“গান ভালোবেসে গান” সংখ্যার আজকের লেখায় ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

শচিনদেব – কিশোরকুমার যুগলবন্দী

শচিনদেব বর্মন আর কিশোরকুমার – দু’জনের সঙ্গীত সংস্পর্শ নিয়ে সঙ্গীত-ঈশ্বর বোধয় অন্যরকম ভেবেছিলেন যা তাঁরা শুরুতে ভাবেননি ।
শচিনদেব ভাবেননি আগরতলা-কুমিল্লা-বাংলার মাটি ছেড়ে মুম্বাইয়ের চিত্রজগতে সঙ্গীতের ঝড় তুলবেন, বা ‘সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল’এর আশ্রয় ছেড়ে মুম্বাইয়ের ফিল্ম-সঙ্গীতকে অপার ঐশ্বর্যমন্ডিত করবেন ।
একই রকম প্রথাগত কোন সঙ্গীতশিক্ষা না-করা কিশোরকুমারও, সঙ্গীতশিল্পী হওয়ার কোন বাসনা না থাকা সত্ত্বেও হিন্দি ফিল্মসঙ্গীতের বেতাজ বাদশা হয়ে উঠবেন এমনটা ভাবেননি ।
‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত আত্মকথায় শচিনদেব লিখেছিলেন “খতিয়ে দেখলে আমার এ জীবনকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায় । শৈশব ও কৈশোরের দুরন্তপনা গোমতী নদীর তীরে কুমিল্লায়, যৌবনের উন্মত্ততা ভাগীরথীর তীরে কলকাতায় – যা জীবনে প্লাবন এনে দিয়েছিল এবং প্রৌঢ়ত্বের ছোঁয়া দিল আরব সাগর – এই মুম্বাইতে ।
হওয়ার কথা ছিল ত্রিপুরার রাজা,হয়ে গেলেন আধুনিক বাংলা গানের মুকুটহীন রাজা । পিতা চেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার পর পুত্র আগরতলায় ফিরে এসে রাজকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন,কিন্তু শচিনদেব আবদ্ধ হলেন সুরের মায়ায় । চেতনায় তখন ত্রিপুরার বাঁশের বাশি,ভাটিয়ালির সুর,মাঝিমাল্লাদের জীবন ও জীবিকার সুর,গোমতী নদীর অপরূপ ছন্দ,কুমিল্লার গাছ-গাছালি,নদী-নালা আর মাঝি-মাল্লাদের মাটির গন্ধমাখা সুর । তিরিশ থেকে ষাটের দশক ছিল বাংলা গানের সোনার দিন। আর প্রাণভরে আধুনিক বাংলা গান শোনার দিনও । বাংলা গানের সেই সোনার দিনের নির্মাণ যাঁদের হাতে হয়েছিল তাঁদের এক অগ্রজন ছিলেন শচিন দেব বর্মণ । আধুনিক বাংলা গানের গায়কীর অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছিলেন শচিন দেব বর্মণ । শচীনদেবের গায়কীতে এমন একটা চৌম্বক গুণ ছিল যে সেই আকর্ষণে বাঁধা পড়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না । কন্ঠ খুব ভরাট ছিল না, উচ্চারণও ছিল ঈষৎ আনুনাসিক, অথচ এই নিয়েই তাঁর অনন্য গায়কী স্রোতাদের কাছে অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণের বিষয় হয়ে যায় । অমন গায়নরীতি তাঁর আগে আমরা পাইনি, তার পরেও নয় ।
শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য শচিনদেব বাংলা ছেড়ে মুম্বই পাড়ি দেননি । অনেক অভিমান নিয়েই তিনি বাংলা ছেড়েছিলেন “… আজ যদি কেউ আমাকে কলকাতা থেকে প্রস্তাব করে পাঠাত, তোমাকে পাঁচশো টাকা করে মাসোয়ারা দেব,তুমি আবার আমাদের মধ্যে ফিরে এসো,আমি তন্মুহুর্তে মুম্বাই-এর তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতা চলে আসতুম – আবার সেই পুরনো দিনের মত গানে গানে মেতে উঠতুম’। প্রাবন্ধিক নারায়ন চৌধুরীকে বলেছিলেন তিনি । জীবন সায়াহ্নে নিজের উপলব্ধি লিখে গেছেন “নিজের শুধু এই পরিচয় যে আমি বাংলা মায়ের সন্তান এবং আমার সুরসৃষ্টি সমগ্র ভারতবাসীর সম্পদ – আমার সুর ভারতবর্ষের প্রতীক”(সূত্রঃ’ শচিন কর্তা’/পান্নালাল রায়) ।
আমাদের অপার বিস্ময় বাংলা ছায়াছবি শচিন দেবের সুরের ঐশ্বর্য প্রায় বর্জনই করেছিল । ১৯৩২এ বাংলা ছায়াছবি সবাক হওয়ার পর দুটি অসফল ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন, তারপর আর কোন প্রযোজক,পরিচালক তাঁকে ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ দেননি । কোন ডাক না পেয়ে কিছুটা অভিমান নিয়েই বাংলা ছেড়ে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন । ১৯৪২এ মুম্বই যাওয়ার প্রথম ডাক পেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । চেয়েছিলেন বাংলাতেই থাকার । কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র জগত থেকে কোন ডাক না পেয়ে অভিমানাহত হয়ে ১৯৪৪এ মুম্বাই চলে গেলেন পাকাপাকি ভাবে । ‘দেশ’পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর আত্মকথনে (মার্চ ১৯৬৯) শচিনদেব লিখেছিলেন “বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করার আকাঙ্খা ছিল খুব । কিন্তু কোন সুযোগই পাচ্ছিলাম না ……। কোথাও কোন চলচ্চিত্র সংস্থা আমাকে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ না দেওয়াতে মনে খুবই দুঃখ হয়েছিল” । তাই ১৯৪৪এ দ্বিতীয় বার যখন মুম্বাই থেকে ডাক পেলেন,আর ফিরিয়ে দিলেন না ।
তারপর হিন্দি সিনেমার গান তাঁর সুরের জাদুতে কি অসামান্য উচ্চতা স্পর্শ করেছিল তা তো ইতিহাস হয়ে আছে । মুম্বাই সিনেমার গান ঐশ্বর্যময়ী হয়ে উঠলো বাংলার মাটির সুরের স্পর্শে আর কোন বাংলা ছায়াছবি শচিনদেবের ছোঁয়া পেল না । শচিনদেব বলতেন সাধারণ মানুষ যে গান সহজেই নিজের গলায় তুলে নেয়, সেটাই হল ফিল্মে হিট গান । শচিনদেব কিশোরকুমারকে দিয়ে একটার পর একটা এইরকম হিট গান গাওয়ালেন যেসব গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতো ।
বস্তুত,শচিনদেবের হাতেই গায়ক কিশোরকুমারের নির্মাণ হল ।

প্রথাগত সঙ্গীত শিক্ষা না করা কিশোর কোনদিন ভাবেনই নি যে তিনি ফিল্মের গায়ক হবেন, ইচ্ছা ছিল অভিনয় ও ফিল্ম প্রযোজনা করবেন।
প্রবাদপ্রতীম গায়ক কুন্দনলাল সায়গলের গায়কী নকল করে নিজে নিজেই গাইতেন – এই পর্যন্ত । দাদা অশোককুমার তখন মুম্বাইএর ডাকসাইটে অভিনেতা । দাদার সঙ্গে স্টুডিওতে আসতেন প্রায়ই ।শচিনদেব কিশোরকে পরামর্শ দিলেন সায়গলের গায়কীর নকল না করে নিজস্ব গায়কী তৈরি করার । একবার কিশোরকুমারের কন্ঠে নিজের কন্ঠের নকল শুনে বিস্মিত হন শচিনদেব । কিশোরকুমারকে দিয়ে গাইয়েছিলেন নিজের অন্যতম সেরা গান ‘নিশিথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা নিশিথে যাইও ফুল বনে’র সুরে ‘ধীরে সে যানা বাগিয়ান মে রে ভমরা ধীরে সে যানা বাগিয়ান মে’ । হিন্দি সিনেমা-সঙ্গীতে কিশোরকুমারের আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে শচিনদেবের অবদানকে অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই ।
শচিনদেবের এক স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে কিশোরকুমার বলেছিলেন “মুম্বাইতে এসেছিলাম অভিনয় করব,প্রযোজনা করব বলে । গান করার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি । বুড়ো লোকটা আমার পিছু নিতেন । রাগ হত । পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতাম” । একদিনের ঘটনা উল্লেখ করে কিশোর বলেছিলেন “ গাড়ি করে যাচ্চি । ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থেমেছে । হঠাৎ পাশ থেকে আওয়াজ শুনি ‘আরে কিশোইরা না ! দেখি ঐ বুড়ো মানুষটা দরজা খুলে নেমে আমার গাড়িতে ঢুকে পড়লেন । ড্রাইভারকে বললেন ‘শহর ছাড়াইয়া গাড়ি লইয়া চলো’ । গাড়ি চলতে চলতে এক সময় সবুজ মাঠের ধারে পৌছায় । মানুষটা গাড়ি থেকে নেমে খেতের মধ্যে যান । হাঁটুর ওপর ধুতি তুলে আল ধরে হাঁটতে থাকেন । গাইতে থাকেন একটার পর একটা গান ।আমি কেমন স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে যাই । দিব্যজ্ঞান হারিয়ে ফেলি । কেবল মনে হতে লাগল, এই মানুষটাকেই তো এতকাল খুঁজছি । আজ থেকে ইনি যা বলবেন তার বাইরে কক্ষনো যাবো না” । এই ছিল শচিনদেব-কিশোরকুমারের সাংগীতিক সম্পর্ক ।
সিনেমা-সঙ্গীতে সঙ্গীত পরিচালক ও গায়কের সাফল্যের ক্ষেত্রে একটা রসায়ন থাকে তা হল নায়ক- গায়কের জুটি । যেমন বাংলা সিনেমার ক্ষেত্রে উত্তমকুমার – হেমন্ত মুখোপাধ্যায় । এই জুটির নির্মাণ করাই সার্থক সঙ্গীত পরিচালকের কৃতিত্ব । তিনিই বুঝবেন কোন অভিনেতার কন্ঠস্বরের সঙ্গে তার নেপথ্য কন্ঠের মিল হতে পারে । যেমন বুঝেছিলেন সত্যিজিৎ রায় । চারুলতা (১৯৬৪) সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের গানে নেপথ্য কন্ঠ ব্যবহার করলেন কিশোর কুমারের । আমরা চমকিত হলাম । পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শচিনদেব দেবানন্দ-কিশোরকুমার জুটি তৈরি করলেন । নায়ক দেবানন্দের হিট ফিল্ম ‘মুনিমজি’ (১৯৫৪), ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’ (১৯৫৪), ‘হাউস নম্বর ৪৪’(১৯৫৫), ফান্টুস (১৯৫৬), পেইং গেষ্ট (১৯৫৭), নও দো এগারো (১৯৫৭), জুয়েল থিফ (১৯৬৭), ‘গাইড (১৯৬৫)’, ‘প্রেম পুজারী’ (১৯৭০), ও ‘তেরে মেরে স্বপ্নে’ (১৯৭১)এবং কিশোরের নিজের প্রযোজনা ‘চলতিকা নাম গাড়ি । দেবানন্দ-কিশোরকুমার জুটির সাফল্য দেখে অন্য সঙ্গীত পরিচালকরাও দেবানন্দের গানে কিশোরকুমারকে ব্যবহার করলেন । দেবানন্দের লিপে কিশোরকুমার মোট ১১৯টি গান গেয়েছেন । কিন্তু শচীনদেব-কিশোরকুমার যুগলবন্দীর সেরা সাফল্য নিশ্চিতভাবেই ১৯৬৯এ শক্তি সামন্ত পরিচালিত ‘আরাধনা’ চলচ্চিত্রটি । এই ছবিতে কিশোর ৩টি গান গেয়েছিলেন যা আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে ।বস্তুত নেপথ্য গায়ক হিসাবে কিশোরকুমারকে মুম্বাই ফিল্ম জগতে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌছে দিয়েছিল ‘আরাধনা’ ছবিটি । নায়ক-গায়ক জুটি হিসাবেও রাজেশ খান্না –কিশোরকুমার জুটি প্রবাদের মত হয়ে গেছে । রাজেশ খান্না ৯২টিছবিতে ২৪৬টি গান গেয়েছিলেন কিশোরকুমার । উল্লেখযোগ্য আরাধনা ছবিতে শচীনদেবের কন্ঠে নেপথ্যে একটি গান ব্যবহৃত হয়েছিল । এই প্রসঙ্গে বলি সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনায় শচীনদেবের একটা শর্ত থাকতো সিনেমার কোন চরিত্রের লিপে তিনি গান গাইবেন না, গান করেনওনি কোনদিন । শুধু দেবানন্দ রাজেশ খান্নাই নয়, ১৯৭০ ও ৮০র দশকের মুম্বাই চিত্র জগতের প্রায় সব প্রধান অভিনেতার গানেই কিশোরকুমার কন্ঠ দিয়েছেন যেমন শাম্মি কাপুর, ঋষি কাপুর, সঞ্জীব কুমার, শশি কাপুর, ফিরোজ খান, সঞ্জয় দত্ত, অনিল কাপুর, মিঠুন চক্রবর্তী থেকে অমিতাভ বচ্চন পর্যন্ত । শুধু অমিতাভ বচ্চনের লিপে কিশোর গান গেয়েছেন ১৩১টি ।
এই লেখা কিশোরকুমারের অভিনয় বা সঙ্গীতজীবন কিংবা শচিনদেব বর্মনের সঙ্গীত-জীবন নিয়ে নয়, সুরের রাজপুত্র শচিনদেব বর্মন ও মুম্বাই ফিল্ম-সঙ্গীতের বেতাজ বাদশা কিশোরকুমারের যুগলবন্দী মুম্বাই ফিল্ম জগতকে কেমন করে এক অসামান্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল সেটুকুই বুঝতে চেয়েছি এই লেখায় ।
শচীনদেব বর্মন চলে গেছেন আজ ৪৫ বছর হল (মৃত্যু- ৩১ অক্টবর ১৯৭৫), কিশোরকুমারও চলে গেছেন ৩৩ বছর হল মৃত্যু ১৩ই অকোবর ১৯৮৭)।শিল্পীর মৃত্যু হয় না, সৃষ্টি ও শ্রষ্টার মৃত্যু হয় না ।হিন্দি ফিল্ম সঙ্গীতের অপার ঐশ্বর্য নিয়ে প্রবাদের মত বেঁচে আছে শচিনদেব – কিশোরকুমার যুগলবন্দী ।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!