সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে হেমন্ত সরখেল (পর্ব – ৮)

তাপ-উত্তাপ

পর্ব – ৮

‘ কেন বুঝতে পারছো না? এ ছাড়াও তো অসুবিধা আছে! সবে মাত্র দেবেশ ধরেছে | এখন স্পট থেকে সরে থাকাই ভালো নয় কি?’- গলাটা নামাতে হলো আমায় |
‘ সেটা আপাতত আমার ওপরে ছাড় | তাছাড়া, তোকে এখনই রোলে নামতে হচ্ছে না তো! শুধু ছায়া হয়ে থাক, প্রয়োজনে উত্তাপটা নিচের ক্যাডাররা টের পেলেই চলবে | এখন তুই সিনিয়র, এটা ভুলে যাচ্ছিস কেন?’
চাকরির এটাই মাহাত্ম্য | যার কথা ছিল হাপিস হয়ে যাওয়ার, সে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা সমেত এক ধাপ চড়ে বসলো | জায়গাটা বুঝে না নিয়ে কেনই বা হুইপ মেনে নেব, বিশেষত এখন এদের কাছে সোনার ডিম দেওয়া হংস যখন আমি | প্রতিদান ঝালিয়ে নেওয়ারও এটাই সময় |
‘ ওঠো, কথা আছে |’
চোখ সরু হলো লহমার জন্য, উঠে দাঁড়ালেন | স্বাভাবিক স্বরে বললেন,
‘ তা’লে ঐ কথাই থাকছে | তুই একদিন গিয়ে তোর ওসব জোগাড়যন্ত্র ক্যান্সেল করে আসছিস | কী, তাই তো?’
‘ হুঁ |’
নিত্য’দার সাইকেল ওনার পরিচয় | যে রাস্তায় গরুর গাড়ি চলে না, সেখানে এ দ্বিচক্রবাহন রাস্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুপারসোনিক হয়ে যায় | এখন, স্বাভাবিক রাস্তায় যাকে ঠেলে নিয়ে এগোনোই বাহুল্য | কথা হচ্ছে টুকটাক |
‘ বল, কী বলবি | আজ হাতে প্রচুর সময় | সবটাই তোকে দিলাম |’
‘ আমার থাক উঁচু হলো, তাই তো?’
‘ সে আর বলতে ! এ জন্য কত হ্যাপা পোহাতে হলো, তা তুই ভাবতেও পারবি না |’
‘ তা ছাড়া আর কী উপায় ছিল তোমার কাছে? নিজের জায়গাটা রাখতে হলে আমায় ধরে রাখতেই হতো তোমায় |’
জ্যোতি’র দোকানের মন্দ আলো পার করছি | শেষ কথাটায় চোখের পরিধি ছুঁয়ে ফেললো দুটো ধুরন্ধর দৃষ্টিকে | পরিস্কার দেখলাম, জ্বলে উঠেই নিভলো, একেই বলে হিমশীতল মস্তিষ্ক | কথাটা যে অকাট্য, সেটা বোঝাতে গতি আরও শ্লথ | সাইকেল ঘাড় ঘোরালো মাঠ পাড়া’র গলিতে |
‘ বেদান্ত পড়েছিস? আচার্য শংকর বলছেন- অজ্ঞানই আমাদের যাবতীয় অনর্থের ওষুধ | কে আমি? জগৎ তত্ত্ব কী? আমরা সম্পর্কিত কোথায়? এটার বিপরীত ভাবই অজ্ঞানতা | দূর হবে কীসে? যথার্থ জ্ঞানে | একেই বলা হচ্ছে আত্মজ্ঞান | আত্মা কিন্তু প্রতি দেহে আলাদা নয়, তোর আমার যত পার্থক্য তা শুধু আমাদের দেহ আর ইন্দ্রিয়দের জন্য | দড়িকে সাপ ভাবছি, দূর থেকে দেখে চকচকে ঝিনুককে রূপোর টুকরো ভাবছি, সমস্ত প্রপঞ্চের একমাত্র উপাদান এই আত্মা | তেমনিই, ক্ষিতী, অপ, তেজ,মরূৎ,ব্যোম’কে আলাদা ভেবে নিয়ে সেই ভাব অনুযায়ী আলাদা যতন করছি, আসলে তো এক! কিন্তু মুশকিলটা হলো, এটা শোনা এবং সেটাকে বিশ্বাস করে ধাপে ধাপে নেতি নেতি করে এগিয়ে চলার সাধনা যাঁরা করতে পারেন তাঁরাই একমাত্র সাধক হয়ে উঠতে পারেন | এ সকলের কম্মো নয় | এই ধাপ আরাধ্য অনুযায়ী সবাইকে পার করতে হয় | শুধু ক্ষেত্রগুলো আলাদা থাকে | বেসিক প্যাটার্ন অলওয়েজ দ্য সেম | আমি পার হয়ে এসেছি | আজ যেটা তুই ভাবছিস, আমিও তোর স্টেজে সেটাই ভেবেছিলাম | মজাটা কোথায় জানিস, ঐ ভাবনাটা আমায় এগোতে দিলো না | আজ যখন এর কারণটা খুঁজতে বসি তখন দেখি, এর পেছনে দাঁড়িয়ে আমার সীমাহীন লোভ | লোভ কর্তৃত্বের, মান্যতার, সমীহ আদায়ের |’
আমরা ব্রাহ্ম সমাজের মাঠে | গা লাগোয়া চন্দ্রিমা’দের বাড়ি | মাঠে হালকা রোশনি রেখেছে ওদের আলয়আলোক | সাইকেলটা শুইয়ে দিয়ে চটি পেতে বসে পড়লেন কমরেড | আমি অনুসৃত হলাম | একটা প্যাঁচা ডেকে চলেছে অবিরাম | প্রার্থনাগৃহের হলটা প্রমাণ সাইজের | এক সময় ব্রাহ্ম’দের চহল-পহলে গমগম করতো এ অঞ্চল | কেশবচন্দ্রের মাসিক আগমন ছিল রায়-এ’দের জন্য | অতসী, বেলী, কাঠালীচাঁপার বাগানে ঈশ্বর আছেন কী নেই, থাকলে কীরূপে আছেন, তার চুল চেরা বিশ্লেষণ চলতো | হাল ফ্যাশানী সুদৃশ্য রমণীদের আগমন ঘটতো বাইরে থেকে | প্রার্থনা গীতের অপরূপ মূর্ছনায় হেসে উঠতো পাখালি | শ্রোতা হিসেবে ভীড় করতো আদিবাসীরা | আজ তাদেরই কোনো এক পরিবার সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালে এ উদাসীন মন্দিরে | তখনই চন্দ্রিমা’রা এসেছিল নিজের ভিটে ছেড়ে | বসিয়েছিলেন মুখার্জিরা | অতীত রোমন্থনে কাটানো সময়ে এগুলো বহুবার আমাকে বলেছে ও |
‘ হ্যাঁ,যা বলছিলাম, একটু ধৈর্য রাখতে হবে তোকে | উথলানো দুধ-এ সর জমে না | সবটা আসবে তোর হাতের মুঠোয় | না চাইতেই আসবে, যেমন আমার এসেছে | জেনে রাখ, যোগ্য হয়ে না উঠলে তুই পরশপাথরেরও যত্ন নিতে পারবি না | আর, আমাদের পথে যোগ্যতা দেয় অভিজ্ঞতা, যেটা সঞ্চয় হয় প্রাত্যহিক যাপিত সময়-এ | এই সময়ই সবথেকে বেশি শক্তিধর | যেমন, এখন তোকে বানিয়েছে রাজা আর আমায় রংক | নয়তো এল.সি. সেক্রেটারি একজন সাধারণ কর্মীর জন্য কোথাও কখনো এতোটা সময় ব্যয় করেছে, শুনেছিস এটা ?’
একটা জিপ এসে দাঁড়ালো মাঠের লাগোয়া মেইন রোডে | তিনটেই তো জিপ এখানে | বি.ডি.ও.-র, পুলিশের আর একটা মুখার্জি-দের | ভাবছিলাম সবে, ততক্ষণে দুধিয়া রোশনিতে স্নান করে নিলাম আমরা | নিশ্চিত মার্ফ, তাও, পাঁচ সেল হবে | পুলিশ | এ টর্চ ওদেরই হবে | তিনটে ছায়া এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে |
‘ নিত্য’দা, আপনাকেই খুঁজছি, পার্টি অফিস থেকে বললো আপনি বেরিয়ে গেছেন | আমাদের দু লিটার পেট্রোল পুড়লো আপনাকে খুঁজে বের করতে |’
কথা শেষ করে হাসলো অধীর | এস.আই. | নতুন এসেছে ফাঁড়ি-তে |
‘ হঠাৎ এ অধমের খোঁজ কেন?’
‘ জটিল ম্যাটার, বসতে হবে একটু, চলুন, যাওয়া যাক, আমাদের কাজ কি আর আপনাদের ছাড়া চলে?’
‘ আপনি এগোন, আমরা আসছি |’
‘ আমরা?’
‘ হ্যাঁ, আশু থাকবে আমার সাথে |’
ইঙ্গিত লক্ষ্য করে তিনটে দৃষ্টিই ছুঁয়ে ফেললো আমায় |
‘ কিন্ত, এটা সিরিয়াস ম্যাটার, এখানে ওকে রাখা…’
‘ ওকে নয়, ওনাকে | তা ছাড়া, এখন থেকে আপনাদের সেকশনটা ও ই দেখবে | বয়স হচ্ছে, আর কতো? এবার ওদের কাঁধেই আসুক জোয়ালটা |’
‘ সে তো খুব ভালো কথা | আসুন, আশু বাবু, বন্ধুত্বটা সেরে ফেলা যাক |’
বাড়ানো হাতটায় সঙ্গ দিলাম | বাকিদের অভিবাদনের প্রত্যুত্তরে হলো ধন্যবাদজ্ঞাপন | সাইকেল তুলতে তুলতে নিত্য’দা বললেন-
‘ এগোন, আমরা আসছি ফাঁড়ি-তে, ওখানেই বসবো | দেখবেন আবার, কোনো উটকো না জুটে যায়!’
‘ আরে না না, নিশ্চিন্ত থাকুন, সে সব তো জানিই | আসুন, ব্যবস্থা করছি |’

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।