সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ২৩)

‘অচেনাকে ভয় কি আমার ওরে’ (পর্ব ২)

আমার বড়মামা পরিবারের সবচেয়ে ডানপিটে এবং প্রতিভাবান ছেলে । বড়মামার গতিবিধি ছিল পুনা শহর জুড়ে । সেসময়কার পুনা ফিল্ম ইন্সটিউট ভবিষ্যত বম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রীর তারকার দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল। তখনো এরা সকলেই ছাত্র । তারকাসুলভ বলিউডি আচরণ তাদের তখনো হয় নি, সাধারন মানুষের মতই তাদের গতিবিধি । বড়মামার জীবনে তখন বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ । পুনা শহর জুড়ে বড়মামা এবং তাঁর বন্ধুরা রাজপাট চালাতেন । বড়মামা নিজে ফার্গুসন কলেজে পরিসংখ্যানশাস্ত্রের তুখোড় ছাত্র হলেও এই ফিল্ম ইন্সটিউটে এবং পুনা ইউনিভার্সিটিতে ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। ভুত, ভগবানকে বিশেষ পরোয়া করতেন না । এই ফিল্ম ইন্সটিউটে যাতায়াতের কারনেই বড়মামার বিজ্ঞাপনের জগতে বহুযুগ ধরে পরবর্তীকালে কাজ করা । তাঁর ঝুলিভর্তি হয়েছিল ‘অচেনা’র বহু গল্পে, এই পুনা শহরেই । বলাই বাহুল্য সৃজনশীল মানুষেরা অনেককিছু নিজেদের ঝুলিতে পুরে রাখেন যা বুদ্ধি দিয়ে ব্যাখার অতীত । এই বন্ধুদের দলের অনেকেই তাদের বিভিন্ন ছবিতে, লেখাতে এসব ঘটনার কথা ধরে রেখেছেন এবং তা বিপুল জনপ্রিয় হয়েছে ভবিষ্যতে।

রাতবিরেতে বন্ধু বান্ধবের সাথে ফিল্ম ইন্সটিউটের হষ্টেলে থেকে যাওয়া বড়মামার কাছে কোন ব্যাপার ছিল না । তা এমনি একরাতে বড়মামা হষ্টেলে থেকে গিয়েছেন, রাতের বেলা তাস চলছে হষ্টেলের রুমে, হঠাৎ সেই হষ্টেলের ঘর বরফের মত ঠান্ডা হয়ে গেল, সকলে তাজ্জব । সেটা ঘোর গরম, যদিও পুনা শহরে বিকেলের দিকে সবসময়তেই একটা ঠান্ডা আমেজ থাকে তবে বরফশীতল কখনই হয় না, সকলে একসাথে উঠে গিয়ে দরজা, জানলা খুলে দিতেই ঘর আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল । ভবিষ্যতেও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, বড়মামারা সব তরুন তুর্কি তখন, এইসবের পরোয়া না করেই নিজেদের নিয়ে বিভোর হয়ে থেকেছেন ।

এই বন্ধুদের দল একবার পুনার আর্মি ব্যারাকে গেছেন কোন ছবির শুটিং এর কিছু মালপত্র জোগাড় করতে । সেসময়তে শিক্ষার্থীরা হাতেকলমে ছবি বানানোর কাজ শিখতেন এবং যাবতীয় জোগারযন্ত্র নিজেরাই করতেন । তা সেই আর্মি ব্যারাকে গিয়ে গোটা দল শুনতে পেলেন ভারী বুটের আওয়াজ তাদের ঠিক পিছনে পিছনে আসছে অথচ ঘুরে তাকালে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই বুটের আওয়াজের উৎস তাঁরা খুঁজে পান নি । আর্মি ব্যারাকের লোকজন বলেছেন ‘কুচ নেহি আপলোগ আপনা কাম কিজিয়ে, কুচ আওয়াজ আতে রহেঙ্গে, আপ ধিয়ান মাত দিজিয়ে ।’
আমার মায়েদের পুনার পার্ক রোডের বাংলো বাড়ীতে আওয়াজ এবং দৃশ্যের জন্ম আকছার হত । পুনার বাড়ীর সামনে একটা বিশাল লম্বা বারান্দা ছিল । সে বারান্দায় বড় মামা, ছোট মামা তাদের বন্ধু বান্ধব জুটিয়ে ক্রিকেট, হকি দুই পিটতেন । পড়াশোনাও করতেন রাতবিরেতে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে । একরাতে বড়মামা টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বারান্দায় পড়তে বসেছেন, সঙ্গে এক বন্ধুও রয়েছেন । বড়মামার মনে হল তাঁর পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে । এই অনুভুতি তাঁর আগেও হয়েছে । রক্ত এবং মাথা তাঁর বরাবরই বেজায় উষ্ণ, তিনি স্বাভাবিক ভাবেই পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি । বড়মামার বন্ধুবরটি কিন্ত অস্বস্তিতে পরলেন । বড়মামাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘তু কুচ মেহেসুস কর রাহা হ্যায় ক্যায়া?’ বড়মামা নির্বিকার হয়ে বললেন ‘ক্যায়া হ্যায়? কুচ নেহি । অন্দর যা কে ব্যাঠেগা তু? দিমাগ নেহি চল রাহা তেরা । চল অন্দর যা কে পড়তে হ্যায়’ এই বলে বন্ধুকে প্রবোধ দিয়ে তাকে নিয়ে সে রাতে ঘরে চলে এলেন । বন্ধুর কাছে কিছু ভেঙে বলেন নি । বেচারা ভয় পাবে আরো । বারান্দা থেকে উঠে আসার সময় বড়মামা যেন দেখলেন বারান্দায় রাখা ইজিচেয়ারের উপর এক আগন্তুক এসে বসলেন । তাঁর মুখটা ভালো বোঝা যাচ্ছে না । বড়মামা আর বোঝার চেষ্টা করেন নি কিছু । বলাই বাহুল্য বন্ধুমহলে এ কথা জানাজানি হবার পর বড়মামার সাথে আর কোন বন্ধু রাতের বেলা পড়াশোনা করতে আসে নি । হষ্টেলে অনেকে একসাথে থেকে এই ‘অচেনাদের’ মোকাবিলা করা একরকম, কিন্তু একটা বাংলোয় শুধু দু তিনজন মিলে পড়তে বসে মোকাবিলা করার সাহস আর কেউ দেখায় নি ।
এই ঘটনার পর থেকে বড়মামা রাত্রে একাই পড়াশোনা করতেন । রাতে প্রায়দিন তিনি পড়তে বসতেন, কেউ এসে মাথার পেছনে দাঁড়াত । এই গল্প শুনে আমি বড়মামাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘তোমার ভয় করত না?’ বড়মামা তাঁর কুচ পরোয়া নেহি মেজাজে বলেছিলেন ‘দুর বোকা, আমি যে ভুতটা আসত তাঁকে একদিন বললাম, কেন দাঁড়িয়ে থাকবেন? বসে পড়ুন, না হয় আমার সাথে আমার পড়া পড়ুন ।’ আমি খানিক্ষণ হাঁ করে থেকে বলেছিলাম ‘তারপর?’
বড়মামা বললেন ‘সেই ভুতটা গিয়ে ইজিচেয়ারে বসে পড়ল’ । আমি আবার বললাম ‘মানেটা কি? তুমি আবার তাকে ইজিচেয়ারে বসতে দেখলে?’
বড়মামা বললেন ‘ হুঁ, দেখলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন, খুব স্পষ্ট কাউকে বুঝতে পারি নি, তবে কেউ যে ইজিচেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছিল সেই আওয়াজের অনুভুতিটুকু পরিষ্কার ছিল । তারপর আমিও অঙ্ক করতে শুরু করলাম সেও আর বিরক্ত করে নি । ‘
এটা শুনে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস করতে পারি নি ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।