সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৩৩)
আরশি কথা
ডিনারে ডাইনিং হলে সকলে এসে বসেছেন. প্রোডাকশন টিমের ছেলেরা একদিকে, অপূর্ব, ঝোরা, মেই লিং আরেকটি টেবিলে. মঞ্জরী আজ রাতে কিছু খাবেন না বলেছেন. নিজের স্টকের কন্ডেন্সড মিল্ক দিয়ে কাজ চালিয়ে নেবেন, রান্নাবাড়ী থেকে গরম জল চেয়ে নিলেন নিজের ঘরেই.
ঝোরা কথা শুরু করে ‘এই সন্ন্যাসী কে তুমি অনেকদিন চেন, তাই না অপূর্ব?’ অপূর্ব বলে ‘হ্যাঁ অনেকদিন, আমি ওনার ছাত্র’.
‘কোথায় পড়িশোনা করেছ তুমি?’
‘কার্শিয়াং এর মিশনারি স্কুলে, মিশনারিদের সাথে থাকতে থাকতেই ধর্মের উপর পড়াশোনায় আগ্রহ, এরপর ভাষা শিক্ষা, ইতিহাস শিক্ষা ও চর্চা সব দিল্লীতে. এই লামা সন্ন্যাসী ভিক্ষু যাকে আপনারা দেখছেন আমাদের দিল্লীতে পড়াতেন. ওনার উৎসাহেই আমার টিবেটিয়ান স্কুল অফ এন্থ্রপোলজিতে আসা, সেখান থেকেই ডকুমেন্টারির শুটিং এ আসা, আপনাদের সাথে আলাপ’.
গরম রুটি মাশরুমের তরকারীতে চুবিয়ে মুখে দিতে দিতে অপূর্ব মেই লিং কে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার গেস্ট হাউসে খাবার অসুবিধে হচ্ছে, তাই না? যা সুন্দর রাধেন আপনি’. ঝকঝকে হাসি হাসেন মেই লিং ‘এমন সুন্দর ফার্ম ফ্রেশ, অর্গ্যানিক ডাল, সবজি আমি পাচ্ছি কোথায়? আর তার সঙ্গে এত সুন্দর পরিবেশ. ক্ষিদে, ঘুম সবই বেড়ে গেছে. আর গেস্ট হাউসের কর্মীদের আতিথেয়তা এত সুন্দর. আর তারমধ্যে তোমাদের সাথে থেকে ধর্মের, ইতিহাস সম্পর্কে কতকিছু জানতে পারছি. এ যে আমার কতবড় সৌভাগ্য. ভারতবর্ষকেই নিজের দেশ বলে জানি, সেই সঙ্গে পিতৃভুমি চীনের ইতিহাস চর্চার সাক্ষী থাকতে পারছি. আমার জীবনপাত্র ভরে গিয়েছে যেন’. বা: অপূর্ব তো বেশ আন্তরিক. ঝোরা মনে মনে ভাবে.
‘আচ্ছা অপূর্ব, এই মনাষ্ট্রীর প্রধান লামা দিব্যি বাংলা বলেন, উচ্চারণ শুনে মনে হয় উনি বাঙালী. তাই না?’ ঝোরা বলে.
‘হ্যাঁ ম্যাডাম ঠিক ধরেছেন আপনি, ওনার নাম অমিতাভ ভট্টাচার্য্য, ভাষা ও ধর্মের উপর অগাধ পান্ডিত্য. পারিবারিক কোন বিপর্যয়ের পর সন্ন্যাস নিয়েছেন.’ ‘ও আচ্ছা,’ আনমনা হয়ে উত্তর দেয় ঝোরা. মানুষের বিপর্যয় যে কত সময় মানুষকে সত্যের সন্ধানে পথে নামিয়েছে. তথাগতর দেখানো মোক্ষের পথে সকলে আলো খুঁজে পাক. ঝোরা মনে মনে প্রার্থনা করে.
আকাশের চাদোয়ায় অসংখ্য নক্ষত্রের হীরকদ্যুতি, একটা রাতচরা পাখী গান গাইছে দূরে. আকাশের সিমানায় শায়িত স্লিপিং বুদ্ধার শরীর থেকে পিছলে যাচ্ছে তারার রূপোলী আলো. অপার্থিব জগতের এক ইঙ্গিত যেন সারা পাহাড়ী জনপদ জূড়ে.