রম্য রচনায় ডক্টর বিশাখা বসু রায়

 নস্টালজিয়া

গল্প দাদু

 

আমার দাদু গল্প বলতেন ইংরাজি তে ।
কৈশোর আর যৌবনের বাইশ টা বছর উনি England আর France এ কাটিয়ে দেশে ফিরেছিলেন । French ভাষায় কবিতা লিখতেন , যা বই এর আকারে আমরা পেয়েছিলাম ।
Member of the Académie of Paris ছিলেন উনি !
কলকাতায় এসে J .Stone Co. (এখন Stone Platt Co.) তে Manager হিসাবে কাজ করেন ।
Lake Terrace এ থাকতেন, যেখানে অনেক গুণীজন সমাবেশ হত ।
ওনার বিশেষ বন্ধু ছিলেন Mr. Nayar যাঁর মেয়ে হলো বিখ্যাত সাহিত্যিক Kamala Das ।
ওনার আর দুজন বিশেষ বন্ধু ছিলেন দেব দম্পতি .
নরেন দেব ও রাধারানী দেবী ..যাঁরা শ্রীমতি নবনীতা দেব সেনের বাবা, মা ।
Sir যদুনাথ সরকার, বিখ্যাত ঐতিহাসিক, আসতেন ।
আমার দাদুর অনেক গুন ছিলো …carpentry, oil painting, gardening , কিন্তু আমাদের কাছে যেটা লোভনীয় ছিলো সেটা ওনার হাতে তৈরী চটি বই ।
মোটা কাগজ কেটে, সেলাই করে বই বানাতেন, আর তাতে একপাশে কবিতা, বা গল্প লিখতেন, আর অন্য পাশে সেটার ছবি আঁকতেন ।
কি যে অভিনব জিনিষ, এখন বুঝি !
ওনার কাছে English এ Fairy tales, Children’s Classics, যেমন Robinson Crusoe, Treasure Island, Gullivers Travels..সব শুনতাম ।

আমার ঠাকুরদা গল্প বলতেন সংস্কৃত তে ।
Lower Circular Road এর বাড়ীতে, ছুটি তে গেলে উনি গল্প বলতেন । সময় বাঁধা, দুপুর তিনটে থেকে চারটে !
অসাধারণ মেধাবী ছিলেন, আর অত্যাশ্চর্য স্মৃতি শক্তি !
প্রথমে সংস্কৃত তে বলতেন এক টা শ্লোক বা stanza, তার পর সেটা আমাদের অনুবাদ করে বলতেন ..আর আমরা , Missionary School এ পড়া, সংস্কৃত না জানা খুদেরা, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম !
ওই বয়েসে, বই না দেখে, মুখস্ত বলে যেতেন, আর আমরা, ওই বয়েসে অভিজ্ঞান -শকুন্তলম, নল-দময়ন্তি, রাজা হরিশচন্দ্রকে চিনেছিলাম !

ক্ষিতীশ জ্যাঠা গল্প বলতেন বাংলায় !
ওই বাড়ীতে, আমার ঠাকুরদা ঠাকুরমা, র সঙ্গে থাকতেন আমার বাবা ‘ র পিস্তুতো দাদা , আমাদের ক্ষিতীশ জ্যাঠা।
অসাধরণ গল্প বলতেন উনি ।
সন্ধ্যে বেলায়, ঘরের আলো নিভিয়ে আমরা মাটিতে বসতাম, আর উনি খাটে বসে রোমহর্ষক সব গল্প বলতেন !
Robert Blake, ব্যোমকেশ বক্সী, জয়ন্ত মাণিক, সেই কোন ছোটবেলায় এদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় !
সজারু’ র কাঁটা, যখের ধন, গ্রামাফোন পিন, এই সব গল্প বলতেন উনি …বই না দেখে ।
যেখানে শেষ করতেন, পরের দিন ঠিক সেখান থেকেই শুরু করতেন, সে পরের দিন ই হোক বা এক মাস বাদেই হোক !
এটা যে শুধু আমাদের ক্ষেত্রে হতো, তা নয়,
আমাদের বিভিন্ন পিস্তুতো ভাই বোনেরাও, অন্য দিনে এই ভাবে গল্প শুনতো !
কি অসাধারণ স্মৃতি শক্তি ছিলো ওনার, আর কি অদ্ভুত গল্প বলার ক্ষমতা !

আজকের Net এর যুগে এই ভাবে ধৈর্য্য ধরে গল্প শোনার ইচ্ছে কারুর আছে কিনা জানিনা, আমাদের কাছে কিন্তু ওটা বিরাট পাওনা ছিলো ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

1 Response

  1. Uttiya Bandyopadhyay says:

    I am cerrain it was lovely story telling with mesmerised children listening to your Dadu ( a member of the French Academy — a buge academic.Tbis may have sown the seeds of your enthuastic interesting snippets of writng for us.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।