গ্রন্থ আলোচনায় চিরঞ্জীব হালদার

ধারালো উপপাদ্যের মাধুকরী সড়ক
একটি জটিল গ্ৰন্থের অক্ষম আলোচনা
২০২২ যাই যাই করছে।আমার সীমিত পঠনমালায়
একটা কাব্যগ্ৰন্থ নাছোড় দখল করে আছে শয়ন বালিশের পাশের সংক্ষিপ্ত জায়গা।আলো জাগালেই আমিও জেগে উঠি আর চুপি চুপি ছিঁচকে চোরে মত মগজে ঢুকিয়ে ফেলি দু’এক পংক্তি।সারাদিন চুইন গামের মত অপাংক্তেয় খন্ড মেধার ঘরে মেলে দিই কবিতার হীরকদ্যূতি।ও হরি ভুলে গিয়েছিলাম এই বছর ‘পোড়া জমি ও চৌতাল’ এর দু’শ বছর। যা ছিল উনবিংশতকের সেরা মেধার উপহার।যা স্মরণ করিয়ে দিলেন ফরাসী বেত্তা অধ্যাপক চিন্ময় গুহ । এক সংবাদ মাধ্যমের সৌজন্যে।মগজ তছনছ করে দেওয়া বহুমাত্রিকতার শ্রেষ্ঠ আধারটির এলিয়টের অন্যতম সেরা উপহার যা গত দুই শতক আপামর সাহিত্যবিশ্ব উদ্বেলিত।
এলিয়টের পাউন্ড ছিলেন।জীবনানন্দের বুদ্ধদেব বসু ছিলেন। এই বাংলার নামহীন জনপদ থেকে কত নিমাই উঠে আসছেন। কার কোলে তারা বিশ্রাম নেবে দুদন্ড এই ২০২২ এ বলার মত অভিভাবক নেই।
এখন যত্রতত্র কবিতা উৎসবের নামে সবাই আত্মপ্রতিষ্ঠার ঢক্কানিনাদে মশগুল।কবিতায় যে আত্মীক উদাসীন বাউলপণা লাগে তাই কে আর দেখিয়ে দেবেন সনাক্ত করে দেবেন নিমাই জানা লক্ষীকান্তদের। উপনিষদ কেহ কখনো ডাকে পাঠায় না। পৌরাণিক ধারার পরিকাঠামো থেকে তুলে আনা এসথেটিক্স ভাবনা গুলো বৈজ্ঞানিক চেতনার বাঁকে মেলে দেওয়ার পর যে কবিতার বহুমাত্রিক স্তর ভাস্বর হয়ে ওঠে তা নিমাইয়ের কবিতা পড়তে পড়তে তলিয়ে যাবেন।
উৎসর্গ পাতায় পাঠকের ঝুলিতে প্রথমেই বলে নেবেন..তারা কেবল অপ্রকৃত ভগ্নাংশ শিখিয়ে চলে।…অনেক কিছু বলতে গিয়ে জানাতে ভুল হল আলোচিত গ্ৰন্থের নাম
‘ঈশ্বর ও ফারেনহাইট জ্বরের ঘোড়া’
নিমাই জানা
প্রকাশক-কবিতিকা ।অ্যাবস্ট্রাক্ট প্রচ্ছদে সাদা কালো লালের মিশেলে পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন কবি নিমাই জানা। এক গ্ৰামীন আবহে বেড়ে ওঠা কবি কিভাবে দেখেন তার ভেতর ত্রিমাত্রিক বৃষ্টিপাত থেকে কলঙ্কহীন আলোকবিন্দুর পারফেক্ট টেন্স।অতি উত্তর আধুনিকতা আমাদের যাপিত জীবনে কিভাবে তাঁবু ফেলে এক দীর্ঘমেয়াদি স্বর ছড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতি পরতে পরতে ,তার এক জ্বলন্ত কাব্যভাষা এই কবিতা সনদ।প্রতিটি ভাষ্যের পৃষ্ঠা এক বহুমাত্রিকতার মহাপুরাণ। এখান ৫৫টি কবিতা ধৃত হয়েছেন ৯৬ পাতায়। সব মনোটনি ছাপিয়ে আপনি একের পর এক কবিতার অন্তরলোকে পৌঁছে যাবেন।তবে এক একটি কবিতা যেন একটি পর্বতের মহাস্তম্ভ।
প্রতিটা কবিতা প্রায় আলাদা আলোচনার
দাবীদার।এটি কবির চতুর্থ গ্ৰন্থ।আধুনিকতার এত কনডেন্স ফর্ম খুব কম কবির কপালে সরস্বতী মেলে দিয়েছেন। এই কবিতার অন্তর্গত প্রলাপ পাঠকের মনে এক মূর্ছনা জাগাবে। আপনি মন্ত্র মুগ্ধের মতন একের পর এক কবিতা পড়তে পারবেন না ।একটি পড়বেন তারপর অবধারিত কিছু বিরতি। কেননা প্রতিদিন লাইন নিরপেক্ষ আলোচনার সাপেক্ষে আপনার মননে এক মায়াজাল বিস্তার করবে।এমন ই এক উচ্চকিত রসের কবি নিমাই।কোন যতিচিহ্ন ছাড়াই সব কবিতা উচ্চারিত ।আসলে নির্ভুল প্রতিস্থাপিত শব্দ দ্বারা নিজস্ব বিরাম ও যতির লয় ঘটেছে প্রতি লাইনে। তবে ভুল ভাল দু’একটি কমার প্রয়োগও আছে। যেমন সমাপ্তি কবিতা “কাল্পনিক সর্বনাম পদ অথবা হাইপোগ্লাইসেমিয়া” অথবা প্রথম কবিতা “একটি ধারালো উপপাদ্য ও কাঠের ময়ূর”।
প্রথমটিতে ১৮ দীর্ঘ লাইনে মাত্র চারটি কমার ব্যবহার না দিলেও বোধহয় কিছু ক্ষতি ছিল না।
শেষ ৫৬ লাইনের সমাপ্তি কবিতাটিতে দশটি কমার ব্যবহার ।এটি কি কবির স্বজাতীয় অর্ধ প্রয়োগ।
এখানে গণিতশাস্ত্র আর পৌরাণিক চেতনার আসামান্য মিশেল।
…. আমি রাধা মাধবের মোহময় ক্ষেত্রফল এর দিকে রম্বসের গণিত চিহ্নটি একে রাখি, স্বস্তিক মাথায়
নীলোৎপল নামের গর্ভস্থ ভ্রুণটি হেসে উঠেছে যাজ্ঞবল্ব আশ্রমে…
এ গ্ৰন্থটি একটানে পড়ে যাওয়ার নয়।
একটি দাঁড়াস বড় কোন শিকার ধরে ফেলার পর যেমন হয় । আপনি গ্ৰাস করার নাছোড় প্রক্রিয়াটি চালাতেই থাকবেন যতক্ষণ না শেষ লাইন আপনাকে থামিয়ে দিচ্ছে।অতঃপর আপনি প্রতিটি লাইনের মায়াবী তন্তু তে জড়িয়ে যেতে যেতে খেই না হারিয়েও স্থবির মহাভোজের অন্তে সাপের মতন স্থির ব্রহ্মের কাছে দেখে নেবেন আপনার অস্তিত্বের দ্যোতক।
প্রতিটি কবিতার মেটাফের দেখার মত।আবহমান পাঠকের ক্ষুধা নিবৃত্তির ছাপিয়ে অন্য গণিতে আপনি মিশে যাচ্ছেন। আমাদের শঙ্কা বর্তমানে যে হারে কবিতার নামে অখাদ্য কবিতার ভীড়ে আমপাঠক কিভাবে সনাক্ত করবে নিমাই জানা দের।গতকাল
ফেসবুক মাধ্যমে কবি উত্তম দত্ত -আফজাল আলিদের সঙ্গত শঙ্কা কবিতার সচেতন পাঠকমহলে কে বেশ নাড়িয়ে দেয় ।পুরস্কৃত কবি ও ভাল কবিতা লিখিয়েদের বর্তমান অবস্থান ও তার নৈতিক প্রেক্ষাপট। যাই হোক আসুন আমরা নিমাইয়ের মায়াজালে নিজেদের প্রজ্ঞাকে আরো একটু সিক্ত করে নিই।
১) রাত আড়াইটার ধারালো ব্লেডে দুটো গণিতের সাথে নিজেকে নিহত করলাম , পৃষ্ঠা ৯ ( একটি ধারালো উপপাদ্য ও কাঠের ময়ূর)
২) বাবার চওড়া কাঁধে কল্কে ফুলের সুঁচ ফুটিয়ে বাঁশি বাজাচ্ছেন হরি প্রসাদ চৌরাসিয়া , গ্রাফের মাথায় দশমিক বিন্দুরা আনন্দে নাচছে , পৃষ্ঠা ১৩ ,( বাই কালার আই সি উ ঘর )
৩) ঝরে যাওয়া মেহগনি পাতার নিচে এবোরশন নামক মৃত্যু বিষয়ক গুচ্ছ কবিতা , যারা শুধু দহন জানে , আগুনের তাপে জ্বর এলে পারদ বলে দেয় আরেকটি মৃত্যুর কথা। পৃষ্ঠা ১৫ , ( নীল রঙের জ্বর অথচ সবুজ ঘোড়া )
৪) ঈশ্বরকে বলে রাখি আমার বিজোড় আর্তনাদের কথা
পৃষ্ঠা ১৮ ( এক মহাপ্রস্থান ও সঙ্গম বিহীন বিজোড় সংখ্যারা )
(৫) জোড় কলমের প্রত্যাশী ক্রোমোজোমেরা সেরিব্রাল স্নায়ু নিয়ে ভূগোলের অববাহিকায় কৃষিকাজ করছে , পৃষ্ঠা ১৯ ( পাঞ্জাবির বুকে সংক্রমিত কফ )
(৬) নাবিক বাবা আমার নামের আগে অভিশাপ জুড়েছে ভর সন্ধ্যেবেলায় , আঙ্গুলের ডগায় উচ্চ রক্তচাপের ফুল।
পৃষ্ঠা ২১ ( ঘামেরা বর্গক্ষেত্রের মতো অবৈধ )
৭) আমার পাশে বসে ক্যান্সার রোগী রেডিয়েশনের কবিতা লিখছেন মন দিয়ে , পৃষ্ঠা ২৫ , ( ঈশ্বর জ্যামিতিক দৈর্ঘ্যে হাঁটেন )
৮) দশমিক সংখ্যাটি এক ডিভাইড ঈশ্বরের নাম , পৃষ্ঠা ৩০ ( লগারিদমের ঈশ্বর অথচ অনুর্বর নারী )
৯) শীতের রাত্রিকে কোনভাবেই দ্বিমাত্রিক নিহত মনস্তাত্ত্বিক কবিতা লিখতে নেই , পৃষ্ঠা ৩৫ , ( একটি শীতকাল ও নিহত পুরুষের জন্য কবিতা )
১০) ঈশ্বর ও আঁতকে উঠুক আমার ভয়াবহতা দেখে , ঈশ্বর কখনো কোন পবিত্র যৌনাঙ্গে হাত রাখে না , পৃষ্ঠা ৪৯ , ( ক্ষমা চাই শাশ্বতীর কাছে )
১১) ইছামতি আসলে কিছু নয় দুটো ভ্রুওয়ালা একটা ভিনিগার নদীর ইস্ট্রোজেন বিষয়ক অপটিক লেন্সের থার্ড জেন্ডার ফর্ম
পৃষ্ঠা ৭০ , ( সাদা রঙের ঈশ্বর অথবা লুব্রিকেটিং বাবার শুক্রাণু )
১২) মা ঘুমের ঘোরে তার পচন স্তনজোড়া খাইয়ে দেয় উদর ফুর্তি করে , আমরা শুধু মানিপ্লান্ট , ম্যান্ডেভিলা আর নিম গাছের বৃদ্ধি বলয় খুঁজে চলি অপরিণত শুঁয়োপোকার মতো
পৃষ্ঠা ৯৪ ( পদ্ম গোখরের নৌকা ও শাঁখের শব্দ )
আসুন দেখা হোক যত তাড়াতাড়ি নিমাই ও আমপাঠকদের।
ঈশ্বর ও ফারেনহাইট জ্বরের ঘোড়া
নিমাই জানা
প্রকাশক-কবিতিকা
দাম -দু’ ই শত মাত্র