কবিতায় চিন্ময় বসু

পাথর ও ফুলের মধ্যে

১|

ধীর শান্ত বিষের ভোরে
আমরা সরীসৃপের ঘুম ভাঙ্গাই।
আমরা পাথর জাগিয়ে তুলি,,
নাছোড় শিকড়, তৃষ্ণার্ত তৃষ্ণা, খনিজ ওষ্ঠ।
এই প্রহরের আলোরা
ধাতব লৌহকঠিন।
অপমানের নির্জন মরু ঠোঁট।
আমার শরীর আমি নিজে ছুঁয়ে দেখি
যেন কাঁটা ফোঁটে বদ্ধ বন্ধ্যা
বাতাসের জ্বর ও শ্বাস ওঠে।
করুণ শিকড় পাথরে জড়ায়।
শীতার্ত জমাট কান্নার আলোর মধ্যে
নিথর উন্মত্ত ক্ষেতের সবুজে
আমাদের মৃত্যু দেখা যায়
নিস্তব্ধ ক্রুরতা আমাদের গিলে খায়।
এর মাঝে আমাদের মরণও
তরবারি হয়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে, বাঁচে মরে
জড় বিশ্বের ওপর ওইটুকু প্রতিশোধে।
সহসা আলো বেড়ে যায়,
পৃথিবী আলোর বন্যায় ভেসে যায়,
আমরা অন্ধ হই,
উষ্ণ বজ্র মুষ্টি, আমাদের ঠোঁট শুকিয়ে যায়, আগুন জ্বলে সবুজ বাগানে, অরণ্যে
প্রাণ বাঁচাতে বাঁচাতে আমাদের
পুনর্জীবিত তৃষ্ণা উবে যায়।
আলো ছাড়া কিছুই নেই
উষ্ণ তীব্র উন্মত্ত আলো।
আলো ভেঙ্গে যায়, বুদবুদ থাকে না।
জলের শব্দ পাই,
অস্পৃশ্য পাথরের গুহার জল।
ভয়ানক সুড়ঙ্গ, আলো নেই,
আর্তির বিভীষিকার জল,
বিনীত ভেজা জিভ নিয়ে
আমি কারাগারে থাকি।
সন্ধ্যে হলে কুয়াশা নামে,
বোবা পাখি ঘরে ফেরে,
মেঘ নিঃসীম আকাশে
ঠান্ডায় জমা মাটির উপরে।
রাতে জল গুমরায়,
ধাতব আকাশ বুকের শিরার প্রণালী চেপে ধরে, দিগন্ত নিমজ্জিত, কাঁপে,
জল গর্জায় কাতরায়
আমরা মৃত্যু থেকে ঘুমে চলে যাই।
বাগানের গাছগুলি স্বর্গ মর্ত্য দেখে যায়
পৃথিবীর প্রতিশোধ নিতে মানুষের ক্ষমতায় স্বর্গের বিরুদ্ধাচারে।

২|
এ কোন দেশ জানতে ইচ্ছে করে। কোন অদ্ভুত হিংস্রতা এর পাথরের দেওয়াল উপভোগ করে?
কি রকম ঠাণ্ডা দৃঢ়তা; বছর ভর শীতল অগ্নি, জমাট একগুঁয়ে লালা, কিভাবে রস, তন্তু, কাঁটা জমিয়ে তোলে।
প্রাক ইতিহাসের প্রদেশ ছিল, পৃথিবীর আগুনের পতাকা, জলের স্ফটিকের আগে থেকে, প্রস্তর যুগ ছিল মৃত্যুর জন্ম হওয়ার আগে, সেই আজ জ্বরের আঁখি পল্লব, নিদ্রাহীন ঠোঁট, ছিল তৃষ্ণা অশেষ, অন্তহীন বালুকাবেলায় পাথরের শ্রেণী ছিল সাগরের পার।
পৃথিবী আর কি এমন দিয়েছে, কেবল মৃত্যু ফুল, পাতার তরবারী। এর ওপর নির্ভর করে
মানুষ জীবন। নিষ্ঠুর তৃষ্ণা নিষ্ঠুর তন্তু বেয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গ থেকে উঠে আসে পার হয় সময়হারা বিস্মৃতির শক্ত পরত ।
ফুঁসে ওঠা ধীর বৎসরগুলি ঘন,
যেন খরচা হয়নি, গাড় সবুজের ভিতর থেকে উপচে বেরিয়ে আসা লুকোনো কান্না
যেন বাতাসকে ছিঁড়ে ফেলে দলা পাক,
আটকে আসা নরম মাংস পিন্ড
যে ডিম আটকে দেয়।
পঁচিশটি তিক্ত বছরের পর
একটি লাল স্থির ফুল উঠে আসে।
যৌনতার জাদু কাঠি তাকে ভাসিয়ে দেয়
স্থির দ্বীপের মত যেন প্রস্তরীভূত ঠান্ডা নিস্তব্ধ জমাট ফেনা!
ওহ ছিদ্রান্বেষী ঐশ্বর্য্য,
এই শুষ্ক নরকের একমাত্র আলো
এত জ্বর আসে তোমার দৃঢ় শিখায়,
নগ্ন, মৃত্যু সংগীত।

৩|

যদি সম্ভব হত
তৃষ্ণার আলোকিত তটে
আমি তার জন্যে গাইতাম যে এখানে থাকে। আর তৃষ্ণা যাকে পোড়ায়।
বৃষ্টির মত ভেজা একগুঁয়ে মানুষ
অস্বাভাবিক সুন্দর গাছের মানুষ
কান্নায় যে জীবন শুরু করে।
যে মানুষ নদীর মাঝে ফুলকি,
পাখী আর বজ্রের মত তার শেষ আর
এই ফলের ভিতর।
পৃথিবীর ফল তো মানুষের শেষ,
সে তার ফুলে ওঠা লবণ
মহাজাগতিক লবণের সঙ্গে মেশায়
সাগরের লবণের চাইতে তো তা অনেক কোমল।
আদম রক্তের সাথে তাকে দিয়েছে
এই গর্বিত শাসন।
কে সে ভিতরে বসে আমার ত্বকের গভীরে
এই জন্ম এই রাত্রিভয়, এই বিশাল প্রভাব পৃথিবীর জন্ম মৃত্যুর ওপরে।
প্রথম নৈঃশব্দ্য থেকে শেষ নিঃশব্দে
পাথর থেকে ফুলের মাঝে হেঁটে যাও তুমি।
আবার তুমি হাওয়ার এক ঝোঁকা
এক ভাসমান নৈঃশব্দ। যেমন নিঃসাড়ে রক্ত গড়ায়, যেমন বিস্মৃত ধোঁয়া, জল।
নিথর অগ্নিশিখা তোমায় বাঁচিয়ে রাখে, তরবারীর মাঝখান দিয়ে চলে যাও
অদৃশ্য, মসৃণ আকাশের কাঁপন দিয়ে,
ছোট নরম পায়ের জান্তব ভয়ের
পালিয়ে যাওয়া দৌড় তোমার সাথে রইলো।

চলছ ফিরছ, ঘুম ও রমন, নাচ,পানভোজন ও স্বপ্ন বাড়িয়ে নিচ্ছ
অপর ঠোঁটের গাড়তায় ঘুমে।
কেউ একাকী তোমার কথা ভাবলো, ভালোবাসল। তোমার নাম ধুলো, পাথর,
তৃষ্ণার্ত ধুলোয় তোমার ধ্বংস
অধ্ক্ষিপ্ত হতে থাকে।

কিন্তু এতো গ্রহের অন্ধ ছন্দ নয়, প্রতিদিন জন্মায় আর রাতের অবশেষ নিয়ে ক্লান্ত জেগে হেঁটে চলে পৃথিবীর বাতাসে।

৪|

টাকাকড়ি ঘোরে ওড়ে তোমায় দেখে না,
ছোঁয় না শুধু খুলে ফেলে উলঙ্গ করে।
পৃথিবীর দেবদূত স্বপ্নের মত পবিত্র,
তুচ্ছ দূর জল, বর্জিত ও নিরাপরাধ শিশু এবং অর্থের নিখাদ সময়ের মাঝখানে আদি প্রাণী। অপর সময় কখনো নিজের ছিল না।
নয়তো ভাবো সেই আগ্রাসী একঘেঁয়েমি আর রক্ত ক্ষরণের স্থির সময়ের কথা।
জাদুকর অর্থ, অদৃশ্য সম্পদ,
শুন্য অথচ অমোঘ চিহ্ন,
রহস্য, রূপ, তরবারী ও আংগুঠি।
শুধু জল, আর ধুলো আর বৃষ্টি,
তিক্ত সূর্য, মেঘ থেকে নির্জন সমুদ্র। বাতাসখেকো আগুন,
যেন শুধু দিন আর রাত
ডোরা কাটা অনন্ত একা
বনানীর পাশে জিভ চাটে,
জিঘাংসা লেজ কামড়ায়।
সুন্দরী অর্থ এনে দেয় বিস্মরণ,
গানের দরজা খোলে, কামনার দরজা বন্ধ হয়।
মৃত্যু মৃত্যু নয়, ছায়া, স্বপ্ন,
টাকার কোনো স্বপ্ন নেই।
হাড়ের ওপর গজায় মানুষের হাড়।
আর তুমি ফুলের মত তাকে নিয়ে
এক লাফে এই বন্ধ্যা নরক পার করতে করতে সময়ের শিকলে বাঁধা পড়ে যান্ত্রিক দৌড়ে।
ফাঁপা চাকা আমাদের
নিংড়ে শুষে নিয়ে ভাগায়, রক্ত শুকিয়ে যায়,
আমাদের রোদন স্থল আমাদের হত্যা করে।
কারণ অর্থের মোহ অনন্ত, অনন্ত মরুভূমি।

৫|

আরো আরো দাও অদৃশ্য আগুন,শীতল তরবারী, তোমার স্থায়ী ক্রোধ। সব শেষ করতে। ওহে আমার শুষ্ক পৃথ্বী, রক্তাক্ত বিশ্ব, সব শেষ করতে।
জ্বলবে, ধিকিধিকি, শিখাহীন অগ্নি, নিরেট জ্বলন্ত, ছাই আর জ্যান্ত পাথর, সীমাহীন তীরভাঙ্গা বালুকার মাঠ, মস্ত আকাশে জ্বলবে, চিহ্নিত পাথর ও মেঘ, নির্জন পাথরের চাপে অন্ধ আলো সংকুচিত হব। একাকী জ্বলনে হবে মুক্তি, পোড়া পাথরের,বরফ শীতল পিপাসার্ত শিকড়ের দেশে।
সব পোড়ে, লুকোনো রাগ পাগল করে ছাই,অদৃশ্য জ্বলে, অসহায় সাগরের মতো, মেঘকে যৌবনবতী করে ঢেউ তোলে পাথুরে ফেনায়। ভ্রমের হাড়ে, শূন্য ফাঁপা বাতাসে, গোপন চুল্লিতে সময়ের মত পোড়ে। মৃত্যুর মাঝখানে যে সময় হেঁটে চলে যায় শ্বাসের মত সহজ ছন্দে সোজা পদক্ষেপে
আগ্রাসী একাকীত্ব পোড়ে, পুড়ে যায়।
অবয়ব ওষ্ঠ বিহীন। শুষ্ক পৃথিবীকে
শেষ করতে,
সব কিছু শেষ করতে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।