(স্বার্থপরতা যদি কুশলতা শেখায় তবে জেনে রাখা ভালো ধ্বংস তার শেষ বার্তা।)
সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর চোখ ভেঙ্গে নেমে আসে ঘুম।আত্মীক বালিশে মাথা ফেলবার আগে একবার রাতের হাল্কা আলোয় দিব্যার মুখের দিকে চায়।গভীর ঘুমে।ওদের মাঝে রয়েছে তিন বছরের ক্ষুদে আদি। ওর জন্যই এখন এই নাইট ল্যাম্প জ্বেলে রাখা। অন্ধকার ঘরের মধ্যে গাঢ় হয়ে নেমে এলেই আদি চিৎকার করে ওঠে। আগে চোখের ওপর আলো পড়লেই আত্মীকের ঘুম চটকে যেত। এখন এই নাইট বাল্বের আলোতেই দিব্যি ঘুমোচ্ছে।সন্তানের জন্য কত অভ্যেস করে নিতে হয় তারপর তবেই না বাবা আর মা হয়ে ওঠা। অবশ্য একটা ছোট বাচ্চা থাকলে ঘরের মধ্যে রাতের হাল্কা আলোও দরকার।আদিও মাথার ওপরে ডান হাতটা ফেলে খুব ঘুমোচ্ছে। দিব্যা বলে- আদির ঘুমোনোর ভাবভঙ্গিমা ঠিক তোমার মতন। আমি মজা করে বলি-বাপ কা বেটা—–আর মনে মনে বলি এ হলো পুরুষ মানুষকে সংসারের মায়ারবন্ধনে জড়িয়ে রাখবার জন্য মেয়েদের মন ভুলানো কথা।
আজ চার-মাস হলো আত্মীকের কোন রোজগার নেই। বেকার বে-রোজগেরে কর্মহীন পুরুষ সে।অনায়াসে এতগুলো বিশেষণ তার নামের পরে ব্যবহার করাই যায়।আইটি সেক্টরের যে অফিসটিতে কাজ করতেন বছরে পাঁচ লাখের একটা বেশ ভালোই চুক্তি ছিলো।হাতে যা পেত ওদের তিনজনের তা দিয়ে ভালোভাবে স্বচ্ছলতার সাথে চলতো। অনেক ইন্ধনেও একটা বোকামি সে কোনদিনও করেনি আর সেটা হল বাবা-মায়ের এই ফ্লাট ছেড়ে রেন্টেড ফ্লাটে গিয়ে থাকা। তাহলে আজ সে টের পেত প্রতিটি মাসের ভাড়া দিতে গিয়ে কত ধানে কত চাল। দিব্যা এই নিয়ে তুলকালাম করে মাঝেমাঝে, আত্মীক বলে দিয়েছে বারেবারে সে এই ফ্লাট ছেড়ে কিছুতেই নড়বে না যতদিন বাবা-মা জীবিত আছেন। এখন বোঝে আত্মীক, জীবনে কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেই হয় সংসারে এবং আখেরে সেটা ভালোই হয়। দীপাঞ্জন দুদিন আগে আত্মহত্যা করেছে নিউটাউনে।ফ্লাটের রেন্টের চাপেই।
আত্মীককে ওর বাবা আজ সকালেই ওনার ঘরে ডাকলেন।আত্মীক দাঁত মেজেই বাবার ঘরে এলো।
বাবা অপেক্ষা করছিলেন।
বোসো। একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করছি। একদম সব খুলে আমায় বলবে। তোমার চাকরি বা জবটি আছে না গেছে? প্রথমে এর উত্তর দাও।
আত্মীক বাবার মুখের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো।তারপর বললে- বাবা আজ চারমাস হল নেই। মার্চে পুরো টাকা দিয়েছিলো। এপ্রিলে সিক্সটি পার্সেন্ট। মে মাসে ফিফটি পার্সেন্টের কম। জুন থেকে স্যালারী বন্ধ। অগাষ্ট মাসে বলে দিয়েছে তোমাদের চাকরি নেই। এমনিতেই গত বছর থেকেই আমাদের অফিসের আর্থিক অবস্থা খারাপ। আর এই লকডাউন তো ওদের আমাদের ছেঁটে ফেলতে ভীষণ সুবিধা করে দিলো।
তাহলে যা জমিয়েছিলে সবটাই তো বেরিয়ে গিয়েছে দেখছি।আমায় বলোনি কেন?তোমার মিসেস অর্থাৎ আমাদের বৌমাটি কি জানেন তোমার মান্থলী স্যালারী আমার পেনসন থেকে কম? না এখনও মূর্খের স্বর্গে বাস করে? আদির শরীর খারাপ করলো ডাক্তার দেখালে একবারও আমায় বললে না কেন টাকার ব্যাপারে? নাতিটিও তো আমাদের।না সেটা তোমরা দুজন মনে কর না?
আত্মীক বাবার দিকে চেয়ে থাকে একগাদা সাহায্যের প্রত্যাশা নিয়ে সেই ছোটবেলার মতন।
আনন্দমোহনবাবু এবারে আত্মীকের মুখের প্রত্যেকটি ভাঁজ প্রতিটি স্বেদগহ্বরে তার আত্মজের তলিয়ে যাবার হিসেব নিচ্ছিলেন। উচ্চপদস্থ সরকারি অফিসার ছিলেন। অনেক মানুষ তাকে ঘাঁটতে হয়েছে।
তোমার মনের মতন চাকরি যতদিন না পাচ্ছ বে-রোজগেরে অবস্থায় এ সংসারের জন্য তোমায় কিছু দিতে হবে না। ঐ বাজারের জন্য মাসের দু-হাজার টাকাও না।আমার যা আছে এতেই ভালোমতন করে পাঁচজনের চলবে। আমার সবকিছু তো তোমাদেরই। তোমার বোন এদেশে আর আসবে না বুঝতেই পারছো ও নিজে আর ওর হাজব্যান্ড কানাডায় বিরাট চাকরি করে।ওদের দুজনের মান্থলী স্যালারী, আমাদের দুজনের ভালো অবস্থায় ইয়ারলি ইনকামের চেয়েও বেশি–এও তো জানো? তিনমাস পরপর যে পাঁচহাজার টাকা আদির জন্য দেই ওটা ওর পিসির পাঠানো এটা বোধহয় জানো না।দিব্যা তো রিলেশনটা ওখানেও খারাপ করে রেখেছে। তুমি রিপেয়ারটা করো। আমাদের প্রত্যেকের আজ সময় এসেছে সম্পর্ক গুলো পুনরায় মেরামতি করে নেবার। এই পৃথিবী এ বছরে এটাই শিক্ষা দিয়ে গেলো।
আইটি তে বি টেক করে আত্মীক সেক্টর ফাইভের দু চারটে কোম্পানিতে ঘোরাঘুরি শেষে এই কোম্পানিতে ছিল। এই তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানিটি ভালো একটা জায়গায় ছিল আর্থিক বিচারে। তো এখন বন্ধ। কতদিন কাঁহাতক বসে থাকা যায় বে-রোজগেরে অবস্থায়। বাবা-মা এখনও বলতে গেলে শক্তপোক্ত আছেন। যেদিন থেকে নড়বড়ে হতে শুরু করবে আত্মীক জানে দিব্যা সেদিন থেকেই নিজের সংসারটুকু নিয়ে কেটে পড়বার চেষ্টা করবে। আজ দিব্যাকে সব জানিয়ে দিয়েছে আর বলেছে হাত খরচের টাকা বাবা-মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নেবে যতদিন কাজ না পাই। কারণে আর অকারণে ওনারাই তো তোমার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা।
আজ খুব ভোরে উঠে স্নান করেছে আত্মীক। মা-বাবা দুজনকেই প্রণাম সেরে নিয়েছে। বাবার প্রশ্নের উত্তরে জানালেন এগারোটা থেকে ইন্টারভিউ। বাইপাসের ধারে রুবির মোড়ের কাছাকাছি কেন্দ্রীয় সরকারি অফিস।আপাতত কনট্রাকচুয়াল জব। দিব্যা সাতসকালেই রান্না করে তৈরী।যেদিন থেকে জানতে পেরেছে আত্মীকের আজ চারমাস হল কোন রোজগার নেই মুখটি বন্ধ করে রেখেছে। বরঞ্চ সব কাজে, হ্যাঁ মা বলে নিজেই এগিয়ে যাচ্ছে শ্বাশুড়ির দিকে।
সমস্ত ডিগ্রী পড়াশোনা পারিবারিক পরিচয় চুপিয়ে রেখে কাজটা যোগাড় হলো মাসিক পনের হাজার টাকায়। ওটাই তার অক্সিজেন হবে এই মুহূর্তে বেঁচে থাকবার। অপবাদ ঘুচবে বেকারত্বের। কসবার বন্ধু পার্থপ্রতিম বললে করতে থাক।সরকার বদলে গেলে যদি আবার সম্ভাবনা থাকে সরকারি কর্মচারি হওয়ার। তবে তোর মাসিক রোজগার বাড়বে বৈ কমবে না এটুকু নিশ্চিত থাক। এটুকু খুশখবরী নিয়ে বাড়িতে বিকেলের মুখে ঢুকলো আত্মীক।
দিব্যার একটু শান্তি হল এ বুকে।তার হাজবেন্ড তাহলে এ মুহূর্তে উপার্জনহীন নয়। দিব্যার মা একদিন দিব্যার বাবাকে চারপাঁচ জনের সহায় একটা পরিবার থেকে বের করে নিয়ে এসে নিজের আপন বৃত্ত রচনা করেছিলেন।রাজ্যসরকারী অফিসে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী ছিলেন। পদ ছিল পিওনের। আত্মীকের নিজের পছন্দের মেয়েকে প্রথমদিন দেখে এসেই আনন্দমোহনবাবু তার স্ত্রীকে বলেছিলেন দেখো এ মেয়ে কিন্তু আত্মীকের একটু রোজগার বাড়লেই বেড়িয়ে যাবে। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখো। তবে আত্মীক ও বেরিয়ে গেলেই এ কলকাতা শহরে চরম বিপদের মুখে পড়বে।সেটাও বলে দিচ্ছি।
বাবা ডেকেছে তাই রাত আটটা নাগাদ বাবার ঘরে ঢুকলো আত্মীক। ওর বাবা নিজের বেডরুমেই একটা ছোটো সোফাসেট এ বসেই বই আর খবরের কাগজ পড়েন। শুধুমাত্র টিভি দেখতেই ড্রইং রুমে আসেন।
আত্মীক কে দেখেই বললেন–শুনেছি। ঠিক আছে বর্তমানে যা দেশের অবস্থা পনের হাজারে রাজি হয়ে ভালোই করেছো। তবে চাকরিটি কি অফিসের কাজকর্ম সংক্রান্ত?
আত্মীক ভেবেই পাচ্ছিলো না বাবাকে কি জবাব দেবে। ওর ডিগ্রী সব লুকিয়ে রেখে ঢোকা এখানে।হাউসকিপিং জব। ক্লিনিং এর একটা পার্ট। ক্লিনিং বলতে মায় রুম টু রূফ। টয়লেটও আছে। ঢোক গিলে গিলে বললে অনেক কষ্টে আত্মীক তার বাবাকে—- হ্যাঁ। অফিসের কাজকর্ম সংক্রান্ত।
আনন্দমোহনবাবু চিল্লিয়ে উঠলেন—-মিথ্যে কথা। তুমি অফিস সুইপিং-এর দায়িত্ব পেয়েছো। আমার বিশেষ একজন লোক ওখানে আছে এ বছরে অবসর। সে তোমায় দেখতে পেয়ে আমায় খবর দিয়েছে। তোমার বিয়ের রিসেপশনে এসেছিলেন।তোমার বেঁচে থাকবার আর কোন উপায় না থাকলে আমি এই রোজগারে তোমায় মেনে নিতাম।আমি মানতে পারছি না ওটা অন্য কাউকে ছেড়ে দাও সে বাঁচুক এই চাকরিটা পেয়ে। নিজেকে সময়ের কাছে দৈন্যতার কাছে বেঁচে দিও না।
আত্মীক বাবার কাছে এগিয়ে গেলো। ঘরের দরজায় আরও দুটি মুখ ছিল,তারা নিঃশব্দে সরে গেলো। বাবার হাঁটুতে থুতনি ঠেকাতেই সেই ছোটোবেলার মতন আনন্দমোহনবাবু আত্মীকের ঘনচুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছিলেন।
আর বলছিলেন- ভয় নেইরে বাবা।আমি তো আছি। শুধু মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখ।