“সব মায়া কিংবা বন্ধনই একসময় শেষ হয়ে যায় পড়ে থাকে শুধু পথ সামনে এগোনোর জন্য”।
প্রিয় মানুষ আপনজন সৌরভের কবিতার লাইন দিয়েই তার স্মৃতি চারণা।
অকাল প্রয়াণের আগে শেষ সাক্ষাৎ ১২ই এপ্রিল ররবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ পথের সন্নিকটে পিনাকীদার সঙ্গে দাড়িয়ে কথা বলছিল আমায় ডেকে বলে আগামী ১৬ই এপ্রিল বাংলা একাডেমীতে সন্ধ্যায় শ্রদ্ধেয় কবি রণজিৎ দাসের একক কবিতা পাঠের সভায় আসার জন্য। তার পরদিনই কোভিড আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় টানা ১৭ দিন যমেমানুষে লড়াইয়ে হেরে গিয়ে মাত্র ৪২ বছরের প্রাণোচ্ছল তরুণ যুবক অকালে প্রয়াত হন। গত ১৫ই জানুয়ারী ২০২০ নন্দন চত্বরে ওর জন্মদিনের সেলিব্রেসন কেক কেটে নিজের হাতে খাইয়ে দেওয়া ওর Whatsapp এ সংরক্ষিত সেই ছবি এখন আমার কাছে শুধুই অতীত বিলাপের স্মৃতি।
তরুণ কবি সম্পাদক ও সংগঠক সৌরভ মুখার্জির সঙ্গে আমার পরিচয় খুব বেশীদিনের নয় সম্ভবত ওর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ হয়েছিল ২০১৮ সালে বাংলা একাডেমীর জীবনানন্দ সভাগৃহে টার্মিনাস পত্রিকার একটি অনুষ্ঠানে। মঞ্চে সৌরভ বিশিষ্ট গুণীজনদের সাথে আসীন ছিল। আমি কবিতা পাঠ করার পর হাততালি দিয়ে আমায় উৎসাহিত করে এবং অনুষ্ঠান শেষে আমার পিঠ চাপড়ে দেয় কবিতাটি খুব ভাল হয়েছে দাদা কিন্তু পাঠে আরও মনোযোগী হতে হবে।এরপর কোথায় থাকি ইত্যাদি খোঁজ খবর নেয়। সেই প্রথম আলাপেই আমি ওর সরলতা বন্ধুসুল্ভ মিষ্টি ব্যবহারে আকৃষ্ট হয়েছিলাম। তারপরে নন্দন চত্বরে অনেক সাহিত্যের অনুষ্ঠানে দেখা সাক্ষাৎ ও কথাবার্তা হয়েছে এবং আমার ফেসবুক একাউন্ট খুঁজে আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠায় সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিয়মিত সমস্ত খবর যোগাযোগে আরও দৃঢ় হয়।
২০১৯ সালের কলকাতা পুস্তক মেলায় কবিতা পাঠের সুযোগ দেওয়া ও আরও অনেক প্রোগ্রামে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত না থাকলে রেগে দুচারটি কথাও শুনিয়ে দিত।
লম্বা চওড়া সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী তারপরেও খুব বেশীদিনের আলাপ নয় আমি ওকে দাদা বলেই ডাকতাম এতে ও প্রায়শই আমাকে বলত আমাকে কি আপনার চেয়ে বড় বলে মনে হয় আমার নাম ধরে না ডাকতে পারলে আমার সঙ্গে আর মিশবেননা ওর বড়দের প্রতি সম্মান শ্রদ্ধা প্রদর্শন দেখা হলেই দাদা বলে বুকে জড়িয়ে ধরা কেমন আছি খবরাখবর নেওয়া অমায়িক ভদ্রতা আন্তরিকতা তরুণ উঠতি কবিদের সুযোগ করে দেওয়া বিপদে আপদে মানুষের পাশে থাকা সমাজ সচেতনমুক বিভিন্ন কর্মসূচী রুপায়ন ইত্যাদি নানা গুনের সমন্বয়ে ব্যক্তি সৌরভকে যত দেখতাম অবাক হয়ে যেতাম। সত্য কথা সে যতই অপ্রিয় হোকনা কেন মুখের ওপর বলে দেওয়া স্পষ্টবাদীতা ওর চরিত্রের একটা বিশেষ গুন ছিল। যারজন্য মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত ওকে অপছন্দ করা ব্যক্তি শত্রু সংখ্যা বন্ধু শুভানুধ্যায়ী সংখ্যার চাইতে অনেক বেশী ছিল বলেই আমার ধারনা।
সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালবাসা স্বরুপ সাহিত্য নিয়ে ব্যবসা নোংরামি নতুন নতুন ছেলেমেয়েদের টাকা পয়সার বিনিময়ে সুযোগ করে দেওয়া তরুণ ছেলেমেয়েদের বিপথে চালিত করা একশ্রেণীর অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়ে সুস্থ সংস্কৃতির পক্ষে জনসমাগমের মাধ্যমে কোভিড মহামারীর মধ্যেও বাংলা লেখক ও শিল্পী মঞ্চের উদ্যোগে একটি প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তুলেছিল এবং ৩রা মার্চ’২০২১ থেকে ৭ই মার্চ কবিতা উৎসবের মুখ্য ভুমিকা নিয়েছিল।
সদা প্রাণবন্ত পজিটিভ চিন্তাভাবনার মানুষ সৌরভের সঙ্গে খুব কম সময়ের আলাপ বন্ধুত্ব হলেও ওই সময়কালের মধ্যেই ব্যক্তি সৌরভের সঙ্গে যতটা মেলামেশার সুযোগ পেয়েছি সেটাও যদি আমি বিস্তৃতভাবে ব্যখ্যা করতে যাই তাহলেও পাতার পর পাতায় লিপিব্দধ করেও শেষ হওয়ার নয়। এই প্রতিবেদন লিখতে গিয়ে বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে চোখের জলের বাঁধ মানছে না যন্ত্রণা কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মুহূর্ত থেকেই অনবরত সুস্থতার সুখবরের জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম ভাস্করদার মেসেজের অপেক্ষায় প্রহর গুনতাম। আমাদের সবার ভালবাসাকে এক লহমায় ছিন্ন করে অকালে চলে যাওয়া কিছুতেই মানতে পারছিনা এরপর নন্দন চত্বরে গেলে বুকটা শুন্যতায় হাহাকার করে উঠবে তখন তোমার ভালবাসার মানুষরা কে কাকে সান্তনা দেবে ? পরিতাপের বিষয় যে করোনা মহামারীর অভিশাপের দরুন শেষ দেখাও দেখতে পারলামনা প্রিয় ভাইটিকে এ আক্ষেপ ইহজীবনে ভোলার নয়। স্বর্গলোকে তুমি সুখে থেক তোমার অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের ব্যাটন আমরা ঠিক বয়ে চলব। কথা দিলাম।