সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ৮৯)

সোনা ধানের সিঁড়ি

১২৮

সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরছি। ফোনটা বেজে উঠল। দিনে হাজারবার তিনি বেজে উঠছেন তাই তার বেজে ওঠা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। ফোনটা কানে দিতেই, “স্যার, আপনার গেঞ্জির সাইজ কত, কি রঙ পছন্দ করেন, গোল গলা না কলার দেওয়া —– ” ইত্যাদি ইত্যাদি। কন্ঠস্বরটি আমার কবিবন্ধু সৌম্য সরকারের। পেশায় যদিও তিনি একজন ডাক্তার। দুঃসংবাদ ছাড়া সবরকমের ফোনের জন্যেই আমি তৈরি থাকি। কোনো কিছুই আমাকে আজ আর অবাক করে না। এই ফোনের জন্য তৈরি না থাকলেও আমাকে একবিন্দুও অবাক করে নি। বরং খুশিই হয়েছি। আমি তো মানুষের সঙ্গে এইরকম সহজ ভাবেই মিশতে চেয়েছি। আমার আড়ালে কোনো মানুষ যদি আমার সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন —– “বাপরে! ওনাকে এই ব্যাপারে সরাসরি কিছু বলা যায় নাকি! যেরকম গম্ভীর ভাবে থাকেন!” হ্যাঁ, আমি একটু গম্ভীর স্বভাবের। বেশি কথা আমি বলতে পারি না। তাছাড়া বেশি কথা বলা পছন্দও করি না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে কোনো মানুষের সঙ্গেই কোনো দূরত্ব রেখে মিশিনি। তাই আমার কাছে সবাই প্রিয়। যদিও কোনো কোনো মানুষের সঙ্গ আমাকে বেশি আনন্দ দেয়। তাই আমার ডাক্তার কবিবন্ধুটি আমাকে ভেতর থেকে চিনে শেষ পর্যন্ত এই ব্যাপারে যে ফোন করে উঠতে পেরেছেন সে জন্যে আমি আনন্দিত।

ঘরের সামনে যেমন দুয়ার থাকে, মানুষ সেখানে এসে দুদণ্ড জিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু দুয়ারটি যদি না থাকত তাহলে সেই বাড়িটি যত ভালোই হোক তা মানুষের কোনো কাজে আসত না। মানুষের জীবনেও এরকম একটা দুয়ার আছে। আছে মানে তাকে তৈরি করতে হয়। ঠিক যেমন ঘরসংলগ্ন দুয়ারটি। শুধু তৈরি করলেই হবে না, তা যেন বসার উপযুক্ত হয়। মানুষ যেন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে, প্রাণের টানে দুয়ারে ছুটে আসতে পারে। বাড়ির মতোই মানুষ এই দুয়ার তৈরি করতে পারে নিজের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পার হয়ে। নিজেকে ছড়িয়ে দেবার উদগ্র ইচ্ছা থেকে। মানুষ যদি এই কাজে সফল হয় তবেই মানুষ নামের সার্থকতা। দুয়ারের অস্তিত্ব ছাড়া বাড়ির উপস্থিতি যেমন হাস্যকর ঠিক তেমনি যে জীবন মানুষের স্পর্শ পেল না তা ঊষর মরুভূমির মতো।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!