“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

ভুতের তাড়ায়

আহঃ… আহঃ… হে ভগবান, আরেকটু… আরেকটু…!
প্রাণপনে সাইকেলের প্যাডেলে পা চালাচ্ছে নিশানাথ। পা তো নয়, যেন বিদ্যুতের টারবাইন। দ্রুত ঘুরছে প্যাডেলে। হাঁটুর নিচের কাফ মাসেলে টান ধরে গিয়েছে। টনটন করছে। থাই মাসল-এর শিরাগুলি বুঝি ছিঁড়েই যাবে এবার! কিন্তু, এখনও যে অন্তত শ-চারেক মিটার! প্রাণে বাঁচতে পেরোতেই হবে, না হলে ভুতের খপ্পরে বিদেশ বিভুঁইয়ে বেঘোরে প্রাণটা যাবে। এই পথটুকু পার করলে তবে কোনও মানুষের দেখা পাওয়া যাবে। প্রাণে বেঁচে যাবে। নিশানাথ আরও জোরে প্যাডেল ঘোরাতে থাকে।
দিল্লির ডিফেন্স কলোনি থেকে বেরিয়েছে নিশানাথ। এখানেই একটি শো-রুমে সে সেলসম্যান। সাইকেল নিয়েই যাতায়াত করে। বাসা থেকে বেরোয় সকাল ন’টা নাগাদ। শো-রুমে সকাল দশটার মধ্যে পৌঁছতেই হয়। মদনগির বলে দিল্লির যে এলাকায় থাকে, সেটি একেবারে নিচুতলার লোকেদের বাস। অধিকাংশের পরিচয় ‘বাল্মীকি’, যাদের ডোম, মেথর বলা হয় বাংলায়।
নিশানাথ কলকাতার ছেলে। পাকেচক্রে দিল্লিতে এসে কোনওরকমে একটা নাম করা চশমার শো-রুমে চাকরি পেয়েছে। শুরুতে অনভিজ্ঞ বলে বেতন সামান্য। মানে, যে বেতন পেত সেই সময়ে, তা দিয়ে দিল্লির কোনও নিম্নমধ্যবিত্ত এলাকাতেও এক কামরার ঘর ভাড়া পাওয়াও সম্ভব ছিল না। পরে অবশ্য বেড়েছিল, কিন্তু নিশানাথ আর ঘর বদলায়নি। ফলে, সব থেকে নিচুতলার বাসিন্দাদের এলাকাতেই মাথা গুঁজতে হয়েছে তাঁকে। এগুলিকে বলা হয় পঁচিশ গজী প্লট। সেখানে একটি ঘর বানালে সামনে থাকে এক চিলতে জমি। উঠোন না চাইলে আরেকটা ঘর। টয়লেট কারও বাড়িতেই নেই। গলিতে ঢোকার মুখে সার দিয়ে অনেকগুলি করে টয়লেট – প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার ঠিকানা। গলির একমুখে পুরুষদের, অন্যমুখে মহিলাদের। এমনই এক গলির একটি এক কামরা ভাড়ার ঘরে থাকে। সামনের চিলতে জমিতেই পুরসভার টাইম কলের লাইন। স্নান, খাওয়া সব জল ওখান থেকেই ধরে রাখতে হয়।
নিশানাথের বয়স তখন সবে ২০ পেরিয়েছে। ওদের পারিবারিক অবস্থা কিন্তু বেশ ভাল। নিজেদের দোতলা বাড়ি কলকাতার থেকে একটু দূরে, এক মফস্বল শহরে। অভাব কিছুরই নেই। রাজনীতি করা খানিকটা বেপরোয়া নিশানাথ নিজের ভাগ্যের খোঁজে নিজেই চলে এসেছিল রাজধানী দিল্লি। এসে এক পরিচিতের বাড়িতে ওঠে। দিনকয়েকের মধ্যেই একটা কাজ জুটিয়ে প্রথমে আরেক যুবকের সঙ্গে এমনই একটি ছোট্ট ঘর শেয়ার করে থাকতে শুরু করে। তারপর আরও কয়েক জায়গায় রুম শেয়ারিং এর পর নিজের মাথা গোঁজার আর একটু নিজেকে একা পাওয়ার তাগিদেই ঘর ভাড়া।
মদনগির বলে যে জায়গাটায় থাকে, একসময় এটি ছিল পাহাড়ি ঢাল। মদনগিরি। এখন সেই ঢাল সমতল হয়ে গিয়েছে, দিল্লির বাইরে থেকে আসা মেহনতি মানুষদের দৌলতে। অনুমতিহীন ঝোপড়িবাসীদের পুনর্বাসনে এই সব জায়গা সমতল করেছে পুর প্রশাসনই। একেকটি পরিবারকে দিয়েছে পঁচিশ গজের প্লট। সমান্তরাল গলির দু পাশে এমন প্লটেই উঠেছে ঘরের সারি। তাঁরই একটির ভাড়াটে নিশানাথ। দুবেলা নিজেই হাত পুড়িয়ে রান্না করে, জল তোলে, বাসন মাজে। এমন মানুষদের জীবনে কোনও গল্প থাকে না, লড়াই করে বেঁচে থাকা ছাড়া। রোজ তাই সকালে এই আট কিলোমিটার রাস্তা সাইকেলে যায়, আবার সন্ধা আটটায় অফিস থেকে বেরিয়ে রেস্টুরেন্টে চা-নাস্তা করে সাইকেলেই ফিরে আসে। তারপর? রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “তারপর ঘরে ফিরে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার!”
ডিফেন্স কলোনির মোড় থেকে মদনগির— পথটুকুর মাঝামাঝি পড়ে চিরাগ দিল্লির মোড়। আড়াআড়ি আরেকটি বড় রাস্তা এখানে ওর পথকে ডান্দিক থেকে এসে বাঁ দিকে চলে গিয়েছে। চার মাথার মোড়। এই সেই ডিফেন্স কলোনি, নিমাই ভট্টাচার্যের উপন্যাসে যা চিরভাস্বর হয়ে আছে। ডিফেন্স কলোনি থেকে চিরাগ দিল্লির চার রাস্তার ক্রশিং পর্যন্ত রাস্তার দু’ ধারে আলোর রোশনাই। গাড়ির বহরে ঝলমল রাজধানী। চিরাগ দিল্লি মোড় থেকে মদনগিরের মোড় পর্যন্ত রাস্তার দু’ ধারে ঘন জঙ্গল। জাঁহাপনা রিজার্ভ ফরেস্ট। এই জঙ্গলে বাঘ ভালুক নেই, কিছু বুনো শেয়াল, খরগোশ আছে বড় জোর। দিনে কেউ কেউ জঙ্গলের খানিকটা ভেতর পর্যন্ত যায় প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজনে। কিন্তু, সন্ধ্যার পর? নৈব নৈব চ। সবাই জানেন, “ওখানে ভুত আছে। কাউকে ধরলে আর ছাড়ে না।”
নিশানাথের ভুতে বিশ্বাস নেই। বন্ধুদের সঙ্গে রাতবিরেতে শ্মশানেও কাটিয়েছে, কমরেডদের সঙ্গে চাষের মাঠেও লুকিয়ে রাত কাটিয়েছে। আজও সে রোজের মতোই সাইকেলে বাড়ি ফিরছিল। কাল রবিবার, ছুটি। তাই আজ মেজাজ বেশ ফুরফুরে। সারা সপ্তাহের পর কাল অন্তত সকাল সকাল ওঠা নেই, তাড়াতাড়ি রান্নার বালাই নেই। তাই অফিস থেকে বেরিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে আমেজ করে সময় দিয়ে টোস্ট চা খেয়েছে। তারপর মনের সুখে সিগারেট ধরিয়ে রেস্টুরেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেয়েছে। রাত নটা বেজে গিয়েছে। বর্ষাকাল, মাঝে মাঝে বৃষ্টি। পথঘাট ভিজে। এমন রাস্তায় জোরে সাইকেল চালানো বিপজ্জনক। ব্রেক ধরতে চায় না। সিগারেট খেতে খেতে সাইকেল চালাবে না বলে একটু দেরিই হয়ে গেল রওনা হতে।
একে বর্ষাকাল, তায় আবার অমাবস্যা। আকাশে চাঁদের আলোর রেশটুকুও নেই। গ্রেটার কৈলাশ পার হতেই তার মনে পড়ল, গত কয়েকদিনে মদনগিরের তিনজন জাঁহাপনা রিজার্ভ ফরেস্টে গিয়ে আর ফেরেনি। একজনকে পাওয়া গিয়েছে গলায় দড়ি দেওয়া। বাকি দু’জনের লাশ পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু কোনও আঘাতের চিহ্ন ছিল না। বিষের কোনও অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি তাদের পাকস্থলিতে। এই দুজনের রহস্যজনক মৃত্যু এলাকায় মুখোরোচক আলোচ্য। আটাত্তুরে নানীজি নিশ্চিত, ‘ভুতে ধরে নিয়ে গেছে ওদের। নাহলে মরবে কেন?’ দশাসই প্রবীণ মহাবীর প্রসাদ, রাগী যুবক হরি বাল্মীকিও দ্বিমত নয়, কিন্তু সরাসরি কোনও মন্তব্যও করতে চায় না – “হোগা কই রাজ। নেহি তো রাতমে গয়া ক্যায়সে!”
চিরাগ দিল্লির মোড় আসার আগে কেন যে এই কথাগুলি নিশানাথের মাথায় এল, সে নিজেও জানে না। আজও কোনও ব্যাখ্যা পায়নি। মোড় পার হওয়ার কিছু পরেই ঘন অন্ধকারে ঢাকা পথ। এই পথে বাসও চলে খুব কম। আর, রাত ন’টার পর তো আরও কম। নানী, হরি, মহাবীরদের কথাগুলি চিন্তা করতে করতে সাইকেল চালাচ্ছিল নিশানাথ। একটা দমকা হাওয়া গায়ের উপর দিয়ে চলে গেল। আর, ঠিক তার পরেই… …।
চ্যাঁ… চ্যাঁ… চিৎকার শুরু হল ঠিক কানের পিছনে। রাস্তায় জনমনিষ্যি নেই। নেই কোনও জন্তুজানোয়ারও। একবার পিছনে ফিরে দেখল নিশানাথ। নাঃ দূরে চিরাগ দিল্লির মোড়ের আলোর বিন্দুগুলি দেখা যাচ্ছে, কিন্তু রাস্তায় তো কেউ নেই! সাইকেল চলছে, আওয়াজও চলছে সঙ্গে সঙ্গে। দুপাশের জঙ্গলে পাতাগুলি নড়ছে, কিন্তু তেমন ঝড়ও হচ্ছে না।
— তবে কি? তবে কি, নানী যা বলছিলেন, সেটাই কি সত্যি! এখানেই নাকি বাঁদী লালকুঁয়ারকে হত্যা করেছিল মোঘল বাদশা। লালকুঁয়ার বাঁদী হয়ে এসেছিলেন, নর্তকী। বাহাদুর শাহ রঙ্গিলা তাঁকে বিয়ে করেন। নাম হয় লালকুঁয়ার। তাঁর নামেই নাকি জাঁহাপনা রিজার্ভ ফরেস্ট। লালকুঁয়ারের তৃষিত আত্মা এখানে ঘুরে বেড়ায়, অন্ধকার রাতে কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে যায়, হত্যা করে। মদনগিরের সবাই সেকথা জানে, সাক্ষ্য দেয়। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে নিশানাথের, তবে কি…!
একটু স্পিড বাড়ায় সাইকেলের। হায়! বিদ্ঘুটে সেই আওয়াজটা আরও জোরে হল! আওয়াজটা সাইকেলের পিছনে পিছনে ছুটে আসছে! ডানপিটে নিশানাথের একটু ভয় হয়, মনে ভাবে, ‘যা রটে। তার কিছু তো বটে! হতেও তো পারে’। চার কিলোমিটার রাস্তার প্রায় দু কিলোমিটার পার হয়ে এসেছে সে। চিরাগ দিল্লি বা মদনগির মোড়ের প্রান্তের আলোর বিন্দুগুলিও দেখা যাচ্ছে না। ঘন অন্ধকারে কোনও প্রাণিই নেই, অথচ কানফাটানো তীব্র সেই শব্দের বিরাম নেই। আরও জোরে… আরও জোরে… প্যাডেল ঘোরাতে থাকে। কী আশ্চর্য! চ্যাঁ চ্যাঁ শব্দটাও একটানা তাঁকে তাড়া করেই চলেছে।
বর্ষার গুমোটে ঘাম তো ছিলই। জোরে সাইকেল চালাতে গিয়ে দর-দর করে ঘামছে নিশানাথ। ভুতটা তাঁকে তাড়া করেই চলেছে। আরও এক কিলোমিটার পেরিয়েও শব্দটা ছুটেই চলেছে। নিজের পায়ের পাতাও যেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, সেখানে তাঁর গতির শেষ সীমায় চালানো ছাড়া উপায় কি? মদনগির মোড়ে যে চা দোকানটা আছে, তার আলোটা এবার দেখা যাচ্ছে। সিগারেট খাওয়া বুকের পিস্টনে হাপরের তাল কেটে যাওয়ার জোগাড়। আরও সাতশো মিটার… ছয়শো… পাঁচশো… চারশো…! “হায় ঈশ্বর”, খানিকটা জোরেই বলে ফেললো সে। “বাঁচাও আমায়…”
নিশানাথের শেষ শ্বাসটুকুও বোধ হয় বেরিয়ে যায়। ‘আর যে পারছি না…’ সাইকেল আরও শ’ দুয়েক মিটার চলার পর পায়ের আর ক্ষমতা নেই। গতি কমে আসছে। নিশানাথের বুকের ভিতরে কেউ হাতুড়ি পিটছে— ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ। আর, আশ্চর্য, আওয়াজটাও কমে আসছে। নিশানাথ কি মারা যাচ্ছে? কানে কম শুনতে শুরু করেছে? ওই তো, মদনগির মোড়ের চা দোকানে কয়েকজন লোক আড্ডা দিচ্ছে। নিশানাথ প্রায় মৃত। সাইকেল থামল এসে চা দোকানে। আওয়াজটা থামল। একটা বিরাট শ্বাস আপনা থেকেই বেরিয়ে এল তাঁর। কোনও রকমে সাইকেলটা পাশের দেওয়ালে ঠেলে দিয়ে ধপ করে দোকানের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লো বুক চেপে। স্ট্যান্ডে তোলার ,অতো অবস্থাও নেই তাঁর। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে। সবার চোখ তাঁর দিকে।
কোনওরকমে এক গ্লাস গরম চা চাইল। একজন হাত বাড়িয়ে জলের জগটা দয়াবশত এগিয়ে দিলেন। ঢক ঢক করে কয়েক ঢোক জল খেয়ে একটু সুস্থ বোধ হচ্ছে তাঁর। চোখে মুখে জল দিয়ে চায়ের কাপটা নিল। চুমুক দিলে চাইয়ের গ্লাসে। পিছনের রাস্তায় চোখ ঘুরছে। না, কেউ তো নেই! তবু সাইকেলটা ছিল বলেই… নিশানাথ ভেবে নিল, … আহা রে, মার অ্যাটলাস…। মায়া নিয়ে তাকাল সাইকেলের দিকে।
– আরে, ওটা কি?
পিছনের চাকার ধুরির সাথে জড়িয়ে আছে, ওটা কি? ভয়ে ভয়ে চায়ের কাপে চোখ ফেরালো, আবার তাকালো।
একটা প্লাস্টিকের ক্যারি ব্যাগের ছেঁড়া টুকরো।
সাইকেল যত জোরে ছুটেছে, ছেঁড়া প্যকেটের ভিতর দিয়ে হাওয়া ঢুকে উল্টোদিকের গুটো দিয়ে বেরোবার মুখে আওয়াজ তুলেছে। ভুত রয়েছে হাওয়ায় আর প্লাস্টিকের প্যাকেটের কম্পনে!
– আউর এক কাপ চাউ দিজিয়েগা ভাই…।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!