হৈচৈ ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী তে ঈশানী রায়চৌধুরী (পর্ব – ১৮)

চললুম ইওরোপ
এঙ্গেলবার্গে নেমে বুঝলাম বেশ খিদে পেয়েছে। তা পাবেই তো যা বিশ্ববিজয় করে ফিরলাম। মনে পড়লে হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে। বাবাই একটা কফিশপে নিয়ে গেল। গুছিয়ে বসে দেখলাম এখানে শুধু কেক আর কফি পাওয়া যায়। কারণ দোকান প্রায় বন্ধ হওয়ার সময়। বেশ বেশ… তাই সই। এখন সন্ধে হয়ে গেছে, তাই আমাদেরও ফেরার তাড়া। যে পথে এসেছিলাম ট্রেনে করে আবার সেই পথেই ফিরতে হবে। জুরিখ হয়ে আবার আমাদের পুরোনো আস্তানা, হোটেল ইজি। স্টেশন থেকে খুব কাছে। বাবাই বলল মা আজকেও কি একই জায়গায় খেতে যাবে? রক্ষে কর বাবা রোজ রোজ ২৫০ইউরোর খাবার খেলে আমাদের হজম হবে না। মা ওদের কোন দোষ নেই…. সুইজারল্যান্ডে ব্যবসা করা খুব এক্সপেনসিভ। না বাবা আজ আমার ম্যাকডোনাল্ডের ঐ র্যাপ টাই খেতে ইচ্ছে করছে।
বাড়ি চল যা খেতে চাইবে রান্না করে খাওয়াব ! ছেলে মুচকি হাসল। চেঞ্জ করে, ফ্রেশ হয়ে আমরা আবার গুছিয়ে বসলাম… বাবাই বলল আমি খাবার নিয়ে এসে ফাইনালি চেঞ্জ করব। ওকে।
বাবাইয়ের বাবা আজ মুডে আছেন বললেন যাই বল আমার ঐ গ্লেসিয়ার কেভটা খুব ভাল লেগেছে। একটা অদ্ভুত নীলচে আলো পুরো পরিবেশটা কেমন অন্যরকম করে রেখেছে। জান ঐ রংটার নাম টার্কিশ ব্লু…. বেশ সবজান্তার ভান করলাম। এত ঠান্ডা যে শ্বাসপ্রশ্বাসে কেমন সাদা মেঘের মত হয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত ফিলিং হচ্ছিল…. টিটলিসের সুপ্রাচীন তুষারহৃদয়ের অন্দরে ঢুকে পড়েছি। এখানকার তুষার প্রায় ৫০০০ বছরের পুরোনো। পুরো গুহাটা ১৫০ মিটার লম্বা….. দশ মিটার পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া যায়। বরফের মেঝে, বরফের দেওয়াল, বরফের ছাদ।খুব পা টিপে টিপে হাঁটলাম যদি পা পিছলে যায়। দেওয়ালের কাছাকাছি গেলে একটা কোল্ড শক ফিল করছি। ভেতরের টেম্পারেচর মাইনাস ১.৫ ডিগ্রী c. ।
এমন কিছু কম নয় তবু এরকম আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে কেন! একটা জায়গা আলো দিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে সবাই ছবি তোলে।আমরাও তুললাম তবে সবগুলোতেই আমরা আছি। পত্রিকা আমাদের ছবি এ্যালাউ করে না তাই বন্ধুদের দেখাতে পারলাম না। টিটলিস মাউন্টেন স্টেশনের লেভেল ওয়ান থেকে সোজা করিডর গিয়ে ঢুকছে এই গ্লেসিয়ার কেভে। বলেছিলাম না কেমন লাগল আজকের এক্সপিডিশন হোটেলের গরম ঘরে বসে বলব…… এই গল্পটা বাকি ছিল তাই শুনিয়ে দিলাম।
অদ্যই আমাদের সুইতজারল্যান্ডে শেষ রজনী। কত প্ল্যান কত কল্পনা সব আজ একটা জায়গায় থামল। পরের জার্নি বার্লিন।
পরদিন আমরা কোলন বন এয়ারপোর্টে এলাম। এই এয়ারপোর্ট সুইতজারল্যান্ড এবং জার্মানি দুটো দেশ থেকেই এ্যক্সেস করা যায়। এখানে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। খুব আরামদায়ক লাউঞ্জে বসে রইলাম। হঠাৎ কত্তামশাইয়ের শরীর খারাপ লাগতে শুরু করল।আসলে ওর মাঝে মাঝে সোডিয়াম ফল করে। নুন খেলে আবার রিকভার করে। তবে বিপদের কথা এখন তো সঙ্গে নুন নেই । আমিও ছোড়নেওয়ালি নই.. ফুডকোর্টে গিয়ে যখন নুন কথাটা কোন ভাষাতেই বোঝাতে পারলাম না আমি খুঁজতে লাগলাম পরপর দোকান। হঠাৎ একজায়গায় একটা বাকেটে নুন মরিচের ছোট ছোট পাউচ দেখতে পেলাম। ব্যস মুশকিল আসান !
যথাসময়ে সুইস এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আমরা পৌঁছালাম বার্লিন। সেই রাত্রে কমপ্লিট রেস্ট । পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়া গেল শহর দেখতে। আমাদের প্রথম দ্রষ্টব্য রাইসট্যাগ অর্থাৎ পার্লামেন্ট। ফেডারেল গভর্ণমেন্ট যখন স্থানান্তরিত হল তখন রাইসট্যাগ আবার জেগে উঠল সম্পূর্ণ আধুনিকরূপে।
অসাধারণ একটা গ্লাস ডোম দেখলাম আমরা। পাশ দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে। আমরা টপফ্লোর পর্যন্ত সিঁড়িতে উঠলাম। বহু ইতিহাসের সাক্ষী এখানে ধরা আছে অনেক ট্রিটি অনেক স্মৃতি। কাঁচের আস্তরণের নিচে সময় থমকে আছে। গ্লাস ডোমটা যতবার দেখছি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। বাইরে সব দেশের পতাকা লাগানো। বিস্মিত চোখে সব দেখে আমরা খোলা ছাদে এলাম। সেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ফোর। সঙ্গে হাওয়া। গরমজামা যথেষ্ট মনে হচ্ছে না। তড়িঘড়ি আবার ভেতরে এলাম। এখানে চারপাশে অনেক সরকারী ভবন। ফেডারেল চ্যান্সেলর আছে। এই চত্বরের সিগনেচার আকর্ষণ ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট। তৈরী হয়েছে ১৭৯১ সালে। এখানকার গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ টেলিভিশন টাওয়ার, বহুদূর থেকে দেখা যায়। এর ওপরে উঠে দর্শকরা ৩৬০ ডিগ্রী প্যানোরমায় শহর দেখেন। কিছুক্ষণ এখানে কাটিয়ে আমরা গরম কফিতে নিজেদের বুস্ট করার জন্য গেলাম। অতঃপর আমাদের গন্তব্য চ্যারিওটেনবার্গ প্যালেস। ছবির মত প্যালেসগার্ডেন আছে স্প্রী নদীর ধারে। বার্লিনের মিউজিয়াম আইল্যান্ড ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ।
তিন চারটে মিউজিয়াম আছে এখানে…. ওল্ড, নিউ ইত্যাদি। বার্লিন মিউজিয়ামের ঠিক উল্টোদিকে বার্লিন ক্যাথিড্রাল। সময়কাল ফিফটিন্থ সেনচুরি। বিকেল হয়ে আসছে চটপট জু তে ঢুকলাম আমরা। একটা জায়গায় বেশ ভিড় দেখে ঢুকলাম….. বেশ বড় একটা জলাশয়ে অনেক শীলমাছ। বিশাল তাদের চেহারা। জলাশয়টা দৃশ্যমান দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। তার ভেতরে শীলমাছেরা নানা কসরৎ দেখাচ্ছে । কখনও পাথরে পিঠ দিয়ে ধবধবে বুক চিতিয়ে আছে আবার কোথাও সোজা হয়ে জলের ওপর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। একটা নিচু গ্যালারিতে অনেক মানুষ আর প্রজাপতির মত দৌড়ে বেড়াচ্ছে শিশুরা। হাততালি দিচ্ছে, হাসছে খিলখিল করে। দৃশ্যমান দেওয়ালের গায়ে চাপড় দিয়ে ছুঁতে চাইছে ওদের। আমি মুগ্ধ হয়ে ওদের দেখছি , আহা এ যে নন্দনকানন ! অনেক না দেখা প্রাণী দেখলাম এই জুতে । সাদাকালো ভেলভেটের জামা পরা পেঙ্গুইনরা দলবেঁধে সভা বসিয়েছে কেউ বা জলে ডিগবাজি খাচ্ছে। হোটেলে ফিরে আমরা যে জায়গায় খেতে গেলাম সেখানকার খাবার নামকরা আবার ইন্ডিয়ান এমনকি বাঙ্গালি লোকজনও আছে আপ্যায়নের জন্যে। এরা এদেশে হোটেল ম্যানেজমেন্ট ট্রেনি। যথারীতি আমরা খুশি।
পরদন আমরা ট্রামে করে
এলাম যে জায়গায় সেখানে লোহার দুসারি দেওয়াল রাখা আছে । অনেক স্মারক আর ইতিহাসের সাক্ষী অনেক ছবি দিয়ে সাজানো। পথে নদীর ওপর প্রাচীন একটা ব্রীজ। ইঁটের স্ট্রাকচার এখনও সংরক্ষণ করে রেখেছে জার্মানরা। ঐতিহ্যের প্রতি ওদের ভালবাসা সত্যিই শিক্ষণীয়। এখানে যখন হাঁটছি টেম্পারেচর মাইনাস টু। আমার দাঁতের পাটি ধরে নাড়িয়ে দিচ্ছে বরফগলা হাওয়া। গলার আওয়াজেও বেশ ব্রেক ডান্স চলছে। যাই হোক এবার যাব সেই জায়গায় যেখানে সত্যিই দেওয়ালটা কিছুটা রয়ে গেছে।
আমরা চললাম ‘ দ্য গ্রেট বার্লিন ওয়াল ‘দেখতে। এই কংক্রীটের দেওয়াল তৈরী হয় ১৯৬১ সালে এবং ভাঙ্গা হয় ১৯৮৯ সালে। মতাদর্শগতভাবে এবং আক্ষরিকভাবে এই দেওয়াল বিভক্ত করেছিল বার্লিন শহরকে। জার্মান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক তৈরী করেছিল এটা। একদিকে পূর্ব বার্লিন সহ পূর্ব জার্মানি অন্যদিকে পশ্চিম বার্লিন। ওয়ালের মধ্রে গার্ড টাওয়ার এবং সংলগ্ন এলাকা ছিল যেটাকে ডেথ স্ট্রিপ বলা হত। এই মৃত্যু এলাকায় ছিল পরিখা যাতে যানবাহন যাতায়াত করতে না পারে ছিল অজস্র পেরেকের বিছানা যাতে কোন মানুষ লাফ দিয়ে পালাতে না পারে।বার্লিন ওয়ালের দৈর্ঘ্য ১৫৫ কিলোমিটার আর উচ্চতা ১১.৮ ফিট। সরকারি হিসেব অনুযায়ী প্রাচীর টপকে পূর্ববার্লিন থেকে পশ্চিমবার্লিনে যাবার চেষ্টা করতে গিয়ে ১২৫ জন জার্মান প্রাণ হারিয়ে ছিলেন। ১৯৮৯ সালের ৯ই নভেম্বর এর পতন হয়।এর পাঁচদিন আগে থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিশাল এক প্রতিবাদ সমাবেশ করেছিল। হাতে গোনা কয়েকজন রক্ষীর পক্ষে এই জনজোয়ার ঠেকানো সম্ভব ছিল না।
বাঁধভাঙা জলস্রোতের মত মানুষ কেউ ব্রান্ডেনবুর্গ গেটের ওপরে উঠে হাতুড়ি আর কুঠার দিয়ে দেওয়াল ভাঙ্গছেন আর খুলে দেওয়া গেট দিয়ে অজস্র মানুষ ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরছেন আর কাঁদছেন। সারা পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে দেখল এই দৃশ্য। আলোড়ন পড়ে গেল বিশ্বের রাজনীতিতে ।