ধারাবাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৩)

চম্বলের ডাকু আর মবিডিকের পিঠ

এক আজব যন্ত্রনির্ভর দিন এসেছে পৃথিবীতে. অতিমারি যে কি ভীষন তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে পৃথিবীবাসি. নাকাল সবাই.
এরমধ্যে ইস্কুল, কলেজের স্যার, দিদিমণিরা যারা এতদিন অন্তরালেই থেকেছেন এবং চট করে অভিভাবকদের নাগালে আসেন নি তাঁরা এসে গেছেন মুঠোফোনের ভিতরে. মাষ্টারমশাই এবং দিদিমণিরা অকুতোভয়, যন্ত্রের ক্লাস বলুন বা চিরন্তন শ্রেণী কক্ষ , তাদের হৃদয় কোন ভয়েই কম্পিত নয়. ফলত ছোট বা বড় যন্ত্রের বিশাল যান্ত্রিক খোলা মুখের মধ্যে ঝঁাপিয়ে পড়ছেন তাঁরা এবং লড়ে যাচ্ছেন বীর বিক্রমে. এই যন্ত্র অবশ্যি কড়মড় করে চিবিয়ে খেয়ে নিচ্ছে ছাত্র, শিক্ষক সম্পর্ক.
যন্ত্রপ্রেমী লোকজনেরা অবশ্যি বলছেন এই পরিস্থিতির নাম ‘নিউ নর্মাল’, বেশ ভালোই তো সব চলছে.
তা দিদিমণি এবং মাষ্টারমশাইদের এই পরিস্থিতি নর্মাল না এবনর্মাল তা এরপরের দুটি দৃশ্যে অনুধাবন পূর্বক পাঠক বিচার করবেন.
দৃশ্য ১|
রান্নাঘরে হুড়ুদ্দুম, নাকে মুখে গোজা, বাস, অটো বা ট্রেন না ঠেঙিয়ে, বাড়ীতে কানে ঠুলি এঁটে বসে পড়া, কখন চেনা মুখগুলো ভেসে উঠবে স্ক্রিনে. ছোটরা ইস্কুলের জামা পড়ে ক্লাসে বসে. একটু বড়দের সে সব বালাই নেই. এদের ইস্কুলের জামা গিয়ে সেঁধিয়েছে চালের হাড়ীতে. তাঁরা মহানন্দে হাজিরার অভিনয় করে যেতে শিখে গেছে. ক্যামেরা অফ , শুধু নীল আলো জ্বেলে অস্তিত্বের জানান দিলেই হল. এমতাবস্থায় দিদিমণিরা ঠিক করলেন দৃশ্যমান থাকবে উভয়পক্ষই, সকলেকেই টেরি বাগিয়ে, অন্তত একটা ইস্তিরি করা জামা পড়ে বসতে হবে. দৃশ্যমান থেকে শ্রবণ কার্য সম্পন্ন করা ছাত্রকূলের দায়িত্ব, কথন এবং শ্রবণ হাঁড়িকাঠে মাথা দেওয়া শিক্ষক, শিক্ষিকার দায়িত্ব.
একদিন এক দিদিমণি দেখলেন তাঁর ছাত্রের মুখের পাশে শোভা পাচ্ছে শ্মশ্রু – গুম্ফ শোভিত আরেকটি মুখ. যেন চম্বলের ডাকাত. গোঁফটি আবার পাকানো. দিদিমণি বিরক্ত হয়ে ছাত্রকে বললেন ‘প্লিজ সি নোবডি ইস দেয়ার এরাউন্ড ইউ, ডিউরিং মাই ক্লাস টাইম.’
ক্লাস শেষে মেসেজ আসে ‘ম্যাম আই এম ইয়োর এক্স স্টুডেন্ট’. ডি. পি চেক করে দিদিমণি দেখেন সেই চম্বলের ডাকু. মা গো এ কে রে? কবে পড়ালাম? আকাশ পাতাল ভেবে কোন কূল কিনারা না পেয়ে, বাধ্য হয়ে দিদিমণি নাম জিজ্ঞেস করেন. ‘সিদ্ধার্থ প্যাটেল ম্যাম, মাই ব্রাদার ইস ইন ইওর ক্লাস নাও’. হে ভগবান ক্লাস টেনের সেই মিষ্টি সিদ্ধার্থ, একি চেহারা হয়েছে. খুব সম্ভবত বছর পাঁচেক আগে এই দিদিমণি তাঁকে পড়িয়েছেন. এ যে একেবারে মেটামরফসিস. পুচকে ছেলে আজকে বীরপুঙ্গব. সামনাসামনি দেখলে ঠিক চিনতে পারতেন দিদিমণি. চম্বলের ডাকু না ভেবে নিশ্চয়ই ভাবতেন কেমন গুটি পোকা থেকে প্রজাপতি হয়েছে তাঁর ছাত্র. খবরাখবর নেন দিদিমণি. তাঁর ছাত্র একটি ক্যান্টিন চালায়, গুরুদুয়ারার সাথে অক্সিজেন লঙ্গরেও কাজ করেছে সে. গর্বে বুক ভরে যায় দিদিমণির. এমন সোনার টুকরো ছেলেকে তিনি কিনা চম্বলের ডাকাত ভেবে বসলেন. ছি: ছি:. নিজের উপর বেজায় রাগ হয়. না: একবার ছাত্রের ক্যান্টিনে ঢুঁ মারতেই হবে নিজের দোষ পোড়াতে, দিদিমণি মনে মনে ঠিক করে নেন. সব দোষ ওই ব্যাটা যন্ত্রের. আক্কেল নেই কোন. ওমন ফুটফুটে ছেলেকে দিদিমণির চোখে ডাকাত বানিয়ে দিলে.
একি অনাছিষ্টির কান্ড . এরই নাম নিউ নর্মাল? দিদিমণি ইষ্টনাম স্মরণ করেন.
দৃশ্য ২|

ক্লাস শুরু.
টপিক :এলিজাবেথান রেনেসাঁস.
দিদিমণি এলিজাবেথান ইরার মধ্যগগনে মহামানবের জয় জয়কারের ধ্বনিতে অতীমারীর গ্লানি ভুলতে বসেছেন, এমন সময় এক ছাত্রীর মাথার পিছনে ভেসে উঠল এক অতিকায় তিমির শুভ্র পিঠ, আবার সেই পিঠের কিনারে দেখা যাচ্ছে নীলাভ সবুজ দ্বীপের তটরেখা. দিদিমণি হতবাক. মবিডিকের আবির্ভাব উনবিংশ শতকে. দিদিমণি পড়াতে পড়াতে পৌঁছে গিয়েছিলেন রেনেসাঁসে, হঠাৎ চোখের সামনে দেখছেন আরও এক শতক পরের এক প্রতীককে. এই অতিকায় শুভ্র জিনিষটি যা ছাত্রীর মাথার পেছনে শোভা পাচ্ছে এ তো তিমিমাছের পিঠ না হয়ে যায় না. কিন্তু এই মবিডিক ডাঙায় উঠে ছাত্রীর বাড়ীতে, ল্যাপ্টপের ক্যামেরার সামনে এই একবিংশ শতকে অতিমারীর সময়ে করছেটা কি?
দিদিমণি হতচকিত ভাব সামলাতে সামলাতে বুঝলেন ক্লাস জূড়ে, খিক, খিক, ঘোঁত ঘোঁত, ফ্যাসফ্যাসের বুড়বুড়ি কাটা শুরু হয়ে গেছে. তিনি এবার তিমিকে পরোয়া না করে হুঙ্কার ছাড়লেন. ‘ওয়েল, নাও ইউ নিড টু রাইট ওয়াট আই সেড, টুয়েন্টি মিনিটস টাইম এলোটেড, ইয়োর মেইলস সুড হিট মাই ইনবক্স ইন নেক্সট টুয়েন্টি মিনিটস’. তিমির পিঠ ততক্ষণে অদৃশ্য হয়েছে,শুধু তাঁর মিলিয়ে যাওয়াতে ক্লাসময় বুরবুরির আওয়াজ উঠছে. চল্লিশ মিনিট পার হল, ক্লাস অফ করে ইনবক্সে উত্তর দেখতে গিয়ে দিদিমণি দেখলেন ক্লাস টুয়েলভ সি এক বিরাট এপোলজি মেইল করেছে, সেই মেলের সারমর্ম হল ক্লাসে ভেসে ওঠা তিমি মাছের বৃহৎ অর্ধচন্দ্রকার শুভ্র পিঠটি এক ছাত্রীর বাবার ভূড়ি ছিল. এবার দিদিমণির বুঝতে অসুবিধা হল না যে তিমির পিঠের ধারে দৃশ্যমান নীলচে সবুজ তটরেখাটি ছাত্রীর বাবার ভূড়ির উপরে কষে বাঁধা নীল তোয়ালে বা লুঙ্গিটি. সেই বাবার মেয়ে দিদিমণির কাছে এই বলে ক্ষমা চেয়েছে যে তাঁর বাবা যে তাঁর পেছনে ক্লাসের সময় এসে দাঁড়িয়েছে সে খেয়াল করে নি, দিদিমণি যেন কিছু মনে না করেন.

না: দিদিমণি সেদিন আর কোন কাজ করতে পারেন নি.
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।