এই সময়ের লেখায় চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

Doctors’ Day

পয়লা জুলাই ডাক্তার দিবস উপলক্ষে
প্রথম বাঙালি শব ব্যবচ্ছেদক কি রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়?

ভারতে শব ব্যবচ্ছেদের ঐতিহাসিক কাজটি প্রথম করেছিলেন ডাক্তার মধুসুদন গুপ্ত, একথা সকলেই জানেন। কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ১৮৩৬ সালে মধুসূদন গুপ্ত যখন প্রথম শব-ব্যবচ্ছেদ করেন, তখন ফোর্ট উইলিয়াম থেকে তোপধ্বনি হয়েছিল। ভারতীয় হিসাবে তো বটেই, বাঙালি হিসাবেও এটা রাজ্যের নাগরিকদের শ্লাঘার বিষয়। কিন্তু তিনিই কি প্রথম? কারণ, আরও এক বাঙালি ডাক্তার শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেনন। তাঁর নাম ডাক্তার রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। তবে, সেই শব ব্যবচ্ছেদ তিনি করেছিলেন ভারতের বাইরে, নেপালে। সালটি ঠিক কবে জানা না গেলেও প্রায় ২০০ বছর আগে সেই শবব্যবচ্ছেদ হয়েছিল।
রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় নাম শুনলেই প্রথমে মনে পড়ে উত্তরপাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সুযোগ্য সন্তান রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের কথা। কিন্তু তিনি ডাক্তার ছিলেন না। লোকে তাঁকে বলতো বাবু রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। ডাক্তার রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের বাসস্থান ছিল কলকাতায়, আর তিনি শব ব্যবচ্ছেদ করেছিলেন নেপালে। নেপালে উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে তিনিই মেডিকেল স্কুল স্থাপনা, নেপালে শব-ব্যবচ্ছেদের প্রবর্তন ও চিকিৎসা বিভাগের পুনর্গঠন করেছিলেন।
কলকাতা বলরাম যোষ স্ট্রিটে তাঁর বাড়তে তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘মিনার্ভা কেমিকেল ওয়ার্কস’ নামে একটি ওষুধ তৈরির কারখানাও। আবিষ্কার করেছিলেন ব্যথা কমানোর দারুণ কার্যকর ওষুধ ‘বিউটিবাম’ (তখনকার বানানে ‘বিউটীবাম)। এখন করোনাভাইরাস যেমন শঙ্কার কারণ, সেই সময়েও ইনফ্লুয়েঞ্জার মহামারী ঘটতো। একবারের ইনফ্লুয়েঞ্জায় হুগলি জেলার বিরাট এলাকা প্রায় জনশূন্য হয়ে যায়। সেই এলাকাকে তখন ‘গুপ্তপল্লী’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল, লিখেছেন গুগলি জেলার ইতিহাসের লেখক সুধীর চন্দ্র মিত্র। ব্রিটিশ আমলে রেলওয়ে লাইন তৈরির কারণে বন্যার জল গঙ্গায় যেতে বাধা পেয়ে বিরাট এলাকার মাটির নিচে জমে ভ্যাপসা পরিবেশে সৃষ্টি করে। তখনও ব্যাপক মানুষের মৃত্যু হয়। অজানা এই জ্বরকে বলা হয় ‘জাপানি জ্বর’। সেই সময় ব্রিটিশ সরকার জাপানি জ্বরে গণমৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে একটি কমিটি করেছিলেন, যাকে বলা হতো ফিভার কমিশন। ডাক্তার নীলমণি মিত্র, অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। প্রয়োজনের তাগিদ থেকে ডাক্তার রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় আবিষ্কার করেছিলেন ‘ফিভার ভ্যাকসিন’। এমন অনেক ওষুধ তিনি আবিষ্কার করেছিলেন বলে জানা যায়।
ডাক্তার রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পর্কে যতটুকু জানা যাচ্ছে, তা লিখে গিয়েছেন জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, তাঁর “বঙ্গের বাহিরে বাঙ্গালী (উত্তর ভারত)” বইতে। জ্ঞানেন্দ্রমোহনের বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৩২২ বঙ্গাব্দে। কলকাতার ৫০ নম্বর বাগবাজার স্ট্রিটের অনাথনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন বইটির প্রকাশক। জ্ঞানেন্দ্রমোহন অবশ্য নেপালকে ভারতের একটি রাজ্য এবং ‘বাঙালিদের উপনিবেশ’ বলে উলেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, “তিনিই এরাজ্যে সর্বপ্রথম শরীর ব্যবচ্ছেদ আরম্ভ করেন। এই বিদ্যা এরাজ্যে তখন একপ্ৰকার অজ্ঞাতই ছিল। প্ৰথম ব্যবচ্ছেদের দিন মহারাজা স্বয়ং তথায় উপস্থিত ছিলেন। সরকারী কাগজ পত্রে এই ঘটনা লিপিবদ্ধও হইয়াছিল।”
এই ঘটনা সম্ভবত ১৮২০ সালের পরের, অর্থাৎ প্রায় পৌনে দুশো বছর আগের। কারণ, রাজকৃষ্ণবাবু নেপালে চিকিতসা বিভাগের প্রধান কর্তা হিসাবে কাজে যোগ দেন ১৮১৯ সালে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন জানাচ্ছেন, “নেপালের বর্তমান চিকিৎসা বিভাগের সর্বপ্রধান কৰ্ম্মচারী ( Physician to H. H. the Maharajah of Nepal, Chief Medical Officer and Inspector of Civil Hospitals) ডাক্তার রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ১৮১৯ অব্দে ব্যবচ্ছেদবিদ্যা ও অস্ত্র চিকিৎসার শিক্ষক (Lecturer on Anatomy and Surgery) হইয়া নেপালে আগমন করেন ও পরে Medical Institution এর পরীক্ষক ও হন। এখানে তখন সবেমাত্র মেডিকেল কলেজ খুলা হইতেছিল।” এই কলেজ খোলার জন্য ও তাঁর উন্নতিসাধনে রাজকৃষ্ণবাবুর অবদান কৃতজ্ঞ চিত্তে লিপিবদ্ধ করেছেন গ্রন্থকার।
রাজকৃষ্ণ বাবু আরও এক ইতিহাস গড়েছিলেন। একসঙ্গে অনেকগুলি পদের গুরুদায়িত্ব তাঁকে সামলাতে হয়েছে। ‘“বঙ্গের বাহিরে বাঙ্গালী’ বইতে লেখা হয়েছে, “একে একে চিকিৎসা বিভাগের যাবতীয় বিভাগে কৰ্ম্ম করিবার পর ইনস্পেক্টর অফ সিভিল হস্পিটালস এবং চীফ মেডিকেল অফিসর পদে উন্নীত হন এবং নেপালের প্রধানমন্ত্রী ও প্ৰধান সেনাপতির সহযোগী চিকিৎসক হন। এক সঙ্গে এতগুলি পদ নেপালে ইতিপূৰ্ব্বে আর কেহ অধিকার করেন নাই। নেপালে পূৰ্ব্বে উক্ত পদ ছিল না। রাজকৃষ্ণ বাবুর উদ্যোগে সমস্ত চিকিৎসা বিভাগ পুনর্গঠিত হইবার পর এই পদের সৃষ্টি হয়।” (বানান অপরিবর্তিত)
কেবল মেডিকেল কলেজ হলেই চিকিৎসা বিদ্যা শেখানো যায় না, দরকার হয় ছাত্রদের উপযোগী বইয়েরও। সেটি যদি স্থানীয় অর্থাৎ মাতৃভাষায় হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয় পঠনপাঠনে। রাজকৃষ্ণ বাবু নেপালের তখনকার কথ্য ভাষায় একটি বিরাট বই লেখেন শরীরবিদ্যা বা অ্যানাটমি নিয়ে। এর ফলে নেপালী ছাত্রদের বিরাট উপকার হয়। এর আগে বাঙ্গালি না নেপালিদের কেউই এই বিষয়ে বই লেখেননি। “গ্ৰন্থখানি সহস্ৰাধিক পৃষ্ঠাব্যাপী এবং বহু চিত্র সম্বলিত। চিকিৎসা সম্বন্ধে গ্ৰন্থ লেখায় নেপালে, ইনিই প্রথম,” লিখেছেন জ্ঞানেন্দ্রমোহন।
মানুষটি আবার ভীষণভাবেই রোগীর বন্ধু। জ্ঞানেন্দ্রমোহনই লিখেছেন, “ডাক্তার মুখোপাধ্যায় এখানে দরিদ্রের বন্ধু, তাহাদের বিনা দক্ষিণায় চিকিৎসা করা ব্যবস্থা দেওয়া তাহার নিত্য কর্ত্যবোর মধ্যে পরিগণিত হইয়াছে। একবার পল্টনের কোন জমাদারের স্ত্রী স্বামীর অনুপস্থিতি কালে প্রসব করিতে না পারিয়া মুমূর্ষু দশা প্রাপ্ত হয়। রাজকৃষ্ণ বাবু সেই সংবাদ পাইয়া এবং সে সময় তাহার বাড়ীতে কেহ নাই জানিয়া সস্ত্রীক তাহার নিকট গমন করেন এবং নিজ হইতে ঔষধ পথ্য দান করেন ও প্রসব করাইবার ব্যবস্থা করিয়া দেন। জমাদার কার্য হইতে প্রত্যাগত হইবার পর সমস্ত অবগত হইয়া যে কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত হইয়াছিল, তাহা বলাই বাহুল্য।”
কিন্তু শুধু চিকিতসা বিদ্যাতেই নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি ডাক্তার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। সম্ভবত, বাঙলার জল মাটি তাঁর মনে যে স্বাভাবিক প্রভাব ফেলেছিল, তা তিনি দমন করতে চাইতেন না। তাই, সাহিত্যের অঙ্গনেও পা রেখেছিলেন। লিখেছিলেন দুটি কাব্যনাটক – “মালিনমুকুল” ও “রাজরাণী”। এর সুবাদে বাংলার বাইরে যারা বাংলা সাহিত্যের চর্চা করতেন, তাঁদের তালিকায় রাজকৃষ্ণ বাবুর স্থানও অগ্রগণ্য।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!