সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে গোবিন্দ ব্যানার্জী (পর্ব – ৬)

পাহাড়ী গ্রাম সূর্যোন্ডি
অযোধ্যা পাহাড়ের সরকারী আবাসন “নীহারিকা”
সেখানে সুজয় নামের ছেলেটিকে ফোন ক’রে দিন
কয়েক আগেই ডর্মেটরি বুক করা আছে আমাদের।
টুটুন ড্রাইভারের পাশে, সামনে থেকে বলছে… কবি,
নীহারিকার ছেলেটিকে জানিয়ে দাও..আমরা আধ
ঘন্টার মধ্যে ঢুকছি। রিং করতেই সুজয়কে পেয়ে
গেলাম মোবাইলে। জানিয়ে দিলাম… আমাদের
গাড়ি ছুটছে অযোধ্যা অভিমুখে। সাতটা পনেরোর
মধ্যে পৌঁছে যাবো। ওপার থেকে সুজয় জানাল…
আসুন আসুন, রুম রাখা আছে। পিছনে ব’সেছে
কালি, শঙ্কর। কালি বলছে… অযোধ্যায় তোমাদের
সেই মাস্টারকে ব’লে দাও… মোরা আসি যাইছুঁ।
গাড়ি এবার পাহাড়ী পথ ধরেছে। ক্রমশঃ উপরের
দিকে উঠছি। বাইরে সন্ধ্যার আবছায়া ছড়িয়ে
পড়ছে, গাছেদের ঝোপ ঝোপ শাখার পিছন থেকে
হারিয়ে যাচ্ছে দিনলিপির যাবতীয় সংলাপ। আরো
পিছনে আকাশের গায়ে লেগেছে বিষণ্ণতার ছোঁয়া।
যতদূরে চোখ যায়… লাল পলাশের রং কোনখানেই
চিহ্নিত করতে পারছি না। শঙ্কর কম কথা বললেও,
মাঝেমাঝে মজাদার কিছু ছিটিয়ে দেয়। ঠিক এখন
বলছে… পলাশ ফোটার আগেই চ’লে এসেছি যে,
এপালায় কুড়ি দেখে ফিরতে হবে মনে হ’চ্ছে।
মাথার ভিতরে পুরোনো একটা স্লটের চিত্রায়ণ ঘ’টে
চলেছে তখন। গুরুপদ সোরেন… বছর তিরিশের
মূলবাসী যুবক। ওর সাথে পরিচয় কয়েক বছরের।
যদুগোড়ায় মূলবাসীদের একটা দরিদ্র আবাসিক
স্কুলে পড়ায়। সেই নিয়ে গিয়েছিল সেবার ওদের
স্বপ্নের স্কুলে। ওখানে শিশুদের সাথে কাটানো সেই
দিনটা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত… সমস্তটা নিয়ে
আচ্ছাদিত ক’রে চলেছে ভাবনার মায়াজাল। ওকে
ফোন করা দরকার। রিং করতেই ওপারে গুরুপদ
বলছে… আসছেন তো স্যার..? বলছি… হ্যাঁ তো,
সাড়ে সাতটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি ওই নীহারিকার
সামনে। যদি সম্ভব হয় ওখানে চ’লে এসো। বিশেষ
কথাও আছে তোমার সাথে। আমরা আপাততঃ
ছ’জন আছি, আগামীকাল সকালে আরেকজন
মিলিত হবে। পিছন থেকে কালি বলছে অনুচ্চস্বরে
… যদি মহুল পাওয়া যায় তো গুরুপদকে ব’লে দিন
নিয়ে আসতে। আহা! মহুলের কথা উচ্চারিত হ’তেই
একটা মিঠা গন্ধ উড়ে গেল সবার মুখের উপর দিয়ে।
গার্গী আমার পাশে ব’সে, বেশ উল্লোসিত কন্ঠস্বরে
বলছে… ও হো দাদা, আমি কখনো মহুল টেস্ট
ক’রি নি… একটু পাই যেন। টুটুন বলছে… আহা,
আগে পাওয়া যাক তো। কবি, ব’লে দাও তোমার
গুরুপদকে… ঐ লিটারখানেক পেলেও জমে যাবে।
আর গুরুপদ ফোনের ওপাশ থেকে বলছে… ঠিক
আছে স্যার, আমি আসছি…
গাড়ি বাঘমুন্ডিকে পিছনে রেখে চড়াই পথে উঠছে
আপার ড্যামের দিকে। কোন এক বসন্তের বিকেলে
এই ড্যামের পাশে দাঁড়িয়ে জলের ভিতর থেকে
উঠে আসা শীতলতার সাথে কথা ব’লেছিলাম খুব
সন্তর্পণে। দু’মুঠো আবির উড়ে গিয়েছিল আবিষ্ট
বাতাসের আবেগ ছুঁয়ে ছুঁয়ে… আর এইখান থেকে
অজস্র কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে আমরা
নেমে গিয়েছিলাম লোয়ার ড্যামের পাকদন্ডি পথে।
অনেক দূর থেকে এই সব ছবি রোঁয়ার ভিতর ঘন
হ’য়ে উঠছে… আমরা পেরিয়ে যাচ্ছি ময়ূর পাহাড়।
ক্রমশ