|| খেলিছো এ বিশ্ব লয়ে || আজকের কথায় ইন্দ্রাণী ঘোষ

কে খেলে এ বিশ্ব লয়ে? কে সেই বিরাট শিশু যে আনমনে খেলে যায় এ জগত সংসার নিয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর যুগ যুগ ধরে সব ধর্মের পুজারীরা উত্তর খুঁজেছেন. কেউ বলেন তাঁর আকার আছে, কেউ বলেন তিনি নিরাকার, কেউ বলেন মানুষকে তিনি এমন ভাবে আগলান যেমন করে মেষপালক পিতা আগলায় তাঁর মেষদের. কখনো সেই আবার ধেনু চড়ানো রাখাল বালক হয়ে আসেন এ মর্ত্যে. সেই পংক্তি ভেসে ওঠে সুরে সুরে ‘ওদের সাথে মেলাও যারা চড়ায় তোমার ধেনু, তোমার নামে বাজায় যারা বেণু’. তাঁর যেমন নানান রূপ, তেমনি সে প্রাণের কাছের, যার সাথে ঝগড়া করা চলে, ভালবাসা চলে, নালিশ চলে, অভিমান চলে.
এই যেমন শ্রাবণ মাস চলছে আর মনে পড়ছে মহাদেবের কথা, তিনি বিরাট শিশু তো বটেই. দেখাই যাক না তাঁর ঘরণী মা অন্নপূর্ণা কি বলেছিলেন তাঁকে নিয়ে ঈশ্বরী পাটনীর কাছে গাংগিনীর তীরে?
‘অতি বড় বৃদ্ধ পতি, সিদ্ধিতে নিপুন
কোন গুণ নাই তাঁর কপালে আগুন’
মহাদেবের প্রসাদ যে সিদ্ধি, আর ত্রিনয়নকেই কপালে আগুন বলেন মা অন্নপূর্ণা.
‘কুকথায় পঞ্চমুখ কণ্ঠভরা বিষ
কেবল আমার সংগে দ্বন্দ অহর্নিশ
গঙ্গা নামে সতা তাঁর তরঙ্গ এমনি
জীবন স্বরূপা সে স্বামী শিরমণি’
কণ্ঠভরা বিষ তাই তিনি নীলকণ্ঠ, আর শিবের প্রবল মেজাজের কথা তো অন্নপূর্ণার চেয়ে বেশি কেউ জানে না.
অন্নপূর্ণার অভিমানখানি যে আমাদেরি ঘরের মেয়ের মত. জীবনদায়িনী গঙ্গা যে তাঁর স্বামীর শিরে শোভা পান,তাতে অন্নপূর্ণা অভিমানী হন. মহাদেব তাঁর জটায় যে মা গঙ্গাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন বিশ্ব সংসারকে বাঁচাতে এও তো বিরাট শিশুর এক খেলাই বটে, যিনি এ বিশ্ব লয়ে খেলতে খেলতে তাঁকে রক্ষাও করেন বটে.
‘ভুত নাচাইয়া পতি ফেরে ঘরে ঘরে
না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে.
অভিমানে সমুদ্রতে ঝঁাপ দিলা ভাই
যে মোরে আপন ভাবে তাঁর ঘরে যাই’.
ভুত সঙ্গ করেন মহাদেব, পাষান বাপ এমন বরে পাত্রস্থ করেছেন মা কে. মৈনাক পর্বত সমুদ্রের নীচে বাস করেন, সে ভগিনীর এমন অপমান সইতে না পেরে সমুদ্রে আশ্রয় নিয়েছেন, সবই যে বিরাট শিশুর খেলা.
এরপর মা অন্নপূর্ণা নৌকা চেপে এসে পৌঁছন নদীর অপর ঘাটে ঈশ্বরী পাটনীর সাথে কথা কইতে কইতে. তাঁর কাঠের সেঁউতি পরে রাঙা চরণ রাখাতে সেঁউতি অষ্টাপদ হল . এও কি এবার মায়ের এক খেলা নয়. ভক্তকে দেখা দিলেন, স্বামীর কথা, ঘরকন্নার কথা বললেন গল্পের ছলে. এ যে ভক্তের সাথে ভগবানের এক খেলা. তাঁকে যে চিনে নিতে হয়, তাঁর খেলা বুঝতে হয়. সেই মিলনের অপূর্ব দৃশ্যের ছবি পাই সেই নদীতীরে, ভারতচন্দ্র রায়গুণা
কারের অন্নদামঙ্গল কাব্যে.
তীরে উত্তরিলা তরী তাঁরা উত্তরিলা
পূর্বমুখে সুখে গজগমনে চলিলা.
সেঁউতি লইয়া বক্ষে চলিলা পাটনী
পিছে তাঁরে হেরি দেবী ফিরিলা আপনি.
সভয়ে পাটনী কহে চক্ষে বহে জল
দিয়াছ যে পরিচয় সে বুঝিনু ছল.
হেরো দেখো সেঁঊতিতে থুয়াছিলে পদ
কাঠের সেঁউতি মোর হইল অষ্টাপদ.
জপ, স্তব, নাহি জানি ধ্যান জ্ঞান আর
তবে যে দিয়াছ দেখা সে দয়া তোমার.
যে দয়া হতে মোর হল এ ভাগ্য উদয়
সেই দয়া হতে মোরে দেহ পরিচয়.
শুনে দেবী অন্নপূর্ণা কহিলা হাসিয়া
কহিয়াছি সত্য কথা বুঝহ ভাবিয়া.
এ খেলা কি ভক্তের সাথে ভগবানের খেলা নয়? দেবী যেন লুকচুরী খেললেন শব্দের মায়াজালে, দীনহীন মাঝির সাথে. শেষে বললেন :
‘বর চাহ মনোনীত, যাহা চাহ দিব’
শুনিয়া পাটনী তখন কহে জোড় হাতে
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’.
দেবীর এই খেলায় বিহবল মাঝি যেন এ জগতের সমস্ত ভক্তকূলের প্রতিভু হয়ে দাঁড়ায়,সে সন্তানের দুধভাতের সংস্থানটুকু ছাড়া কিছুই চেয়ে উঠতে পারে না. সে সারা পৃথিবীর সম্পদ চাইতে পারত, কিন্তু ভগবানের খেলা এমনই তিনি তাঁকেই দেখা দেন যিনি নির্লোভ. অন্নপূর্ণার সাক্ষাত লাভকারী সেই মাঝি তাই চোখের জলে ভেসে মনে মনে শুধু বলতে পারে.
‘এ তো মেয়ে মেয়ে নয় দেবতা নিশ্চয়’.
মাঝির সাথে পার্বতীর এই খেলার গল্প কত শত বছর আগে লিখে গেছেন কবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকার.
লোভের শেষ হোক. খেলার ছলে বিনাশ হোক পাপের, ক্রোধের, ঈর্ষার, অসুখের, রোগের. এই অন্ধকার সময়ে দাঁড়িয়ে বিরাট সেই শিশুর কাছে এই প্রার্থনাই করি যিনি খেলে চলেন এই বিশ্ব নিয়ে নিরন্তর নানা আকারে, নিরাকারে, নানা রূপে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!