সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে হেমন্ত সরখেল (পর্ব – ১১)

তাপ-উত্তাপ
পর্ব – ১১
আগন্তুকেরা উঠোনে দাঁড়ালেন | চেয়ার আনতে ঘরে ঢুকলো খালেক, পেছন পেছন আমি | কাঠের হাতলঅলা চেয়ার | একজনে একটার বেশি আনা যাবে না | চেয়ার তোলার আগেই হাত টেনে ধরলাম,
‘ আগে আমার কথার উত্তর দে | সেক্রেটারি? আমি?’
‘ হ্যাঁ, গতরাতের সিদ্ধান্ত, আমি সকালে জেনেছি | ঐ যে চামউকুনটা তোর সাথে সাথে ঘুরছে, খবরটা ও জানে বলেই ঘুরছে |
‘খুড়ো?’
‘ তোর খুড়ো জোনালে | আমায় ফিসারী আর যুব ফেডারেশনের সেক্রেটারি করেছে | সামনে ইলেকশন, ঢেলে সাজানো হয়েছে |’
‘ কিন্তু… কিন্তু…আমার নামটা তুই এদের ভুল বললি কেন ?’
‘ থাম,আশু, এদের বিদায় করতে দে, শোন, একটা কথা মাথায় রাখ, এ বৌ’কে কিন্তু ঘরে তোলা যাবে না | কারণটা তোকে পরে বলবো | এখন আগে এটা করি |’
থামতে হলো | ওর ইশারায় থামতে হয় আমাকে বরাবর | জীবনে কেউ একজন থাকে যাকে আমরা কখনোই মন থেকে অমান্য করতে পারি না | আমার জীবনে সে জায়গাটায় কবে যে আমার অজান্তেই ঘাঁটি গেঁড়েছে খালেক আমি টেরটিও পাইনি |
কামরাঙা গাছের ছায়ায় একটা টেবিল পাতা | ওদের উঠোন ছাড়িয়ে ধানের গোলাকে বাঁয়ে রেখে এগিয়ে গেলে শুরু হয়ে যায় চাষের জমি | গোলার পাশেই একটু পেছন চাপা এ গাছটা | উঠোনে দাঁড়িয়ে নজরে আসে না পাতা টেবিল | ইচ্ছে করেই স্থানের চয়ন, কে আসছে কে যাচ্ছে তাতে নজর রাখার প্রয়োজন কী বাপু!
টেবিলের চারপাশে আমরা চারজন | এক রাউন্ড চা শেষ হয়েছে | যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলছে | মামুদ্বয় এটা প্রমাণ করতে ব্যগ্র যে ভাগ্নী তাদের কাছেই ছিল, অন্য কারো সাথে চলে যাওয়াটা নিতান্তই একটা আষাঢ়ে গল্প | আসলে, কাঁচা বয়সে বাপ মরা মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হলো, ও তো তখন খেলে বেড়ায় | উচ্ছল জলধিতরঙ্গ | সেই তাকে বাঁধা পড়তে হলো শ্বশুরবাড়ি এসে | কিতকিত খেলার সাথীদের ছেড়ে বর-ভাসুর-জা-তে চট করে মন বসলো না | দারিদ্র্যতার কারণে জামাইও সে বাড়ি বিয়ের পর আর পা রাখেনি | হাঁফিয়ে উঠেছিল কচি প্রাণ | তাই একদিন…
‘ এখানেই, এখানেই প্রশ্নটা জাগছে | একটা কথার উত্তর দিন তো দেখি! এমন কচি কিতকিত খেলা মেয়েটা, যে বিয়ের পর আর বাপের ঘরমুখো হয়নি, সে রাস্তা চিনে রাতের অন্ধকারে মামাদের বাড়ি অব্দি গেল কী করে? পায়ে হেঁটে চল্লিশ কিলোমিটার গেছে এটা যেন আবার বলে বসবেন না!’
রা সরছে না কারোর ই, জুয়াচুরি ধরা পড়ে গেছে | এমন একটা কোনো গিঁট আছে, যেটা এনারাও খুলতে নারাজ |
‘ বলুন, কী করবেন? যদি এ প্রশ্নের উত্তর থাকে তো দিন, তা না হলে আমরা কাজীসাহেবকে ডাকি, উঁনি তালাকের ব্যবস্থা করবেন | রইলো দেনমোহর, সেটা দেখছি কতোটা কী করা যায় | কোর্টে গেলেও এ প্রশ্নটার জবাব আপনারা দিতে চাইবেন না, সেটা বিলক্ষণ বুঝতে পারছি | সে ক্ষেত্রে দেনমোহরও ফস্কে যাবে | আজ তবু কিছু সম্ভাবনা আছে |’
খালেক সহমতি পেয়ে উঠে গেল | ওনারা দুপুরে এখানে খাবেন, কাজীকে খবর দিতে হবে | তালাক হবে দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর | টাকার কথাটা ফাইনাল করতে হবে | আমায় বসতে বলে গেল | চা আসছে সেকেন্ড রাউন্ড | আমাদের চারপাশের মাটিটা আয়না হয়েছে কামরাঙার ফুলে | বৃন্ত-দল’এ গাছের টিয়ার ঝাঁকের প্রতিবিম্ব হয়ে আছে | এটাই কি সেই সময় যখন তাকে কথাটা বলে ফেলা যায়!
চা নিয়ে এল পাতু | খানিকটা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে কাশেম | গাম্ভীর্য মুখাবয়বে | অন্য দিকে তাকিয়ে আছে | টুকটাক কথা হয়েছে এনাদের সঙ্গে | এলাকার পার্টি মেম্বারদের সাথে তেমন পরিচয় নেই | পন্থী যে বাম নয় সেটা পরিস্কার | তাই হয়তো এখানে নতি স্বীকার করতে হচ্ছে | পাতু চায়ের ট্রে টেবিলে রেখে আমায় বললো,
‘ কাশেম কী জানি কইবো তোমারে |’
‘ র, আইতাছি, চা শেষ কইরা লই |’
লোকাল কমিটির অফিসে পার্টি ক্যাডারদের উপচানো ভীড় | আনুষ্ঠানিক ঘোষণা শেষে মালার বোঝা গলায় লটকে আমি চেয়ারে | মালা ই তো ? ফাঁসের দড়ি নয় তো ? বক্তারা একে একে সারছেন | অভিনন্দন জানানোর সাথে সাথে কার অঞ্চলে কোন কোন সমস্যারা হাঁ করে আছে, সেটাও জানাচ্ছেন | খালেকের হাত বায়ুবেগে চলছে | এটার দায়িত্বটা ওকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছি | আমার চেয়ারের পেছন ঘেঁষে দাঁড়ানো পাতু | বাঁ পাশে নিত্য’দা, ওনার পাশে জোনালের জয়েন্ট সেক্রেটারি আমিনুল ইসলাম | চিঠিটা দিয়ে ওনাকে পাঠানো হয়েছে | খালেকের সঙ্গে আমিনুলের গভীর হৃদ্যতার খবর মোটামুটি পার্টির চলমান ক্যাডাররা জানে | সব শেষে আমায় বলতে হবে | মনে মনে ঝালিয়ে নিচ্ছিলাম, কলেজ বা পথ এটা নয়, এখানে আরও বেশি ওজন প্রয়োজন | এত কম বয়সে আগে কেউ এমন গুরু দায়িত্ব পায়নি | এত সংগোপনী সিদ্ধান্ত, সকলেই যথেষ্ট চমকেছে |
সভা সঞ্চালনায় দেবেশ | অাহ্বান আমার জন্য | নরমে গরমে প্রতিশ্রুতি আর সহযোগিতার অাশা রেখে যখন চেয়ারে বসেছি তখনও হাততালি চলছে | বুঝলাম, আমিই ভেতরে ভেতরে কুণ্ঠিত হয়ে ছিলাম, জনপ্রিয়তার ডোর আলগা তো হয়ইনি, উল্টে বেড়েছে | সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখা মালাগুলো অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করে দেবেশ তুলে নিল হাতে | বিগলিত হয়ে বললো- ‘মাথায় যেন কিছু বসিয়ে রেখো না, দাদা |’
‘ আরে না, রাত গয়ি বাত গয়ি |’
‘ থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, দাদা। মাথা থেকে একটা পাহাড় নেমে গেল |’
জিপে ফিরে গেল আমিনুল ও ওর সঙ্গে আসা আরো দুজন কমরেড | সমানে স্লোগান চলছে | আজ আমিও জিন্দাবাদের অংশ | নিত্য’দা হাত উঁচু করে থামালেন ক্যাডারদের | অফিসের বাইরে স্ট্রিট লাইটের মন্দ আলোয় যুক্ত হয়েছে আরেক প্রস্থ ফ্ল্যাশ লাইট | সাংবাদিকেরা ফিরছে | আমাদের পেছন পেছন পুরো বাহিনীটা অফিস থেকে বেড়িয়ে স্টেশন অভিমুখে | স্লোগান শুরু করলো দেবেশ, নিত্য দা মুচকি হাসলেন | আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, – ‘অতিশয় ভক্তি দেখছি | ভয় করছে না?’
‘ না, সতর্কতা জন্মাচ্ছে |’
‘ ভাবনা নেই, খালেক আছে তোর সাথে ছায়া হয়ে |’
‘ জানি তো, তবে তোমাকেও চাই |’
‘ আছি আমি |’
কথাগুলো স্লোগানের আওয়াজে সীমানা পেরিয়ে খালেকের কানে পৌঁছায়নি | ওর দিকে তাকাতে প্রশ্নে ডোবা দুটো চোখ তা-ই বললো |
দুপুরের পরে খালেক এল | সবে চোখটা লেগেছে | পাতু’র ডাকে চটকে গেল বিউটি স্লিপ | পশ্চিম পোতায় একটা ঘর তুলতে হবে | বিকেলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা | সমস্তটা ছক কষতে বেলা ঢলে বিকেল | বাড়ির বাকি তিনজন চুপচাপ শুনছেন | মাঝে মধ্যে গলা উঁচু হলে পাতু’র চাপা ধমক খাচ্ছে ও মায়ের কাছে | যারা কোনদিন এসবের সাত-পাঁচে থাকেননি তারা আজ কতো গম্ভীর! প্রতিটা নতুন আগমন কীভাবে নব দায়িত্বে দায়িত্বশীল করে তোলে সেটা আজ দুপুরের আলোচনায় মা’কে দেখলেই বোঝা যেত | ভালো হয়েছিল আমাদের হোমওয়ার্কটা | স্মুথলি সমাধা হয়েছে | ক্রসিং-এর সামনে এসে আমি, খালেক আর পাতু আলাদা হলাম, নিত্য দা বাকিদের নিয়ে আলাদা | দেবেশ কানে কানে বলে গেল আগামীকাল সকালেই শ্যামল মিস্ত্রি আসবে | যেন বাড়িতে থাকি |