“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় দেবদাস কুণ্ডু

স্বপ্না

বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে।
বারান্দায় টিনের শেডের ওপর বৃষ্টির শব্দ। যেন ঘোড়া ছুটছে। বারান্দা লাগোয়া বেড রুমে শুয়ে
আছি আমি। আমার ঘুম পাতলা। তার মধ্যৈ ক
দিন ধরে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনছি। কোন মেয়ের পায়ের নুপুরের শব্দ। প্রথম দিন ঘুম ভেঙে গেল। এত রাতে নুপুরের শব্দ? বাইরে কোন মেয়ে কি হাঁটছে? না, বস্তি ঘুমে নিস্তবদ্ধ।
অনেকখন পর বুঝলাম শব্দটা আমার ঘরেই হচ্ছে। কোন শরীর নেই। শুধু দুটো পায়ের জোড়া নুপুরের ধ্বনি। ঘর বারান্দা ডাইনিং সর্বত্রই হচ্ছে সেই ধ্বনি। সদ্য ফ্ল্যাট কিনেছি। এ কি উপদ্রব? পর পর বেশ কয়েক দিন হল না। ভাবলাম ঘুমের ঘোরে কোন ভুল হয়েছে। রাস্তায়
গীতাঞ্জলি ঘড়িতে দুটো বাজলো।ঢং ঢং।
এখনও বৃষ্টি হচ্ছে। আজ অফিসে যাবার সময় বুঝেছি, হবে এক চোট। সারাদিন সেজেছে
মেঘ। এখন ঢালছে।একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে চমকে উঠলাম। আজ আবার সেই নুপুরের ধ্বনি। আজ স্পষ্ট দেখলাম লাল শাড়িতে হেঁটে যাচ্ছে একটি মেয়ে। মাথায় এক ঢাল চুল। পিছন
ফেরা। মুখ দেখা যাচ্ছে না। পাশের ঘরে গেল। ডাইনিং এ এল। বারান্দায় এল। আমি ডাক দিলাম
–কে তুমি?
ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটি। আমার মাথা ঘুরে গেল। এত সুন্দর মেয়ে আমি এর আগে দেখি নি। হিন্দী ছবির নায়িকারা হার মানবে।
—আমি স্বপ্না।
আমার চেতনা হল। বললাম–তুমি এত রাতে?
—তার আগে বল তুমি কে?
—-বিপ্লব।
–কোন বিপ্লব?
—তুমি কি অন্য কোন বিপ্লবকে চিনতে?
কোন জবাব দিল না।
—তুমি এখানে দু দিন এলে। কেন?
—কেন মানে? এটা আমার ঘর।
–তোমার ঘর?
–হ্যাঁ ।এই ঘরে আমি বড় হয়েছি। খেলাধূলো
করেছি। পড়াশুনা করেছি। কবিতা লিখেছি।
—তুমি কবিতা লিখতে পারো? আমায় শোনাও
না একটা কবিতা।
– – —-তাহলে ঘরে চল। বাইরে বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। ঘরে ঢুকতে আকাশ চিরে আলোর রেখা ছুটে গেল প্রবল শব্দ করে।
স্বপ্না বলল-তোমায় ভালোবসেছি মেঘের মতো। যত ফুল ছিল অর্পণ করেছি তোমার পায়ে। যত পাখি ছিল তাদের শুনিয়েছি প্রেম কথা। প্রবল রোদে অপেক্ষা করেছি শিউলি
গাছের নিচে। তুমি এলে না।
—কাঁদছো কেন স্বপ্না?
স্বপ্না শান্ত হয়ে বলে—তুমি বুঝি একা থাকো?
–হ্যাঁ ।আমি একা।
—তোমার কোন গার্ল ফ্রেন্ড নেই বুঝি?
–না। নেই।
—একা একা কেউ বাঁচতে পারে না। একটা বন্ধু খূঁজে নাও।
—তুমি আমার—এই তোমার ঠোঁট ছূয়ে—
বিপ্লব চমকে গেল। কার সংগে সে এতখন কথা বলছিল? কে তাকে কবিতা শোনালো? কিছুই বুঝে উঠতে পারল সে।
পরের দিন পাশের ঘরের পলাশ জেঠুকে বেলল—একটা কথা বলবো?
—কি বলবে আমি জানি।
—মানে? – –
—তুমি স্বপ্নার কথা বলবে তো?
–হ্যাঁ ।
—স্বপ্না দাশ বাবুর মেয়ে। ভালো মেয়ে। পড়াশূনায় ভালো। ভালো কবিতা লিখতো।কটা মেয়ে পারে বলতো? একটা মেয়ে একটা ছেলেকে ভালোবাসতে পারে না? অন্যায় তো কিছু করেনি। বিপ্লবকে ভালোবেসে ছিল।
—বিপ্লব?
—ছেলেটির নাম ছিল বিপ্লব। এই দেখ তোমারও
তো নাম বিপ্লব। ওর বাবা মেনে নিল না। স্বপ্না
সুইসাইড করলো।
—এই জন্যই কি রমিহ পাল একটু কম দামে ফ্ল্যাট বেচে চলে গেল?
—অনেকটা তাই।
এক মাস পর পলাশ জেঠু বললেন–বিপ্লব তুমি
কি ফ্ল্যাট বেচে চলে যাবে?
—কেন?
—স্বপ্না ।
—-স্বপ্না তো প্রায় রাতে আসে আমার ঘরে।
—তারপরও তুমি?
—কি করবো? আমি যে স্বপ্নাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আমি ওর সেই হারানো বিপ্লব ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।