতাজী সুভাষচন্দ্র’ বইয়ে লিখেছেন, “… অন্যান্য কথার পরে সুভাষচন্দ্রকে কালিদাস রায় জিজ্ঞাসা করলেন. – ‘বন্দেমাতরম্ গানটি আপনার সভাপতিত্বেই আংশিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে – এতে অবশ্যই আপনার সম্মতি ছিল’? সুভাষবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার সম্মতি না থাকলে আমি নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করতাম। শুধু বাংলার দিক থেকে বা বিশেষ কোনও ধর্ম বা জাতির দিক থেকে কোনও বিষয়ের বিচার কংগ্রেস করতে পারেনা। আজ সমস্ত সমস্যাকে সর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করতে হবে। সেই জন্যে সর্ববাদী-সম্মতভাবে যে অংশটুকু গৃহীত হয়েছে তাতে বন্দেমাতরম্ সঙ্গীতের মর্যাদা কোনও মতে ক্ষুন্ন হয়নি বলেই আমি মনে করি”। রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুরোধে ১৯৩৮ সালের ৮ই ডিসেম্বর কলকাতার কর্নওয়ালিশ স্ট্রীটে শ্রীনিকেতনের শিল্পভবনের একটি স্থায়ী ভান্ডার [শ্রীনিকেতনের গৃহ শিল্প জাত সামগ্রীর ভান্ডার] উদ্বোধন করলেন সুভাষচন্দ্র।
রাষ্ট্রনেতা সুভাষচন্দ্র – কবির তাসের দেশ নাটিকা উৎসর্গ
শ্রীনিকেতনের শিল্প ভান্ডারের উদ্বোধনের কিছুকাল পরে [২১শে জানুয়ারি ১৯৩৯] সুভাষচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার জন্য শান্তিনিকেতন যান। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্বাগত ভাষণে বলেছিলেন, “… আমরা খুশি হয়েছি আজ তোমাকে এখানে পেয়ে … এখানে দেশের যে সাধনা সে তোমাকে জানতে হবে, স্বীকার করতে হবে, গ্রহণ করতে হবে … তোমাকে আমি রাষ্ট্রনেতা রূপে স্বীকার করছি মনে মনে। আমার সংকল্প আছে, জনতার মধ্যে আমার সেই বাণী আমি প্রকাশ করব। তুমি বাঙলা দেশের রাষ্ট্রীয় অধিপতির আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছ, অন্য দেশকে আমি জানি না, সেখানে আমার জোর খাটবে না, আমি বাঙালি বাংলাকে জানি – বাংলার প্রয়োজন অসীম, সেইজন্য যদি তোমাকে আহ্বান করি, স্বীকার করতে হবে – আগামী ৩রা ফেব্রুয়ারি কলকাতায় আমি তোমাকে আহ্বান করব রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ নিয়ে”।…
এর পর মাঘ, ১৩৪৫ সালে (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯) তিনি ‘তাসের দেশ’ নাটিকা সুভাষচন্দ্রকে উৎসর্গ করেছিলেন। উৎসর্গ পত্রে বলা হয়েছিল – “কল্যাণীয় শ্রীমান সুভাষচন্দ্র, – স্বদেশের চিত্তে নূতন প্রাণ সঞ্চার করবার পুণ্যব্রত তুমি গ্রহণ করেছ, সেই কথা স্মরণ ক’রে তোমার নামে “তাসের দেশ’ নাটিকা উৎসর্গ করলুম”।
সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগ – সুভাষচন্দ্রকে দেশনায়ক পদে কবির বরণ।
এর কিছুদিন পরেই শুরু হল কংগ্রেসের মধ্যে অচলাবস্থা। শেষ পর্যন্ত অচলাবসস্থা কাটাতে সুভাষচন্দ্র পদত্যাগ করলেন ২৯শে এ্রপ্রিল ১৯৩৯। সুভাষচন্দ্রের পদত্যাগ রবীন্দ্রনাথকে দারুণ আঘাত দিয়েছিল। তিনি সুভাষচন্দ্রের প্রশংসা করে এক টেলিগ্রাম পাঠিয়ে বললেন, “অত্যন্ত বিরক্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়িয়াও তুমি যে ধৈর্য্য ও মর্যাদা বোধের পরিচয় দিয়াছ, তাহাতে তোমার নেতৃত্বের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের উদ্রেক হইয়াছে। আত্মসম্মান রক্ষার জন্য বাঙলাকে এখনও সম্পুর্ণরূপে ধীরতা ও ভদ্রতাবোধ অব্যাহত রাখিতে হইবে; তাহা হইলে আপাতদৃষ্টিতে যাহা তোমার পরাজয় বলিয়া মনে হইতেছে তাহাই চিরন্তন জয়ে পরিণত হইবে”।
মে মাসে সুভাষচন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে ‘দেশনায়ক’ নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন। ‘দেশনায়ক’-এর শুরুতেই তিনি বললেন, “সুভাষচন্দ্র, বাঙালি কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি। গীতায় বলে, সুকৃতের রক্ষা ও দুষ্কৃতের বিনাশের জন্য রক্ষাকর্তা বারংবার আবির্ভূত হন। দুর্গতির জালে রাষ্ট্র যখন জড়িত হয় তখনই পীড়িত দেশের অন্তর্বেদনার প্রেরণায় আবির্ভূত হয় দেশের অধিনায়ক।,,,, সুভাষচন্দ্র, তোমার রাষ্ট্রিক সাধনার আরম্ভক্ষণে তোমাকে দূর থেকে দেখেছি। সেই আলো আধারের অস্পষ্ট লগ্নে তোমার সম্বন্ধে কঠিন সন্দেহ জেগেছে মনে,তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে দ্বিধা অনুভব করেছি। আজ তুমি যে আলোকে প্রকাশিত তাতে সংশয় আবিলতা আর নেই, মধ্যদিনে তোমার পরিচয় সুস্পষ্ট, বহু অভিজ্ঞতা কে আত্মসাৎ করেছে তোমার তোমার জীবন, কর্তব্যক্ষেত্রে দেখলুম তোমার যে পরিণতি তার থেকে পেয়েছি তোমার প্রবল জীবনী শক্তির প্রমাণ। এই শক্তির কঠিন পরীক্ষা হোয়েছে কারাদু:খে, নির্বাসনে, দু:সাধ্য রোগের আক্রমণে, কিছুতে তোমাকে অভিভূত করেনি। তোমার চিত্তকে করেছে প্রসারিত, তোমার দৃষ্টি কে নিয়ে গেছে দেশের সীমা অতিক্রম করে ইতিহাসের দূর বিস্তৃত ক্ষেত্রে। দু:খকে তুমি করে তুলেছো সুযোগ, বিঘ্নকে করেছো সোপান। সে সম্ভব হোয়েছে যেহেতু কোনো পরাভব কে তুমি একান্ত সত্য বলে মানো নি। তোমার এই চরিত্র শক্তিকেই বাংলাদেশের অন্তরের মধ্যে সঞ্চারিত করে দেবার প্রয়োজন সকলের চেয়ে গুরুতর”।
রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের শেষ সাক্ষাৎ
২৯শে জুন, ১৯৪০ – অ্যালবার্ট হলের সভায় সুভাষচন্দ্র প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন তিনি ৩রা জুলাই ‘হলওয়েল মন্যুমেন্ট’ অপসারণের দাবীতে যে মিছিল হবে তাঁর নেতৃত্ব দেবেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করলেন ২রা জুলাই সকাল এগারোটার সময়। প্রেস রিপোর্ট (ইউনাইটেড প্রেসের সংবাদদাতা) থেকে জানা যায় উভয়ের মধ্যে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। প্রায় এক ঘন্টার উপর আলোচনার শেষে সুভাষচন্দ্র এলগিন রোডের বাড়িতে ফেরার দেড়ঘন্টার মধ্যে ভারতরক্ষা আইনের ১২নং ধারায় গ্রেপ্তার হলেন। তাঁকে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্রের এই ছিল শেষ সাক্ষাৎকার।
২৯শে নভেম্বর ১৯৪০, সুভাষচন্দ্র জেলে যাওয়ার পর মুক্তির দাবীতে আমরণ অনশন শুরু করলেন। এগারো দিন অনশনে কাটাবার পর সরকার বাধ্য হলেন মুক্তি দিতে। অনশনের দিনগুলিতে তাঁর কাছে পৌঁছেছিল রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতার সংবাদ। কিন্তু সুভাষচন্দ্র তখন এলগিন রোডের বাড়িতে নজরবন্দী। ১১ই জানুয়ারি ১৯৪১, তিনি এলগিন রোডের বাড়ি থেকে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে রবীন্দ্রনাথের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানতে চেয়ে এক চিঠি লেখেন। চিঠির শেষে লিখেছিলেন, “গুরুদেবের শরীর আজকাল কেমন আছে লিখিয়া বাধিত করিবেন”।
এই চিঠি লেখার সাতদিন পরে (১৬ই জানুয়ারি, ১৯৪১) সুভাষচন্দ্র চিরকালের মত দেশত্যাগ করলেন।
সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধান: রবীন্দ্রনাথের উৎকন্ঠা
সুভাষচন্দ্রের অন্তর্ধানের খবর পেয়ে মেজদা শরৎচন্দ্র বসুকে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম করেন শান্তিনিকেতন থেকে, “Deeply concerned over Subhas’s disappearance. Convey mother my sympathy. Kindly keep me informed of news”.
শরৎচন্দ্র বসুর পক্ষে সুভাষচন্দ্রের গতিবিধি জানা সত্বেও রবীন্দ্রনাথকে জানানো সম্ভব ছিল না। তবু তিনি টেলিগ্রাম করেছিলেন, – “Mother and we profoundly touched by message. No news of Subhas yet despite utmost efforts last few days. Hope he will have your blessings wherever he may be”.
অমিয়নাথ বসু সমর গুহকে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছা ছিল সুভাষচন্দ্র দেশে ফিরলে শরৎচন্দ্র যেন তাঁর হয়ে প্রথম মালাটি সুভাষচন্দ্রের গলায় পরিয়ে দেন। ইতিহাসে অবশ্য সে ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে গেছে চিরকালের মত।
ঋণ: রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র – নেপাল মজুমদার। আমি সুভাষ বলছি – শৈলেশ দে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রিয় তিন মনস্বী – ড. শ্যামাপ্রসাদ বসু।