জয়ী আজ একটু বেশি সকাল সকাল উঠে গ্যাসে কেটলিটা চাপালো, আঁচলে নতুন চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে। বেশ ছিমছাম দেখতে হালকা আধুনিক চশমা। বাবাকে দেখতো গম্ভীর মুখে চশমার কাঁচ মুছে চোখে লাগাতে। গম্ভীর মুখখানা বাবার আরো গোমড়া লাগতো। বড় বড় মোটা কাঁচের আচ্ছাদন দৃষ্টির উপর। সৌমেন অনেকদিন ধরেই বলছিলো, “মাথা ধরছে যখন একবার চোখটা দেখিয়ে নিলেই তো হয়। ম্যাডাম! চালশে পড়ার টাইম তো এসে গেছে ।” চল্লিশে চোখের দৃষ্টি যদিবা ঝাপসা হয় , মনের দৃষ্টি কি আরো স্বচ্ছ-স্পষ্ট হয়ে যায়….. কি আবোল তাবোল কথা ভাবছে জয়ী। জল গরম হয়ে ফুটে জয়ীর চালশে দৃষ্টির ফ্রেম ঝাপসা করে দিলো। চশমাটা খুলে একবার ঝাপসা কাঁচ শাড়ির আঁচলে মুছে নিলো সে।
মনের জানালা দরজার গায়ে জটিলতার ছিটকিনিগুলো সব খুলে দিয়ে জীবনের প্রতিটি ঋতু বদল কে সাদরে সে আমন্ত্রণ করেছে। চাওয়া-পাওয়ার ওজন মাপার যন্ত্রে কারচুপি করেনি কখনোই । সেই সাদা সাদা পেঁজা তুলো মেঘের আড়ালে কোনো এক অপলক দৃষ্টি ,যেন আছে তার উপর। তাঁর দৃষ্টি কোনো আচ্ছাদনে বাঁধা নয়। বিধাতার কাছে ফাঁকি দিতে পারেনা কেউই।
কাল সারা রাত বাচ্চাগুলোর কথা ভেবে বারবার জয়ীর চোখ জলে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো , কিন্তু একমাত্র ওর মনের দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ। তাই সে ‘বোকা ‘, ’emotional’ । কাল ভিড়ের মধ্যে এই কথা গুলো বারবার তার কানে আসছিলো। পিঠে হাত রেখে কেউ কেউ বললো,’ এই সব ব্যাপারে বেশি জড়িয়ে পড়োনা , বাঙালি হয়ে ওই সব অবাঙালিদের সাথে গেলে বিপদে পড়বে। সত্যি টা না জেনে কি দরকার বাবা ! নিজের লোকদের সাথে থাকাই ভালো’
কেউ আবার বললো ‘ আরে বাবা কাল তুমি ঝামেলায় ফাঁসলে ওরা কিন্তু আসবেনা ,এরা সঠিক কি বেঠিক হোক দলবদ্ধ থাকে , এই বাঙালিদের মধ্যে এই জিনিসটার বড্ড অভাব। তুমি কেন বাঙালি হয়ে দল বদল করবে ?’… কিন্তু এতো সাবধান বাণী , পরামর্শ , সব কেমন কানের পাশে ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে যাচ্ছিলো। চোখের সামনে ওই অবাঙালি ছাপ লাগানো বাচ্চাগুলোর চোখ যেন একটা উত্তর খুঁজছিলো। ওদের মুখের আদলটা টুটুল আর পুপুর সাথে কাল রাতে স্বপ্নে বারবার মিলেমিশে যাচ্ছিলো। নাহ ! স্বপ্নে নয় , কাল সারারাত তার চালশে দৃষ্টি সিলিং এর দিকে চেয়ে প্রহর গুনেছে।চোখের কোণে জল বেয়ে পড়েছে।
জয়ী ভুল ঠিক জানেনা ….জানতে চায়না। ন্যায় -অন্যায় জানেনা। জানে শুধু কাল রাতে ওই পরিবার টি ড্রয়িংরুমে আলো জ্বেলে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছে। মিসেস সিনহার গুমড়ানো কান্না জয়ীর বন্ধ দরজার আড়াল থেকেও তার মনের দরজায় বারবার কড়া নেড়েছে। দুপুর থেকে ওদের রান্নাঘরে গ্যাস জ্বলেনি। বাচ্চাগুলো কি খেয়েছে কে জানে ? টুটুল পুপু র খাওয়া নিয়ে জয়ী সদা চিন্তিত থাকে। সিনহার বাচ্চাগুলো তাদের বাবার খুব আদুরে। বাচ্চাগুলো বাবার অপেক্ষায় হয়তো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। মিস্টার সিনহা কাল বাড়ি ফেরেননি ওই মতাদর্শের কাজিয়ার পর। নিজের বাড়িতে ফোন করেছিলেন কি নিজের পরিবারকে জানাতে নিজের খবর , দ্বিধা করছিলো জয়ী সেটা জানতে । কাল সে তো ওদের পাশে দাঁড়াতে পারেনি।আজ সেই দ্বিধা বোধ আরো প্রকট হয়ে উঠেছে।
কেউ কিছু শুনতে পায়না, দেখতে পায়না , তবে জয়ী কেন তার বোধশক্তির গলা টিপে মারতে পারেনা? তার চালশে চোখ তার ফ্ল্যাটের বন্ধ দরজা ভেদ করে সিনহা পরিবারের ঘরের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় এক অদৃশ্য অস্তিত্বের মতো। একদিনের ঘটনা একটা মিষ্টি সম্পর্কে তিক্ত বিষ ছড়িয়ে দিলো। সঠিক বেঠিক , সত্য অসত্যের বিচার করে যে বোধ, তাতে চালশে দৃষ্টি পড়েছে।
বারান্দায় ভোরের আলো এসে পড়েছে। ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়ায় চায়ের কাপ হাতে জয়ী এসে দাঁড়ালো। সিনহার ছোট ছেলেটি জয়ীর খুব আদরের , সে উস্কোখুস্কো চুলে একটা পাউরুটির প্যাকেট কিনে কমপ্লেক্স এর মেন গেট্ দিয়ে ঢুকছে। জয়ীর বারান্দার টুংটাং চাইমের আওয়াজে সে মিষ্টি হেসে একবার জয়ীর বারান্দার দিকে তাকাতো। আজ আবার হাওয়ায় সেটা বেজে উঠলো , কিন্তু … কিন্তু সে তাকালোনা। চশমার আচ্ছাদনে ঢাকা জয়ীর দৃষ্টি এবার সত্যি ঝাপসা হয়ে এলো। আর সকলের মতো তার ও আজ চালশে হয়েছে।