শহরের ব্যস্ততার মাঝে এই একটুকরো সবুজ ঘেরা জায়গা।হয়তো জনজীবনের যান্ত্রিক প্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি বলেই, এখনো বেঁচে আছে। এখানে আসলে বিশ্বনাথ এর মনে হয় , শহরের মাঝে থেকেও যান্ত্রিক cacophony অনেকটাই যেন এখানে কম। একটা ছোট্ট গেট দাঁড়িয়ে আছে জীর্ণ মরচে ধরা শরীরে এই সবুজ কে বাঁচিয়ে কঠোর প্রহরীর মতো। তালা চাবির বালাই নেই। এই একটুকরো সবুজ, ধাতব জীবন কে কিছু দেয়না, যা দেয় তা হলো এক বুক নিঃস্বাস। বিশ্বনাথ সেনের retired জীবনের সূর্যাস্তে এই প্রতিদিনের একান্ত সবুজ বিকেল তাকে যেন বলে , সূর্যাস্থের পরম লগ্ন ভারী মোহময়।
আগে বিশ্বনাথ প্রাতঃভ্রমণে আসতেন। কিন্তু সাত বুড়োর একটি টিম একদিন ধরলো তাকে, ” মশাই আপনাকে প্রায়ই দেখি এখানে একা আসেন। আমাদের গ্রুপ এ চলে আসুন , একটু সুখ দুঃখের গল্প আর আড্ডা হবে। আর আমাদের জীবনে কি বা আছে বলুন , শুধু দিন পার করে দিন গোনা ছাড়া ” ।বিশ্বনাথ দ্বিধা নিয়েই দুদিন সাথে থাকলেন , কিন্তু দুদিনেই হাঁপিয়ে উঠলেন। পেনশনের জন্য সরকার কি নতুন পদক্ষেপ নেবে, কোন ব্যাঙ্ক ইন্টারেস্ট রেট কত দিচ্ছে, ওষুধের দামে রিবেট কত হলো , বৌমা আজকাল দেরি করে বাড়ি ফিরছে , নাতি নাতনিদের উজ্জ্বল ভবিষৎ ,আজকালকার ছেলেমেয়েদের আচার ব্যবহার নিয়ে ঘোর কলিযুগের দোহাই আর সবথেকে উত্তম বিষয় হলো ‘ আমাদের কাল আর এখন নেই , আগের সময়ের ব্যাপারই আলাদা ‘ ইত্যাদি নানা বিষয়তে বিশ্বনাথ কোনোরকম উৎসাহ তো দেখাতে পারেইনি বরং ভেবেছে এদের হাত থেকে নিষ্কৃতির উপায় কি ? সাত পাঁচ ভেবে ঠিক করলো , বৈকাল ভ্রমণ অনেক বেশি অভিপ্রেত তার কাছে। তাই আজকাল ছোট্ট একটা জলের বোতল আর মাথায় একটা সাদানিলচে ক্যাপ টুপি পরে , আকাশি রঙের টিশার্ট আর জিন্স এ এই একটুকরো সবুজে বিশ্বনাথ সূর্যাস্ত কে চোখ ভরে দেখে। হালকা পায়ে একটু হাঁটা তারপর এই সবুজ রংচটা বেঞ্চিতে একটু জিরিয়ে নেওয়া, বেশ কেটে যায়। তবু এই একাকী জীবনে মনের মধ্যে আনমনা কথা কাউকে শোনাতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বুদবুদি কেটে কথার ফেনা থিতিয়ে পড়ে।
আজ একটু বেশি হাঁটা হয়েছে তাই , হৃদকম্পন অ্যালার্ম দিচ্ছে , তাই একটু বেশি সময় বিশ্বনাথ বেঞ্চে বসে থাকলেন। একটু আনমনা ছিলেন , হয়তো মনে কথা বুদবুদি কাটছে। একজন ভদ্র মহিলা পাশে এসে বললেন , ‘ দাদা একটু জল পাওয়া যাবে ?’ একটু হকচকিয়ে গিয়ে তাকালেন বিশ্বনাথ। আলগোছে খোঁপা করা পরনে ধূসর সবজে রঙের শাড়ী , খুব ঘামছেন। তাড়াতাড়ি বোতলটা এগিয়ে দিলো বিশ্বনাথ। ভদ্রমহিলা বসে আধ বোতল জল ঢগঢগ করে খেলেন। তারপর একটা স্বস্থি -তৃপ্তি মাখা চোখে ‘ধন্যবাদ ‘ বললেন। বিশ্বনাথ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ দিদি আপনি ঠিক আছেন তো ?’ উল্টো দিক থেকে হাত জোর করে নমস্কার জানিয়ে উনি বললেন ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ‘ ,আসলে জলের বোতলটা আজ না নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। হাঁটার অভ্যেস নেই , নতুন শুরু করেছি তো তাই আর কি …’ ‘ আপনি কি রোজ হাঁটেন ? বিশ্বনাথ বললো, ‘ওই আর কি …. প্রথম প্রথম কতকটা বিরক্তি কাটাতে ঘরের চার দেয়াল ছেড়ে আসা ,তারপর এই একটুকরো সবুজ বেশ ভালোই লাগে, তাই রোজ এই বিকেলে একটু আসি। ‘ অপরদিকে উনিও বললেন ,’ ঠিক বলেছেন ছেলে অফিস বেরিয়ে যায় তারপর সারাদিন কোনো কাজ নেই , খুব বোকা বোকা লাগে নিজেকে জানেন। বিকেলে টিভি দেখতেও ভালো লাগেনা তাই একরকম ছেলের কথা তেই শুরু করলাম কিন্তু এখন নিজেরই ভালো লাগে।’ আজ সূর্যাস্ত যেন একটু বেশি দেরিতে হলো, দুই প্রাক্তন এর আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে।
আরেকটা নরম রোদ পরে আসা বিকেল,দুজন দুদিক থেকে হেঁটে আসছেন , কোনো কথা নয় ,শুধু সৌজন্যমূলক ঘাড় নাড়িয়ে হাসি। তারপর কেটে চললো আরো অনেক গুলি পড়ন্ত বিকেল। মাঝে মাঝে সবুজ রংচটা বেঞ্চে বসে কথা হয় দুজনের। কলিযুগের ফ্রেমে তারাও যে আটকে আছে , তাই অনেক বয়সীরা তাদের দিকে মিচকি হেসে তাকায় । যদিও বিশ্বনাথ সেন এবং তপতী সান্যাল এর কাছে শহরের cacophony র মতো ওই সব মস্করা মাখানো হাসি গুঞ্জন পৌছোয়না। দুজনেরই অভিযানের গল্প পড়তে ভাল লাগে , বিদেশী নানান নতুন রান্নার রেসিপি টিভি তে দেখতে ভালো লাগে, পরশুরাম দুজনের পছন্দের লেখক। নানা গল্পে সূর্যাস্তের সময় পার হয়ে যায়। বিশ্বনাথের মনে কথা বুদবুদ কাটেনা , এই পরম সখ্যতা তার অতি প্রিয়। মিস্টার সেন এবং মিসেস সান্যাল এর মিতালি কোনো সম্পর্কের ফ্রেমে বাঁধা নয়। প্রত্যাশা হীন এক সম্পর্ক।
গতকাল রাতে সেন মশাই কে ছেলে রাতে ডিনার টেবিলে বলেই ফেললো , ‘ বাবা !শিল্পী কাল কলেজ থেকে ফিরছিলো , ওর বন্ধুরা ওকে বলেছে কি তুমি জানো ? বলেছে ,’ তোর বাবা পার্কে বসে প্রেম করে তুই জানিস সেটা ? ‘ শিল্পী মুখ ফুটে তো তোমায় বলবেনা , লজ্জায় মেয়েটা ওর বৌদি কে সব বলেছে। আমিও সোমার কাছ থেকে শুনলাম।’ বিশ্বনাথ রুটি তা আধ ছেঁড়া রেখেই থমকে গেলেন । গলার কাছে এক খন্ড রুটি যেন তার শ্বাস রোধ করেছে। কিছু বলতে পারলেন না। শুধু বললেন , শিল্পীর লজ্জা হয়েছে ?’ ওদিকে , কানাঘুষো মোবাইলে, whatsapp জোকস হয়ে কোনো কোনো জুম্ ক্যামেরায় বন্দী হয়ে ফেস বুক পেজে ‘মুচমুচে প্রাক্তন প্রেম ‘হেডিং পেলো।
মিতালি এখন ভার্চুয়াল দুনিয়ায় অন্যরকম। সেখানে একটি কমেন্ট বক্স থাকে যা আমাদের জীবনের সব মূল্যবোধের মূল্যায়ন করে। ‘রূপোলি চুলে রুপোলি প্রেম ‘ ‘ সূর্যাস্তে প্রেমের সূর্যোদয় ‘ এমন নানান নাম। আমরা সবাই যে কবি , সাহিত্য আমাদের রন্ধ্রে। রোজ চাই খবরে থাকতে প্রথম পাতায়।
তাই রসদের ক্ষয়িষ্ণু ভান্ডার এর যোগান সরবরাহ তো চাই। তাই ১৪ ই ফেব্রুয়ারী প্রেমদিবসে , দুজন প্রাক্তনের সহজ মিতালি হয়ে উঠলো রসময়ের আখ্যান।
বিশ্বনাথ সেদিন বিকেলে নিয়মে হেঁটে এসে বসলেন সবুজ রঙ চটা বেঞ্চে। তপতী আসেননি । আজ তিন দিন দেখা নেই। দুদিন ধরে একটা পর্তুগীজ রান্নার রেসিপি পকেটে নিয়ে ঘুরছেন।টিভি তে দেখিয়েছিলো , বিশ্বনাথ টুকে রেখেছেন। মিসেস সান্যালের ছেলে নাকি একটা berbeque ওভেন কিনেছে। তাই রেসিপি টা দেখে মনে হয়েছিল ওনাকে দেবেন। কিন্তু কি হলো? শরীর ঠিক আছে তো। এই সব ভেবে ঠিক করলেন একবার ওনার বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখি।
বিশ্বনাথ আর বেশিক্ষন না বসে তপতির বাড়িরই দিকে হাঁটা লাগালেন। দরজায় কলিং বেল দু তিন বার বেজে উঠলো , কোনো সাড়া নেই। আর বেল বাজানো টা অভদ্রতা ভেবে পিছন ফিরলেন। ঠিক তখনি দরজা খোলার আওয়াজ। মিসেস সান্যাল কেমন সঙ্কোচ ভীরু দৃষ্টিতে বিশ্বনাথের দিকে চাইলেন। ‘ আ–আপনি …’ ? বিশ্বনাথ বললেন, ‘ কি ব্যাপার বলুনতো শরীর ঠিক তো? আসছেন না যে আজকাল বিকেলে হাঁটতে , তাই ভাবলাম। .. কথা শেষ করতে না দিয়েই তপতী বললেন, নাহ ! আর বিকেল বেরোনো হবে না আমার সেন দা …ঘরের ছাদে সকালে পায়চারি করি। ‘ কেন ‘ প্রশ্ন টা করতে গিয়ে বিশ্বনাথ তপতীর মুখে চেয়ে হয়তো কেন র উত্তর টা পেয়ে গেলেন। শুধু বুক পকেটে একবার হাত রাখলেন , রেসিপির চিরকুট টা বের করতে কিন্তু.. কিন্তু থেমে গেলেন।
পাশের বাড়ির ছাদে কিছু সন্দেহ মাখা চাহনি। থাক… আজ যান্ত্রিক জীবনের cacophony র অট্টহাস্য যেন সখ্যতার সুর কেটে দিয়েছে। ভ্যালেনটাইন ডে, ফ্রেন্ডশিপ ডে আরো আছে কত বিশেষ দিন। দেয়া -নেয়া প্রত্যাশার দিন। সহজ মিতালী সেখানে ধাতব জীবনের একটি নাম চায়। সূর্যাস্ত আজ খুব তাড়াতাড়ি নেমে এলো। বিশ্বনাথ ,বললো ‘ ও আচ্ছা , তাহলে চলি মিসেস সান্যাল।’ গেট টা খুলে বেরিয়ে গেলেন। তপতীর চশমার কাঁচ ভ্যাপসা হয়ে গেলো। শীতের সন্ধ্যেতে তার চোখে কুয়াশা নামলো কি ??