সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১৭)

নবান্নের দিনে

দামিনী ঠিক করেছে, নবান্নের দিন নতুন আতপ চাল রান্না হবে । দাশুদের বাগানের পাঁচ রকম সবজি লাগবে । বেগুন, ফুলকপি, পালং, কড়াইশুটি, ওলকপি, গাজর । পাচ রকম তরকারি রান্না হবে ।
ভোরে উঠে দামিনী চাল গুঁড়ো করতে বসে। খেজুরের রস জ্বাল দেয় । কড়ায় নলেন গুড় টগবগ করে ফুটতে শুরু করে, আরও ঘন হলে, থালায় কাপড় বিছিয়ে তাতে গুড় ঢেলে দেয় দামিনী । গুড় শক্ত হলে পাটালি হবে । কামিনীশাল চালের পায়েস রাধে দামিনী । ভুরভুরে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে, বাতাসে । কাজ গোছাতে বিকেল গড়ায় । দামিনী একা হাতেই সব সামলায় । দাশুর টিকি পাওয়া যায় না । চালের গুড়ো, নারকোল দিয়ে পিঠে করা সেরে রান্নাঘরে শেকল তোলে দামিনী ।

এমন সময় দাশু এসে হাজির হয় । কোন কথা না বলে রান্নাঘরে সটান ঢুকে গিয়ে পায়েসের হাঁড়ি আর পিঠের ডেকচি নিয়ে বলে ‘চল’। দামিনী তৈরি ছিল । আঁচলে বেশ করে নতুন ধান আর পাটালি বেঁধে নেয় । দামিনী বিশাল আঁচলে কয়েক মণ ধান আর পাটালি এঁটে যায় ।
ভরা পূর্ণিমার চাঁদের কিরণ বেয়ে দুজনে পৌঁছয় বৈরাগীর ঘরে । বৈরাগী ঠাকুরের সেদিন শরীরটা যুতের ছিল না । সে মাধুকরীতে যেতে পারে নি । গোবিন্দকে কি ভোগ দেবে ভেবে যাচ্ছে । এমন সময় দাশু হাজির দামিনীকে সঙ্গে করে ।
দাশু এসেই হাকডাক শুরু করল, ‘নাও ঠাকুর তোমার গোবিন্দের ভোগ এনেছি, নিবেদন কর ।’
বৈরাগী আনন্দে ‘জয় গোবিন্দ, জয় গোবিন্দ বলে খানিক নেচে নিলে । গোবিন্দকে ভোগ নিবেদন করলেন, দাশুদেরও দিলেন । দাশু বললে ‘ নাও এবার চল দেখি । ‘ বৈরাগী বললে ‘ রাতে যে চোখে ভাল দেখি না বাবা’ । দাশু বললে ‘আমার কাঁধে চাপ, আমাদের বাড়ী গিয়ে গান গাইবে, বন্ধুরা আসবে’। দাশুর কথা ফেলতে পারে এমন সাধ্যি বৈরাগীর নেই । সে পিঠে চেপে বসলে । দামিনী বললে ‘তোমরা এগোও আমি আসছি’ । বলে দামিনী জঙ্গলের ধারে গিয়ে সুর করে সেই মাতামহী হস্তিনীকে ডাকল, মাতামহী তাঁর দল নিয়ে বেড়িয়ে এলে দামিনী তাঁর আঁচলে বাঁধা কয়েক মন ধান আর পাটালি তাদের দিলে, তাঁরা মহাখুশি হয়ে দামিনীকে শুড় তুলে আশীর্বাদ করে । দামিনী মাতামহী হস্তিনীকে দেওয়া কথা রাখে ।

বাড়ী ফিরে তারা দেখে দাশুর বন্ধুরা সকলে এসে পড়েছে । বলাই বাহুল্য সেই বন্ধুদের দলে আমিও ছিলাম । দূরে গোয়ালপাড়ার কুটিরগুলোতে গরিব দু:খী মানুষগুলো নিজেদের ভাগের ধান গোলায় তুলে, সন্ধ্যের মধ্যে পান্তা খেয়ে শুয়ে পড়েছে । দাশু করল কি একটা মাটির হাড়ির মধ্যে কালি পটকা রেখে তাতে আগুন দিয়ে দিলে । পটকা বিকট শব্দে ফাটতে থাকল । গোয়ালপাড়ার মানুষগুলো ধড়মড় করে জেগে উঠে, ক্যানেস্তারা ফাটাতে ফাটাতে, মশাল জ্বেলে দাশুদের বাড়ীর দিকে ছুটতে লাগল । তারা ভাবলে হাতির দল ফিরে এসেছে । গ্রামের মানুষেরা জড় হতেই দাশুর বন্ধুরা এগিয়ে যাই । দাশুকে কেউ দেখতে পায় না । গাঁয়ের লোক জানে এদিক পানে একটা বাড়ীর বাগানে প্রচুর শাক, সবজি, ফল, ফুল হয় । তারা মাঝে মাঝে সেসব নিয়ে যায়, কেউ বারন করে না । আজ এসে দেখে সেই বাড়িতে বিশাল ভোজের ব্যবস্থা । কোন বিকেলে তাঁরা পরিশ্রম শেষে পান্তা খেয়েছিল, ভোজের ব্যবস্থা দেখে তাদের ক্ষিদেও চনমন করে ওঠে । ছেলেপুলে, বৌ নিয়ে সকলে খেতে বসে মহা খুশি হয়ে । দাশুর বন্ধুরা দামিনীর রান্না করা আতপ চালের ভাত, নবান্নের ডাল, পঞ্চ ব্যঞ্জন, পিঠে, পায়েস সকলকে পরিবেশন করে খাওয়ায় । বৈরাগী গান ধরে ‘হরি নাম নিয়ে জগত মাতালে, আমার একলা নিতাই’ । সে গানের সুর, কার্তিকে জ্যোৎস্নার সাথে মিলে নক্সা বোনে ফাঁকা ধানের ক্ষেতে । ভরপেট খেয়ে বাড়ি ফেরার পথে মানুষগুলো দেখে ভাঙা দেউলের মাথায় আপনা থেকেই জ্বলে উঠেছে প্রদীপ ।

পরেরদিন সকালে আমি বাড়ি ফেরার পথে দেখি, ভাঙা দেউলের সামনে জড় হয়েছে গাঁয়ের মানুষগুলো । আমি জিজ্ঞেস করলাম ‘আজ এত ভিড় কেন গো? এ দেউল তো ফাঁকা পড়ে থাকে ।’ তারা বললে ‘কাল রাতে এ দেউলের মাথার প্রদীপ নিজে নিজে জ্বলে উঠেছে, অনেক বছর পর । গ্রামের মঙ্গল হলে আমরা গরীব দু:খীরা দেউলে বাতাসা ভোগ দিই।’
আমার মনে একরাশ সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ে । মনে মনে বলি ‘দাশু যতদিন আছে মঙ্গল হবেই’ ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।