T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় দিশারী মুখোপাধ্যায়

লেটারবক্সের স্বপ্নযোগ

কার্তিকের সকালে আলো কুয়াশা মেশানো গাছেদের আধা আধা হাল্কা ছায়া এসে পড়ে দীপকের পুবদুয়ারি বাড়ির পাঁচিলের গায়ে ঝুলে থাকা লেটারবক্সের গায়ে ।
পোস্টম্যানের ছায়া আসে সাইকেল চেপে । বেল বাজায় । জলতরঙ্গ না মন্দিরা , সে বিতর্কে যাবার মত কেউ ছিল না অত সকালে । এমন সকালকে ভোর বলা যায় স্বচ্ছন্দে । দীপকের লেটারবক্সের মধ্যে একটা চিঠি ফেলে পোস্টম্যানের ছায়া । তারপর সেই ছায়া তার পোস্টম্যান ও সাইকেলটিকে নিয়ে উবে যায় । তখনই ঘুম ভাঙে দীপকের । দুতলার উপর থেকে সাড়ে তেইশটা সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে আসে দীপক । দরজা খোলে পশ্চিমদিকে । খোলে লেটারবক্স । খুলতেই নিমরাজি হয়ে বেরিয়ে আসে একটা টিকিটিকি । না , কোনো চিঠি নেই । সূর্য তখন , যাইযাই সময়েও আকাশ জুড়ে হাতপা ছড়িয়ে বসেছে রঙ আর তুলি নিয়ে । ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে পাঁচ ।

 

দীপকের এক প্রতিবেশীর নাম অঋণ সরকার । প্রবীণ নাগরিক । বাজার করা তাঁর নেশা । পৃথিবীর সমস্ত রাস্তা তাঁর ইচ্ছায় সরল এবং সমান্তরাল । আপ এবং ডাউন পাশাপাশি । লেটারবক্সের পরিবর্তে তিনি তাঁর পোশাকের সর্বাঙ্গে অসংখ্য পকেট । কিন্তু সদাসর্বদা নজর রাখেন । বাতাসের বেচাল দেখলে রেয়াত করেন না । অ্যাড্রিনালিন খরচ করেন ডিরোজিওর দর্শন অনুযায়ী । দীপকের লেটারবক্স , সেই লেটারবক্সের পোস্টম্যান আর তার ছায়া এবং সাইকেল এবং একই সঙ্গে সকালের আলো এবং প্রদোষের রাগ , কোনোটিই তাঁর পছন্দের নয় । লেটারবক্সমার্কা লোকের প্রতিবেশী হতে পেরে মনে মনে তাঁর বেশ রাগ । আবার প্রচ্ছন্ন মজাকিও উপভোগ করেন লেহন সহযোগে । মনে মনে তারিফ করেন নিজের কেয়ারি করা গোঁফ আর মোটা জুলফির । দীপকের লেটারবক্সে আরশোলা , মাকড়সা , টিকটিকি এমনকী বিষধর কালাচের যাতায়াতও তিনি এনজয় করেন । আবার বিরক্তও হন । কখনোসখনো তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন লেটারবক্সটি আসলে দীপকের হৃদপিণ্ড । হৃদপিণ্ডের প্রতি এরকম উদাসীনতাময় আকর্ষণ এবং তাচ্ছিল্যে ভরা অনুরাগ বরদাস্ত হয় না তাঁর । তবু তিনি ওর প্রতিবেশী , কেননা দীপকের চোখে তিনি শুনেছেন হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ।

বাড়ির দুতলায় নিজের ঘরের মধ্যে যখন ঘুম ভেদ করে উদ্ভিদ হয়েছিল দীপক , তখন ছিল সকাল , মতান্তরে ভোর । একথা আগেই বলেছি । সিঁড়ি ভেঙে যখন সে নিচে নেমে আসে , বাড়ির বাইরে লেটারবক্সে পৌঁছায় , তখন প্রায় সন্ধ্যা । একথাও আগেই বলেছি । কিন্তু আপনাদের মত কয়েকজন সচেতন পাঠক পাঠিকার চোখে আমার বারো ঘন্টা সময় চুরির কীর্তি ধরা পড়ে গেছে । সুতরাং কৈফিয়ত দিতেই হবে । কৈফিয়ত তো দিতে চাই । কিন্তু সে কৈফিয়ত বারো ঘন্টা না বারো মাস না বারো বছরের ? সময়ের গায়ে এরকম সন্দেহের ছোপ লেগেছে। কয়েকজন আঙ্কিক পণ্ডিত বারোটার বারোটা বাজিয়ে ছেড়ে প্রশ্ন তুলেছেন , এইখানে বারোটার সঠিক অর্থ কোনটি । যেটি ঠিক , তার গায়ে টিক মারতে হবে । পণ্ডিতেরা ভনিতার পক্ষপাতী নন । যেটি আসবে সেটি আসুক সরাসরি । যেটি যাবে , যাক , মুহূর্তেই । অকারণ অভ্যর্থনা বা বিদায় সম্ভাষণে সময়ের অপচয় হয় ।

আমি যখন উপর তলায় ছিলাম , স্বপ্ন বেশ জমেছিল ঘরে পাতা মিষ্টি দই যেন । সেই দই খাওয়ার চেয়েও চোখে দেখে আনন্দ বেশি । অথচ পোস্টম্যান যে সংবাদটি দিয়ে গেল , তাতে ছিল স্পষ্ট টক দই , গ্রীষ্মের দিনে উপকারী বেশি । এখন এই টক-মিষ্টি , লাল-সাদা , তরল-ঘন এইসব ভাবনার মাকড়সার জাল ত্রিভুবনের পরিব্যাপ্ত হেঁয়ালিকে তুচ্ছ করে তোলে । আমি অতি তুচ্ছ এক পতঙ্গের মত টিকিটিকির মুখে ধরা পড়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে ছটফট করি উর্ধ্বশ্বাস-ঘড়ির কাছে মিনতি জানিয়ে । অথচ এসব শুধু নির্মম নয় , উপরন্তু প্রবঞ্চক । তাই সে আমাকে যাঁতার সুখ অনুভবে সাহায্য করে । সেই সুখে আকণ্ঠ ডুবে গিয়ে আমি ঘন্টা মাস বছরকে সমার্থক শব্দকোষে শরবত বানাই ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।