সত্যজিৎ রায় কে আমরা প্রোফেসর শঙ্কু, গোয়েন্দা ফেলুদা এবং তারিণী খুড়োর স্রষ্টা হিসেবেই চিনি। এদের মধ্যে আমার ব্যক্তিগত ভাবে অত্যন্ত পছন্দের চরিত্র তারিণী খুড়ো, তার কথা বলার ভঙ্গিমা, গল্পের স্টক আমাকে বারবার মুগ্ধ করেছে। তবে সত্যজিৎ রায় যেখানে থাকবে সেখানে ফেলুদা থাকবে না তা কি করে হয়! অগ্যতা এই দুটো চরিত্রকে আপনাদের সামনে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম মাত্র। ফেলুদাকে বিশেষ কিছু বলার সাহস আমার নেই তবে তারিণী খুড়োকে নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়।
ভারতবর্ষের তেত্রিশটি শহরে ছাপান্ন রকমের কাজ করেছেন তারিণীখুড়ো, ফলে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঠাসা এমনই অফুরন্ত তাঁর গল্পের স্টক যে, দু-ভলিউম আরব্য উপন্যাস লেখা চলে। আর্টের খাতিরে একটু যা রং চড়ানো, এছাড়া সবই নাকি সত্যি। কলকাতার বেনেটোল লেনের আড্ডায় বসে দুধ-চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক দিয়ে সেইসব গল্পই শোনান তারিণীখুড়ো। এসব আমরা অনেকেই জানি, বলতে গেলে সবারই পড়া তার এই অভিজ্ঞতার কথা। তার অধিকাংশ গল্পে আছে অলৌকিকত্বের বিস্ময় শিহরণ।
কাহিনীর সূত্রপাত
প্রখর রুদ্রের এক জম্পেশ প্লট খুঁজতে এবার লখনৌ এলেন লালমোহন বাবু, যদিও কিসের কেমন প্লট পাবে তা মাথায় ঢুকলো না ফেলুদা আর তপসের। তবে এটাই আসল কারণ নয়, অনেকদিন ধরেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে ডাক্তার লালমোহন বাবুকে আবহাওয়া পরিবর্তন করতে বলেছেন; তাই ঠিক হলো লখনৌ যাওয়া হবে।
ফেলুদারও অনেকদিন কেস টেস নেই, তাই ভাবলো ঘুরেই আসা যাক। তপসে কে বলতে রাজি হয়ে গেল, সবাই মিলে চললো লখনৌ।
“বুঝলেন ভায়া, এই কন্যান ডয়েলের জবাব নেই। আমি একটা প্লট খুঁজতেই হিমশিম খেয়ে যাই আর উনি যে কতকত গল্প লিখেছেন তার হিসেব নেই। তবে যাই বলুন হোমসের মত গোয়েন্দা পৃথিবী খুঁজলেও পাওয়া যাবে না” বললেন লালমোহন বাবু।
“তা আপনার মাথায়ও তো বুদ্ধি কম না, আপনিও লিখে2 ফেলুন গোটা কয়েক এমন” মুচকি হাসতে হাসতে বললো ফেলুদা।
“তা যা বলেছেন, কিন্তু বুঝলেন আমার কি মনে হয়! গোয়েন্দা গল্প লেখা বোধ করি পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ।”
কালই লখনৌ এসে পৌঁছেছে ফেলুদারা, আজ একটু এদিক সেদিক ঘুরতে বেরিয়েছে। বলা ভালো লালমোহন বাবু কিছু কেনাকাটা করতে লখনৌ এর মেজর শপিং এরিয়া হজরতগঞ্জ নিয়ে এসেছে, এখানে কী সব কিনবেন তিনি।
তপসে আর লালমোহন একটা দোকানে ঢুকলেন কেনাকাটা করতে বাইরে ঘোরাঘুরি করছিল ফেলুদা।
হঠাৎ একটা বৃদ্ধ ব্যক্তির কে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। লোকটি একটু ইতস্তত করছেন যেন, বারবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা চিরকুট বার করে কিছু একটা পড়ছেন আবার ঢুকিয়ে রাখছেন।
“কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে, কাছে গিয়েই দেখা যাক।”
ফেলুদাকে এগিয়ে যেতে দেখে ওই লোকটিও এগিয়ে এলেন।
– আরে ফেলু মিত্তির যে? এখানে কী মনে করে?
– তারিণী খুড়ো না? তা এই বয়সে আবার কোনো অভিজ্ঞতা সংগ্রহে এলেন নাকি? লালমোহন বাবু অনেক দিন ধরেই বলছিলেন আবহাওয়া পরিবর্তন করতে লখনৌ আসবে তাই আর কি! ওঁর সঙ্গে আমি আর তপসেও চলে এলুম। আপনার কথা বলুন!
– বলবো সব বলবো! একমাত্র তুমি পারবে আমাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে। যাক বাবা তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলুম বাপু।
– কি হয়েছে মশাই বলুন তো খুলে। তখন থেকে দেখছি কোনো বিষয়ে একটু চিন্তিত আছেন।
দূর থেকে লালমোহন বাবু আর তপসে ফেলুদা আর তারিণীখুড়োকে একসঙ্গে দেখে হন্তদন্ত করে ছুটে এলেন।
– কি মশাই কেনাকাটি হয়ে গেল? দেখুন দেখুন কার সাক্ষাৎ পেয়েছি। বললো ফেলুদা।
– আরে রাখুন মশাই কেনাকাটা, যা গলাকাটা দাম, মাগো!
ওঁকে চেনাচেনা লাগছে! আরে তারিণী খুড়ো যে!
– কেমন আছো ভায়া? আমি ওই চলে এলুম ঘুরতে ঘুরতে, তোমাদের সঙ্গে দেখা অপ্রত্যাশিত। তবে হয়ে একদিক থেকে ভালোই হলো বুঝলে! বললেন তারিণী খুড়ো
– আমি ভালো আছি মশাই, স্বয়ং তারিণী খুড়োর সাক্ষাৎ পেয়েছি, ধন্য মশাই আমি ধন্য।
জটায়ুর কথা শুনে ম্লান মুখেও হাসি ফুটে উঠলো তারিণী খুড়োর।
– কিহে তপসে ভাই তুমি কেমন আছো?
– “এই চলে যাচ্ছে” হাসতে হাসতে জবাব দিলো তপসে।
– ভায়া ফেলু আজ সন্ধ্যেয় তাহলে তোমার সাক্ষাৎ পাচ্ছি?
– তা পাচ্ছেন বৈকি, চলে আসুন না…
পুরো কথা বলতে না দিয়ে এক বিস্ময় নিয়ে তারিণী খুড়ো বললেন।
– না না সন্ধ্যের পর কোথাও না কোথাও না, আমি উঠেছি লাটুশ রোডের এক বাংলোয়। তুমি যদি কষ্ট করে একটু আসতে…
– আরে এ কি বলছেন, নিশ্চয়ই যাব। তবে দেখা হচ্ছে সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময়।
বাংলোর ঠিকানা দিয়ে প্রস্থান করলেন তারিণী খুড়ো।
বেশ হন্তদন্ত হয়েই ফিরে গেলেন, ফেলুদারাও অবশ্য লাটুশ রোডের কাছাকাছি উঠেছে। হজরতগঞ্জ থেকে লাটুশ রোডের দূরত্ব তা মিনিট পনেরো হবে।
– “কি বুঝলেন ফেলু মিত্তির? কোনো রহস্যের গন্ধ টন্ধ পেলেন নাকি”? জিজ্ঞাসা করলেন লালমোহন বাবু।
– “তা মশাই কিছুটা তো পাচ্ছি, দেখা যাক কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়”।
– “তারিণী খুড়ো কে দেখে আমার বেশ চিন্তিত মনে হলো” বললো তপসে।
– “চিরকুটে কোনো এক লেখা ওঁর চিন্তার কারণ আমার যতদূর মনে হলো” বললো ফেলুদা।
তপসে আর লালমোহন বাবু একে অপরের মুখচাওয়াচায়ি করলেন একবার।
ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার সময় ফেলুদা, তপসে আর লালমোহন বাবু পৌঁছালেন তারিণী খুড়োর বাংলোয়।
তারিণী খুড়ো বোধকরি ঘরে পাইচারী করছিলেন, ওদের দেখেই ছুটে এলেন।
– আরে এসে গেছো তোমরা! আমি তখন থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। তা আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
– না কোনো অসুবিধা হয়নি, আমাদের হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেকেরই তো রাস্তা। বললো ফেলুদা।
– নিন বসুন এবার। হরিপাল সবকে লিয়ে চায়ে পাকোড়া লে আও। ভৃত্য কে চা জলখাবারের হুকুম করলেন তারিণী খুড়ো।
“হরিপাল আমার দেখা শোনা করছে এখানে, ভেবেছিলুম একাই করে নেব, কিন্তু পারলুম না। কেমন যেন সব খাপছাড়া হতে লাগলো সব। তারপর হরিপাল নিজে এসে কাজ চাইলো, ব্যস নিয়ে নিলুম”, বললেন তারিণী খুড়ো।
– তা আপনি কদ্দিন এসেছেন এখানে? জিজ্ঞাসা করলেন লালমোহন বাবু।
– তা এই দিন দশেক হবে।
– আর আপনার ভৃত্য টি কতদিন থেকে আছে? জিজ্ঞাসা করলো ফেলুদা।
– তা আমার আসার দিন চারেক পরে এলো, তা ধরুন ছ’দিন মত হলো।
এরমধ্যে হরিপাল চা আর পিঁয়াজি নিয়ে এলো।
– তা হরিপাল এইটুকু সময়ে তুমহারা পেঁয়াজি আউর চা কাইসে হুয়া? বললেন লালমোহন বাবু
– নেহি বাবু ও তো সাবজিনে মুঝে বোলকে রাখাথা ইসলিয়ে জলদি সে হো গ্যায়া।
– তুমি বাংলা ভি সামঝতে হো? বললেন ফেলুদা
– ও বাবু ইসকে পেহেলে এক বাঙালি সাবকে পাস কাম কারতাথা, উহাসে শিখলিয়া।
– ঠিক হে তুম যাও।
চলে যেতে যেতে আবার ঘুরে এলো হরিপাল।
-সাবজি রাত কে লিয়ে কেয়া কেয়া বানায়ু?
-থোরি দের পেলেহে তো বলা, যাও আভি।
চলে গেল হরিপাল।
– তোমরা কিন্তু আজ রাতের খাবার এখানেই খেয়ে যাবে। তারিণী খুড়ো বললেন।
– আলবাত খেয়ে যাব, খাওয়া কি ছাড়া যায়? বলে বসলেন লালমোহন বাবু।
ফেলুদা একবার তাকাতেই বেলুনের মত চুপসে গেল যেন।
সবাই খেতে শুরু করেছেন, এবার বলতে শুরু করলেন তারিণী খুড়ো।
-এবার আসল ঘটনায় আসা যাক যার জন্য আমি কলকাতা ছেড়ে এই লখনৌ তে এসেছি।
ফেলুদা আর বিশেষ উত্তর দিলেন না শুধু হুমমম বলে চায়ে চুমুক দিলেন। তারিণী খুড়ো আবার বলতে শুরু করলেন।
-এ শহর আমার চেনা, সে সময় আমার চাকরি বলতে কিছু নেই। লটারিতে লাখ দেড়েক টাকা পেয়েছিলুম তার সুদে ভালোই চলছিল।
এই লাটুশ রোডেই একখানা বাংলো নিয়ে থাকতুম, ওই পায়োনিয়ার কাগজে মাঝে মধ্যে ইংরেজিতে চুটকি লিখতাম। তবে অন্য এক অদ্ভুত বাতিক ছিল আমার সেটি হলো এক নিলামের দোকানে একটু বেশি যাতায়াত ছিল। এই হজরতগঞ্জের এক দোকানেই আমার নিত্য যাতায়াত ছিল।
অবশ্য প্রথম প্রথম শখ ছিল তারপর ব্যবসা বানিয়ে ফেললুম, নবাব আমলের কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যেত। তা আমি করতাম কি, সুবিধার দাম পেলে আমেরিকার ট্যুরিস্টদের কাছে বিক্রি করে দিতাম।
একদিন দোকানে গিয়ে এক বাক্স পছন্দ হলো, বাক্স খুলতেই দেখলুম একটা ছোট গোল আয়না। আয়নার চারিপাশে লাল সবুজ পাথর দিয়ে নকশা করা, দেখলে একেবারে চুনী পান্না মনে হয়। তা ওটি এত মনে ধরলো যে কিনেই নিলুম, বিক্রি টিক্রি আর করলুম না।
বাড়ি এসে সেটি আর খুলেও দেখিনি, অমনই পড়ে ছিল। কয়েক বছর পর যখন কলকাতা ফিরলাম, ওটিও সঙ্গে করেই আনলুম।
তো সেদিনকে যখন আমার কলকাতার বেনেটোলা লেনে আড্ডায় বসে ন্যাপলাদের গল্প শোনাচ্ছিলুম আমার কেমন জানি মনে হলো বাক্সটা খুলে একবার দেখি। গল্প শেষ করে বাক্সটা নিয়ে বসলুম, একেবারে ধুলো পড়ে গেছিল। ভালো করে মুছে যখন ওটি খুললাম, খুলতেই একটা হাওয়ার ধাক্কা এসেই আমার চোখে মুখে লাগলো। ভাবলুম অনেকদিন পড়ে ছিল তাই মনে হয় এমন হয়েছে, বেশি পাত্তা দিলুম না। আয়নাটা বের করে আমার শোবার ঘরে দেওয়ালে টানিয়ে রাখলাম। কিন্তু তারপর থেকেই শুরু হলো অদ্ভুত রকমের উপদ্রব।
আয়না থেকে নানান রকম শব্দ আসতে থাকে। রাতে ঘুমাতে গেলে মনে হয় যেন কোনো বদ্ধ গুহার মধ্যে আমাকে আটকে রাখা হয়েছে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। রোজ চোখ খুলতেই অনুভব করি কেউ যেন আমার মুখের উপর ঝুঁকে আছে, আমি জাগতেই যেন সরে যায়। এমন প্রায় দিন সাতেক চললো, তারপর দেওয়াল থেকে আয়নাখানা নিয়ে বাক্সবন্দি করে দিলাম, তাতে তো উপদ্রব কমলো না বরং বেড়ে গেল। তা সাতদিন পর হঠাৎ একটা চিরকুট বাক্সের পাশ থেকে উদ্ধার করি।
ফেলুদা বেশ উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলো “ওতে কি লেখা ছিল?”
তারিণী খুড়ো একটা চিরকুট ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিলেন, তাতে লেখা আছে-
“দিল কি ঘড়ি নেহি আয়ি।
যাব দিন ঢাল জায়েঙ্গে, তব তুমারে শ্বাসোমে জেহের দে দুঙ্গি,
মুঝে মেরে সাইরাত কে পাস লে চলো নেহিতো তুম ভি মারোগি”।
লেখাটা পড়ে খানিকক্ষণ চুপ রইলো ফেলুদা, ততক্ষণে চা শেষ হয়ে গেছে। আর এক রাউন্ড চায়ের অর্ডার করলেন তারিণী খুড়ো।
চা চা খেতে আবার শুরু করলেন তারিণী খুড়ো-
“আজকাল ঘুমাতেও পারিনা ঠিক করে, ঘুমালেই যেন অন্ধকার পুরীর মধ্যে নিক্ষেপ হই ক্রমাগত, তাই যতটা পারি জেগে থাকার চেষ্টা করি।” বলতে বলতে তারিণী খুড়োর চোখে মুখে ভয়ের রেখা দেখা দিলো।
“ওইইইইইই চিৎকার শোনা যাচ্ছে” কাঁপতে কাঁপতে বললেন তারিণী খুড়ো।
“কোথায় কিসের চিৎকার? আমি তো পাচ্ছি না শুনতে! তপসে কোনো চিৎকার শুনতে পারছিস?”
“ওই তো কিসের যেন কোলাহল, অনেকগুলো কণ্ঠের চিৎকার ভেসে আসছে” বললেন তারিণী খুড়ো।
“না আমি তো কোনো চিৎকার শুনতে পারছি না”,উত্তর দিলো তপসে।
“না ভায়া আমিও কিছু শুনতে পারছি না”, বললেন লালমোহন বাবু।
“আপনি শান্ত হন! কোনো চিৎকার হচ্ছে না, এ আপনার মনের ভুল।” ফেলুদা বললো।
“না না এ আমার মনের ভুল না ফেলু মিত্তির, কিছুতেই মনের ভুল হতে পারে না।”
“ঠিক আছে এক কাজ করুন, ওই বাক্স সমেত আয়না আমাকে দিন। দেখি কী করা যায়”, ফেলুদা বললো।
এর মধ্যে হরিপাল ডাকতে এলো-
“সাব আ’যাইয়ে খানা রেডি হ্যায়।”
“আচ্ছা হরিপাল তুমহারে ঘর কিধার হে?” বললেন ফেলুদা।
“স্যারজি পাশ মেই হে।”
“কউন কউন রেহেতা হ্যায় ঘর মে?”
“কই নেহি স্যারজি, মেনে সাদি নেহি কিয়া। পিতাজি আউর মাম্মিজি কুছ সাল পেহেলে গুজার গেয়ে।”
“ঠিক হ্যায় তুম যাও খানা লাগাও।”
“আপনার কাছে হরিপালের ঠিকানা আছে?” তারিণী খুড়োকে প্রশ্ন করলেন ফেলুদা।
একটা কাগজে হরিপালের ঠিকানা লিখে দিলেন তারিণী খুড়ো। যাওয়ার আগে তারিণীখুড়ো বাক্সটি কোন্ দোকান থেকে কিনেছেন একবার জিজ্ঞাসা করে নিলো ফেলুদা।
“বক্সটি কিনেছিলাম হজরতগঞ্জের ‘ক্রিস্টিয়া’ বলে নিলামের দোকান থেকে।”
রাতে খাওয়া দাওয়া সেরে হোটেলে ফিরতে ফিরতে সাড়ে দশটা বেজে গেল ফেলুদাদের। সাথে করে বাক্সটি নিয়ে এসেছে, ব্যাগের মধ্যে বাক্সটি রেখে সে রাতে ঘুমিয়ে পড়লো সবাই। পরদিন সকালে উঠে কাউকে কিছু না বলে ফেলুদা কোথাও একটা বেরিয়ে গেল, ফিরলো সেই দুপুর বেলা। ফিরে বললো কাল ভোরে একবার আমাকে বেরোতে হবে, ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে তোরা সাবধানে থাকিস। সেদিন খুব একটা বেশি কথা বললো না ফেলুদা, কোনো জটিল রহস্যের সন্ধান পেলে বরাবরই মনে মনে ছককষে চুপচাপ।
পরদিন ঠিক বিকেল বিকেল হোটেলে ফিরলো ফেলুদা
-বুঝলি তপসে যা জীবনে বিশ্বাস করিনি আজ তাই ঘটলো আমার সঙ্গে।
লাল মোহন বাবু মুখখানি বাড়িয়ে বেশ কৌতূহল মাখানো চোখ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-
-কি হে মশাই! কোনো জটিল রহস্য নাকি!
-শুধু জটিল কি মশাই, এ এক্কেবারে ঘোরতর জটিল। তপসে এক গ্লাস জল দে।
জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিতে দিতে তপসে বললো-
“আচ্ছা ফেলুদা, ওই বাক্সটা তোমার কাছেই আছে তো, নাকি…”
তপসের পুরো কথা শেষ না করতে দিয়ে ফেলুদা বললো-
“বলবো বলবো সব বলবো, আজ সন্ধ্যে বেলা তারিণীখুড়োর বাংলোতেই গিয়েই সব বলবো। কুচ তো ধীরজ রাখো তপেসরঞ্জন মিত্তির।”
সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ ফেলুদারা পৌঁছালো তারিণী খুড়োর বাংলোতে।
তাদের দেখে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন তারিণী খুড়ো-
“কি মশাই এত হাপাচ্ছেন কেন?” বললো ফেলুদা
“আসলে আমি কিছুই বুঝতে পারছিনা, হঠাৎ যে কী হলো।” উত্তর দিলেন তারিণী খুড়ো।
“ঠিক আছে আগে ভেতরে চলুন তারপর একে একে সব শুনবো।”
তারিণী খুড়োর সামনে ফেলুদারা বসে আছে, তপসে আর লালমোহন বাবুর চোখে মুখে বিস্ময় লেগে।
তারিণী খুড়ো বললেন-
“কাল দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে বারান্দায় কিছুক্ষণ বসে ছিলুম, তারপর থেকে শরীর যেন হালকা হতে শুরু করলো। মাথা থেকে কিছুর বোঝা নামলে যেমন হয় মেজাজখানাও তেমন ফুরফুরে হয়ে গেল। তারপর কখন জানিনা ঘুমিয়ে পড়লাম ওখানে বসেই! যখন ঘুম ভাঙলো সময় আর দেখিনি বোধকরি ঘণ্টা দুই ঘুমিয়েছি কিন্তু ঘুম থেকে উঠে হরিপাল কে ডাকতে গিয়ে দেখলুম সে ব্যাটা নেই। গোটা বাংলো খুঁজলাম কোথাও পেলুম না দুদিন ধরে, কোথায় গেল বলো দেখি!”
“আর খুঁজেও পাবেন না তাকে”, উত্তর দিল ফেলুদা।
“কী করে? কপ্পুর নাকি যে উবে গেল!” বললেন লালমোহন বাবু।
“তা অবশ্য আপনি ঠিকই বলেছেন, উবেই গেল একেবারে”, উত্তর দিলো ফেলুদা।
“আপনি হরিপালের দেওয়া ঠিকানায় খোঁজ করেননি তারিণী খুড়ো?”
“না তা অবশ্যি যাওয়া হয়নি।” জবাব দিলেন তারিণী খুড়ো।
“গেলেও বাড়িটি খুঁজে পেতেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে”, বেশ গম্ভীর হয়েই বললো ফেলুদা
“কেন হে মশাই, বাড়িঘর কি ইনভিজবেল নাকি?” প্রশ্ন করলেন লালমোহন বাবু
এবার বলতে শুরু করলো ফেলুদা-
“আওধের তৃতীয় বাদশাহ ছিলেন মুহাম্মদ আলী শাহ। ১৮৩৭ সন থেকে ১৮৪২ সাল অবধি তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। মুহাম্মদ আলী শাহ ছিলেন দ্বিতীয় সাদাত আলী খানের পুত্র। আওধের দ্বিতীয় বাদশাহ ছিলেন নাসিরউদ্দিন হায়দার শাহ উনি ছিলেন মুহাম্মদ আলী শাহের চাচা। সেই সময় মুহাম্মদ আলী শাহের কোনো এক শরিক ইজাউদ্দিনের কন্যা আনজারা সুলতানা এমন কাজ করে বসেন যা গোটা আওধের বাসিন্দা মানতে পারেনি।
“চুরি টুরি করেছিল নাকি মশাই”, প্রশ্ন করলেন লালমোহন বাবু।
-তা চুরিই বটে তবে মন চুরি।
-আরেব্বাস মন চুরি! এ যে দারুণ ব্যাপার।
-না হে দারুণ ব্যাপার নয়, এই ঘটনার সূত্রপাত তখন থেকেই শুরু।
আবার বলতে শুরু করলো ফেলুদা-
“কাল সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে সোজা গেলাম হরিপালের ঠিকানায়, সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, এ ঠিকানা তার নয়। হরিপাল নামে কেউ সেখানে থাকেই না। আমি ধরেই নিলাম সে বেটা নির্ঘাত চুরির ধান্দায় এসেছিল।
তারপর সেখান থেকে গেলাম হজরতগঞ্জ বাজারে, ততক্ষণে প্রায় সব দোকান খুলে গেছে। দোকানের নাম বলতে একজন দেখিয়ে দিলেন। দোকানে গিয়ে দেখলাম মাঝ বয়সী এক ভদ্দরলোক বসে আছেন।
বাক্সের কথা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন এ বাক্স সম্বন্ধে তিনি বলতে পারবেন না। তবে তার বাবা অবশ্য জানতে পারেন, কিন্তু বয়সের ভারে তিনি আর দোকানে আসেন না। তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে চাইতে বাড়ির ঠিকানা দিলেন। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, এ বাক্স ছিল আনজারা সুলতানার।
“তা মশাই এ বাক্সের সঙ্গে আনজারার কি সম্পর্ক?” বললেন লালমোহন বাবু। তারিণী খুড়ো অবশ্য চোখে বিস্ময় নিয়ে ফেলুদার কথা শুনছে।
“আলবাত সম্পর্ক আছে লালমোহন বাবু, সম্পর্ক না থাকলে এত বড় কান্ড কি আর ঘটতো! আনজারা সুলতানা ছিল সেসময় কার নামকরা সুন্দরী, তার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ তাকে বাক্স সমেত এই আয়নাটা উপহার দেয়। আয়নায় ছিল চুনী আর পান্না বসানো। আয়নাটি ছিল আনজারার অন্যতম প্রিয়।”
তারপর? প্রশ্ন করলো তারিণীখুড়ো-
এই আওধেরই বাসিন্দা ছিল হরিপাল, সনাতন ধর্মী। সেসময় তো বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির চরম নিদর্শন আমরা সবাই জানি। তা এই হরিপালের প্রেমে পড়লো আনজারা, হরিপালও ভালোবেসে ফেললো। এ কথা ছড়িয়ে পড়তেই তা বাদশাহের কানে যায়।
এই চরম অধর্ম কেউ মানতে পারেনি, বাহশাহের আদেশে আনজারা কে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে তবে হরিপাল কে বন্দী রাখা হয় বদ্ধ কারাগারে। তারপর আর তার খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আনজারার বাড়িতে শুরু হয় এক উপদ্রব, ওই বাক্সের মধ্যে থেকে নানা রকম চিৎকার শুনতে পাওয়া যেত সবাই বলতো আনজারার আত্মা নাকি ওই আয়নার মধ্যেই আছে। পরে অবশ্য কি হয়েছে জানা যায় না।
“দোকানের মালিক এসব কী করে জানলো?, সে তো অনেক আগের কথা মশাই” প্রশ্ন করলো লালমোহন বাবু।
“উনিও এক নিলামে এটি কিনেছিলেন তারপর থেকেই ওঁর সঙ্গেই এমন উপদ্রব শুরু হয়, উনি পরে খোঁজ নিয়ে এসব জানতে পারেন। তারপর তো তারিণী খুড়ো এটি গিয়ে কিনে আনলেন।” বললো ফেলুদা।
“তা সেই বাক্সটি এখন কোথায়?” প্রশ্ন করলেন তারিণী খুড়ো।
“কোথায় আবার! আজ সকালেই তিন ঘণ্টা পথ গিয়ে সেটিকে জায়গা মত রেখে এসেছি।”
“তার মানে তুমি সকালে ফৈজাবাদ গেছিলে ফেলুদা” জিজ্ঞাসা করলো তপসে।
“আজ্ঞে, তখনকার আওধা এখনকার এই ফৈজাবাদ, তা সেখানে গিয়ে সমাধিস্থল খুঁজে বাক্সটি তার উপরেই রেখে এসেছি”। তবে একটা জিনিস ঘটলো জানিস তপসে! যার কোনো বাখ্যা আমি খুঁজে পেলাম না।”
“জলদি বলুন মশাই, আপনি কি আনজারা কে দেখলেন নাকি?” বললেন লালমোহন বাবু।
“না তা দেখিনি, তবে অনুভব করেছি। আমি যখন বাক্সটি রেখে ফিরে আসছি কী মনে হলো একবার পেছন ফিরে দেখি, তাকাতেই দেখলাম সেটি আর নেই। ফিরে গিয়ে তন্ন তন্ন খুঁজলাম বাক্সটি আর খুঁজে পেলাম না।”
“সাংঘাতিক তো”,বললেন লালমোহন বাবু।
“আপনি এবার নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন খুড়ো” বললো ফেলুদা।
“আমার বড়ো উপকার করলে ফেলু মিত্তির, কি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমাকে! ভালো থাক হরিপাল এবং আনজারা। আমি ভাবছি কালই বরং কলকাতা ফিরে যাব। তা তোমরা কবে যাবে?” জিজ্ঞাসা করলেন তারিণী খুড়ো।
জবাব দিলেন লালমোহন বাবু “আমরা আগামী পরশু ফিরবো মশাই, আপনার চিন্তামুক্তি হলো এটাই শান্তি।”
“আজ উঠি খুড়ো, আবার কখনো দেখা হবে।”
উঠে যেতেই তারিণী খুড়ো প্রশ্ন করলেন “তাহলে চিরকুটে লেখাটির অর্থ কী?”
ফেলুদা বললেন মানেটা কিন্তু খুবই সোজা।
“প্রথমে ছিল দিল কি ঘড়ি অব নেহি আয়ি এটার মানে হলো আত্মার মুক্তির সময় আসেনি। তারপর ছিল যাব দিন ঢাল জায়েঙ্গে তব তুমহারে শ্বাসোমে জেহের দে দুঙ্গি এটার মানে হলো দিন শেষ হয়ে অন্ধকার নামলে তোমার নিঃশ্বাসে বিষ মিশিয়ে দেব। কারণ আনজারা কিন্তু দম বন্ধ হয়েই মারা গিয়েছিল ওর কষ্টটা প্রতিনিয়ম ছিল, আর সে কখনোই একা একা আসতে পারছিল না অগত্যা আপনাকে ভয় দেখিয়ে নিয়ে আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তারপর ছিল মুঝে মেরে সাইরাত কে পাস লে চলো নেহিতো তুমভি মারোগি- সাইরাত একটি মারাঠি শব্দ এটার হিন্দি অর্থ দিওয়ানা আর বাংলা অর্থ প্রেমে পাগল আবার ইংরাজি তে ওয়াইল্ড ও বলা চলে। তার মানে ও বলতে চেয়েছে ওকে ওর প্রেমিকের কাছে নিয়ে যেতে নাহলে আপনার মৃত্যুও হতে পারে। আর আপনি তো আপনার কাজটা ঠিকঠাকই করেছেন, বাকিটা আমি করে দিলাম। এবার আসি, আবার দেখা হবে কখনো।
“আনজারা মারাঠিও জানতো!” বললেন লালমোহন বাবু।
“ভূতেরা চাইলে সব জানতে পারে মশাই” উত্তর দিলো তারিণী খুড়ো।
ফেলুদারা সাতদিন হলো কলকাতা চলে এসেছে, অবশ্য তার আগেই তারিণী খুড়ো আসবেন বলেছিলেন।
“তপসে, ভাবছি একবার বেনোটোলা লেনে যাব”, বললো ফেলুদা
“তারিণী খুড়োর বাড়ি?”
“হুম আজই একবার যাব, দেখি আবার কিছু ঘটলো কিনা!”
এর মধ্যে লালমোহন বাবু ঢুকলেন-
“কি হে মশাই কোথায় যাওয়ার কথা হচ্ছে! আবার কোনো নতুন এ্যাডভেঞ্চার নাকি!”
উত্তর দিলো তপসে “না তারিণী খুড়োর বাড়ি…”
“তা ভালো আবার ওঁর সঙ্গে দেখা হবে, তা চলুন মশাই যাওয়াই যাক।”
ফেলুদারা যখন বেনেটোলা লেনে পৌঁছালো তখন সবে সন্ধ্যা নেমেছে, খুড়োর ভৃত্য এসে দরজা খুলে দিলেন।
“আরে ফেলু মিত্তির যে, এসো তপসে। দ্য গ্রেট জটায়ু! আমার বাড়ি! এসো এসো সবাই ভেতরে এসো।”
“লখনৌ থেকে ফিরে কোনো খবর দিলেন না তাই চলে এলুম” উত্তর দিলো ফেলুদা।
“লখনৌ? লখনৌ তো যাওয়া হয় না মশাই বহুবছর। তবে লখনৌর কথায় মনে পড়লো লখনৌ থেকে আনা একখানা আয়নার বাক্স চুরি হয়ে গেছে দিন কুড়ি আগে, বাক্সটি কিনেছিলুম এক নিলামের দোকান থেকে…”
“বলছেন কি মশাই আপনি এর মধ্যে লখনৌ যান নি”, বললেন লালমোহন বাবু।
“না মশাই আমি লখনৌ কেন কলকাতা ছেড়েই কোথাও যাইনি এর মধ্যে।”
লালমোহন বাবু হা করে তাকিয়ে রইলেন তারিণী খুড়োর দিকে।
“চল তপসে, আজ আসি খুড়ো পরে একদিন আসবো আবার” বললো ফেলুদা।
সমাপ্ত
কপিরাইট সংক্রান্ত বিশেষ বিজ্ঞপ্তি: – লেখিকা অবগত আছেন যে স্বর্গীয় সত্যজিৎ রায়ের জীবনকালের সমস্ত কাজ, তারিণীখুড়ো, ফেলুদার নাম এবং চরিত্র সৃষ্টি এই সব কিছুর স্বত্বাধিকারী একমাত্র সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর আইন সঙ্গত উত্তরপুরুষ। সেই মর্মে লেখিকা কিংবা প্রকাশকের কেউ এই সকল চরিত্রের আলাদা করে কোনো স্বত্বাধিকার দাবি করছেন না। এটি সম্পূর্ণভাবে সত্যজিৎ রায়ের এক পাঠিকার দ্বারা তাঁর অমর সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন যাকে ইংরেজিতে ‘ফ্যান ফিকশন’ বলা হয়ে থাকে।