“পোষা পাখির কোনো কল্পনা নেই, কিন্তু তাঁর কল্পনাশক্তিই তাঁর স্বাধীনতা”
১৮৮০ সালের ২৭ জুন। আমেরিকার অ্যালাবামা তাসকাম্বিয়া গ্রাম। এই গ্রামের আর্থার কেলার ও কেটি অ্যাডামস কেলারের সংসারে জন্ম নিয়েছে একটি কন্যা সন্তান। বাবা-মা মেয়েটির নাম দিয়েছে হেলেন কেলার। হেসে খেলে সুন্দরভাবে বড় হচ্ছিল এই আমেরিকান শিশুটি। বয়স যখন ১৯মাস, হঠাৎ করে শিশুটির ভয়ংকর অসুস্থতা (সম্ভবত স্কারলেট জ্বর) ধরা পড়ল। বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলো শিশুটি।
কিন্তু এই ভয়ংকর ব্যাধি কেড়ে নিলো চিরতরে শিশুটির দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকশক্তি। কন্যার সাথে সাথে বাবা-মায়ের জীবনে নেমে এলো ভীষণ অন্ধকার। নানা চেষ্টা করেও যখন কন্যার দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাকশক্তি ফেরাতে পারলেন না, তখন তাঁরা তাঁকে নিয়ে যান বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল (টেলিফোনের আবিষ্কারক)-এর কাছে। ছ-বছর বয়সে গ্রাহাম বেল তাঁকে পরীক্ষা করে দেখাশুনা করবার জন্য কুড়ি বছর বয়স্ক অ্যান সুলিভান নামে একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকাকে পাঠিয়ে দেন। ইনি নিজের মৃত্যু অবধি (১৯৩৬) তাঁর সঙ্গিনী ছিলেন। এঁরই সাহায্যে হেলেন কেলার ব্রেইল পদ্ধতির দ্বারা অতি দ্রুত পড়তে লিখতে শেখেন; ৮ বছর বয়সেই অ্যানির সাহায্যে হাতের আঙ্গুল দিয়ে দাগ কেটে কেটে লিখতে শেখেন হেলেন। ১০ বছর বয়সে তিনি নরওয়েতে উদ্ভাবিত এক পদ্ধতি অনুসরণ করে কথা বলা শেখেন। ১৪ বছর বয়সে ভর্তি হন আমেরিকার নিউইয়র্কের ‘রাইট হুমাসন’ নামক বধির স্কুলে। ১৯০০ সালে তাঁর বয়স ২০, তখন উচ্চতর শিক্ষার জন্য তিনি র্যাডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টি-প্রতিবন্ধী হিসাবে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন।
স্নাতক অর্জনকারী বাক, শ্রবণ ও দৃষ্টি-শক্তিহীন হেলেন গান শুনতে ভালোবাসতেন। তিনি গান শুনতেন অনুভূতির মাধ্যমে। শিল্পীদের কণ্ঠ স্পর্শ করেই বলতে পারতেন কোন শিল্পী গান গাইছে, এবং কি গান গাইছে।
নৌকা চালাতে ভালোবাসতেন এই অনন্যসাধারণ নারী। তিনি দাবা, তাস সাঁতার ইত্যাদিতে ছিলেন স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ ও পারদর্শী। বই পড়তে ভীষণ ভালবাসতেন হেলেন। ১৯১৩ সালে, আমেরিকায় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় লাইব্রেরী। এখানে হেলেন বই পড়তেন নিয়মিত। ‘টুয়েন্টি টুয়েন্টি ভিশন’ সম্পন্ন বহু ব্যক্তির চেয়েও বেশি বই তিনি পড়েছেন বলে জানা যায়। রাজনীতিতেও ছিলও তাঁর সাহসী পদার্পণ। তিনি ১৯০৯ সালে আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। তাঁর রাজনৈতিক অভীষ্ট ছিল আয়ের সুষম বণ্টন প্রতিষ্ঠা করে পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ করা।
নানা পত্রিকায় লিখতে আরম্ভ করেন, মূলত অন্ধত্ব ও তার সমস্যা নিয়ে। তখনকার দিনে শিশুর জন্মান্ধতাকে পিতামাতার যৌনরোগজাত বলে মনে করা হত, ফলে মর্যাদাবান পত্রিকায় এর আলোচনা একরকম নিষিদ্ধ ছিল। সেই সামাজিক নিষেধ ভেঙে হেলেন লিখতে আরম্ভ করেছিলেন। ১৯১৩ সালে “আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য ব্লাইন্ড” প্রতিষ্ঠানের হয়ে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করেন, এবং এই প্রতিষ্ঠানের জন্য কুড়ি লক্ষ পাউন্ডের দান সংগ্রহ করে দেন। বক্তৃতা দিয়ে বহুবার পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন। বহু গ্রন্থের লেখিকা। অ্যান সুলিভানের সাহচর্যে তাঁর শৈশব জীবন নিয়ে লেখা উইলিয়াম গিবসনের নাটক “দ্য মিরাকল ওয়ার্কার” পুলিটজার পুরস্কার পেয়েছে (১৯৬০), পরে চলচ্চিত্রায়িত হয়ে দুটি অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ শ্রীমতী হেলেন কেলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান ৪ঠা জানুয়ারি ১৯২১ তারিখে। কবি-পুত্র রথীন্দ্রনাথ তার ডায়েরিতে লিখছেন, “এই সাক্ষাৎকারের আয়োজন করেছিলেন শ্রীমতী ওয়ালিঙ। দুটি মোটর গাড়িতে করে রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ, বসন্তকুমার রায়, শ্রীমতী ওয়ালিঙ, শ্রীমতী স্কট (ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকার মিঃ স্কটের স্ত্রী), হেলেন কেলারের চিকিৎসক ও তাঁর পত্নী এবং শ্রীমতী ওয়ার্থাইম লঙ আইল্যান্ডের ফরেস্ট হিল অঞ্চলে শ্রীমতী কেলারের বাড়িতে যান। রথীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল শারীরিক প্রতিবন্ধকতার দৃশ্য দেখতে তাঁর ভাল লাগবে না, বিশেষ করে তা যখন উচ্চস্তরের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু হেলেন কেলারের উপস্থিতি সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটিয়েছে, তাঁকে দেখে মনে হল তিনি যেন আনন্দে পরিপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথকে কাছে পেয়ে তিনি খুবই খুশি হলেন, বললেন, তাঁর অনেক বই – বিশেষত গীতাঞ্জলি ও গার্ডেনার – তিনি পড়েছেন। তাঁর কয়েকটি প্রিয় কবিতা ও বাংলায় দুই পাখি (“খাঁচার পাখি ছিল”…) কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ পাঠ করেন। শ্রীমতী কেলার তাঁর ঠোঁটে ও কণ্ঠনালীতে আঙ্গুল রেখে শব্দ সংগীত অনুভব করতে সক্ষম হলেন। তাঁর শিক্ষিকা খাঁচার পাখির সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য বিষয়ে কিছু বললে হেলেন বললেন, “পোষা পাখির কোনো কল্পনা নেই, কিন্তু তাঁর কল্পনাশক্তিই তাঁর স্বাধীনতা”। তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘গড’, ‘লাইট’ ও ‘লাভ’ শব্দগুলির বাংলা জানতে চান ও সেগুলি স্মৃতিতে গেঁথে রাখেন। রবীন্দ্রনাথ “আমি চিনি গো চিনি তোমারে” গানটিও গেয়ে শোনান। হেলেন ভারতবর্ষের একজন বিশেষ ভক্ত ও তার স্বাধীনতার জন্য তিনি বেশি অপেক্ষা করতে রাজি নন। হেলেন রবীন্দ্রনাথকে তাঁর “The World I live in” বইটি উপহার দিয়ে The Gardener থেকে একটি পঙক্তি লিখে দিলেন – “I forget, ever forget, that the gates are shut everywhere I dwel alone” [“কক্ষে আমার রুদ্ধ দুয়ার সে কথা যে যায় পাসরি”]।
এই সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে হেলেন কেলার তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, –
“… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন আমেরিকায় এলেন, তিনি এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে, কয়েকজন বন্ধু ও গুণমুগ্ধকে সঙ্গে করে। তিনি মানুষটি দীর্ঘ, রাজকীয়। তাঁর কাঁচাপাকা চুলদাড়ি একসঙ্গে মিশে গিয়ে তাঁকে প্রাচীনকালের সত্যদ্রষ্টা ঋষিদের মত দেখাচ্ছিল। প্রশান্ত ও সহৃদয়-ভাবে, প্রায় প্রার্থনা করবার মত কণ্ঠে, তিনি আমাকে নমস্কার জানালেন। আমিও তাঁকে জানালাম, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়ে আমি খুশি হয়েছি, কারণ আমি তাঁর কবিতা পড়েছি, আমি জানি তিনি মানবতার প্রেমিক। ‘আমারও খুশি হওয়ার কারণ আছে’ – তিনি শান্তভাবে বললেন, “আমার লেখায় যদি মানব-প্রেমের চিহ্ন পড়ে থাকে… যে সব মানুষ শুধুই নিজেকে ভালবাসে না, ঈশ্বরকে ভালবাসে, স্বজাতির অন্যদের ভালবাসে, তাঁদের জন্য পৃথিবী অপেক্ষা করে আছে’।
“বন্ধু ও শ্রদ্ধাবান শ্রোতাদের মাঝখানে বসে পড়ে রাজকীয় মানুষটি বলতে শুরু করলেন কবিতার কথা, ভারতবর্ষ ও চীনের কথা, আধ্যাত্মিক শক্তির কথা – যে শক্তিই শুধু স্বাধীনতা আনতে পারে। পৃথিবীর উপরে যুদ্ধের যে কালো মেঘ জমে আছে তিনি বিষণ্ণ গলায় তার কথা বললেন। পশ্চিম চীনের গলা দিয়ে আফিম প্রবেশ করিয়ে দিতে চেষ্টা করছে, চীনেরা যদি আফিম না খেতে চায়, তাদের দেশটা অধিকার করে নেওয়া হবে। … কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরের কূলে কূলে ইংরেজদের এই শকুনি-বৃত্তির জবাব দেওয়ার কণ্ঠ জেগে উঠতে আরম্ভ করেছে; জাপান জেগে উঠেছে পৃথিবীর প্রাচ্যতম অংশে। চীনও জেগে উঠবে, ডাকাতরা যখন তার প্রাচীর ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করবার চেষ্টা করবে …. ধ্বংস ছাড়া আর কোনো পরিণাম হতে পারে না। ঈশ্বরকে ভালবাসাই একমাত্র পন্থা, সমস্ত সমস্যা ও প্রতিবন্ধকের উত্তর এতেই নিহিত আছে”।
এছাড়াও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর যে আলোচনা হয় হেলেন কেলার তার বিবরণ প্রকাশ করেছেন তাঁর জার্নাল ইত্যাদি গ্রন্থে। সেগুলি অবলম্বনে নরেশচন্দ্র দেব তাঁর হেলেন কেলার গ্রন্থে (১৯৭৪) সেই কথোপকথনের একটি সারসংক্ষেপ রচন করেছেন তার কিছুটা এখানে প্রকাশ করা হল, “… ভারতবর্ষে লোকশিক্ষার সম্পসারণ যে কত জরুরী এবং এই উদ্দেশ্যে তিনি নিজে যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে রবীন্দ্রনাথ তা হেলেন কেলারকে বুঝিয়ে বললেন। তিনি তাঁকে জানালেন যে শান্তিনিকেতনে যে মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হবে, তার পাঠক্রমের মধ্যে স্কুল ও কলেজ দুইই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পৃথিবীর সব জাতির মিলনক্ষেত্র হবে এই মহাবিদ্যালয়। যখন বিশ্বভারতীর পরিকল্পনা তাঁর মনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, তখন আপন অন্তরের প্রেরণা থেকেই তিনি বেরিয়েছেন বিশ্বপরিক্রমায়, নানা দেশের মানুষের বর্তমান চিন্তাধারা, তার স্বপ্ন, তার কীর্তির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচয় করে নিতে, সব দেশের সকল স্তরের মানুষের মধ্যে নিজের স্থান খুঁজে নিতে। বিশ্বমানবতার পূজারী, তিনি সর্বসাধারণের মধ্যেই তাঁর ভালবাসার আসন পাততে চান। কিন্তু যখন তিনি দেখেন যে মানুষই মানুষের চরম দুঃখের সৃষ্টি করে, তখন তাঁর হৃদয় ব্যথা-বেদনায় ভরে ওঠে। বনের হিংস্র পশু, বিষধর সাপ কিংবা প্রকৃতির প্রলয়ংকারি শক্তিই মানুষের বড় শত্রু নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু মানুষই। তাঁর বেদনাহত মনে এই প্রশ্নই বারবার জেগে ওঠে – যে মানুষ এত জ্ঞান, বিদ্যা, বুদ্ধি ও মননশীলতার অধিকারী, হৃদয়ে তার এত দয়া, মায়া, মমতা, ভালবাসা, তবু জাতিতে জাতিতে কেন এত ভয়, অবিশ্বাস, কেন এত দ্বেষ, হিংসা, সংঘাত?… এই ভালবাসার ভিত্তিতেই তিনি বিশ্বভারতী স্থাপন করবার জন্য বিরামহীন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর স্বপ্ন এই, যে বিভিন্ন সংস্কৃতি এখানে সমন্বিত হয়ে সগৌরবে অগ্রগতি লাভ করবে। তাঁর আশা যে বিশ্বভারতীর ছাত্র-শিক্ষক সবাই এই আদর্শে অনুপ্রাণিত হবেন যে স্বদেশপ্রেম বিশ্বপ্রেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, এবং বিশ্বমানবের আশা, আকাঙ্ক্ষার সহিত সামঞ্জস্য রেখে চলবে। মৈত্রী পরমত-সহিষ্ণুতা, পরস্পরের সহিত সহযোগিতা ও সমবেদনা – এর ভিতর দিয়েই মানুষ পাবে তাঁর শান্তি ও আনন্দ”।…
হেলেন কেলার কবিকে বললেন, “আমার কাছে কখনো কখনো বড়ই আশ্চর্য মনে হয় যে ভারতবর্ষ এখনও স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি”।… এই মন্তব্যের উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, “স্বাধীনতা লাভের জন্য হয়ত আমরা অনেক দিন অপেক্ষা করতে পারি, যা হয়ত অন্য কোনও দেশ পারে না। শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেলেই ভারতবর্ষ সমূহ উপকৃত হবে না। যেখানে সমাজের প্রতিটি শ্রেণী পরস্পরের প্রতি মৈত্রী-ভাবে উদ্বুদ্ধ, যেখানে গণকল্যাণই সকলের মুখ্য লক্ষ্য, স্বাধীনতা শুধু সেখানেই ফলপ্রসূ হতে পারে”।…
পৃথিবীকে অবাক করে দেওয়া এই অসাধারণ প্রতিভা ও মানসিক ক্ষমতাসম্পন্ন নারী হেলেন কেলার ১৯৬৮ সালের ০১ জুন আরেকদফা বিস্ময়ে সবাইকে বিস্মিত করে চলে যান না ফেরার দেশে!
তথ্যসূত্র: রবিজীবনী: প্রশান্তকুমার পাল। রবীন্দ্রজীবনকথা – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রসূত্রে বিদেশীরা – সমীর সেনগুপ্ত।