সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৯)

অন্য আলাপণ

গৌরিদি , আলুথালু বেশে কাজে বেড়োয় রোজ. হাঁটুর উপর কাপড় তুলে. উনোঝুঁটি করা মাথার উপরে. চার, পাঁচ বাড়ী বাসন মেজে, বাড়ী গিয়ে নিজের বাড়ীর রান্না চাপায়. স্বামীটি ফুল বেঁচে, যে কটা পয়সা পায় মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়. ফলত গৌরিদির মেজাজ তুঙ্গে, নিজের কপালকে দোষ দেয়া ছাড়া কি বা করে. এই গৌরিদি অবশ্য ভোজনরসিকা, ভ্রমণপিপাসু. বিকেলবেলা কাঁচের চূড়ি ম্যাচিং টিপে সাজতে ভালবাসে. বাপ, মা মারা গেছেন বিয়ের আগেই,বাপ মা হারা গৌরিদির বিয়ের সম্বন্ধ দাদা এনেছিলেন, তবে বিয়ে করতে জোর করেন নি. গৌরিদি নিজেই গিয়ে ব্যাবস্থা করে এল বিয়ের. দাদা বারণ করেছিলেন এ বিয়েতে. গৌরিদি দাদার বোঝা হয়ে থাকতে চায় নি.শেষ অবধি জোর করেই ছাদনাতলায় গেল গৌরিদিদি. পরের গল্প তো চেনা ছকে বাঁধা, অতএব গৌরিদি কাজ করতে এল. শাশুড়ি মা যতদিন বেঁচে ছিলেন প্রাণ ঢেলে সেবা করেছে গৌরিদি. একদিন শাশুড়ী মা কোন একটা পুজোর আগে বৃদ্ধ ভাতা পেয়ে (সম্ভবত ৬০০ / টাকা), দুপুরে হা ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত হয়ে ব্যাংক থেকে বেড়িয়ে, টিউবওয়েল টিপে খানিক জল পান করে, সামনের কলাওয়ালার কাছ থেকে কলা কিনে, পয়সা দিতে গিয়ে নিজের ঝোলাটি আতিপাতি করে খুজছিলেন, এক যুবক এসে বললে ‘দাও ঠাকুমা খুঁজে দিচ্ছি’, বলাই বাহুল্য টাকাটি আর পাওয়া যায় নি. সেদিন শাশুড়ী মা বাড়ী এসে শুধু কেঁদেই গেলেন, কিচ্ছুটি দাঁতে কাটলেন না. গৌরিদি তাঁর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক শান্ত্বনা দিলে. বুড়ো মানুষ না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন রাত্রীবেলা. পরদিন গৌরিদি মলিন মুখে কাজে এল. শাশুড়ীর জন্য মন খারাপ. গৌরিদির চোখ ছলছল. যে কয় বাড়ী কাজ করে তাঁরা একটু প্রাপ্যের চেয়ে বেশি পুজোর টাকা গৌরিদিকে দিতে চেয়েছিলেন তাঁর শাশুড়ীর জন্য. নেয় নি গৌরিদি. বলল ‘আমি যতদিন খাটতে পারব, দুটো খেতে পাব, আমার শাশুড়ীও পাবেন’.

এ হেন গৌরিদির একমাত্র ছেলে, হঠাৎ করে একদিন দেখা গেল নেলপলীশ লাগাচ্ছে আঙুলে, পায়জামা বা ট্র‍্যাকসুটের বদলে পাটিয়ালা পড়তে শুরু করেছে, কানে দুল পড়েছে, চোখে কাজল, ঠোঁটে লিপস্টিক মাখছে. মাধ্যমিকে থার্ড ডিভিশনে পাশ করে,ইস্কুলের পড়াশোনাতে ইতি দিয়ে ঘোষনা করল, সে ‘মাসি’দের সঙ্গে চলে যাবে. গৌরিদি সেদিন খুব কাঁদল. তা সে ছেলে কয়েকটা বাড়ীতে কাগজ দেবার কাজ করত ইশকুলে পড়তেই. সকালেবেলা কাগজ দিত. ইদানিং পথে চেনা, পরিচিত কাউকে দেখলে লুকিয়ে পড়ত. ‘মাসিদের’ সাথে মাঝেমধ্যে গিয়ে থাকত তাদের ডেড়ায়. গৌরিদির হাতে টাকা পয়সা দিত. গৌরিদিকে শুরু হল শ্বশুরবাড়ী দোষারোপ. স্বামী, শাশুড়ী দুজনেই বলতে লাগল, একটামাত্র ছেলে বাড়ীর তাও এই পদের হল. গৌরিদির চোখের জল শুকোত না. তারপর একদিন সে ছেলে কোন এক আত্মীয়ের সাথে দিল্লী পাড়ি দিল. ম্যাজিশিয়ানের টিমে খেলা দেখাবে. মাকে বলে গেল ‘তোমাকে নিয়ে যাব’. ছেলে কথা রেখেছে. দূরপাল্লার ট্রেন শুরু হবার পর গৌরিদিকে রাজধানী এক্সপ্রেসের টিকিট পাঠিয়ে নিয়ে গেছিল. গৌরিদি পুরানা কিল্লা, ইন্ডিয়া গেট, লাল কিল্লা দেখে, সরোজিনী নগর মার্কেটে শপিং করে, প্লেনে করে কাল ফিরেছে. প্লেন গুজরাট হয়ে হপিং করে ফিরেছে. গুজরাটে রাতে লকডাউন থাকার জন্য সেই রাতটা সেই বিমানবন্দরে থাকতে হয়েছে. কোন বিমানবন্দর বলতে পারল না গৌরিদি. তবে গৌরিদির
মুখে এক লাবণ্য ফুটেছে. মা তো. সন্তান যেমনি হোক যাই করুক. সে যে আছে জীবন জুড়ে সেই তো যথেষ্ট. বাড়ী ফিরেছে মায়ের সাথে ছেলে, আবার কদিন বাদে কাজে ফিরে যাবে.
মায়ে পোয়ে আলাপন কয়েকদিন চলবে.

সেই নির্মলতা চোখকে, মনকে বড্ড আরাম দিচ্ছে

গণেশের মুন্ডু যে হস্তীর,এর জন্য তাঁকেও তো অন্য দেবতাদের মত সুপুরুষ ধরা হয় না, সে তো অন্যরকম. তবু সে মা দুগগার সবচেয়ে আদরের ছেলে, ‘বক্রতুন্ড মহাকায়া’ আর মা দুগগার অপর নাম যে গৌরি সে কে না জানে.

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।