ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে এ এফ এম সেবগাতুল্লা (পর্ব – ১২)

সাবির সুবীর আর মাতলা নদী
সাবির – সুবীর সরকারি অনুমতি চেয়েছে যাতে জাহাজের সংলগ্ন খোঁড়াখুঁড়ির করতে পারে। জাহাজের ভিতরে প্রবেশ করতে পারে তারও অনুমতি নিল। অবশেষে ওরা অনুমতি পেয়েও গেলো। ওদের বেশ ফুরফুরে মেজাজ। আবার ওরা আমঝাড়া গ্রামে যবে, ফুলবাড়ি গ্রামে যাবে।
সেই মত ওরা আবার ট্রেন পথে কালিকাপুর থেকে ক্যানিং হয়ে আমঝাড়া এল। এবার গ্রামের বৃদ্ধদের সাথে কথা বলতে থাকলো। ওরা আসলে ইতিহাস আর ক একটা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছে। প্রথমে ওরা সিদ্ধান্ত নিল আমঝাড়া গ্রামে এমন কোনও বৃদ্ধ মানুষজন আছে কি যিনি অতীত দিনের কিছু সুলুক সন্ধান দিতে পারেন। অবশেষে ওরা একজন বৃদ্ধের সন্ধান পেয়েছে। বৃদ্ধের ছোট বেলার ঘটনা গ্রামের অনেকেই জানেন। নদী তখন বেগবতী , এক ভয়ংকর ঝড়ের সম্মুখীন হয়েছিল সেই নৌকা – যে নৌকার যাত্রী ছিলেন তৎকালীন কিশোর এই বৃদ্ধটি। পঞ্চাশের দশকে যখন নৌকাডুবি ঘটেছিল এই বৃদ্ধের তখন প্রায় দশ – বারো বছর বয়স হবে, এখন তার বয়স প্রায় আশি। কিন্তু সাবির – সুবীর কথা বলতে গিয়ে জানল উনি কথা বলতে বলতে হারিয়ে যান। সাবির – সুবীর বৃদ্ধের বাড়ির লোকের কাছে থেকে জানতে পারেন ওনার দুইবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। যার ফলে ওনার মস্তিস্কে স্মৃতি মনে রাখার ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে সমস্যা হয়। এদিকে উনিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লোক হিসাবেই জানা গেছে। গরীব ঘরের গ্রামের বুড়ো হলে যা হয় আর কি ,সঠিক চিকিৎশা হয়না ! এর পর সাবির – সুবীর বৃদ্ধের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। তবে জানিয়ে গেলো তারা এই দাদুর কাছে আবার আসবে গল্প করতে।
সুবীর , সাবিরকে পরে জিজ্ঞাসা করল আচ্ছা ” আচ্ছা তুই এই দাদুকে যে প্রশ্ন করবি সেই উত্তর যে দাদু সঠিক ভাবে দিতে পারছে তুই কিভাবে জানবি ? কারণ দাদু কখনও কখনও ঠিক ঠাক কথা বলেন কখনও কখনও হারিয়ে জান। তো এই অবস্থায় কি ভাবে সঠিক তথ্য নেওয়া সম্ভব”? প্রত্যুত্তরে সাবির সুবীরকে জানাল ” ঠিকই বলেছিস বন্ধু। এই অবস্থায় সঠিক খবর নেওয়া সত্যি একটু সমস্যার “!
ওরা ফুলবাড়ি গ্রামে আত্মিয়দের বাড়িতে ফিরেগেল। গ্রামটা আমঝাড়া গ্রাম থেকে খুব বেশি দূর নয়। যাই হোক সাবির – সুবীর তো এদের কুটুম। আজ রাতের মেনু হল হাতঝাড়া পিঠে আর দেশি মোরগের মাংস। এই মাংসের তরকারিটা ছিল লাল লাল ঝোল সাথে বড় পিসের আলু দেয়া, সাথে নারকোল দিয়ে চালের আটার হালুয়া। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বিশেষত বাঙালি মুসলিম পরিবারে গেস্ট আসলে এমন খাবার দাবারের চল আছে। সাবির আহমেদ আর সুবীর চ্যাটার্জী বেশ খুশি। সাবিরের এমন ধরনের রেসিপির সাথে আলাপ আছে, কিন্তু সুবীরের নেই। তাই সুবীর আজ বিশেষ খুশি।
রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সাবির – সুবীর আলোচনা করছে । ওরা নিজেরা বলাবলি করছে এই নৌকাডুবি, ঝড়, জাহাজ, প্রতাপাদিত্যের দূর্গের হয়ত ঠিক ঠাক ইনফরমেশন দিতে পারবেন এই দাদুই। দরকার হলে সরকারি সহায়তায় ওরাই কলকাতায় নিয়ে গিয়ে দাদুকে ডাক্তার দেখিয়ে আনবে। এখন বাজে রাত একটা দশ। মধ্য রাত। চারিদিকে যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার! দূরের কিছু মাটির বাড়ি আবছা দেখা যায়।শেয়াল আর কুকুরের আওয়াজ যেন মিলেমিশে যাচ্ছে। দূরের তাল গাছগুলকে দেখে মনে হয় কোনও এক দানব দাঁড়িয়ে আছে।খামারের পাশের খড়ের গাদা – ঝোঁপ ঝাড় এই রাতে বেশ ভয়াল মনে হয়! গ্রামের বাদায় নিশুতি রাতের হারিয়ে যাওয়া বহু আগের সুন্দরবনের যেন ছোঁয়া পাওয়া যায়। দূরে এই গভীর রাতে খালপাড়ে রাতের তারায় ধুষর হয়েগেছে! ফুলবাড়ি গ্রাম যেন মহীনি রূপ ধারণ করেছে। বড় মধুর এই অজ পাড়া গাঁয়ের মধ্যরাতের বিরল অনুভূতি। এমন গ্রামই তো অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি দেয়।
ওদের ঘুম পেয়ে যায়। তবে ঘুমোতে যাবার আগে ওরা সিধান্ত নিল। দাদুর কাছে সিরিয়াস ভাবে ঘটনা গুলো জানতে হবে। আর সাবির বলল ” আমঝাড়া গ্রামে ভাবছি কাল থেকেই খোঁড়াখুঁড়ি করতে যাব”।
চলবে