ধারাবাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৪)

বৃষ্টিনামা

একে করোনাতে জেরবার এই শহর আর তার সাথে সঙ্গত দিয়ে বৃষ্টি নাকাল করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে. উপরঝন্তু না হয়ে শান্তি নেই. কোথায় গেল নূপূর পায়ে, নীলাম্বরী শাড়ীতে, খোলা চুলের মোহিনী রূপ. এখন একেবারে যে মুখ ঝামটানি দিয়ে যাচ্ছে কি বলি. যাদের প্রাণে পুলক জাগে জাগুক কিছু বলার নেই তবে বৃষ্টির এই একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যানানি নয় বিকট মুখ ঝামটানি জীবনের সব রস নিংড়ে একবারে ছিবড়ে করে দিয়েছে. এই ছিবড়ে জীবনের জাবর কাটতে কাটতে হৃদয় যখন হেদিয়ে যায়, যখন গুচ্ছের ভেজা কাপড়ের স্তুপ আর সিংক ভর্তি বাসন দেখে, রস বলতে বাসন মাজার লেবুগন্ধি লিকুইড ছাড়া কিচ্ছু মনে পড়ে না, তখন এক ধাক্কা মেরে ছিবড়ে জীবনকে কাঁচকলা দেখিয়ে দুদ্দাড় করে এই শহরের পথে বেড়িয়ে পড়তে হয়.
ফাঁকা অজগর পীচের রাস্তা একা একা ভেজে, যেন এক, আধটা গাড়ী তার উপর দিয়ে গেলে তাঁর ভয়ঙ্কর বিরক্তি. ভিক্টোরিয়ার মাথার পরী ভেজে একা একা. ময়দানের ঘাসে বৃষ্টির সবুজ প্যাষ্টেলের ছোঁয়া, ড্রয়িং খাতার এলোমেলো সবুজ রঙের কথা মনে করিয়ে দেয়. ফুচকা ঝালমূড়িওয়ালাদের কোথাও দেখা যায় না, তবে ইতিউতি আগুনের ঝলক দেখা যায়. চায়ের ঝোপরাতে ঢুকে পড়ে ধপাস করে কাঠের বেঞ্চিতে বসে পড়তে হয়. সঙ্গে বন্ধু /বান্ধবী থাকলে ভালো, না থাকলে একা বসলেও চলবে.
চাওয়ালা দাদাকে বলতে হয় লাল চা আদা দেওয়া বা দুধ, চিনি, আদা, দেওয়া চা জম্পেস করে বানাতে. বেশ বড় ভাড়ে চা নিতে হয়. মানে প্রমান সাইজের ভাড়. ১০ টাকা দাম নিক না. এমন বৃষ্টির দিনে পুচকে ভাড়ের চায়ে গলা ভেজে নাকি. ধুস. সঙ্গে প্রজাপতি বিস্কুট চলতে পারে, বা খুব বেশি করে লঙ্কা দিয়ে অমলেট. আর যদি কপালের জোর থাকে তাহলে পাশের ঝুপড়ির মাসি অনেক কষ্টে উনুনে বাতাস দিয়ে আঁচ ধরিয়ে যে তেলভর্তি কড়াইতে আলুর চপ, পেঁয়াজি বেগুনী নামক অমৃতের জন্ম দিচ্ছে তা এক আধটা পেয়ে গেলে, সে একেবারে নিখিল বাঁড়ুজ্জের সেতারের মেঘ মল্লারের ঝালার সাথে আল্লারাখার তবলার যুগলবন্দী হয়ে যায়.
এই স্বর্গীয় মেলবন্ধনের পর মেজাজ যখন বাদল বাতাসের আর্দ্রতা ঝরিয়ে ফুরফুরে হয়ে যায় বসন্তের বাতাসটুকুর মত, তখনি বান্ধবীর মুঠোফোনে ডাক আসতে হয়. সেই বান্ধবীর ডাক অবশ্যই ফেলতে নেই. কারন তাঁর বাড়ীতে তাঁর কর্তা গিন্নীটির এবং গিন্নীর বান্ধবীদের জন্য অতি উপাদেয় পরোটা, আলুরদম এবং পটভর্তি চা বানিয়ে অপেক্ষা করে থাকেন.যদি গিন্নীর বান্ধবীরা এই উপহারের কথা আগে থেকে না জানেন, তাহলে তো কথাই নেই. এতে দুনিয়ার হিংসের উদ্রেক হলে বলতে হয় ‘চুলোয়ে যাক দুনিয়া, বন্ধুত্ব বেঁচে থাক, বান্ধবীর আর তাঁর বরের প্রেম বেঁচে থাক’।তিন বান্ধবীতে গল্প করতে করতে বৃষ্টির মুখঝামটানিকে স্রেফ ‘ইগ্নোর’ করতে হয়.
বাড়ী ফেরার পথে যখন ‘এফ. এম.’ এ বাজে ‘ছোটি সি কাহানি সে বারিষও কি পানি সে, সারি ওয়াদি ভর গায়ি, না জানে কিঁউ দিল ভর গায়ি’, তখন গাড়ীর জানলার কাঁচে বৃষ্টির তেহাইয়ের সাথে মনের মাদলে তাল মেলাতে হয়, আর মনে করতে হয় একটু বুঝি ধরল বৃষ্টি . আর গানটা শেষ হতে না হতেই যখন ঝপাত করে ব্রিজের উপর থেকে জল গাড়ীর ছাদে পড়লে তখন পাশে বসা বান্ধবীকে বলে উঠতে হয় ‘আমরা মদন, ভেবেছিলাম বৃষ্টি থেমে গেছে কিন্তু আমরা মেট্রোর ব্রীজের ঢাকার নীচ দিয়ে যাচ্ছিলাম বুঝিই নি .’ এত হাসাহাসি করতে দেখে গাড়ীর সারথি যখন বলে ‘বৌদি এই মুষলধারা বৃষ্টিতে গাড়ী নিয়ে মুশকিলে না পড়ি, আপনাদের বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলে বাঁচি’. দিলদরিয়া মেজাজ নিয়ে তখন ধমক দিতে হয় বলতে হয় ‘ধুর বাবা, থামো তো’.
এরপর বাজারে একটি বার ঢুঁ মারতে হয়. ফেরার পথে আটটার বাজারে দু চারটে মলিন ক্যাপ্সিকাম, টমেটোকে পাশ কাটিয়ে আলু, পেয়াজ, ডিমের স্টকের দিকে গিয়ে বাজারের থলি ভরে নিতে হয়. এই রসদ জুটিয়ে নিতে পারলে. পরপর কয়েকদিন বাড়ীর বাইরে না বেরোলেও চলে.
এই ভাবেই শেষ হয় বৃষ্টিনামা. একটা মেঘছেড়া, বৃষ্টি ধোয়া রোদের অপেক্ষা নিয়ে.
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।