ছোটগল্পে দেবদাস কুণ্ডু

জন্ম 26মে1961 ।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বানিজ্য স্নাতক ।গল্পকার।তিনটি গল্প সংকলন আছে।কৌশল পর্ব ।নির্বাচিত গল্প। এখন দূরত্ব ।বানিজ্যিক অবানিজ্যিক সকল কাগজে গল্প প্রকাশিত হয়েছে।

একটি মৃত্যুর পর

সকালবেলা একটা মৃত্যু। বিজনের মনটা বিষণ্ণ।
# # #
পূর্ণিমে আসছে না, গত পরশু থেকে। সে দেশে গেছে। কলকাতা শহরে বাড়ি বাড়ি বাসন মাজার কাজ করে যে টাকা জমিয়ে ছিল সেই টাকা দিয়ে জমি কিনেছে। সেই জমি নিয়ে গণ্ডগোল। মুসলিমের জমি। সব শরিককে না জানিয়ে বেঁচে দিয়েছে গ্রামের আবুচাচা। এখন অন্য শরিকটা বাগড়া দিচ্ছে। ঝামেলা মেটাতেই দেশে গেছে। ফিরবে ১০ দিন পর।
এখন প্রীতির মাথার ঠিক নেই। পূর্ণিমার সব কাজ তাকে করতে হচ্ছে। এরপর আছে রান্না পুজো দেওয়া, তারপর অফিস দৌড়ানো।
বিজন এগিয়ে এসে বলে ‘ঘরটা আমি মুছে দেব?’
প্রীতি ঠাকুরের বাসন ধুতে ধুতে বলে, ‘ঐ জল জল করে ঘর মুছবে?’
‘তাহলে বাসনগুলো মেজে দিই?’
‘তুমি বাসন মাজলে এঁটো লেগে থাকবে। দরকার নেই।’
‘না হলে আমি পুজোটা দিয়ে দিই?’
‘তুমি দেবে পুজো! কোনদিন ঠাকুরের সামনে দু’দণ্ড বসেছো?’
কথা না বাড়িয়ে বিজন সিগারেট কিনতে নিচে নেমে এল। সি ব্লকের কাছে একটি মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। বলল, ‘তুমি ভাই সাতদিন আমার ফ্ল্যাটে কাজ করে দেবে? একবেলা।’
‘ও বদলির কাজ। তা ক’জন লোক?’
‘দু’জন।’
‘পঞ্চাশ টাকা রোজ দিতে হবে।’
‘বলো কি?’
‘ত্রিশ টাকা দেবো। একবেলা তো আসবে।’
# # #
বউটার নাম জ্যোৎস্না। গায়ের রং কালো। দু’দিন এলো। কাজ করলো। ষাট টাকা নিল। আজ ৮টা বেজে গেল। এখনো এলো না। মনে হয় না আসবে।
জ্যোৎস্না আসবে বলে সব কাজ ফেলে রেখে স্নান সেরে পুজোয় বসেছে প্রীতি। এখন সে কি করবে?
বিজন বলল, ‘আমি শুকনো করে ঘর মুছে দিতে পারবো।’
মুছতে গিয়ে বিজন বুঝল, ঘর মোছাটাও একটা আর্ট। মেঝেতে জল রয়ে গেছে। প্রীতি দেখলে রাগ করবে। জোরে পাখা চালিয়ে দিল বিজন। প্রীতি পুজো সেরে ওঠার আগেই ঘর শুকনো হয়ে যাবে।
বেসিনে হাত ধুয়ে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়াল। তারপর বেডরুমে ঢুকে অবাক বিজন। মেঝের জল এখনও শুকায় নি। ভেজা মেঝেতে বেশ কিছু পালক পড়ে আছে। পালক এলো কোথা থেকে? হঠাৎ চোখ পড়ল, টেবিলের ওপর একটা চড়ুই মরে পড়ে আছে। একটু আগে ঘর মুছলো! কখন মরলো পাখিটা? ঘরের ভিতরই বা কি করে মরলো!
পড়াশুনার টেবিল। তার গায়ে আলমারি। আলমারির গা ঘেষে টেবিলের ওপর পাখিটা শুয়ে। পা দু’টো গুটিয়ে পেটের কাছে। সরু ঠোঁটে তাজা রক্তের দাগ।
বিজনের মনে নেমে এলো মেঘলা সকাল। আঙুল দিয়ে নাড়া দিলো। যদি এতটুকু প্রাণ থাকে! নিথর দেহ।
বিজন একটু গলা তুলে ডাকলো, ‘প্রীতি, প্রীতি, একবার এঘরে আসো তো।’
‘কেন কি হয়েছে?’
‘আসো না একবার। দেখ কি কাণ্ড হয়েছে।’
‘কি হয়েছে? এত ডাকাডাকি কেন?’ ঘরে ঢুকে বলল প্রীতি।
‘দেখ টেবিলের এবার একটা চড়ুই’ মরে পড়ে আছে।’
‘মরলো কি করে?’ মনে হল প্রীতির, পাখাটা ফুল স্পিডে ঘুরছে। তার ব্লেডে আঘাত পেয়ে মরেছে। ‘সঙ্গে সঙ্গে প্রীতি বিজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘পাখা ফুলে দিয়েছো কেন? এর ধাক্কা খেয়ে পাখিটা মরল। এরজন্য তুমি দায়ী।’
‘কি বললে আমি পাখিটাকে মেরেছি?’ তুমি মেরেছো?’
‘আমি?’ প্রীতি অবাক।
‘আলমারির মাথায় তিনটে লাগেজ। ওপরে পিলার থাকায় লাগেজের পাশে দেওয়াল ঘেষে একটা সরু প্যাসেজ হয়েছে। কয়েকদিন ধরে পাখিটা সেখানেই বাসা বাঁধতে চেয়েছিলো। সঙ্গে আরো একটা পাখি ছিলো। দম্পতি। তুকি কি করলে ওখানে কাপড় গুজে প্যাসেজটা বন্ধ করে দিলে।’
‘দেব না। ঘরের মধ্যে বাসা বাধবে। আমার পছন্দ নয়।’
‘তখন ওরা রুট বদল করলো। আগে ওদের বাসা ছিলো দক্ষিণের দেওয়ালের প্যাসেজ। এবার করলো পশ্চিম দিকের দেওয়ালের প্যাসেজে।’
‘ওরা যে রুট বদল করবে, তা আমি কি করে জানবো? এখন এসব কথা বলার সময় নেই আমার।’
‘না, না, তুমি একটু শোন, মানুষ যখন এক জায়গায় বাসা বাধতে পারে না, তখন অন্য জায়গায় বাসার সন্ধানে বের হয়। এই যেমন আবার বাবা পূর্ব পাকিস্তানে মুসলমানের আক্রমণে থাকতে না পেয়ে চলে এল এই বঙ্গে। কলকাতায়। পাখিরাও তেমন। মানুষ আর পাখিতে কোন তফাৎ নেই।’
‘পাখিরা যে মানুষের মতো আচরণ করে আমার জানা ছিল না।’
‘এখন পশ্চিমের দেওয়ালে বাসা করছে, পাখার তলা দিয়ে যেতে হবে। সেই যেতে গিয়েই ব্লেডে ধাক্কা খেয়ে মারা গেল পাখিটা।’
‘দেখ পাখিটার মৃত্যুর জন্য আমি বা তুমি দায়ী নই। ওর মৃত্যু ছিলো। মরে গেছে। প্রীতি চলে গেল।
কয়েক মাস আগে দু’টো চড়ুই বাসা বেঁধেছিলো বারান্দায়। বারান্দার দেওয়ালে হুকে একটা বালতি ছিল দরজার আড়ালে।
একদিন দুপুরবেলা বিজন দেখলো, ঠোঁটে একটা পোকা নিয়ে একটা চড়ুই বারান্দার দড়িতে বসে দুলছে। অন্য একটা চড়ুই একটু দূরে কেবল লাইনের তারে বসে ডাকছে। হঠাৎ খাবার নিয়ে পাখিটা বারান্দার দরজার পিছনে চলে গেল। কি ব্যাপার দরজার পিছনে কেন? ততক্ষণে দ্বিতীয় পাখিটা প্রথম পাখির জায়গায় চলে এসেছে। ঘাড় তুলে এদিক ওদিক দেখছে। যেন পাহারা দিচ্ছে।
বিজনের খাওয়া হয়ে গেছে। বেসিনে হাত ধুয়ে বারান্দার দরজাটা সরাতেই দেখলো বালতির ভিতর থেকে পাখিটা উড়ে গেল। তাহলে কি বালতিতে বাসা বেঁধেছে?
বালতিটা নামিয়ে তার ভিতর চোখ ফেলে বিজন অবাক হয়ে গেল। ছোবরা সরিয়ে কি সুন্দর একটা গর্ত করেছে। গর্তের চারধারে লোহার তার দিয়েছে। যাতে ছোবরাগুলি পড়ে না যায়। সেই গর্তে রোম ওঠা চারটে ছানা চিঁ চিঁ করছে। ওদেরই খাবার দিয়ে যাচ্ছে পাখি দু’টো। এরপর থেকে প্রতিদিন একবার করে বালতি নামিয়ে বিজন দেখে ছানাগুলো কতটা বড় হলো। ছানা থেকে পূর্ণাঙ্গ পাখি হবার আশ্চর্যময় পর্বটা তো সে কোনদিন দেখেনি।
একদিন বিকেলে প্রীতি বলেছিল ‘আচ্ছা এই বারান্দাটা জাল দিয়ে ঘেরা যায় না?’
বিজনের বুকটা ধক করে ওঠে, ‘কেন জাল দিয়ে ঘিরবে কেন?’
‘আর বলো না। পাখিতে আমার কারি গাছের সব পাতা খেয়ে ফেলছে।’
‘না, না। গাছের কোন অসুখ হয়েছে। তুমি নার্সারিতে গিয়ে ওষুধ নিয়ে এসো।
‘জল আর ওষুধ সবই আমি দিচ্ছি। চড়ুই পাখিই পাতাগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। তুমি আজই বারান্দাটা জাল দিয়ে ঘেরার চেষ্টা কর।’
‘এখন মিস্ত্রি পাবো কোথায়?’
‘তাহলে কাল করো।’
‘এত তাড়াতাড়ির কি আছে?’
‘জাল লাগাতে তুমি এত অনীহা দেখাচ্ছো কেন?
বিজন তখন সত্য কথাটা বলে ফেলল, ‘ঐ বালতিতে কয়েকটা চড়ুই ছানা আছে। জাল দিলে ওদের মা আসতে পারবে না। ওরাও না খেয়ে মরে যাবে।’
‘বালতি ওখান থেকে সরাতে হবে। ছোবরা গুলো ফেলে দিতে হবে। তাই তুমি নেট দিতে চাইছো না। আসলে পাখিগুলোকে তুমি প্রশ্রয় দিচ্ছো, এরপর বেডরুমে বাসা বাঁধবে।’
প্রীতির কথাই ঠিক হলো। ছানাগুলো বড় হয়ে উড়ে যেতেই ওখান থেকে বালতি সরিয়ে নেওয়া হলো। বারান্দা জাল দিয়ে ঘেরা হল।
ঐ দুটো চড়ুই, না অন্য চড়ুই বাসা বাঁধতে চেয়েছিলো বেডরুমে। পরিণতিতে মৃত্যু হল।
মৃত পাখিটাকে দেখছিলো বিজন। পেটে কটা ডিম ছিল কে জানে? চার পাঁচটা ছানা তো হতো নিশ্চয়। ওদের সংখ্যা একটু বাড়ত। ইদানীং তো মোবাইল টাওয়ারের দৌলতে ওদের প্রজন্ম শেষ হতে চলেছে।
‘এখনো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোক প্রকাশ করছো নাকি? যাও ওটাকে ফেলে দিয়ে এসো।’
‘সে না হয় আমি দিচ্ছি। তুমি লাগেজের কোন থেকে কাপড়গুলো সরিয়ে নিও।’
‘না।’ প্রীতি জোর গলায় বলে, ‘এবার জানালায় নেট লাগাবো।’
বিজন অসহায় গলায় বলে, ‘ওরা যাবে কোথায় প্রীতি? আমাদের দু’টো ঘর! অনেকটা জায়গা। তার এক কোণে ওরা যদি বংশ বিস্তার করে মানে বেঁচে থাকতে চায় তুমি এই টুকু স্পেস ওদের জন্য ছাড়তে পারবে না?’
‘ঐ তো পূর্ণিমাকে নিয়ে কয়েকদিন ছুটলে, দিল কেউ জায়গা?’
কথাটি মিথ্যে বলেনি প্রীতি। পূর্ণিমাদের ঝুপড়িতে ২০-২৫টা পরিবার থাকে। বিজন কয়েকদিন ওদের কয়েকজনকে নিয়ে স্থানীয় নেতা, কাউনসিলারের কাছে ছুটে গেছে। সবার এক কথা, যার জায়গা সে তো তার জায়গা দখল নেবেই। তোমরা খুঁজে দেখ এমন ফাঁকা জায়গা কোথাও আছে নাকি? অনেক খুঁজেছে তারা, খাল ধার, সুভাষ মেলার মাঠ, ধোবার মাঠ, পুরনো ফাঁড়ির পিছনের জায়গা, রেল লাইনের ধার, কোথাও এতটুকু জায়গা তারা পায়নি। তখন বিজনের বাবার কথা মনে পড়ছিল, পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসে প্রথমে নবদ্বীপ তারপর শোভাবাজার, তারপর উল্টোডাঙায় বাসস্থান করে। সে এক যাযাবর মানুষের মতো জায়গা বদল করা। বিজন বলতে যাচ্ছিল আমাদের যদি সন্তান থাকতো। ‘শোন প্রীতি’।
‘প্রীতির শোনার সময় নেই। ‘প্রীতি জুতোয় পা গলিয়ে সিঁড়িতে শব্দ তুলে বেরিয়ে গেল।
# # #
কলিং বেল টিপতেই দরজা খুলে দিলো প্রীতি। রাতে জুতো বাইরে থাকলে চুরি হয়ে যায়। তাই জুতো জোড়া হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে চমকে উঠলো বিজন। বারান্দায় আলো জ্বলচ্ছে। বস্তির পালান একটা বড় কাতার দিয়ে জালটা অর্ধেক কেটে ফেলেছে। তাকে দেখে পালন বলে, ‘দেখো বউদির কাণ্ড। এত রাতে জাল কাটবে। বললাম, কাল সকালে কেটে দেবো, তা শুনলো না।’
পালানের গলা দিয়ে মদের গন্ধ আসছে। সন্ধ্যা হলে পালান বাংলা মদ খায়। প্রীতি কি মদের গন্ধ টের পায়নি? তবু পালানকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে!’ আশ্চর্য। আরো আশ্চর্য হলো বিজন। বারান্দার দরজা সরিয়ে সেখানে জুতো রাখতে গিয়ে দেখল, সেখানে একটা নতুন বালতি ঝুলছে। আর তার ভিতর ছোবা রাখা হয়েছে।
প্রীতি কিচেনে রাতের রুটি করছে। বিজন সেখানে গিয়ে আলতো করে প্রীতির ঘাড়ে একটা চুমু দিলো।
প্রীতি বলল, ‘কি হচ্ছেটা কি?’
‘আমিও তো সেটাই জানতে চাইছি।’
‘জানো আজ অফিসে গিয়ে না খুব বাবার কথা মনে পড়ছিলো। ওপার থেকে বাবা যখন এখানে আসে, আমাদের কিছু আত্মীয়স্বজন ছিলো, তারা কেউ আশ্রয় দেয়নি। নানা জায়গায় ঘর ভাড়া নিয়ে থেকেছে। শেষে আজাদ-হিন্দ-কলোনীতে জায়গা দখল করছে। টিনের চাল দিয়ে ঘর বানালো। সেই নোংরা কলোনীর ছোট্ট ঘরে আমরা ভাইবোনেরা বড় হয়েছি। বাবাকে বললাত, বাবা একটা ভাল জায়গা দেখে চলে যাই না আমরা। বাবা বলতো, ‘আর উদ্বাস্তু হতে বলিস না মা, উদ্বাস্তুদের অনেক জ্বালা।’ প্রীতির চোখ দুটো ঝাঁপসা হয়ে আসছে।
‘প্রীতি আমিও সেই কথাই বলতে চাইছি। এই যে ফ্ল্যাট বাড়িটায় আমরা থাকছি, এখানে আগে গাছপালা ছিল, পুকুর ছিলো। পাখিরা এখানে আশ্রয় পেত। আজ ওদের উদ্বাস্তু করে আমরা থাকছি। তাহলে ওরা যাবে কোথায় বলো?’
# # #
একটু রাত হলো শুতে।
প্রীতি বলল, ‘আজ কাগজে একটা খবর পড়ে মনটা খুব খুব খারাপ হয়ে গেল।’
‘কি খবর?’
‘পোল্যান্ড থেকে দশ লক্ষ লোক উদ্বাস্তু হয়ে জার্মানিতে ঢুকে পড়েছে। জার্মানি বলছে ওদের আশ্রয় দেবে না। ওরা কোথায় যাবে বিজন।’
বিজন কোন জবাব দিতে পারে না।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!