চীনা ভবন থেকে বেড়িয়ে গুরুপল্লীর দিকে মন্থর পায়ে হাটতে থাকে মঞ্জরী. গুরুপল্লীর ঠিক মুখটাতে একটা ঝুপ্সি আম গাছ আছে. এই গাছটাকে মঞ্জরী এত ভালবাসে কেন? তাঁর নিজের নামের সাথে নিবিড় যোগাযোগের জন্য? হবেও বা. চীনা ভবন থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আমগাছের তলায় টানটান করে আসন পেতে বসে মঞ্জরী. খেলার মাঠের কোনাকুনি চোখ রাখে. কোনার দিক থেকে কাজল মাখা মেঘ উঠছে, নীচে সোনালি পাড় বসানো আকাশ. কেমন পাথর গুড়িয়ে, তেল রঙ মিশিয়ে চকচকে কাজল তেল রঙ আকাশে কেউ মাখিয়ে দিয়েছে. হঠাৎ গাছের গায়ের থেকে দুটো হাত বেড়িয়ে এসে মঞ্জরীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে. চোখ বুজে ফেলে মঞ্জরী. কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে কেউ যেন বলে ‘কেমন আছিস?’ মঞ্জরী আবেশে চোখ বুজে বলে ‘তোর কথা ভেবে যেমন থাকা যায়’. জলদগম্ভীর এক স্বর বলে ‘হুমম’. ‘তোর মনে পড়ে একদিন আমরা হাতিপুকুরের পাশ দিয়ে দুজনে হাটছিলাম,সেদিন এমনি জলরঙা দুপুর ছিল. জারুলেরা অবিন্যস্ত ঝরছিল তোর চুলে. আমি সেদিন কত জারুল, রাধাচূড়া কুড়িয়েছিলাম. তোর চুলের দিঘীতে সেদিন লেগেছিল মধুর ঘ্রাণ. সত্যি তো সেদিনতো এমনি মেঘ মল্লারের রিনঠিন ছিল সারাদিন. আবেশে চোখ জুড়িয়ে আসে মঞ্জরীর. এলিয়ে দেয় নিজেকে দুই বলিষ্ঠ বাহু বন্ধনের নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে. কাজল কালো মেঘ থেকে বৃষ্টির আহ্লাদী ফোঁটারা ঝরে আম্রপল্লব, জারুল, রাধাচূড়া পাতাদের ছূঁয়ে. মঞ্জরীর চোখ , চিবুক, ঠোঁট জূড়ে চলে একজনের আদরখেলার আতিশয্য.
‘ও দিদি চা এনেছি যে’. স্টাফরুমের ছবি মাসি. ‘ বৃষ্টি আসার আগেই দেখলাম তুমি আসন গুছিয়ে এদিক পানে আসছ, তখনি জানি এদিক পানেই থাকবে, এই গাছের তলায়’. অবিন্যস্ত শাড়ি গুছিয়ে উঠে বসে মঞ্জরী ‘এই বৃষ্টিতে চা নিয়ে আসি কি করে বল তো, তাই বৃষ্টি থামতেই তোমায় খুঁজতে বেরলাম. নাও চাটুকু খেয়ে নাও’. ‘দাও” বলে পরম তৃপ্তিতে চায়ে চুমুক দেয় মঞ্জরী.’ ও দিদি তুমি খালি হেথায় এসে কেন বসে থাক গো, হেথায় তোমার কে আছে? ‘.খালি চায়ের কাপ ছবি মাসির হাতে দিয়ে, দুষ্টু হাসে চৈনিক ভাষার অধ্যাপিকা মঞ্জরী মুখার্জ্জী. ‘ সে আছে’., এই বলে আসন গুছিয়ে ক্লাসের দিকে রওনা দেন মঞ্জরী. হতভম্ব ছবি মাসি দাঁড়িয়ে থাকে খালি চায়ের কাপ হাতে, নাহ দিদির প্রেমিককে আজও দেখতে পেল না সে, কে যে এসে দিদিকে এমন সোহাগ করে যায় যে দিদির গালে এমন রক্তিম আভা শোভা পেতে থাকে ছবি মাসি ভেবেই পায় না. এবার বৃষ্টিতে ভিজতে হলেও সে দিদির পিছু নিয়ে দেখবেই তাঁকে, দেখতেই হবে.