কবিতায় পদ্মা-যমুনা তে ফারহান আবিদ (গুচ্ছ কবিতা)

১| বৃত্ত এঁকে যাই

ভীষণ রকম চলে যাওয়ারা টানছেন।
কেমন এক অবিচ্ছেদ্য, অবধারিত নক্ষত্রের মতন।
বিপাকে ফেলে দেয়,
ভাবি বেঁচে থাকাটাও মন্দ কিনা?
চেনা-অচেনা-অল্প চেনা আলোর ফাঁক গলে,
কখনও সঞ্জীব, কখনও রুদ্র, কখনও আদিত্য নামে,
বেঁচে থাকারা দৈন্য পুষে যায়।
তুমি আমি বরং চলো,
মাটিতে পাটকাঠি বুলিয়ে
বৃত্ত এঁকে যাই,
ক্রমাগত বৃত্ত এঁকে যাই..

২| থেমে গেছি

বহুবার লিখতে গিয়েও থেমে গেছি,
পৃথিবীর দিগন্ত ছোঁয়া দ্রাঘিমা রেখাদের ছুঁয়ে এসেছে
প্রতিটি লেখার বর্ণ।
বার্লিনের নগর গোধূলি হয়ে,
বুদাপেস্ট হেঁটে এসেছে প্রতিটি লেখা স্বপ্ন।
বহুবার লিখতে গিয়েও থেমে গেছি,
বল তো আরও কতখানি লিখলে ছুঁয়ে আসা যেত,
তোমার চিবুকের অতটুকু তিল!
ফুটপাথ রাজপথ সয়লাব
শাহবাগ আজিমপুর আর হাওয়ায় ভাসা সুখেদের পদ্ম।
বহুবার লিখতে গিয়েও থেমে গেছি,
আদৌ কি লিখে থামানো যেত, শহরের প্রতিটি
বোবা শ্লোগানের অহংকারী স্বপ্ন?
ছারখার দাবানল ধানমন্ডি,
শুধু প্লাস্টিক বর্মের আতঙ্কে,
একটা জনপদ বারেবার শোক হতে রিক্ত হয়ে ফেরে!
বহুবার লিখতে গিয়ে থেমে গেছি,
তোমাকে কি বলব?
বলা টা কি ঠিক হবে?
শহরের বর্ষায় শালিকের গান শোননি কখনও?
যদি শুনতে, বুঝতে,
এক বর্ষায়
কখনও কখনও গেরস্থের সব হারিয়ে যায়, যেতেই পারে!

৩| অনাস্থা উপাখ্যান

কোন কোন সময় খুব দ্রুত পরিব্রাজক পাখির ডানায় ভর করে চলে যায়।
কিছু কিছু সময় থম্ ধরে পড়ে থাকে মনে হয়, বুঝি নড়ছেই না
কিন্তু আসলে নড়ছে ধীর লয়ের মাঝ সাগরের জাহাজের মত।
কিছু কিছু সময় সহস্র আলোকবর্ষের গতিতে চলে যায়, যেন ফিরে দেখতে বারণ।
কোন সময়কেই পাই না,
কাছে থেকে দেখতে, একটু খানি ছুঁয়ে দেখতে।
মনে হয় স্থাবর অস্থাবর মনের সব জমি-জমা বেচে দিয়ে দূর-সুদূর কোন সাগর পাড়ে এক বুক সমান জায়গা কিনি, শুধু নীল দেখব বলে।
আমার সারা জীবন অমন বিস্তীর্ণ নীল দেখে মনে হয়েছে,
এখানে কোন দিন সময়ের বয়েস বাড়ে না।
এমন কেন জীবন হয় না,
শুধুমাত্র একটা গান শোনার জন্য নবীন স্বপ্নের এপিটাফ লেখা হয়?
এমন কেন জীবন হয় না,
শুধু সময়টা ভাল লাগছে বলে এই পথ কোনদিন শেষ হবে না!
এমন কেন একটা কবিতা হয় না,
যাকে শোনার জন্য অযুত প্রাণ সহাস্যে নশ্বর হয়!
এমন কেন জীবন হয় না,
শুধু সাগরের গল্প শোনাবে বলে, বুড়ো প্রেমিক গোটা দুনিয়ার যাবতীয় সাগর পাড়ে হেঁটে বেড়ান। নুড়ির থেকে দানা দানা গল্প কুড়ান!
এমন কেন জীবন হয় না, মাঝ রাত্তিরে প্রিয় মানুষের এক ফালি হাসি দেখবার জন্য সব ছেড়ে কেউ পাড়ি দেয় হাজার মাইল!
এমন কেন সময় আসে না,
সব কিছু সুন্দর লাগে, ভাল লাগে।
এমন কেন সময় আসে না,
জীবন মাতোয়ারা তোলপাড় বাজির দর, সব মিথ্যের বাজার ছারখার করে দেয় না!
সময়, জীবন এদের কারোরই বুঝি বয়েস বাড়ে না।
মানুষের বয়স বাড়ে বলেই সে সময়ের অথবা জীবনের দৌঁড়ে পিছিয়ে যায়,
কখনও হেরে যায়।
মন রে,
না হয় কিছু আপোষে অনাস্থা রাখলাম।

৪| অব্যক্ত

তিনি কিছু লিখে রেখে যান নি।
না কোন রোদের বুকে ঘাসফুলেদের দীর্ঘশ্বাস,
না কোন বিকেলের ধার ঘেঁষে সন্ধ্যারাতের শ্লোক,
না কোন অনিন্দ্য সবুজের স্বপ্নে ঘোরলাগা মদিরা,
না কোন পাতা ঘেরা গল্পদের ঘ্রাণে মথিত নিরালা।
তিনি কিছু লিখে রেখে যান নি।
না কোন নিয়মের শত বারণ উপেক্ষার মন্ত্র ,
না কোন সমুদ্র তীরে সারা জীবন বেঁচে থাকার ব্যবসা,
না কোন কান্না ভাঙা বেহাগের সুরের সপ্ত স্বর্গ,
না কোন সম্রাটের রাজ অমাত্য হবার লুকোন সূত্র।
তিনি কিছুই লিখে রেখে যান নি।
না সহস্র লিখে না যাবার আকুতি, অজুহাত।
না সন্তানদের বলে যাওয়া, কতখানি হিসেবের কাঙাল তিনি।
না প্রিয় মানুষটির নোলক হারিয়ে যাওয়া, মানুষটি হারিয়ে যাওয়ার মতোই!
না, না লিখেও কতখানি লিখে যাওয়া যায়!

৫| নৈর্ব্যক্তিক

এক গুচ্ছ ভাললাগা নিয়েও গল্পেরা ফুরিয়ে যেতে পারে
নতুন সুরের ভাঁজে জেগে ওঠে লোহিত কণিকা
গান খোঁজে তার চিরচেনা পথ, পথের আকাল।
অনেক আশারা হয়ে যেতে পারে তুচ্ছ,
সমুদ্র সফেন পাখা মেললে
সাগর হয়ে যেতে পারে মিথ্যে।
সীমানা পেরোয় একা গাঙচিল তার পথের টানে,
নাবিক পাল তুলে ভাসায় জলের শ্লোগান,
তরী বাইবার স্বপ্নেরা একে একে নিদ্রামগ্ন,
তারাদের উঠানে নিমফুলের গন্ধে
তার শেষমেষ কোন কল্প থাকে না।
বয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি বা আছে?
নিস্তরঙ্গ মনে হয় সকল অন্তরীক্ষ তার,
জ্বলে উঠবে বলে হাসে না কোন গান,
গানের সুর দূর পরাহত,
এখানে শুধু মেঘেদের শ্লোগান,
মেঘেদের শ্লোগান,
মেঘেদের শ্লোগান,
এক গুচ্ছ ভাললাগা নিয়েও গল্পেরা ফুরিয়ে যেতে পারে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।