আজকের লেখায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

লালন ও রবীন্দ্রনাথ

লালনের গানের পুঁথিই কি সুকৌশলে গীতাঞ্জলিতে রূপান্তরিত হয়েছিল?
অন্নদাশঙ্কর রায় লিখছেন – “লালন ফকিরের শিষ্যদের বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে লালনের গানের পুঁথিই সুকৌশলে গীতাঞ্জলিতে রূপান্তরিত হয়। সুতরাং কবিগুরুর নোবেল পুরস্কার তথা বিশ্বজোড়া খ্যাতির মূলে বাংলার বাউল লালন সাঁই। আমি যখন কুষ্টিয়ার মহাকুমাশাসক তখন আমাকে একথা বলেন কুমারখালির ভোলানাথ মজুমদার। সে সময় কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় মুনসেফ ছিলেন মতিলাল দাশ পরবর্তীকালে ডক্টর মতিলাল দাশ। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত ‘লালন গীতিকার’ প্রধান গ্রন্থকার। তিনি স্বতন্ত্রভাবে সে কথা শোনেন।
তিনি লিখছেন, “ভোলাই শা’র নিকট হইতে গানের পুঁথি আদায় করিতে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছিল। ভোলাই সা বলিল, ‘দেখুন রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালবাসিতেন, আমাদের খাতা তিনি লইয়া গিয়াছেন, সে খাতা আর পাই নাই, কলিকাতা ও বোলপুরে চিঠি দিয়াও পাই নাই’। এ কথার সত্যতা কতদূর কে জানে? কিন্তু ভোলাই কবিগুরুকে লালনের চেনা বলিয়া মনে করে এবং বলে যে, কবিগুরু লালনের গানকে রূপান্তরিত করিয়াই জগত-জোড়া নাম কিনিয়াছেন। … সে যাহা হউক, বৃদ্ধের অনেক স্তুতি করিয়া কোনোক্রমে একটি গানের নকল পুঁথি জোগাড় করিলাম”।
একদিন ভোলানাথবাবু অন্নদাশঙ্কর রায়কে অনুরোধ করেন যে তিনি যেন লালন ফকিরের আসল পুঁথিটা কবিগুরুর কাছ থেকে উদ্ধার করে দিতে সাহায্য করেন। আসল পুঁথিখানা যে কবির কাছে আছে একথা মেনে নিতে অন্নদাবাবুর অনিচ্ছা ছিল। এই নিয়ে গুরুদেবকে বিরক্ত করার কথা ভাবতে তিনি অসমীচীন বলে মনে করেন। কুষ্টিয়া মহাকুমায় অবস্থিত শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মত যান ১৯২২ সালে। তবে পুরোনো কর্মচারীদের মধ্যে একজন ছিলেন শচীন্দ্রচন্দ্র অধিকারী। পরবর্তীকালে যিনি ‘গুরুদেব ও শিলাইদহ’ প্রসঙ্গে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। দিনকয়েক পরে অন্নদাশঙ্কর রায় পুরোনো চিঠিপত্রের মধ্যে কুষ্টিয়ার নবাব জনাব গোলাম রহমানের লেখা একটি চিঠি আবিস্কার করেন, তার সঙ্গে গাঁথা ছিল গোলাপ রহমানকে লেখা শচীন অধিকারীর একখানি চিঠি। শচীনবাবু শান্তিনিকেতন থেকে সে চিঠি লিখেছিলেন ১৯৪৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর তারিখে। তাতে ছিল –
“শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু আমাকে তাঁহার আঁকা (১৯১৩) কয়েকখানা স্কেচ দিয়াছেন। তিনি বলিলেন যে তিনি লালন ফকিরের একটা পেনসিল স্কেচ আঁকিয়াছিলেন তাহা যে কোথায় তাহা খুঁজিয়া পাওয়া যাইতেছে না”।
এই স্কেচ ছাড়া আরও একখানা ছবির কথাও শচীনবাবুর চিঠিতে ছিল। তিনি এ বিষয়ে রথীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন। রথীবাবু সেই ছবির কথা স্মরণ করতে পারলেন না। তবে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনের জন্যে যখন পুরোনো ছবির বাক্স খোলা হবে তখন সন্ধান দিতে বলেছেন।
নন্দবাবুর স্কেচ পরে প্রকাশিত হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লালন-গীতিকার’ মলাটে সেই স্কেচই মুদ্রিত। কিন্তু নন্দলালবাবু তো লালনকে চোখে দেখে আঁকেননি। যতদূর জানা যায়, যা দেখে এঁকেছিলেন সেটিও একটি স্কেচ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকা। সম্ভবত শচীন্দ্রবাবু যে ছবির কথা উল্লেখ করেছেন এ সেই ছবি। বাক্সবন্দী হয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল। ইতিমধ্যে উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু কেউ বলতে পারে না কবে ও কোথায় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লালনকে দেখেন।
ছবি না হয় পাওয়া গেল, কিন্তু আসল খাতাখানার কি খবর? এর উত্তর পাওয়া যাবে ডক্টর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের জবানিতে।
“ছেলেবেলা হইতে দেশের নানা মুসলমান ফকিরের মুখে লালনের গান শুনিয়া আসিতেছি। বয়োঃবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লালনের বিষয় জানিবার জন্য খুব আগ্রহ হয়। ১৯২৫ সালে ওই অঞ্চলের বিখ্যাত লালনশাহী ফকির হীরুশাহের সঙ্গে বাড়ি হইতে দশ মাইল পথ হাঁটিয়া লালনের সেঁউরিয়া আখরায় উপস্থিত হই।… এই সময় আশ্রমে রক্ষিত একখানা পুরানো গানের খাতা দেখি। উহা নানা প্রকারের ভুলে এমন ভর্তি যে, প্রকৃত পাঠোদ্ধার করা বহু বিবেচনা ও সময়সাপেক্ষ। আশ্রমের কর্তৃপক্ষরা বলে যে সাঁইজির আসল খাতা শিলাইদহের ‘রবি বাবুমশায়’ লইয়া গিয়াছেন। … লালনের শিষ্যরা আবার সেই গানগুলি বর্তমান খাতায় লিখিয়া রাখিয়াছে। তাহারা আরও বলে যে সাঁইজীর সেই গানের খাতা পাইয়াই রবীন্দ্রনাথ অত বড় কবি হইয়া সকলের প্রশংসা লাভ করিয়াছেন।… তারপর ১৯৩৬ সাল হইতে কুষ্টিয়ায় যখন স্থায়ীভাবে বাস করিতে আরম্ভ করি তখন লালনের সমস্ত গান পূর্ণাঙ্গ ও শুদ্ধরূপে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করি। তখন সেই খাতাখানি একবার দেখিবার প্রয়োজন হইলে আখরার তদানীন্তন মালিক ভোলাই শা ফকির বলে যে ঐ খাতা মুনসেফ মতিলালবাবু লইয়া গিয়াছেন ফেরত দেন নাই।… মতিলালবাবু যে খাতা লইয়া যান নাই, সে খাতা লালনের আস্তানাতেই আছে, তাহার প্রমাণ শীঘ্রই পাওয়া গেল। যাই হোক, সেই খাতা দেখিবার আবার সুযোগ মিলিল”।
উপেন্দ্রবাবু দেশ বিভাগের পর কলকাতায় এসে কোনো এক সূত্রে খবর পান যে, রবীন্দ্রনাথের পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে লালন ফকিরের গান সম্বলিত একটা খাতা পাওয়া গেছে। ঐ খাতা শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে আছে। তখন তাঁর মনে হল এই বোধ হয় সেই বহুশ্রুত, বহুকথিত ‘সাঁইজীর আসল খাতা’। সেই খাতা দেখবার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৪৯ সালে শান্তিনিকেতন যান। সঙ্গে শচীন্দ্রনাথ অধিকারী। রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ প্রবোধচন্দ্র সেন মহাশয়ের সৌজন্যে খাতাখানা হস্তগত হলে দেখা গেল, এটা সেই নানাপ্রকারের ভুলের নমুনাভরা লালনের আখরার খাতাখানির একটি কপি। বেশ বোঝা গেল ‘আসল খাতা’ সেই একমাত্র খাতা যার নকল রবীন্দ্রনাথ নিয়েছেন, যা মতিলাল দাশ দেখেছেন ও বা উপেন্দ্রবাবুও কয়েকবার দেখেছেন। শচীন্দ্রবাবু বললেন এই হাতের লেখা তিনি ভালরূপে চেনেন। এটি শিলাইদহের ঠাকুর এষ্টেটের এক পুরাতন কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যের। তখন উপেন্দ্রবাবুর মনে হয় যে, রবীন্দ্রনাথ লালনের আখড়া থেকে খাতাখানি সংগ্রহ করে তাঁর কর্মচারীকে দিয়ে নকল করিয়ে নেন। পরে ওর থেকে কতগুলি গান নিয়ে শুদ্ধ করে ‘প্রবাসী’-তে প্রকাশ করেন। দীর্ঘকাল ধরে রবীন্দ্রনাথের দ্বারা আসল খাতা নিয়ে যাওয়ার যে গল্প চলে আসছিল তার মূলে যে বিশেষ কিছুই নেই তা পূর্বে অনুমান করলেও এবার নিঃসন্দেহ হলেন উপেনবাবু।
তবে জলধর সেন তাঁর ‘কাঙাল হরিনাথ’ গ্রন্থে এবং শচীন্দ্রনাথ অধিকারী (শিলাইদহের অধিবাসী, ঠাকুর এষ্টেটের বহুদিনের কর্মচারী) তাঁর ‘শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ-লালন ফকিরের সাক্ষাতের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল তাঁর গ্রন্থে এঁদের উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, এই সকল বর্ণনার কোনও যথার্থ প্রমাণ নেই। তাই প্রত্যক্ষ প্রমাণের অভাবে রবীন্দ্রজীবনীকারের মত আমরাও মেনে নিই লালন ফকিরের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়নি। তবে লালনের ব্যক্তিজীবন, তাঁর ধর্মমত ও পদবিষয়ে রবীন্দ্রনাথ অবহিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যে, সংগীত সাধনায় লালন ফকিরের গানের প্রভাব সুগভীর। তাঁর বহু গান রবীন্দ্রনাথ শুনেছেন, বেশ কিছু গান সংগ্রহও করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত লালনের গানগুলি প্রকাশিত হয় ১৩২২ বঙ্গাব্দে ‘প্রবাসী’-র ‘হারামণি’ বিভাগে – [আশ্বিন, অগ্রহায়ণ, মাঘ সংখ্যায়। – ‘সংগ্রহকর্তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ নির্দেশসহ ২৯৮টি ‘লালন ফকিরের গান’ সংকলিত হয়। রবীন্দ্রভবনে রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে নকল করা ২০টি [কয়েকটি গান দু-বার লিখিত হওয়ায় মোট ২৮৫টি] ‘লালন ফকিরের গান/বাউল সংগ্রহ’ দুটি খাতায় রক্ষিত আছে। ‘আসল খাতা’ খুঁজতে যাওয়া বৃথা। ‘আসল’ কোনোটিই নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘নকল খাতায়’ ছিল ২৯৮টি গান। তাঁর উপরে লালনের প্রভাব যদি পড়ে থাকে তবে ‘ফাল্গুনি’-তে ‘গীতাঞ্জলি’-তে নয়।
লালনের গান প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর দেহরক্ষার দুই সপ্তাহের মধ্যে ‘হিতকরী’ পত্রিকায় ৩১শে অক্টোবর ১৮৯০ খৃষ্টাব্দে। তারপরে ১৩০২ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায়। প্রবন্ধের নাম ‘লালন ফকির ও গগন’। লেখিকা সরলা দেবী। ‘ভারতী’ ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা। সরলাদেবী রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয়ী। লালনের সঙ্গে কবির সাক্ষাৎ ঘটে থাকলে প্রবন্ধটিতে তার উল্লেখ থাকত। কবি নিজেও সেকথা তাঁর লেখায় বা বক্তৃতায় উল্লেখ করতেন। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাতের কথা কবির জীবিতকালে শোনা যায়নি। পরে যাঁরা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে শিলাইদহের শচীন্দ্রনাথ অধিকারীই এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য নিরূপণের অধিকারী। ‘পল্লীর মানুষ রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে তিনি ‘লালন ফকিরের সঙ্গে মোলাকাৎ’ নামে লালনের সঙ্গে কবির সাক্ষাৎকারের যে বিবরণ দেন তা পরে প্রত্যাহার করেন। কাহিনীটি তিনি শুনেছিলেন বরকন্দাজ হায়দার মিঞার কাছে। হায়দর সম্ভবত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিল। দুজনেই তো বাবুমশায়। লালনের স্কেচ এঁকেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ।
কেন রবীন্দ্রনাথ নয়, তার সোজা উত্তর লালনের মৃত্যুর সময় কবির বয়স ছিল উনত্রিশ আর লালনের একশ ষোলো। অন্তত একশ বারো। সাক্ষাৎকারটি রবীন্দ্রনাথের ক-বছর বয়সে ঘটেছিল তা কেউ বলেনি। যদি তেইশ বছর বয়সে হয়ে থাকে তবে তখন লালনের বয়স একশ দশ বা একশ ছয়। লালন সে বয়সে কোথাও গেলে ঘোড়ায় চড়ে যেতেন। পায়ে হেঁটে যেতেন না। ছেঁউরিয়া আর শিলাইদহ পাশাপাশি গ্রামও নয়। মাঝখানে গোরাই নদী ও কাঁচা রাস্তা। এত ক্লেশ স্বীকার করে লালন মোলাকাৎ করতে যাবেন কেন? কবি কি সেই বয়সেই বিশ্বকবি? না, বঙ্গবিখ্যাতও না। বাউলরা অন্যের লেখা কবিতা পড়ে না। মোলাকাৎ করতে গেলে যেতে হয় কবির সঙ্গে নয়, বাবুমশায়ের সঙ্গে। হায়দার বরকন্দাজ নাকি বলেছিল, আজ সকালে ছেঁউড়ের প্রজারা দরবার করতে এসেছিল। তাঁদের মধ্যে নিশ্চয়ই লালন ফকির ছিল। হায়দারের এই ধারণার কারণ এক বৃদ্ধের ফেলে যাওয়া সাপমুখো লাঠি নাকি লালন ফকিরের। হায়দারের কথা সত্য হলে প্রপিতামহবয়সী অথর্ব এক বৃদ্ধকে তরুণ জমিদার আবার পরের দিন হাজির হতে বলেন। তাঁর কন্ঠে যে যে গান শোনেন তাও নাকি হায়দারের মনে ছিল। কিন্তু কবে মনে ছিল? যবে রবীন্দ্রনাথও আর নেই। মাঝখানে কেটে গেছে খুব কম করে ধরলেও একান্ন বছর।
শিলাইদহে ষোলো সতেরজন প্রজা দরবার করতে আসে। তাঁদের সঙ্গে একজন বৃদ্ধও এসেছিল। তার কোনো দরকার ছিল না। কোনোরকম বক্তব্য বা জিজ্ঞাসাও ছিল না। সে শুধু নীরবে তিন-চার ঘন্টা ধরে দুটি চোখ ভরে রবীন্দ্রনাথকে দেখছিল। তার মুখের কথা শুনছিল চুপটি করে। কিন্তু এমন চমৎকার খোশগল্পটি প্রত্যাহার করে শচীন্দ্রবাবু আমাদের গল্পপ্রিয় দেশবাসীদের হতাশ করেছেন। তার আগে তিনি অনেক অনুসন্ধান করে জানতে পেরেছেন যে, “এই সত্য কাহিনীটির নায়ক রবীন্দ্রনাথ না আসতে পারেন। তাঁর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গেই সাঁইজীর ঐভাবে আলাপ হয়েছিল”। জ্যোতিরিন্দ্র সাঁইজীর স্কেচ এঁকে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তো একখানা গান পর্যন্ত লিখে নেননি। গানের খাতা সংগ্রহ করেন শিষ্যদের কাছ থেকে কে জানে কতকাল পরে। এসব বিবেচনা করলে কাহিনীটিকে রবীন্দ্রজীবন থেকে বাদ দিতেই হয়। লালনজীবন থেকেও। দুজনেই যে যার গগনে দীপ্যমান। ততদিনে একজন অস্তাচলগামী, অপরজন উদয়াচলে আসীন। কিন্তু দুই জ্যোতিস্কের সাক্ষাৎকার প্রমাণাভাবে অসিদ্ধ।
রবীন্দ্রনাথ লালনের জন্য দুটি মহৎ কাজ করে গেছেন। একটি তাঁর গোরা উপন্যাসে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’র যোজনা। যদিও তখন তিনি জানতেন না যে গানটি লালন ফকিরের। উপেন্দ্রনাথ ভট্টচার্যের পূর্বে আর কেউ এটা আদ্যপান্ত ও ভনিতাসমেত সংগ্রহ করেননি। যাইহোক, বাংলা সাহিত্যের অমর উপন্যাস ‘গোরা’ লালনের একখানি গানকেও অমর করে দিয়েছে।
আর একটি কাজ অক্সফোর্ডে দেওয়া বক্তৃতায় কবিগুরু আবার সেই খাঁচার ভিতর অচিন পাখী’রই ইংরেজি তর্জমা যোজনা করেছেন। সেইটেই বাউল সাধনায় মূল সুর। রবীন্দ্রনাথের মানুষের ধর্মেরও মর্মবাণী। সেটি যে লালনের লেখা একথা বোধ হয় তখনও তাঁর অজানা। তাই লালনের নাম না উল্লেখ করে তিনি বলেন, –
“This Village Poet Evidently agrees with our sage of the Upanishad who says that our mind comes back baffled in its attempt to reach the Unknown Being; and yet this poet like the ancient sage does not give up adventure o the Infinite, thus implying that there is a way to realization. It reminds me of Shelly’s Poem in which is sings of the mystical spirit of beauty”.
The awful shadow of some unseen Power
Floats though unseen among us; visiting
This various world with as inconstant wing
As summer winds that creep from flower to flower;
Like moonbeams that behind some piny mountain shower,
It visits with inconstant glance
Each human heart and countenance;
তবে জমিদারী পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহ এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলতত্ত্বের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। তিনি লিখেছেন-
কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মানদীর ধারে,
যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙ্গে ফেলতে।
দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।
এছাড়া ১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক ভাষণে লালনের ‘অচিন পাখি’ গানটির উল্লেখ করে রবীন্দ্রনাথ লালন ও শেলীর মধ্যে তুলনা করতে প্রবৃত্ত হয়েছেন। তিনি বলেছেন-
“That this unknown is the profoundest reality, though difficult in comprehention, is eqally admitted by the English poet as by the nameless village singer in Bengal of whose music vibrates the wing-beats of the unknown bird, – only Shelley’s utterance is for the cultural few, while the Baul Song is for the tillers of the soil, for the simple folk of our village households, who are never bored by the mystic transcendentalism.”
“এমন মানব জনম আর কি হবে
ও মন যা কর তা ত্বরায় কর এই ভবে।”
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দের প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লালনের উক্ত পঙ্কতিমালা উল্লেখ করে এর সমালোচনায় বলেন-
“এই ছন্দের ভঙ্গি একঘেয়ে নয়। ছোটবড় নানা ভাগে এঁকেবেঁকে চলেছে। সাধুপ্রসাধনে মেজেঘষে এর শোভা বাড়ানো চলে, আশা করি এমন কথা বলবার সাহস হবে না কারো।”
এসব গান থেকেই উপলব্ধি করা যায় যে লালন সাঁই সব সময় বিলীন থাকেতেন পরমাত্মার মাঝে। আর সেই অসীম পরম আত্মার মাঝেই খুঁজে বেরিয়েছেন মানবসত্ত্বার মানুষকে। মানবতাই তাঁর নিকট ছিল বিশেষ গুরুত্ববহ । তাই তিনি সহজেই বলতে পারতেন প্রচলিত ধর্ম মানুষের মাঝে বিরোধের সৃষ্টি করে। পরমাত্মার সাথে মানুষের একাত্ম হওয়ার ধর্মই মানবতা ধর্ম। যা মানবাত্মার দিব্যজ্ঞানের পরিচায়ক। তাঁর ভাষায় –
‘ডানে বেদ, বামে কোরান,
মাঝখানে ফকিরের বয়ান,
যার হবে সেই দিব্যজ্ঞান
সেই দেখতে পায়’
আর এই বাণীর দ্যোতনা খুঁজে পাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায় । তিনি সীমাবদ্ধতার ভেতর খুঁজেছেন অসীমের আলোক রশ্মি। অন্য এক ধরনের ভাব দর্শনে আলিঙ্গন করতে চেয়েছেন অসীমত্বের মাঝে অস্তিত্বের সন্ধান। বিশালত্বের মাঝে খুঁজে ফিরেছেন স্বীয় আত্মার অস্তিত্ব। পরমের মাঝে বিলীন হওয়ার আনন্দ রাশি। তাই তিনি লেখনীর তুলিতে ছাপিয়ে তোলেন সেই আকাঙ্খার সুর ও ছন্দ –
‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি
বাজাও আপন সুর।
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর।
কত বর্ণে কত গন্ধে
কত গানে কত ছন্দে,
অরূপ, তোমার রূপের লীলায়
জাগে হৃদয়পুর।’
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায় – ‘আমার লেখা যারা পড়েছেন, তাঁরা জানেন বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ- আলোচনা হতো। আমার অনেক গানে আমি বহু সুর গ্রহন করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরগিনীর সাথে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বানী কোন এক সময় আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে। আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স- শিলাইদহ (কুস্টিয়া) অঞ্চলের এক বাউল একতারা হাতে বাজিয়ে গেয়েছিল –
‘কোথায় পাবো তাঁরে – আমার মনের মানুষ যেঁরে।
হারায়ে সেই মানুষে- তাঁর উদ্দেশে
দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে’
(এই গানটি গেয়েছিল-ফকির লালন শাহের ভাবশিষ্য গগন হরকরা। যার আসল নাম বাউল গগনচন্দ্র দাস। বাউলগণ পরমেশ্বরকে নারী-জ্ঞানে ভালোবেসে ,শ্রদ্ধায়, ভক্তি-প্রেমে অন্তরে তাঁর সান্যিধ্য প্রাপ্তির লাভের আশায় হৃদয়ের সমস্ত চেতনা, আবেগ মন্থিত সুরাশ্রয়ে বিমোহিত হয়ে আকুলিত প্রাণে সুর তুলে থাকেন। )
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের ভাষায় ঐ বাউলের গানের কথা ও সুরের মাধুর্য আমাকে এতোই বিমোহিত করেছিলো যে, আমি সেই সুর ও ছন্দে বাংলাদেশকে মাতৃরূপ জ্ঞানে লিখেছি –
‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাঁজায় বাঁশি’
যা বর্তমানে রক্তস্নাত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় সঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে মাতৃ-জ্ঞানে ভালোবেসে, শ্রদ্ধায়, ভক্তি-প্রেমে, অন্তরে সমস্ত চেতনায় লালন শাহের সুর ও ছন্দে রচনা করেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। অর্থাৎ, আমাদের রক্তের ঝর্ণাধারার বিনিময়ে অর্জিত জাতীয় সঙ্গীত ভাষা ও শব্দ বিন্যাসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ দৃশ্যমান হলেও ; সুর ও ছন্দে এবং প্রেরণার উৎস হিসেবে বাউল সম্রাট লালন শাহের অবদানকে ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।
সঙ্গীতের জন্ম বা উদ্ভব হয়েছে ধ্যান সাধনা থেকে। আত্মদ্রষ্টা মহাপুরুষগণই সঙ্গীতের আদি জনক। ভারতীর দর্শন, ঈশ্বরের চেতনা রবীন্দ্রনাথ তুলে এনেছিলেন শ্রীমদভগবদ্গীতা হতে। যা বিস্তৃত হয়েছে গানের সুর ও ছন্দে ‘গীতাঞ্জলি’তে। আর এ গীতাঞ্জলির প্রতি ছত্রে ছত্রে খুঁজে পাওয়া যায় ফকির লালন শাহের সঙ্গীতের বা লালন দর্শনের মূল ভাবাদর্শের পরশ।
রবীন্দ্রনাথ অরূপের (নিরাকার) অপরূপ রূপে অবগাহনের নিমিত্তে অতল রূপ সাগরে ডুব দিয়েছেন অরূপ রতন (অমূল্য রতন) আশা করি, তাঁর ভাষায়-
‘রূপসাগরে ডুব দিয়েছি
অরূপ রতন আশা করি;
ঘাটে ঘাটে ঘুরব না আর
ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।
সময় যেন হয় রে এবার
ঢেউ-খাওয়া সব চুকিয়ে দেবার
সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে
অমর হয়ে রব মরি।’
আর লালনের দার্শনিকতায় প্রবাহমান গুনরাজির অসীমান্তিক মহা ভাব-সাগরে সাঁতার কেটে জানিনা কতুটুকু ছুঁতে পারবে অমূল্য সেই নিধি। তিনি দয়াল, এই ভরসায় বাঞ্ছা করি তাঁর মহানাম কীর্তর্নে এ মহাসত্যই লালন দর্শনের আদিপাঠ। লালনের কালামে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রূপ সাগরে ডুব দিয়ে অরূপ রতন পাওয়ার আকঙ্খার অনেক পূর্বেই। লালন তাঁর একতারার তারে সুরে ও ছন্দে গেয়ে গেছেন –
‘রূপের তুলনা রূপে।
ফণি মণি সৌদামিনী
কী আর তাঁর কাছে শোভে
যে দেখেছে সেই অটল রূপ
বাক্ নাহি তার, মেরেছে চুপ।
পার হলো সে এ ভবকূপ
রূপের মালা হৃদয়ে জপে’
এই রূপের তুলনা মানবসত্ত্বায় নিহিত বস্তুমোহমুক্ত নিষ্কামী মহা মানবের স্বরূপ। যে মহা মানব সম্যক গুরুদেবের কাছে সম্পূর্ন আত্ম-সমর্পিত চিত্তে কঠিন ধ্যানব্রত অবস্থায় শিক্ষা গ্রহন করেন। যেখানে অরূপে( অস্থিত্বহীনতায়) খুঁজে ফেরে রূপের সন্ধান। যেখানে ‘নিজেকে জানা’ এর জন্য পরিপূর্ন আত্মদর্শনে ব্যাপৃত থাকে। লালন তাঁর তত্ত্ব সহিত্যে নতুন কিছুই বলেননি। যুগে যুগে মহা পুরুষ, অবতার, পয়গম্বর বা ঈশ্বরের প্রিয় ব্যক্তিগণ যা বলেছেন, সেই সকল বানীই তার সুরধ্বনীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে। আমিত্বের উৎসর্গ সাধন করা- এ ধারায় আপন মনের জাগতিক লোভ লালসাময় কঠিন আসক্তির বন্ধন ছিন্ন করে পরিশুদ্ধ স্বাত্ত্বিকতা অর্জনের নিমিত্তে আত্ম দর্শনের শিক্ষাদান করাই লালন দর্শনের সারকথা। অর্থাৎ, সক্রেটিসের দর্শনে – Know thyself .- নিজেকে জান। সিদ্ধার্থ গৌতমের বাণী – ‘আত্মনং বিদ্ধি’ – আপনাকে জ্ঞানী করে তোল। সনাতন ধর্মালম্বীদের (হিন্দু ধর্মমতে) চেতনায় যাকে বলে, ‘নিঃশ্রেয়স’- আত্মার বিশুদ্ধ উন্নতির মাধ্যমে মোক্ষ লাভ করন। আর ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মোহম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম – তাঁহার উপর শান্তি বর্ষিত হউক) এর বাণী -‘ মান আরাফা নাফসাহু, ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু।’- যে নিজেকে চিনেছে বা নিজেকে ধ্যান করেছে, সে পরমাত্মা বা ঈশ্বরকে চিনেছে। সেই কথাই ফকির লালন চেতনায় বেজে উঠেছে হাজার কথায়, বিবিধ সুরে। অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল ধর্মের উৎস চেতনা পরিশুদ্ধ আত্মার অনুসন্ধান করা। যার মাধ্যমে পরমাত্মার সান্নিধ্য লাভের প্রচেষ্ঠায় ব্রতী হওয়া। তাই লালন ফকির দ্বিধাহীন চিত্তে প্রকাশ করেছেন –
‘যার আপন খবর আপনার হয় না।
একবার আপনারে চিনতে পারলেরে
যাবে অচেনারে চেনা
আত্মরূপে কর্তা হরি,
নিষ্ঠা হলে মিলবে তাঁরই ঠিকানা।
ঘুরে বেড়াও দিল্লি লাহোর
কোলের ঘোর তো যায় না’
ধর্ম তত্ত্বে পরমাত্মা বা ঈশ্বরকে অনুসন্ধানের জন্য বৈরাগ্য সাধন প্রক্রিয়ায় বনে-জঙ্গলে, পাহার-পর্বতে, অথবা মক্কা-কাশীতে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেনি লালন শাহ; তেমনি তাঁর ভাবশিষ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লালন দর্শনের মতোই ঈশ্বরের মহিমা খুঁজে ফিরেছেন মানুয়েষর মাঝে। মানুষই ঈশ্বর, মানুষই দেবতা, মানুষের মাঝেই পরমাত্মার অস্থিত্ব লীন। তাই লালন শাহের কন্ঠে যেমন শুনি-
‘ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার।
সর্বসাধন সিদ্ধি হয় তার
নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে
আকার সাকার হইল সে
যে জন দিব্যজ্ঞানী হয়, সেহি জানতে পায়
কলি যুগে হল মানুষ অবতার’
অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন শাহের ভাব দর্শনের দ্যোতনাকে আরও উচ্চমার্গ্মে তুলে ধরেছেন। মনে হয় লালনের চিন্তা-চেতনাকে শালীন ও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন স্বয়ং কবিগুরু। মার্জিত ভাষার পরিশীলিত সুরের মাধুর্য দিয়ে কবিগুরু একতারার সুরের স্থানে বীণার তারে ঝংকৃত করেছেন মানব ও মানবতার মাঝেই পরমাত্মার অস্তিত্ব। সেই পরমাত্মাকে পেতে হলে আমিত্বের অহংবোধকে লীন করে দিতে হবে মানুষ-গুরু সাধনে; মানবতার পরাকাষ্ঠা দেদীপ্যমান করে। কবিগুরুর ভাষায় তা হলো –
‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা
সমস্ত থাক পড়ে।
রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে
কেন আছিস ওরে।
তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে
করছে চাষা চাষ –
পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ,
খাটছে বারো মাস।
রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,
ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে –
তাঁরই মতন শুচি বসন ছাড়ি
আয় রে ধুলার ‘পরে।’
অপরদিকে, ফকির লালন শাহ মানবদেহে নিহিত আলোকিত সত্তার উন্মেষের ইচ্ছায় স্বীয় কন্ঠে উচ্চারন করেন –
‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।
মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই
মূল হারাবি’…
মানুষ ছাড়া মনরে আমার
দেখিরে সব শূন্যকার
লালন বলে মানুষ আকার
ভজলে পাবি’
লালন ফকির তাঁর পরমাত্মার সাথে মিলনের প্রচন্ড আকাঙ্খা তাঁকে উন্মাতাল করে রাখতো, তাই সে প্রভুর সাথে মিলনের আকাঙ্খায় বেদন সুরে গেয়ে বেড়ায়-
‘মিলন হবে কতোদিনে।
আমার মনের মানুষের সনে
ঐ রূপ যখন স্মরণ হয়
থাকে না লোক লজ্জার ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
ও প্রেম যে করে সেই জানে’
প্রভুর সাথে মিলনের ইচ্ছা লালনকে যেমন চাতক প্রায় জোছনালোকের প্রত্যাশায় দিন গুনতো , তেমনি প্রভুর সান্নিধ্য পাবার আশায় রবীন্দ্রনাথ ব্যাকুল হৃদয়ে গাইতেন –
‘যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু,
এবার এ জীবনে,
তবে তোমায় আমি পাইনি যেন,
সে কথা রয় মনে ।
যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই
শয়নে স্বপনে।’
অথবা
‘আমার মিলন লাগি তুমি
আসছ কবে থেকে।
তোমার চন্দ্র সূর্য তোমায়
রাখবে কোথায় ঢেকে।
কত কালের সকাল-সাঁঝে
তোমার চরণধ্বনি বাজে,
গোপনে দূত হৃদয়-মাঝে
গেছে আমায় ডেকে।’
বাউল সম্রাট লালন ফকির এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- এ দু’জন মহৎ-প্রাণ ও সাধুর কর্ম ও রচনার কিছু দিক নিয়ে আলোকপাত করেছি বটে। লালন শাহের প্রয়াণের সময়কালে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ যৌবনকাল। তখন তাঁর বয়স ২৮/২৯ বছর। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে ‘গীতাঞ্জলি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এবং বাংলা ভাষাকে এনে দিয়েছে সুনাম, সম্মৃদ্ধি ও বিশ্বজনীনতা সেই গীতাঞ্জলির প্রতিটি ‘গীত’ ধীর-স্থিরতার সাথে পাঠ করলে নিজের অজান্তে মনে হবে – এ কথাগুলো যেন তাঁর পূর্ব-পুরুষ বাউল ফকির লালনের ভাষার দ্বারাই প্রভাবিত।
তথ্যসূত্র: রবিজীবনী: প্রশান্তকুমার পাল। লালন ফকির ও রবীন্দ্রনাথ – অন্নদাশঙ্কর রায়। শচীন্দ্রনাথ অধিকারী – ‘শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ’।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!