গদ্যানুশীলনে গোপেশ দে

বর্ষা

আচ্ছা ছেলেটি আমার দিকে আড়চোখে তাকায় কেন ? সোজা তাকালেই তো পারে।এরকম তাকানোটা আমি অবশ্য অপছন্দ করি না তবে একটু অস্বস্তি লাগে এই যা।ছেলেটি কি আমার সাথে কথা বলতে চায়? তা বলতে চাইলে বলবে বারণ করেছে কে? স্কুলে যাওয়ার পথে কত ছেলেই তো আমার সাথে যেচে কথা বলত চিঠি দিত, ফুলও দিত।আমি কারো কারো চিঠি নিতাম আবার নিতামও না।আসলে একটা কেও ভাল লাগত না।সব ষন্ডামার্কা আর গন্ডমূর্খ ছেলে।
এই ছেলেটির সাথে আমারও কথা বলতে ইচ্ছে করে।কিন্তু আমি যেচে কথা বলতে যাব কেন ? আমি একটা মেয়ে? ছেলেরাই আগে এগিয়ে এসে কথা বলে সেটাই স্বাভাবিক।কিছু মেয়ে অবশ্য আলাদা।তবে কি আমি কিছু মেয়ের দলেই যাব ? না সে হয় না।
সেদিন আমার স্কুলের একটা বন্ধুর সাথে বাজারে দেখা।বন্ধুটি আমাকে দেখার পরও একটি কথাও বলল না।এমনকি একই দোকানে দু’জন গেলাম। কেনাকাটাও হল।তারপরও কথা বলল না চয়ন।আমি কথা বলতে যাব কোন দুঃখে।আমি অন্য মেয়েদের মত না।চয়ন আমার সাথে দুটো কথা বললে আমিও কথা জুড়ে দিতাম।কী এমন হত? প্রেম।প্রেম কি অত সস্তা।অনেক ছেলেই আমাকে নিজের করে নিতে চেয়েছে তাই বলে আজেবাজে ছেলের কাছে ধরা দেব এত বোকা নই আমি।
এই ভাড়াটে ছেলেটা হয়ত ভাবে আমি ওর সম্পর্কে কিছুই জানি না।কিন্তু আমি ওর সম্পর্কে সবকিছুই জেনে বসে আছি।
একটা মজার ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি।আমি নীল চুড়িদার পরলে ছেলেটিও নীল জামা পরে।আমি হলুদ কিছু পরলে সেও হলুদ।ছেলেটির বোধহয় সব কালারেরই জামা আছে।কিন্তু আমার সাথে ম্যাচিং করে কেন ? নাকি ব্যাপারটা কাকতালীয় !
আমি আগে খুব কম যেতাম চৈতালি কাকিমার বাড়ি।এখন একটু বেশিই যাই।আমার কন্ঠ পেলেই ছেলেটি বেরিয়ে আসে।আমি সেটা খেয়াল করি।আর এদিক ওদিক এমন বোকার মত ছেলেটি চায় যেন সে কিচ্ছুটি বোঝে না।অথচ আড়চোখে যে চায় সেটা আমি জনি।ন্যাকা…! এই আড়চোখের ভাষা দু রকমের।একটা খারাপ চাউনি একটা ভালো।দুটোই আমি বুঝি।ছেলেটার চাউনি বোকাবোকা এবং মিষ্টি।তবুও একটু অস্বস্তি লাগে।আড় চোখে চাইবে কেন ?সোজা তাকালে আমি কি তাকে খেয়ে ফেলব ?
ছেলেটি দেখতে শুনতে খারাপ না।তবে ধবধবে ফর্সা।এ রঙ ছেলেদের মানায় না।আমার রংটা ছেলেটার হলে ভালো হত আর ছেলেটার রঙটা আমার।ফর্সা রংটা মেয়েদের জন্য।ফর্সা ছেলেদের কেমন ক্যালাস ক্যালাস লাগে দেখতে।তারপরও কেন যেন ভালোই লাগে দেখতে ছেলেটিকে।
ছেলেটার রুমের জানালায় ক’ দিন ধরেই আমি টোকা দিই।ছেলেটা কোনো সাড়া শব্দ দেয় না।বোধহয় ঘুমিয়ে থাকে।জানালায় টোকা দিয়েই আমি সরে পড়ি যদি ছেলেটি আচমকা জানলা খুলে আমাকে দেখে তাহলে কী বিচ্ছিরি ব্যাপারই না হবে।ভাবতেই গা গুলিয়ে যায়।তবু এই টোকা টোকা খেলা টা ভালো লাগছে ইদানীং।ছেলেটা কি সত্যি জানে না কেউ একজন তার জানলায় টোকা দেয় ? বলব বলব ছেলেটি একবারটি আমার সাথে কথা বলুক, বলে দেব টোকাবাজ মেয়েটি আমি।
মনটা খারাপ।পরশু আমার বিয়ের দিন তারিখ হয়ত ঠিক হয়ে যাবে। পত্রাপত্রি করতে বরপক্ষ আসছে।সে ধরণের কথাই হয়েছে গতকাল।
মাস খানেক আগে যাদবপুর থেকে এক পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে এসেছিল।ছেলেটিকে আমার ভালো লেগেছে ছেলেটিরও নাকি আমাকে ভালো লেগেছে।বড় ব্যবসায়ী ফ্যামিলির ছেলেটি।বিয়ে এক প্রকার ঠিকঠাক হয়ে গেছে বলা যায়।আমার মা বাবাতো এক পায়ে রাজী।ছেলের ফ্যামিলিও।কিন্তু নিজের পছন্দের কেউ থাকলে ভালো হত।ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখে দেখে লাভ ম্যারিজটা মাথায় গেঁড়ে বসেছে।
আমার যদি ভালবাসার কোনো মানুষ থাকত তবে অবশ্যই এ সম্বন্ধটা ‘ না ‘ বলে দিতাম।
পত্রাপত্রি হয়ে গেলে আর এই ছেলেটির জানলায় টোকা দিতে আসব না।কারণ আর প্রেমের চিন্তা মাথায় আনা ঠিক হবে না।পত্রাপত্রি হয়ে গেলে এসব ভাবা মানে বাবা মার মুখে চুনকালি দেয়া।এখানে সিনেমার চিন্তা করলে চলবে না।
আগামীকালের মধ্যে যদি ছেলেটি আমার সাথে যেচে কথা বলে আর প্রেম নিবেদন করেও ফেলে আমি রাজী হয়ে যাব।আমি নিজে তবুও যেচে কথা বলব না।এটা আমার পারসোনালিটি।এটা আমার অহংকার।
ছেলেটির জন্য আগামীকালের দিনটাই বরাদ্দ।যদি আমাকে ভালোবাসে তাহলে যেন আগামীকালই আমার সাথে কথা বলে এই আশাটাই করছি এখন।আমিও ঘনঘন ওর আশপাশে ঘুরঘুর করব বিকেল বেলা অফিস থেকে এলেই।
আমার সাথে শুধু একবার কথা বলেই দেখুক না আমিও গড়্গড় করে কথা বলে যাব।তারপর ছেলেটিকে সরাসরি আমিই প্রশ্ন করব ওর কারো সাথে সম্পর্ক আছে কিনা ? এতে ছেলেটি যদি বুদ্ধিমান হয় তবে বুঝে যাবে আমি কি বোঝাতে চাইছি।ছেলেটি প্রপোজ করলেই ব্যাস আমিও রাজী হয়ে যাব।পত্রাপত্রিটা পিছিয়ে দেয়া কোনো ব্যাপারই না আমার কাছে।পরশুদিন আর বরপক্ষ আসতে দেব না।তারপর আস্তে আস্তে বাবা মাকে বুঝিয়ে বলব আমি এই ক্যাবলাকে ভালোবাসি।আমার যে লাভ ম্যারিজ করার খুব ইচ্ছে।ছেলেটির হাতে আর কয়েক ঘন্টা সময় আছে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!