T3 || বর্ষ শেষে বর্ষবরণ || সংখ্যায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

বাঙালির বর্ষবরণ

আচার্য যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি পয়লা বৈশাখকে বাঙালির নববর্ষ উৎসব হিসাবে মানতেই চান না। তিনি তাঁর পূজা-পার্বণ [আশ্বিন ১৩৫৮] গ্রন্থে লেখেন, “কয়েক বৎসর হইতে পূর্ববঙ্গে ও কলিকাতায় কেহ কেহ পয়লা বৈশাখ নববর্ষোৎসব করিতেছে। তাহারা ভুলিয়াছে, বিজয়াদশমীই আমাদের নববর্ষারম্ভ। বৎসরে দুইটা নববর্ষোৎব হইতে পারে না। পয়লা বৈশাখে বণিকেরা নূতন খাতা করে। তাহারা ক্রেতাদিগকে নিয়ন্ত্রণ করিয়া ধার আদায় করে। ইহার সহিত সমাজের কোন সম্পর্ক নাই। নববর্ষ, প্রবেশের নববস্ত্রপরিধানাদি একটা লক্ষনও নাই”।
নববর্ষ উৎসব – হুতোমের ভাষায়: “‌ইংরেজরা নিউ ইয়ারের বড় আদর করেন। আগামীকে দাড়াগুয়া পান দিয়ে বরণ করে ন্যান – নেশার খোঁয়ারির সঙ্গে পুরানোকে বিদায় দেন। বাঙ্গালীরা বছরটি ভাল রকমেই যাক্ আর খারাবেই শেষ হোক্‌, সজ্‌নেখাঁড়া চিবিয়ে, ঢাকের বাদ্দি আর রাস্তার ধূলো দিয়ে পুরানোকে বিদায় দেন। কেবল কল্‌সি উচ্ছুগ্‌গুকর্ত্তারা আর নতুন খাতাওয়ালারাই নতুন বৎসরের মান রাখেন!”‌
হুতোম বাংলা নববর্ষ উৎসব উদ্‌যাপনকে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন, একটি পর্ব নববাবুদের উৎসব পালনের বিষয়। ধর্মীয় পূর্ণকলস উৎসর্গের মতো নববাবুরা বছর শেষকে বিদায় এবং মদের কলসী উৎসর্গ করে বাগানবাড়িতে নববর্ষকে স্বাগত জানাত। অন্য পর্ব দোকানদারদের হালখাতার মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদ্‌যাপন করা।
ঈশ্বর গুপ্ত’র নববর্ষ উৎসব – সাহেবদের নিউ ইয়ার পার্টিকে টেক্কা দেওয়া:
তবে, কেউ কেউ বলেন, কবি ঈশ্বর গুপ্তই নাকি প্রথম ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা করেছিলেন। কবি-সাংবাদিক ঈশ্বর গুপ্ত ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত সংবাদপত্র ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর সম্পাদক। তিনি বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এক বার ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর একটি বিশেষ সংখ্যাই প্রকাশ করে ফেললেন এবং সেই উপলক্ষে আয়োজন করলেন এক মহা ভোজসভা। শহরের তাবড় তাবড় ‘বাবু’ নিমন্ত্রিত হলেন সেখানে। লোকে লোকারণ্য, গমগম করছে ভিড়। এর আগে ইংরেজের উপনিবেশ কলকাতা মহানগরী এরকম জনসমাগম দেখেনি কখনও বাংলা নববর্ষে। এ যেন সাহেবদের নিউ ইয়ার পার্টিকে টেক্কা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন ঈশ্বর গুপ্ত।
সেখানে আজ চাঁদের হাট বসেছে। কে নেই সেখানে? হাটখোলার দত্তরা আছেন, জানবাজারের রাণী রাসমণির জামাই মথুর বিশ্বাস আছেন। প্রসন্ন ঠাকুর আছেন, ব্রজমোহন সিংহ আছেন। শ্যামাচরণ সেন আছেন, ধর্ম্মদাস পালিত আছেন। ঘুরে ঘুরে অতিথি আপ্যায়ণ করছেন ঈশ্বর গুপ্তের ভাই রাম গুপ্ত। সভাস্থলের একদিকে প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশ আর জয়গোপাল তর্কালঙ্কার দুজনে এক অভিনব চেষ্টা করছেন, সংস্কৃতে কবির লড়াই। সে দেখতে শুনতে লোকজন ভিড় করে এসেছে। একটা হাসির হররা উঠল, কারণ পাশ থেকে গৌরীশঙ্কর ওরফে গুড়গুড়ে ভটচায একটা আদিরসাত্মক উদ্ভট শ্লোক বললেন।
জোড়াসাঁকো থেকে এসে পৌঁছলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। শোভাবাজার থেকে আগেই এসে গেছেন রাজা রাধাকান্ত দেব। এই দুজন বাঙালি সমাজের দুটি অংশের নেতৃত্ব দেন, বাঙালির টোরি পার্টি আর হুইগ পার্টি বলতে পারেন। ওঁরা দুজনেই আজকের সভার মধ্যমণি। এককালে এই ঈশ্বর গুপ্তর উদ্যোগেই দেবেন ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে রাধাকান্ত দেবের ধর্ম্মসভার মিটমাট হয়েছিল। দেবেন ঠাকুরকে সভাস্থলে পদার্পণ করতে দেখে রাজা রাধাকান্ত দেব আসন ছেড়ে এগিয়ে গেলেন।
দুজন নক্ষত্র পরস্পরকে আলিঙ্গন করলেন আজ ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে। রাধাকান্ত দেব আর দেবেন ঠাকুর পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে যখন কোলাকুলি করলেন, সেই সময় সমবেত জনতার উল্লাস আর জয়ধ্বনি শুনে মনে হল, বাঙালির আজ বড় সুখের দিন।
কুশল বিনিময়ের পর রাধাকান্ত আর দেবেন দুজনেই একমত হলেন, আজ পয়লা বৈশাখে ঈশ্বর তার রচিত একটি কবিতা না শোনালেই নয়। গুপ্তকবি তখন খাঁটি বাংলায় ব্যাঙ্গাত্মক শব্দে নববর্ষের মৌজ-মস্তি ও খাওয়াদাওয়া নিয়ে সশব্দ ফুট কাটলেন, –
নববর্ষ মহাহৰ্ষ, ইংরাজটোলায়।
দেখে আসি ওরে মন, আয় আয় আয়॥…
সাহেবের ঘরে ঘরে, কারিগুরি নানা।
ধরিয়াছে টেবিলেতে, অপরূপ খানা॥
বেরিবেষ্ট, সেরিবেষ্ট, মেরিবেষ্ট যাতে।
আগে ভাগে দেন গিয়া শ্ৰীমতীর হাতে॥…
হিপ্‌ হিপ্‌ হোরে হোরে ডাকে হোল ক্লাস।
ডিয়ার ম্যাডাম ইউ টেক্‌ দিস্‌ গ্লাস।।
নববর্ষের ইতিহাস:
তবে বাংলা নববর্ষ পালনের সূত্রপাত ঠিক কে করেছিলেন তা বলা খুবই কঠিন। তবে কয়েকজন ঐতিহাসিক বাঙ্গলা দিনপঞ্জি উদ্ভবের কৃতিত্ব আরোপ করেন ৭ম শতকের রাজা শশাঙ্কের উপর। পরবর্তীতে মুঘল সম্রাট আকবর এটিকে রাজস্ব বা কর আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত করেন। ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের  প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে “বঙ্গাব্দ” বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয়।
হালখাতা – চোখের জলের নববর্ষ:
সত্যজিত রায় লিখেছিলেন, ‘বাকি রাখা খাজনা, মোটে ভালো কাজ না’। স্রেফ খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য, তারিখ-ই-ইলাহি বাদ দিয়ে নক্ষত্রের নামানুসারে লিখিত বঙ্গাব্দ নতুনভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন পহেলা বৈশাখ। উর্দু শব্দ পহেলা শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রথম এবং বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ যে একটি শুভদিন এ কথা শাস্ত্র বা বাংলা পঞ্জিকা কস্মিনকালেও দাবি করেনি। বছরের আর পাঁচটা দিনের মত এটি ছিল সাধারণ একটি দিন। তবে, এই দিনে সবচেয়ে আনন্দে থাকতেন বাংলার শাসক ও জমিদারেরা। তাঁদের কাছেই একমাত্র দিনটি শুভ ছিল।
পয়লা বৈশাখ ছিল জমিদারদের খাজনা উসুল উদযাপনের দিন। বাংলা বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ১ তারিখে রাজ পুণ্যাহ (রাজকর আদায়ের উৎসব) পালন করা হত। সেই সময়ে পুণ্যাহ আর বাংলা নববর্ষ সমার্থক ছিল। ফেলে আসা বছরের বকেয়া খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য হতেন প্রজারা। এবং জমিদারের কাছারি থেকে নতুন বছরের বন্দোবস্ত গ্রহণ করতেন। প্রজাদের অর্থশোক ভোলাতে চোখের জলে ভেজা পুণ্যাহ-এর মধ্যে সুচতুর ভাবে উৎসবের রঙ মেশানো হয়েছিল। মিষ্টিমুখের সঙ্গে সঙ্গে গান বাজনা, যাত্রা, মেলা প্রভৃতি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত প্রজাদের জন্য। প্রজাদেরই পয়সায়। ১৯৫০ সালে ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যাক্ট-এর অধীনে জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটে। সেই সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যায় পয়লা বৈশাখের রাজ পুণ্যাহ প্রথা। রয়ে যায় খাওয়া দাওয়া আর উৎসবের অংশটুকু।
বাবুদের নববর্ষ পালন:
প্রথম বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখটি পড়েছিল ইংরেজি ১২ এপ্রিল ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে। সোমবার। বঙ্গবাসী বাংলা ও ‌ইংরেজি দুটো নববর্ষ উনিশ শতকে কীভাবে পালন করত তার অনবদ্য বর্ণময় বিবরণ পাওয়া যায় হুতোম–‌এর নকশায়:‌
“বাবু আমোদ করতে যাবেন, তাই বাবুর স্ত্রীকে চুনট করা উড়ুনিটা, সোনায় কাজ করা হাতির দাঁতের ছড়িটা, রুমালটা হাতের উপর তুলে দিতে হত। রুমালটা হাতে নিয়ে হয়ত বাবু দেখলেন তাতে বোকে মাখানো নেই। ব্যাস্‌!‌ বাবু রেগে লাল, বললেন, বোকেটা আবার গেল কোথায়?‌ বাড়ির ‘‌মেয়েছেলেটা’‌ এটুকুও খেয়াল রাখতে পারে না। সে কি রাজকার্য্য করে!‌ কিসের জন্য তা হলে বিয়ে করা”?‌…
এদিকে শহরে সন্ধ্যাসূচক কাসোর ঘন্টার শব্দ থামলো। সকল পথের সমুদায় আলো জ্বালা হয়েছে। ‘বেলফুল’! ‘বরফ’! ‘মালাই’! চিৎকার শুনা যাচ্ছে। আবগারীর আইন অনুসারে মদের দোকানের সদর দরজা বন্ধ হয়েছে অথচ খদ্দের ফিরছে না। ক্রমে অন্ধকার গাঢাকা হয়ে এল। এ সময় ইংরাজি জুতো, শান্তিপুরে ডুরে উড়ুনি আর সিমলের ধুতির কল্যাণে রাস্তায় ছোটলোক ভদ্দরলোক আর চেনবার যো নাই।’ তুখোর ইয়ারের দল হাসির গররা ও ইংরেজি কথার ফররার সঙ্গে খাতায় খাতায় এর দরজায় তার দরজায় ঢুঁ মেরে বেড়াচ্চেন – এরা সন্ধ্যা জ্বালা দেখে বেরোলেন আবার ময়দা পেষা দেখে বাড়ি ফিরবেন! মেছোবাজারের হাঁড়িহাটা – চোরবাগানের মোড়, জোড়াসাঁকোয় পোদ্দারের দোকান, নতুন বাজার, বটতলা, সোনাগাজীর গলি ও আহারিটোলার চৌমাথা লোকারন্য – কেউ মুখে চাদর জড়িয়ে মনে কচ্চেন কেউ তাঁরে চিনতে পারবে না। আবার অনেকে চেঁচিয়ে কথা কয়ে, কেশে, হেঁচে, জানান দিচ্ছেন যে, তিনি সন্ধ্যার পর দুদণ্ড আয়েশ করে থাকেন।…
নববর্ষ – শোভাবাজার রাজবাড়িতে:
ধনী রাজগৃহে পয়লা বৈশাখে বসত শাস্ত্র-আলোচনা-সভা। সভা শেষে বাঈ-নাচের আসর। রাজা রাধাকান্ত দেববাহাদুরের (১৭৮৩-১৮৬৭) আমলে শোভাবাজার রাজবাড়িতে পয়লা বৈশাখে বসত তেমনি পণ্ডিত সম্মেলন। ভিন্ন পরিবেশের সে উৎসবের আদ্যোপান্ত ছবি মেলে দীনবন্ধু মিত্র-র (১৮৩০-১৮৭৩) সুরধনী কাব্যে—
বসিয়াছে বাবুগণ করি রম্য বেশ,
মাথায় জরির টুপি, বাঁকাইয়া কেশ,
বসেছে সাহেব ধরি চুরুট বদনে,
মেয়াম চকিছে ওষ্ঠ মোহন ব্যাঞ্জনে,
নাচিছে নর্ত্তকী দুটি কাঁপাইয়ে কর,
মধুর সারঙ্গ বাজে কল মনোহর,
বাঙালীর নববর্ষ ও সঙদের গপ্পো:
কোলকাতাতে সঙদের আবির্ভাব হয় বাবুকালচারের সময় থেকে। নানারকম পোষাক ও রঙিন সাজে সেজে, গান, অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদির দ্বারা সৃষ্টি করা হত হাস্যরস। মূলত গ্রামীণ লোকেদের মনোরঞ্জনের জন্য সৃষ্টি হলেও, সময়ের সাথে সাথে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের হাত ধরে এটি চলে আসে শহরাঞ্চলে। ঊনবিংশ শতক থেকেই কোলকাতা ও হাওড়াতে অঞ্চলভিত্তিক সঙদের শোভাযাত্রা বেরোতে থাকে। সেই দিনে কোলকাতার গলি ও রাজপথের বাড়ির বারান্দায়, ছাদে ও জানালায় আবালবৃদ্ধবনিতা সঙের শোভাযাত্রা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। কলকাতা হয়ে উঠত মিলন মেলার নামান্তর। গৃহস্থঘরে অতিথির জন্য তৈরি হত শরবত। থাকত পান তামাকের ব্যবস্থা। দর্শকের জন্য পথের উপর সামিয়ানা টাঙানো হত। তথাকথিত ইঙ্গবঙ্গ যুবককে নিয়ে লেখা সঙের গান —
“এখন ছেলেরা এক নতুন টাইপ
চোদ্দ না পেরতে পাকা রাইপ
মুখে আগুন ঢুকিয়ে পাইপ
একমাত্র life ধারণ wife এর চরণ কর্ত্তে ধ্যান…
তৎকালীন বাঙালি সমাজে বছরভর যে সব ঘটনা, দৃশ্য বা কথা দাগ কেটেছে তা আলোকিত হত সঙের ছড়ায় আর গানে।
জোড়াসাঁকোয় নববর্ষ উৎসব:
সরলাদেবী চৌধুরানী লিখছেন: আমাদেরও একটি পারিবারিক উৎসবের দিন ছিল যেদিন পরস্পরকে আলিঙ্গন প্রণামাদি করা হত। সে নববর্ষে, ১লা বৈশাখে। নতুন কাপড় পরার কতকটা রেওয়াজও সেইদিনটিতে ছিল। এক হিসেবে এইটিই আমাদের যথার্থ পারিবারিক মিলনের দিন। সেদিন অতি ভোরে ব্রাহ্ম মূহূর্তে দেউড়িতে ঘণ্টা বেজে উঠত। ঘুমিয়ে থাকলেও জেগে উঠে, বাড়িসুদ্ধ পুরুষেরা সকলে প্রস্তুত হয়ে নবশুভ্রবস্ত্র পরিধান করে, উঠানে উপাসনা-সভায় সমবেত হতেন, আর মেয়েরা খড়খড়িতে। উপাসনাদি হয়ে গেলে বয়সের তারতম্য অনুসারে প্রণাম আলিঙ্গনাদি শেষ করে মেয়েমহলেও-সরবৎ পান করান হত বাইরে—তার বাড়ির লোকদের সেদিন সকলের একত্র ভোজন হত মধ্যাহ্নে।
রবীন্দ্র সাহিত্যে নববর্ষ:
বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ ও নববর্ষকে নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি থাকলেও বাংলা ভাষার কবিরা কম কাব্য রচনা করেননি। তাঁদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের সঙ্গে, জীবনের সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বৈশাখ। অবশ্য কবির জন্মদিনটিও বৈশাখেই। আজ এই ভয়ংকর অতিমারীর দিনে, আর রাজনৈতিক হিংসার আবহে রবীন্দ্রনাথ বহুদিন আগেই তাঁর কাব্যে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন, –
নববর্ষ এল আজি
দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে;
আনে নি আশার বাণী,
দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়।
প্রতিকূল ভাগ্য আসে
হিংস্র বিভীষিকার আকারে;
তবু নববর্ষের গল্প বলতে গিয়ে সেই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, “আজ নববর্ষের প্রাতঃসূর্য এখনো দিক্‌প্রান্তে মাথা ঠেকিয়ে বিশ্বেশ্বরকে প্রণাম করে নি–এই ব্রাহ্মমুহূর্তে আমরা আশ্রমবাসীরা আমাদের নূতন বৎসরের প্রথম প্রণামটিকে আমাদের অনন্তকালের প্রভুকে নিবেদন করবার জন্যে এখানে এসেছি। এই প্রণামটি সত্য প্রণাম হোক।
এই-যে নববর্ষ জগতের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে, এ কি আমাদের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশ করতে পেরেছে? আমাদের জীবনে কী আজ নববর্ষ আরম্ভ হল?
এই-যে বৈশাখের প্রথম প্রত্যুষটি আজ আকাশপ্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালো, কোথাও দরজাটি খোলবারও কোনো শব্দ পাওয়া গেল না, আকাশ-ভরা অন্ধকার একেবারে নিঃশব্দে অপসারিত হয়ে গেল, কুঁড়ি যেমন করে ফোটে আলোক তেমনি করে বিকশিত হয়ে উঠল–তার জন্যে কোথাও কিছুমাত্র বেদনা বাজল না। নববৎসরের ঊষালোক কি এমন স্বভাবত এমন নিঃশব্দে আমাদের অন্তরে প্রকাশিত হয়?
… কিন্তু, মানুষ তো পুরাতন আবরণের মধ্যে থেকে এত সহজে এমন হাসিমুখে নূতনতার মধ্যে বেরিয়ে আসতে পারে না। বাধাকে ছিন্ন করতে হয়, বিদীর্ণ করতে হয়–বিপ্লবের ঝড় বয়ে যায়। তার অন্ধকার রাত্রি এমন সহজে প্রভাত হয় না; …
নববর্ষ – রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন পালন:
১ বৈশাখ – ১৩৪৩ – [মঙ্গল 15 Apr 1936] – কবি নববর্ষের দিন লিখলেন:
বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে
শেষধাপের কাছটাতে ।
কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে পা ডুবিয়ে দিয়ে।
জীবনের পরিত্যক্ত ভোজের ক্ষেত্র পড়ে আছে পিছন দিকে
অনেক দিনের ছড়ানো উচ্ছিষ্ট নিয়ে।…
এই কবিতাটিকে আমরা বলতে পারি তাঁর জন্মদিনের কবিতা। কারণ সেদিন আশ্রমে তাঁর জন্মদিনের উৎসব প্রবর্তিত হয়। পঁচিশে বৈশাখ গ্রীস্মাবকাশের মধ্যে পড়ে বলে এই বছর থেকে এই নববর্ষের দিন জন্মদিনের ব্যবস্থা হল। নববর্ষের সকালে মন্দিরে কবি যে ভাষণ দিলেন [জন্মদিন] তার মধ্যে এই কবিতাটির মর্মকথা পাই, দুটি রচনা পাশাপাশি পড়লেই সেটা স্পষ্ট হবে। এই কবিতার অনেক কথা, অনেক অভিযোগ, অনেক তত্ত্ব আছে, যেটা পাঠ করলে কবির বিষাদঘন মনের দুর্বলতা প্রকাশ পায় –
দেখেছি শুধু আপনার নিভৃত রূপ
ছায়ায় পরিকীর্ণ,
যেন পাহাড়তলিতে একখানা অনুত্তরঙ্গ সরোবর।…
পাথর ডিঙিয়ে আপন সীমানা চূর্ণ করতে করতে নিরুদ্দেশের পথে
অজানার সংঘাতে বাঁকে বাঁকে…
সে বছরের ৪ঠা বৈশাখ [১৭ এপ্রিল, ১৯৩৬] রাণু মুখোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, কল্যাণীয়াসু তোর চিঠিখানি পেয়ে খুসি হলুম। … কাল রাত্রে এসেছি আশ্রমে। গরম নিশ্চয়ই— কিন্তু তা নিয়ে নালিশ করে লাভ নেই— জন্মেছি গরম দেশে। কবিতা লেখবার সময় লিখতে হয়েছে, “সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে”— যত গরমই হোক কথাগুলো আর ফিরিয়ে নেবার জো নেই। নববর্ষের আশীৰ্ব্বাদ। ইতি ৪ বৈশাখ ১৩৪৩ ভানুদাদা
বাঙালীর বর্ষবরণ ও খাওয়াদাওয়া:
বাঙালির বাঙালিত্ব এখন কিঞ্চিৎ সংকুচিত, অর্থাৎ আ-নোলামস্তক৷ জিভ দেখেই এখন বাঙালি চেনা যায়৷ বিশেষ করে এই নববর্ষে৷ সারা বছর মাখন-পাঁওরুটি কিংবা সিরিয়ালে প্রাতরাশী বাঙালির ঘরে আজ ধন্য লুচি, তোমার মহিমা ত্রিভুবনে৷ আর হবে না-ই বা কেন? রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বঙ্গবীর বলছে,
সাহেব মেরেছি! বঙ্গবাসীর
কলঙ্ক গেছে ঘুচি।
মেজবউ কোথা, ডেকে দাও তারে।
কোথা ছোকা, কোথা লুচি?
বর্ষবরণে পান্তা-ইলিশ অবশ্য আহার্য, এটা কোথাও কখনোই প্রচলিত ছিল না। কেননা বৈশাখ একটি খরার মাস, যখন কোনো ফসল হতো না আর কৃষকদের হাতে পয়সাও থাকতো না। গ্রামবাংলায় নববর্ষের উৎসবই ছিল খুবই সাধারণ আর ছোট আকারে। কৃষাণী আগের রাতে একটি নতুন ঘটে কাঁচা আমের ডাল ও চাল ভিজিয়ে রাখতেন। সকালে কৃষক সেই চালপানি খেয়ে হালচাষ করতে যেত। দুপুরবেলায় কাজের ফাঁকে পান্তা খেতো কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে আবার কখনো কখনো একটু শুঁটকি, বেগুন ভর্তা বা আলু ভর্তা দিয়ে। কবির ভাষায়-
“পান্তা ভাতে মরিচ-পেঁয়াজ
গরম ভাতে ভর্তা
সকাল বিকাল খেয়ে জবর
ঘুমায় গাঁয়ের কর্তা।”
রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশে পা দিয়েছেন। রন্ধনপটিয়সী প্রজ্ঞাসুন্দরী, তৈরি করলেন কিছু অদ্ভুত নামের সমস্ত রান্না যেমন, ‘দ্বারকানাথ ফিরনি পোলাও’, ‘রামমোহন দোল্‌মা ভাত’, ‘সুরভী পায়েস’ ইত্যাদির সঙ্গে সেই নববর্ষে যুক্ত হল আরও একটি নতুন পদ। কবির জন্ম মাসে প্রজ্ঞাসুন্দরীর নতুন উদ্ভাবন— শীতশেষের ফুলকপি, খোয়া ক্ষীর, বাদাম-কিসমিস, জাফরান আর সোনা-রূপার তবক দিয়ে তৈরি বরফি (শোনা যায় বাদাম জাতীয় মিষ্টি নাকি কবির অত্যন্ত পছন্দের ছিল)। তিনি তার নাম দিলেন ‘কবি-সংবর্ধনা বরফি’। রবীন্দ্রনাথ যেমন জানতেন —‘বাসনার সেরা বাসা রসনায়’:
শোভন হাতের সন্দেশ, পানতোয়া,
মাছমাংসের পোলাও ইত্যাদিও
যবে দেখা দেয় শোভামাধুর্যে-ছোঁওয়া
তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়!
নববর্ষের চিঠি:
হালখাতা, নতুন বইয়ের আবির্ভাব, লেখক-প্রকাশক মিলন — এ সবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাংলা নববর্ষের সঙ্গে। নববর্ষের চিঠির আবেগের গভীরতা বুঝি অনেকের কাছেই অতলান্ত! প্রায় শতবর্ষ আগে ১৩২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘কল্যাণীয়াসু রাণু’-কে লিখলেন,
আজ আর বেশি লেখবার সময় নেই— কেননা আজ তিনটের গাড়িতেই রওনা হতে হবে। গাড়ি ফেল্ করবার আশ্চৰ্য্য ক্ষমতা আমার আছে— কিন্তু সে ক্ষমতাটা আজকে আমার পক্ষে সুবিধার হবে না। অতএব তোমাকে নববর্ষের আশীৰ্ব্বাদ জানিয়ে আমি টিকিট কিনতে দৌড়লুম। ইতি ২ বৈশাখ ১৩২৫ শুভাকাঙক্ষী শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কিংবা রানী চন্দকে অবনীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখে পাঠিয়েছিলেন, ‘‘নববর্ষে নতুন বন্ধুর জন্য বসে আছি, কবে এসে সে গল্প শুনবে আমার কাছে।’’
স্বামী বিবেকানন্দ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে ধীরামাতাকে (ধীরামাতা, বিখ্যাত বেহালা বাদক ওলিবুলের স্ত্রী সারা সি বুল। শান্তওধীর প্রকৃতির জন্য স্বামীজী তাঁকে ‘ধীরা মাতা’ বলে ডাকতেন​।) লিখছেন, প্রিয় ধীরামাতা, শুভ নববর্ষ আপনার নিকট আসুক এবং বহুবার এভাবে আসতে থাকুক—এই আমার আকাঙ্ক্ষা। আমার স্বাস্থ্য পূর্বাপেক্ষা অনেক ভাল আছে এবং আবার কাজ করবার মত যথেষ্ট শক্তি পেয়েছি।
কিন্তু নববর্ষের চিঠি স্মৃতি হয়ে গেছে চিরকালের মতো। আধুনিকতা আর প্রযুক্তি কি তা হলে মুছে দিচ্ছে নববর্ষের চিঠির আবেগকে? বইপাড়ার বই পাকে বৈশাখে:
আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে,
কাঁচা ইঁট পাকা হয় পোড়ালে তা আগুনে।
মনে আছে এই কবিতাটা? তেমনি একসময় বইপাড়ার নতুন বইগুলিও পেকে উঠত বৈশাখের আগেই৷ বই পাকা? কথাটায় কানে একটু খটকা লাগলেও এক সময়ে এই পয়লা বৈশাখ কলেজ স্ট্রিটে বইপাড়ায় গিয়ে অকস্মাৎ শেলফের কোনও বই ধরে টান মারতে গেলেই প্রকাশক হাঁ হাঁ করে উঠতেন, ওটা নয় ওটা নয়, অন্য কপি দিচ্ছি, ওটা কাঁচা আছে এখনও! অর্থাৎ বাঁধাইয়ের আঠা শুকোয়নি৷ এখন অবশ্য বাঙালির বই পাকানোর অধিকাংশ উদ্যোগ, মাঘের শীতে, বইমেলায়৷
নববর্ষে রাস্তায় গান গাইতেন উত্তমকুমারঃ
একসময় পয়লা বৈশাখে দক্ষিণ কলকাতার বসুশ্রী সিনেমা হলের সামনে সকাল বেলায় রাস্তার ওপর বাঁধা খোলা মঞ্চে গান গাইতেন মহানায়ক উত্তমকুমার। শুধু তিনি কেন, সমকালের চলচ্চিত্র জগতের তাবড় ব্যক্তিত্বরা হাজির হয়ে নিজেদের অনুষ্ঠান পরিবেশন করতেন। আসলে সকালে সেখানে বসত জলসা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, পঙ্কজ মল্লিক সহ সে সময়ের সব নামি দামি গায়করা হাজির হতেন সেখানে। মানুষ বসে থাকত রাস্তা জুড়ে। সব শ্রোতা দর্শককে মিষ্টি মুখ করাতেন আয়োজকরা। নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো হত সকলকে।
সূত্র: রবীন্দ্ররচনাবলী। ঈশ্বরগুপ্তের কবিতা। ইন্টারনেট। স্বামী বিবেকানন্দের পত্রাবলী। হুতোম পেঁচার নকসা। যোগেশচন্দ্র রায় – পূজা-পার্বণ।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!