সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৯৩)

সোনা ধানের সিঁড়ি
১৩২
সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ে। সবেমাত্র ক্লাস ইলেভেনে উঠেছি। হঠাৎই মাথায় ভূত চাপলো পত্রিকা করব। তখন তো গ্রামে থাকি। এমন নয় যে ধনিয়াখালি গ্রামে আমরাই লিটল ম্যাগাজিন প্রথম প্রকাশ করতে চলছি। হাতে গোনা দু’একটা লিটল ম্যাগাজিন ছিল। ভূতটা অবশ্য আমিই প্রথম চাপিয়েছিলাম। দেখতে দেখতে সবকিছু হয়েও গেল। এবার প্রকাশের দিনক্ষণ ঠিক করা। পত্রিকা প্রকাশের জন্যে তিনজন মানুষকে আমরা ডেকেছিলাম। কবি রূপাই সামন্ত, কবি সলিল মিত্র এবং কবি দীনবন্ধু হাজরা। এই উদ্বোধনের জন্যেই আমি এক বন্ধুকে নিয়ে নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিলাম আমাদের বাংলার শিক্ষক অমরবাবুকে। অবশ্য উনি ছিলেন খেলার শিক্ষক। আমাদের বাংলা ক্লাসও নিতেন। আমাদের বাড়ি থেকে সাইকেলে আধ ঘন্টার দূরত্বে ভাণ্ডারহাটীতে উনি থাকতেন। আমাদেরকে ওনার বাড়িতে দেখে উনি খুশি হননি। তার ওপরে যখন শুনলেন পত্রিকা প্রকাশের জন্যে আমরা ওনাকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছি উনি তো একেবারে রেগে আগুন। জানিয়েই দিলেন উনি আসবেন না। শুধু তাই নয় আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “তোর বাবা পুজো করে খায় আর তার ছেলে হয়ে রোজগারের ব্যবস্থা না করে সাহিত্য করতে এসেছিস। দাঁড়া, তোর বাবাকে বলছি।”
বলাই বাহুল্য খুব কষ্ট হয়েছিল। যদিও আঠারো বছরের উন্মাদনায় তিলমাত্র ভাটা পড়েনি। শুধু মনে হয়েছিল, উনি তো আমাকে অন্যভাবেও বলতে পারতেন। না, উনি আসেননি। কিন্তু আমাদের পত্রিকার প্রকাশ অনুষ্ঠান খুব ভালোভাবেই শেষ হয়েছিল। বেশ কিছু মানুষজনও এসেছিলেন।
আজ অনেক বছর পরে এসব কথা কেন হঠাৎ করে মনে পড়ল জানি না। দেখতে দেখতে লেখার জীবনও পঁয়ত্রিশ বছর হয়ে গেল। এখনও সাহিত্য ছাড়া মুহূর্ত মাত্র জীবন কাটানোর কথা ভাবতেও পারি না। অনেক কঠিন সময় এসেছে কিন্তু সাহিত্যের ওপর তিলমাত্র আঘাতও লাগতে দিইনি। ঠিকই করেছিলাম চাকরি করব না। নিজের মতো একার জীবন কাটাব। সেটা হয়তো পারিনি। কারণ আমার ওপর নির্ভর করে আছে আরও দুটি প্রাণী। বিয়ে করতে চাইনি কিন্তু তবুও অনিচ্ছা সত্ত্বেও হয়েছে। চাকরি না করার জন্যে অনেক কষ্ট এসেছে কিন্তু যার জন্যে আমি সমস্ত কষ্ট হাসিমুখে মেনে নিয়েছি, সেই সাহিত্যই আমাকে ক্ষমতা দিয়েছে সমস্ত কষ্টকে পার হয়ে যাবার। বাবা মায়ের পরে এতবড় আপনজন পৃথিবীতে আমার আর কেউ নেই। সাহিত্যই আমাকে হাতে ধরে শিখিয়েছে পার্থিব সম্পদের ফেরে না পড়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে যেতে। “এমনি করে যায় যদি দিন যাক না ” —— ভাসিয়ে দিয়েছে সে আমাকে। এ এক অসীম শান্তি। আমৃত্যু এইভাবেই যেন ভেসে যেতে পারি। শেষ ইচ্ছা একটিই —– লিখতে লিখতেই যেন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ি।