গল্পেরা জোনাকি -তে ইন্দ্রাণী সমাদ্দার

রজনীগন্ধা

রূপকথা হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গাড়ির দরজা বন্ধ করলো। নিঃশ্বাস প্রঃশ্বাসের আওয়াজ নিজের কানে এসে ধাক্কা মারছে। এই আবাসনে লিফট নেই। আজ থেকে দশ বছর আগে যখন সে ফ্ল্যাট কিনেছিল তখন রূপকথা একবারো ভাবেনি, তিনতলায় ওঠা-নামা কোনোদিন কোন সমস্যা হতে পারে। আসলে নিজেকে মানুষ যখন আয়নায় দেখে তখন মন যা দেখতে চায় তাই দেখে । অতিতের আমিকে কখনো কখনো দেখলেও ভবিষ্যতের আমিকে কজন দেখে। যদিও সিঁড়ি দিয়ে ওঠা নামার সমস্যা বাদ দিলে রূপকথার এই আবাসন নিয়ে আর কোন আক্ষেপ নেই। বিপদে আপদে এই আবাসনের আবাসিকরা আজও এগিয়ে আসে। রূপকথা রায় পেশায় কর্পোরেট অফিসের উচ্চপদস্ত অফিসার। রূপকথা ও তার মা এই নিয়ে রূপকথাা র সংসার। তার একমাত্র নেশা ভ্রমণ । নাঃ নাঃ আরেকটা নেশা আছে – রজনীগন্ধা । রজনীগন্ধা সে মাথায় লাগায় না। ঘর সাজায় না। তবে রজনীগন্ধা তার সঙ্গে না থাকলে তার মন আনচান করে। অফিসের কাজে মন বসে না। রজনীগন্ধা শেষ হয়ে গেলে সে প্রথম প্রেমে পরা কিশোরীর মত রজনী গন্ধার বিরহে ছটপট করে। এই নিয়ে তার বন্ধু- বান্ধব এমন কি কলিগরাও মজা করে আনন্দ পায়। আজ রাজারহাটে মিটিং আছে । হেড অফিস থেকে ডিরেক্টার আসছেন। এই প্রজেক্টের কোঅর্ডিনেটর নীলেশ মহান্তিকে নিয়ে গাড়ি ছুটবে রাজারহাটের পথে। ঢালাই ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি যানজটের জন্য থমকে দাঁড়ালো। আজো অফিসে পোঁছাতে দেরী হবে। রূপকথার নিজের উপর রাগ হোলো। আজ ভেবেছিল সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠবে কিন্তু ভোর নটার আগে তার আজও ঘুম ভাঙ্গেনি। একে ডিরেক্টর আসছেন তার উপর নীলেশের সঙ্গে এই প্রজেক্টে তার প্রথম কাজ। কেমন লোক কে জানে! একবার দেখে নিলো সব ফাইল যা লাগবে আছে কিনা। সব দরকারি কাগজ ঠিক আছে হঠাৎ মনে হোলো তার প্রাণ ভোমরা রজনীগন্ধা ব্যাগে আছে তো?
ব্যাগ তোলপার করে খুঁজছে। কোথাও নেই। কিন্তু তার পরিষ্কার মনে আছে গতকাল অফিস ফেরতা রজনীগন্ধা কিনে সে বাড়ি ফিরেছে। চোখটা ছল ছল করে উঠল। আজ সারা দিন কি করে সে কাটাবে রজনীগন্ধা ছাড়া। একটা প্রশ্ন ছুটে আসতে রূপকথা খেয়াল করে নীলেশ গাড়িতে উঠে পরেছে। নীলেশ জানতে চায় কিছু কী রূপকথা খুঁজছে। রূপকথা জানায় সে রজনীগন্ধা বাড়িতে ফেলে এসেছে। নীলেশ জানায় –‘ সব্বোনাশ! আমি শুনেছি রজনীগন্ধা ছাড়া তুমি এক মুহূর্ত থাকতে পারোনা। সারাদিন তুমি থাকবে কি করে ?’ কথা শেষ হবার আগেই নীলেশ হোহো হরে হাসতে থাকে। দেখে রূপকথার গা জ্বলে যায়। এইদিকে রূপকথার রজনীগন্ধার শোকে গলা শুকিয়ে আসছে। রাজারহাটে পৌঁছেই খুঁজতে হবে রজনীগন্ধা। হঠাৎ গাড়ি থেমে যায়। ড্রাইভার কিছু না বলে দুম করে গাড়ি থেকে নেমে যায়। নীলেশ বলে ‘ ড্রাইভার কিছু না বলে নেমে গেলো। কী অদ্ভুত’ । একটু আগের হাসির জন্য রূপ কথা রেগেই ছিল। সে বলে ওঠে ‘তুমি একটা কিম্ভুত প্রকৃতির ডাকে সারা দিতে গিয়ে হয়ত বেচারা আমাদের বলে যেতে পারেনি।‘
কিছুক্ষণ পর গাড়ির দরজা খুলে ড্রাইভার হাসিহাসি মুখ করে রূপকথার দিকে তাকালো। বলে ‘ম্যাডাম আপনার রজনীগন্ধ্যা এনেছি।’ শুনে রূপকথা আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। কিন্তু ড্রাইভারের হাতে দেখে এক গোছা রজনীগন্ধা। সেই দেখে নীলেশ হেসে গড়িয়ে পরে। হাসতে হাসতে বলে এই রজনীগন্ধা সেই রজনীগন্ধা নয়। প্যাকেটে যে রজনীগন্ধ্যা মশলা পাওয়া যায় সেটা এই ম্যাডাম খান। ড্রাইভার ছেলেটি মাথা চুলকে জ্বিভ কাটে। তাকে দেখে রূপকথা হোহো করে হেসে ওঠে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।