সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৬)

এই তো তোমার আলোক ধেনু
দুই বছরের লক ডাউনের পর ইস্কুল যখন খুলল, ইস্কুলের গেটের উপরে মাধবীলতার ঝাড়টা খিলখিল করে হাসছিল । ইস্কুলের উঠোনের পাশের লেবু গাছটা উদার হয়ে হাওয়ায় ঢেলে দিচ্ছিল লেবু ফুলের গন্ধ । দুই পটের বিবি গোলাপসুন্দরী গাছ তাদের লাল আর কমলা রঙের সাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল গেটের পাশে । দু বছর পর ছোটরা ফিরছে যে । সবাই খুশি ।
ইস্কুল ঠিক করেছে মায়েদের জন্য বাচ্চারা কার্ড এঁকে নিয়ে যাবে । ইস্কুল সবাইকে ব্ল্যাঙ্ক কার্ড দেবে তাঁর উপরে ছবি আঁকা হবে, ভিতরে লেখা হবে মায়েদের জন্য ‘থ্যাঙ্ক ইউ মম’ । মা জননীরা একা হাতে বাচ্চাদের সামলেছেন যে দু বছর, দস্যিরা ইস্কুলে থাকলে তবু কিছুক্ষণ তাঁরা নিশ্চিন্তে কাজ সেরে একটু জিরোতে পারেন পাখার তলায় বসে, দু চুমুক চা খেতে পারেন, একটু গান শুনতে পারেন। দু বছর তো কিছুই হয় নি এসব । তা এ হেন কর্মকান্ডর ভার পড়ল দিদিমণিদের উপর । দিদিমণিরা কার্ড জোগার করলেন । যারা ছবি আঁকতে ভালবাসে তারা কার্ডের উপর নিজেরা ছবি আঁকবে, কিছু কার্ডে অবশ্য ছবি আঁকাই আছে, ভিতরে সকলকেই নিজে নিজে লিখতে হবে মায়েদের উদ্দেশ্যে দু চার কথা । মায়েদের জন্য ক্যাডবেরিও পাঠাবে ইস্কুল ।
তা, যেই দিদিমণি বাচ্চাদের দিয়ে লেখালিখির কাজটি করাচ্ছিলেন, তিনি লম্ফঝম্প করে এক তলা, চারতলা করতে করতে ইয়াব্বড় জিভ বার করে হাঁপালেও, কাজটি করতে বেশ মজা পাচ্ছিলেন । এই যেমন ক্লাস টুয়েলভের খানিক ডানা মেলতে শেখা নব যৌবনের দুতেরা তো হেসেই অস্থির । তারা তো বলেই ফেলল ‘ম্যাম, মায়েদের যা জ্বালিয়েছি, এখন থ্যাঙ্ক ইউ কার্ড লিখে নিয়ে গেলে হাতা, খুন্তি, বেলনা যা পাবে হাতের কাছে তাই ছুঁড়ে মারবে’ । দিদিমণি হেসে বললেন ‘ক্যাডবেরিটা দিও, তাহলে আর রাগ করবেন না’ । হেসে গড়িয়ে পরে নতুন যৌবনের দুতেরা, বলে ‘আরে ম্যাম সে তো আমরা পেটে পুরে নিয়ে যাব, মা দেখবে কি করে? হ্যা হ্যা হ্যা’ ।
দিদিমণি আর কথা না বাড়িয়ে, হাসি চেপে ছোটদের ক্লাসের দিকে যান । ক্লাস ফাইভে গিয়ে দেখেন সেখানে কেউ কিচ্ছু লিখছে না, চুপ করে সকলে কি যেন ভাবছে । দিদিমণি অনেক জিজ্ঞেস করার পর একজন আরেক বন্ধুকে দেখিয়ে বলে ‘ম্যাম, ওর মা অনেক ছোটবেলায় তারা হয়ে গেছেন, এই কার্ডটা ওর মায়ের কাছে যাবে কি করে?’ দিদিমণি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে গিয়ে বলেন ‘ঠাকুরের আসনে বা তোমার সবচেয়ে প্রিয় বইয়ের মধ্যে রেখে দিও, মা ঠিক দেখে নেবেন, মায়েরা বাচ্চাদের মধ্যেই থাকেন’ । এই শুনে খুদে খুদে হাত তখনি রঙ পেন্সিল বার করে, কাজে লেগে গেল ।
দিদিমণি আনমনা হয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন সু্য্যিদেব ঝুপুস করে এক ঝুড়ি সোনালি রঙ আমের মঞ্জরীদের মাথায় ঢেলে দিলেন আর দখিন হাওয়াও তাদের সাথে লুকোচুরি খেলতে এসে পড়েছেন ।