রবীন্দ্রনাথের যে কবিতাগুলি ১৯০৮-০৯ সালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তীক্ষেত্রে সেই কবিতাগুলিই ১৯১০ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ রূপে সেজে উঠেছিল। আজ গীতাঞ্জলি রচনার একশ দশ বছর আর নোবেল প্রাপ্তির একশ সাত বছর পূর্তি হয়ে গেল। সেই গীতাঞ্জলির পান্ডুলিপি পড়ে মুগ্ধ হয়ে কবি ইয়েটস ভূমিকা লিখেছিলেন। লন্ডনে রোটেনস্টাইনের বাড়িতে কবি ইয়েটস্ যেদিন বন্ধু-বান্ধবকে গীতাঞ্জলি থেকে পাঠ করে শুনিয়েছিলেন সেদিন ঐ আসরে কবি মে সিনক্লেয়ারও উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় অভিভূত হয়ে তিনি নিঃসংকোচে লিখেছিলেন, “ রবীন্দ্রনাথের কবিতায় মানুষের সাধারণ আবেগমথিত নিবেদনের মিলন হয়েছে এমন এক সঙ্গীত ও ছন্দ যা পশ্চিমী শ্রোতার কাছে অচিন্তনীয়, যাতে আছে শেলীর অপার্থিব চেতনা, অদ্ভুত সূক্ষ্মতা ও তীব্রতা…. এবং তা এমন সহজিয়া রীতিতে যাতে এই যাদুকরী-আবেশকেও মনে হয় পৃথিবীর সবচে’ স্বাভাবিক রূপবন্ধ। মিল্টনও না, সে মানুষের হৃদয়ের তুলনায় বড় বেশি জাঁকালো ; ওয়ার্ডসওয়ার্থ নয়, সে বড় সূক্ষ্ম আর অন্তর্লীন …. এমনকি দান্তেও নয় যদিও তিনি বাংলার এই মরমিয়া কবির খুব কাছাকাছি।”
আর যে গীতাঞ্জলির একটি কবিতা কবি আওয়েন বুক পকেটে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছিলেন।
যদিও গীতাঞ্জলি কাব্য রচনার পেছনে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৪৯৬-১৯০৭) আকস্মিক মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছিল। শমীকে শোকবিদায় জানানোর ভাব-বিহ্বলতা রূপান্তরিত হয় এক অভিনব ভক্তিরসে। কবি গুরুর সৃষ্টিজগতের ঈশ্বর আরাধনার সাথে প্রকৃতি রাজ্যের মিলনে মানুষে মানুষে যে বন্ধন, তার মুখ্য প্রকাশ ঘটে গীতাঞ্জলিতে। ১৯০২ সালে হারান স্ত্রীকে। মনের দিক থেকে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। ১৯০৫ সালে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে কিছুদিন নীরবতার পরে কবি শান্তিনিকেতনের আশ্রমিক জীবনকে বেছে নিলেন। সব উজাড় করে দেন সেখানে। ঠিক ওই সময়ে তাঁর জীবনে আরও এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ১৯০৭ সালে ছেলে শমীন্দ্রের মৃত্যু তাঁকে শোক বিহ্বল করে তোলে। প্রিয়জনের এমন মৃত্যু তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। এমন এক সংকটকালে তাঁর মধ্যে বদল আসে। শোক মৃত্যু বেদনাকে সঙ্গী করে খুঁজে বেড়ান মৃত্যুঞ্জয় জীবনবোধের। জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ এই সময় কঠোর নিরামিশাষী ছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশ্রম পরিচালনার আদেশগুলি এই সময় তিনি কঠোরভাবে মেনে চলতেন। এমনকি অসুস্থতার সময় ডাক্তার আমিষ খাওয়ার পরামর্শ দিলেও, তিনি তা শোনেননি।
গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ রচনার প্রসঙ্গে রবীন্দ্র-গবেষক সুকুমার সেন লিখেছেন: ‘উৎসর্গ’ আর ‘খেয়া’র সময়ে গান লেখা চলিয়াছিল প্রচুর। ইতিমধ্যে (১৩১৪ সালের মাঝামাঝি) কনিষ্ঠ পুত্রের [শমীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৯৬-১৯০৭)] আকস্মিক মৃত্যুতে কবিধর্ম কিছুদিনের মতো যেন বিচলিত হইল। তখন শোকবেদনার উৎসাহ হইল এক অভিনব ভক্তিরসে। তাহার মুখ্য প্রকাশ ‘গীতাঞ্জলি’তে (১৩১৭) ।
রবীন্দ্র-জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে: “’প্রায়শ্চিত্ত’ [১৯০৯] নাটক লিখতে লিখতে অনেকগুলি গান লিখলেন [রবীন্দ্রনাথ]-তার কয়েকটির মধ্যে ‘গীতাঞ্জলি’ পর্বের পদধ্বনি শোনা গেল। জীবন গভীর একটা রসের স্তরে প্রবেশ করছে, গানগুলি তারই আগমনী”।
আর গীতাঞ্জলি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই ইন্দিরাদেবীকে লিখেছিলেন, “এই কবিতাগুলি আমি লিখব বলে লিখিনি—এ আমার জীবনের ভিতরের জিনিষ– এ আমার সত্যকার আত্মনিবেদন— এর মধ্যে আমার জীবনের সমস্ত সুখদুঃখ সমস্ত সাধনা বিগলিত হয়ে আপনি আকার ধারণ করেছে। এই জীবনের জিনিষ জীবনের ক্ষেত্রে আদর পায় একথা আমি বেশ বুঝতে পেরেছি কিন্তু একথা বোঝানো শক্ত” । …
আর এই গীতাঞ্জলির প্রচারের আলোয় আলো আসা থেকে নোবেল প্রাইজ পর্যন্ত পুরো গল্প বলতে গেলে প্রথমেই শুরু করতে হবে লন্ডনের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী উইলিয়াম রোটেনস্টাইনকে (১৮৭২ – ১৯৪৫) দিয়ে। যিনি কবির ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথের বিশেষ বন্ধু। প্রাচ্যের সাহিত্য ও চিত্রকলায় বিশেষ আগ্রহী রোটেনস্টাইন এক বছরের মতো ভারতে ঘুরে বেড়িয়েছেন, সেটা ১৯১০ সালের দিকে। সেসময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে কবির সঙ্গে রোটেনস্টাইনের দেখা হলেও তেমন সখ্যতা গড়ে ওঠেনি। হতে পারে ছবি আঁকায় কবির আগ্রহ তখনো তেমন প্রকট ছিল না। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে দেশে ফেরার আগে ওঁর গল্প ও কবিতার অনুবাদ চেয়েছিলেন রোটেনস্টাইন। লন্ডনে ফিরেও কবির গল্পই চেয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। লন্ডনে আসার জন্য আমন্ত্রণও করলেন। ইতিমধ্যে আনন্দকুমারস্বামীর (যিনি ইতিপূর্বে রবীন্দ্রনাথের কিছু কবিতা অনুবাদও করেছিলেন) বাঙালি সহযোগী অজিত চক্রবর্তীর রবীন্দ্র কবিতার অনুবাদ করা এক খাতা তাঁর হাতে এল। রোটেনস্টাইন টের পেলেন কবির কবিতা তাঁর গল্পের চেয়েও অসাধারণ এবং তাতে অপূর্ব ভাবানুভূতি ছড়িয়ে আছে।
যখনকার কথা বলছি, তখন কবির গল্পের অনুবাদই বেশি পাওয়া যাচ্ছে, কবিতার অনুবাদ ক’টাই বা? রোটেনস্টাইন ও কুমারস্বামীর আগ্রহ দেখে রবীন্দ্রনাথ ইংলন্ড যাত্রা মনস্থ করলেন। ১৯১১-র অক্টোবরে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূ প্রতিমাকে নিয়ে বিলেত যাত্রার জাহাজ-টিকিটও কেনা হল। কিন্তু নানা কারণে যাত্রা বাতিল। অর্শের রোগে তার আগে থেকে শরীরও কাহিল কবির। শেষ অবধি সেই যাত্রা ঘটল ১৯১২ সালের মে মাসে।
২৭ মে বোম্বাই থেকে বিলেতে পাড়ি দেওয়ার আগে কবি শরীর স্বাস্থ্য ফেরাতে পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে যে মাস দুই কাটালেন, তখন প্রায় এক ভূতে পাওয়া দশায় নিজের নানা সংকলন থেকে অজস্র কবিতা অনুবাদ করে গেলেন। এমনকী মাঝসমুদ্রে জাহাজ যখন, তখনও ডেকচেয়ারে বসে দিনে একটা দুটো কবিতা অনুবাদ করেই চলেছেন। তখনও ধারণার বাইরে এই অনূদিত কবিতাগুলোই তাঁর বাকি জীবন কী ভাবে বদলে দেবে।
শেষ অবধি গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ ‘সং অফারিংস’ বলে যে পাণ্ডুলিপি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৬ জুন লন্ডনে নামলেন, তার ৫৩টি কবিতা গীতাঞ্জলির, ১৬টি নৈবেদ্যর, ১১টি খেয়ার, ৩টি শিশুর এবং ১টি করে চৈতালি, কল্পনা, অচলায়তন ও উৎসর্গের। আর নামার পরে পরেই লন্ডনের বিখ্যাত টিউবরেলে সেটি হারিয়ে ফেললেন। রক্ষে এই যে লেফট লাগেজ অফিস থেকে গীতাঞ্জলি খুঁজেও পাওয়া গিয়েছিল। সে-পাণ্ডুলিপি পড়ে তো রোটেনস্টাইন সপ্তম স্বর্গে। ব্যগ্র হয়ে উঠলেন ইংরেজি ভাষার সেরা কবি ডবলিউ বি ইয়েটসকে পড়ানোর জন্য। তাঁকে চিঠিতে লিখলেনও রোটেনস্টাইন: এই কবিতা যা তিনি নিজেও তাই।
রোটেনস্টাইনের চেষ্টায় রবীন্দ্রনাথ ও ইয়েটসের প্রথম দেখা হল ২৭ জুন, এক নৈশভোজে। এর পর ৭ জুলাই রোটেনস্টাইনের বাড়ির এক সান্ধ্য আসরে ইয়েটস গীতাঞ্জলি থেকে কিছু কবিতা পড়লেন। আর ১০ জুলাই কবির সম্মানে আয়োজিত ত্রোকোদেরো রেস্তোরান্টের এক নৈশভোজে সত্তর জনের মতো অতিথির সামনে ইয়েটস গীতাঞ্জলির তিনটি কবিতা পড়ে শোনালেন। সেখানে অন্যান্য বিশিষ্ট জনদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইয়েটসের বান্ধবী মড গান এবং ঔপন্যাসিক এইচ জি ওয়েলস। ইতিমধ্যে ইয়েটস গীতাঞ্জলির কবিতাগুলোকে সাজিয়ে এবং রবীন্দ্রনাথের বিবেচনার জন্য কিছু কিছু পেন্সিল দাগানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এর পর যে অপূর্ব কাজটি ইয়েটস করলেন তা হল, গীতাঞ্জলির এক অসাধারণ ভূমিকা রচনা। সেখানে তিনি লিখলেন,
“… এই অনুবাদগুলির পাণ্ডুলিপি সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি দিনের পর দিন, রেল গাড়িতে বসে রেল গাড়িতে বসে পড়েছি, বাসে বসে পড়েছি, খাবার দোকানে বসে পড়েছি – পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝেই খাতা বন্ধ করে ফেলতে হয়েছে, যদি কোনো অচেনা লোক দেখে ফেলে আমি কাঁদছি? এই সব গীতিকবিতা – আমার ভারতীয় বন্ধুদের কাছে শুনেছি, মূল রচনার ভাষা ও ছন্দের অনিন্দ্য সব সূক্ষ্ম সুষমায় ভরা, তার রঙের সুকুমারত্ব, তার ছন্দের অভিনব বিধূনন, সে নাকি অনুবাদ কর্মের সকল চেষ্টার অতীত – এদের চিন্তার মধ্যে দিয়ে এমন একটি পৃথিবীকে প্রকাশ করে যার কথা আমি সারাজীবন ধরে স্বপ্নের মধ্যে ভেবেছি। একটা সুপ্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির চরম প্রকাশ এই কাব্য, কিন্তু এমন স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে যেমন সহজে মাটিতে জন্মায় ঘাস, জলে নলখাগড়া, একটি ঐতিহ্য যেখানে কবিতা আর ধর্মবোধ সমার্থক, শতাব্দীর পর শতাব্দী পার হয়ে এসেছে, শিক্ষিত ও নিরক্ষর উভয়ের কাছ থেকেই গ্রহণ করেছে উপমা ও আবেগ, তারপর জনসাধারণের কাছে ফিরে গেছে মহান চিন্তার প্রকাশ কে বহন করে”।…
ইয়েটসের এই মুগ্ধতা কিন্তু নোবেল পুরস্কারের থেকে কিছু কম স্বীকৃতি নয় গীতাঞ্জলির। কিংবা কবি এজরা পাউন্ডের ভালবেসে ফেলা সেই পঙক্তি যেটি রবীন্দ্রনাথ সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে পাঠানো ধন্যবাদ পত্রেও উল্লেখ করেছেন:
WHEN I GO from hence let this be my parting word, that what I have seen is unsurpassable.
“কত অজানারে জানাইলে তুমি,
কত ঘর দিলে ঠাঁই
দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,
পরকে করিলে ভাই।”
অথবা, কবি উইলফ্রেড আওয়েনের বুকপকেটের নোটবইয়ে লিখে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সং অফারিংস-এর ৯৬ নম্বর কবিতাটি, যেটির অনুবাদও আজও পড়লে মুগ্ধ হতে হয় : THOU HAST made me known to friends whom I knew not. Thou hast given me seats in homes not my own. Thou hast brought the distant near and made a brother of the stranger.
যাবার দিনে এই কথাটি
বলে যেন যাই
যা দেখেছি যা পেয়েছি
তুলনা তার নাই।
আর সেই যুদ্ধেই প্রাণ দেন আওয়েন।
আর গীতাঞ্জলি অর্থাৎ ‘সং অফারিংস’-এ ইয়েটসের প্রিয় পঙক্তি ছিল: Children have their play on the seashore of worlds.They know not how to swim, they know not how to cast nets.
জগৎ-পারাবারের তীরে
ছেলেরা করে খেলা।
জানে না তারা সাঁতার দেওয়া,
জানে না জাল ফেলা।
বিখ্যাত এথেমিয়াম পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) কবিতামালায় এমন এক স্নিগ্ধ প্রশান্তি রয়েছে যার শিক্ষা পশ্চিমের অশান্ত-চিত্ত মানুষের বড় দরকার।”
টি. ডব্লু. রলেস্টন ১১০০ শব্দের দীর্ঘ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “জীবনের মৌল বিষয়ের সঙ্গে এই কবিতাগুলি এতো ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট যে এর চেতনা, এবং এমনকি, এর বাকপ্রতিমার একটি বিশ্বজনীন তাৎপর্য রয়েছে”।
দি নেশান পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, “ভুলে যাও ইয়েটস্-এর তদ্বির, ভুলে যাও যে ‘এটি সাহিত্য-বিশ্বের একটি শীর্ষ-ঘটনা’, এবং (তবু) গীতাঞ্জলি’তে পাবে প্রণয়াকুল হেমন্তের নিখাদ পুষ্পকোরক যাতে রয়েছে (মানুষের) সনাতন বিশ্বাসের ইঙ্গিত”।
১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ নভেম্বর বুধবার সাহিত্যে নোবেল ঘোষণা করা হয়। এবং রবীন্দ্রনাথ এই গ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। পর দিন খবরটি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মুদ্রিত হয় ; কিন্তু তা বিলম্বে কলকাতায় পৌঁছে। ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় যখন তারবার্তার মাধ্যমে খবর আসে যে রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে, সে দিনটা ছিল খুব হাওয়ার রাত। খোয়াইজুড়ে রাস পূর্ণিমার গোল হলুদ চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে পারুল বন। জোব্বার পকেট থেকে টেলিগ্রামের কাগজটা বের করলেন কবি। ভাঁজ খুলে বার দু’য়েক পড়লেন। চেয়ে রইলেন দূর বনপথে। চোখে উদাস করা চাহনি। তারপর উদাসীন ভাবে নোবেল প্রাপ্তির টেলিগ্রামটা সচিবের দিকে এগিয়ে বললেন, ‘‘নিন, নেপালবাবু। এই আপনার ড্রেন তৈরির টাকা!’’ রবিঠাকুরের কথা শুনে নির্বাক আশ্রম-সচিব নেপালচন্দ্র রায়! দু’চোখের কোণ ভিজে এল তাঁর! আসলে নোবেল কমিটির কাছে কবির ঠিকানাই ছিল না!
ওই বছর ১০ ডিসেম্বর স্টকহলমের নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি। টেলিগ্রামে লিখে পাঠানো তাঁর বার্তা সেখানে পাঠ করা হয়। তিনি লিখেছিলেন— “সুইডিশ অ্যাকাডেমির অনুভবের কাছে আমি আমার কৃতজ্ঞতা ব্যক্ত করছি। তাঁরা দূরকে নিকট করেছেন এবং এক অপরিচিতকে ভ্রাতৃত্বে বরণ করে নিয়েছেন।”
১৯২১ সালে রবীন্দ্রনাথ সুইডেন যান। ২৬ মে স্টকহলমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে নোবেল সম্মানকে স্মরণ এবং গ্রহণ করে তিনি যে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন, তা সংক্ষেপে হল, “আমি বুঝতে পারি, মানব জীবনের যাবতীয় আনন্দের অভিব্যক্তি, মানবাত্মার হৃদয়ের উৎসস্থল থেকে উঠে আসা আশার বাণী সেই অনন্ত আকাশের দিকেই ধাবিত। আমি যেন স্পষ্ট তা দেখতে পাই। বুঝতে পারি, আমরাও আসলে বড় হয়ে যাওয়া শিশু, আমাদের কলতানকে অনন্তের দিকে পাঠিয়ে চলেছি। আমি এই অনুভূতি হৃদয়ের উৎসস্থল থেকে বুঝি। এই পরিবেশ আর পরিস্থিতিই আমাকে ‘গীতাঞ্জলি’র কবিতাগুলি রচনা করতে প্রাণিত করেছে। উজ্জ্বল তারায় তারায় খচিত ভারতের আকাশের নীচে বসে মধ্যরাতে আমি তাদের গাই। এবং খুব ভোরে, এমনকি গোধূলিতেও আমি এই গানগুলি লিখি। এই গানের দল বয়ে চলে পরের দিনটির দিকে। আরও এক বার এই মহাপৃথিবীর হৃদয়দ্বারে প্রবেশের প্রেরণা লাভ করি”।
ঋণ: রবীন্দ্ররচনাবলী। ইন্টারনেট। উইকিপিডিয়া।