কবিতায় ছন্দা চট্টোপাধ্যায়

বনসাই
ছোট্ট একটা ব্যালকনিতে আমি…
জাপানি স্টাইলে ছাঁটা বেঁটে বটগাছ।
ওরা আর কী করবে বলো?
ব্যালকনির মাপ অনুযায়ী টবের মাপ…
আমার আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছেটা হায়,
বাহারি গ্রীলের ফাঁক দিয়ে বাতাস ছুঁতে চায়।
আমার আরণ্যক সন্ততিরা হারিয়ে গেছে…
আমাজনের রাজসূয় যজ্ঞের অগ্নিগ্রাসে।
আমার পা, মানে… শিকড়গুলো দৌড়তে চায়
দিগন্তবিস্তৃত অরণ্যভূমি ছাড়িয়ে..
দূরে কোথাও দূরে দূরে;
আমার স্নান করতে ইচ্ছে করে…
ঝরোঝরো মুখর বাদলদিনে
অঝোর বারিধারায়। আমি পারিনা।
টবের পোড়ামাটির প্রাচীর
সীমান্তের অতন্দ্র বেড়া যেন।
আমার মালি কিন্তু যত্ন করে আমায় খুব।
সার মিশিয়ে দেয়, দেয় পুষ্টি ও জল মাপ মতো।
কম না, বেশীও না… প্রয়োজন ঠিক যতোটুকু তত।
পাশের ঘরের বুড়ো মানুষটাকে যেমন দিতো—
প্রোটিনেক্স, এনসিওর, মাল্টিভিটামিন।
ভালো না বাসলে বাগান বাঁচে না,
একা বনসাই আমি তাই জীবন্মৃত,
আমার সীমিত মাটিতে বসত করেনা
বর্ষার দাদুরি…
ঐ বুড়োটা যেমন ডুকরে উঠতো
-“দাদুভাই,একটু কাছে আয়”-!!
আমার আশেপাশে নাচেনা প্রজাপতি,
মৌমাছি, ফড়িং,–জ্বলে না জোনাকির টিপ॥
অথচ দ্যাখো, আমি ছিলাম বিপুল বটবৃক্ষ…
কত বিহঙ্গকে দিয়েছি কুলায়,
ক্লান্ত পথিকেরে ছায়া,
আর প্রেমিকের প্রতিশ্রুতি
প্রেমিকার পাখির নীড়ে—
আমার পত্রচ্ছায়ার আশ্রয়!!
ভালোবাসা কী সবার সয়?
তবু রেসের ঘোড়া যেমন
পোষমানা বন্য অশ্ব,
আমিও তেমনই বৃদ্ধ বট,
কিংবা বিকলাঙ্গ অশ্বত্থ
অনন্ত আয়ুর অভিশাপ নিয়ে
অসহায় বন্দী বনসাই,
ভালোবাসা হারিয়ে ফেলা
উদ্বাস্তু মানুষ অথবা গাছ।
বুঝে গেছি ভালোবাসা-অবহেলা…..
একাকিত্বেই বাঁচে স্মৃতির বারান্দায়।