ছোটগল্পে দীপিকা দাস সিকদার

আইনে স্নাতক ও স‍্যোসাল ওয়ার্কে স্নাতকোত্তর ও কাউন্সেলিং ডিপ্লোমা | হিসাবে হিসাবে কর্মরতা একটি ফস্টার কেয়ার হোমে | দাঁড়ানো মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নিজের নিজের প্রতিষ্টান "কাঁচরাপাড়া এডুকেশনাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির" বর্তমানে এই সোসাইটির মহিলাদের স্বনির্ভরতা ও সমাজ সেবামূলক কাজ করছে | ছোটো থেকে আবৃত্তির জগতে, সময় পেলে কিছু লেখা লিখি করি, বর্তমান ঠিকানা- গ্রাম-শ‍্যামাপ্রসাদ পল্লী, পোষ্ট অফিস -পলাশী, জেলা-উত্তর 24 পরগনা |

শিকড়ের টানে

‘শিকড় ছাড়া যেমন গাছ বাঁচে না, তেমন শিকড় না চিনলে বাঁচে না মানুষের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় |’ এই কথাটা বাবার কাছে বহুবার শুনেছে সোমা,আর এই কথাটা বলার পর সোমার বাবা যেন চুপ হয়ে যেত | বুঝতে পারত সোমা বাবার ভিতরে এক চাপা কষ্ট কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে অনেকবছর ধরে| এখনো সোমার মনে পড়ে ,ছোট বেলায় যখন ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটা পড়ত, তখন সে দেখতো বাবার চোখে জল | বাবাকে জিজ্ঞেস করলেই বলত ও তুই বুঝবি না শিকড়ের টান কাকে বলে, সত‍্যি হয়তো সেদিন কিছু বোঝে নি সোমা,কিন্তু আজ বোঝে সত্যি হয়তো সব কিছু ভোলার নয়,ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না অনেক কিছু| দেখতে দেখতে অনেক বছর কেটে গেল, সোমার বাবা তার চাপা কষ্টটা বুকের গভীরে হয়তো সযত্নে রেখে দিয়েছিল সোমার বড় হওয়ার অপেক্ষায় | আজ সোমা কলেজ উত্তীর্ণা এক যুবতী | কর্মজগতে প্রবেশ করার অপেক্ষায় দিন গুনছে|| কিন্তু শৈশবের সেই প্রশ্ন এখন ও উঁকি মারছে তার মনের ঘরে | সেদিন টিভিতে একটি নাটক হচ্ছিল সেখানে বাংলাদেশের কিছু ঘটনা দেখানো হয়েছিল, সেদিন সোমা তার বাবাকে দেখলো অঝোরে কাঁদতে,বাবাকে জিজ্ঞেস করতেই বলল,আজ বড্ড মনে পড়ছে করিম মিঞা,স্বপন,দিলীপ টার কথা,সোমা বললো এরা কারা বাবা? তার বাবা বললো আমার খেলার সাথী| তার বাবা আরও বলল আজও সে চোখ বুঝলে দেখে দেশের বাড়ি,পুকুর ঘাট| এরপর তার জন্মস্থানের কথা বলতে শুরু করে,বাবার মুখে সোমা শুনলো,ওদেশে ওদের নিজেদের বাড়ি,পুকুরঘাট,মন্দির সব আছে | আমাদের কাছে গল্প করেছে সোমা| আমরা তখন বললাম কাকু কাকিমাকে নিয়ে ঘুরে আয় একবার | নিজের আত্মপরিচয়কে একবার দেখে আয় স্বচক্ষে | আমাদের কথা শুনে দেরী না করে পাসপোর্ট করে নিজের বাবা মাকে নিয়ে এগিয়ে গেল শিঁকড়ের টানে| আমি কাছ থেকে দেখেছি সোমাকে অফুরন্ত মনোবল তার,না হলে একা বাবা মাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়তে পারে এইভাবে | একটা কথা বলতো সবসময় আমাদের কাছে,বাবাকে ও যেভাবে হোক বাবার জন্মস্থানে নিয়ে যাবে| সত‍্যি সে তার কথা রেখেছে, বাবাকে সে দাঁড় করাতে পেরেছে বাবার নতুন প্রজন্মের সামনে | ছুঁতে পেরেছে সে পূর্ব পুরুষের জন্মভিটে | খোঁজ পেয়েছে সেই নদীর,যে নদী সোমার বাবার বুকে বয়ে চলছিল এতদিন নিঃশব্দে নিরন্তর ভাবে | পূর্ব পুরুষের বেড়ে ওঠা ভূস্বর্গ ও তার মানুষজনেরা কেমন ও বাবার স্মৃতিকে ফিরিয়ে দেওেয়ার জন‍্য সূদুর কলকাতা থেকে ছুটে গেছে সে বরিশালে | মুগ্ধ হয়ে ঘুরে দেখেছে পিতা ও পূর্ব পুরুষদের স্মৃতি ধন‍্য জায়গাগুলি, জীবনের একটা সময় তাদের সাথে কাটাবার,মুগ্ধ হয়ে শুনেছে সবার কথা,তাদের ভালোবাসা ও অন্তরের টান দেখে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে | তাই তো কলকাতায় এখনো একটা কথা বাজে তার কানে সবসময় ‘আবার এসো কিন্তু তোমার পিতৃভূমিতে,শিকড়ের টানে’।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।