Cafe কাহিনী -তে তুষ্টি ভট্টাচার্য

আফ্রিকায় যাব এবার 

আফ্রিকা বলতেই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেরেঙ্গেটির জঙ্গল। পাল পাল পশু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে, বা এক দল হরিণের পেছনে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক বাঘের সতর্ক নজর, ঘুমিয়ে পড়ার আগে সিংহর বিশাল হাই তোলার দৃশ্য অথবা গাছের ডালে চিতার লেজ ঝুলিয়ে বসে থাকা! অথবা ঘন জঙ্গলের ভেতরে কোন আদিবাসী গ্রামে আগুন ঘিরে এক দল আধা ন্যাংটো নারীপুরুষের হুল্লা হুল্লা নৃত্য! ডাইনী বিদ্যা, তুকতাক, ব্ল্যাক ম্যাজিকের দেশ আফ্রিকা, গোবি মরুভুমির দেশ আফ্রিকা,চাঁদের পাহাড়ের দেশ আফ্রিকা – এই তো ধারণা ছিল মাত্র! ‘পরে চমৎকৃত হলাম’! অনেকটা আমাদের দেশের মতই শুরু। প্রথমে শ্রুতি নির্ভরতা, তারপর সেই শ্রুতির ওপর ভিত্তি করে লেখার হরফের প্রবেশ। আর বেশিরভাগ সাহিত্যের বিষয় ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক। পরবর্তীকালে সমসাময়িক প্রসঙ্গ এসেছে, বৃটিশ বা পাশ্চাত্যের উপনিবেশ তৈরি হওয়ার ফলে সেখানকার আধুনিক সভ্যতার সুফল যেমন আমাদের দেশও পেয়েছিল, আফ্রিকাও সেরকমই ফল পেয়েছে। আর তারপরেই এসেছে রেসিজম, নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির সংঘাত। আমি মোটামুটি ভাবে আফ্রিকার সাহিত্যের শুরু থেকে এই সংঘাতের সময় পর্যন্ত চলনটা ধরার চেষ্টা করেছি আমার লেখায়।
আফ্রিকান সাহিত্য মূলত প্রথাগত মৌখিক উপাদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই উপাদান ও পরবর্তীকালে ও অ্যাফ্রো-এশিয়াটিক এবং আফ্রিকান ভাষায় যে লিখিত সাহিত্য রচিত হয়েছে – এই দুইয়ের মিলিত ফসল রয়েছে আফ্রিকান সাহিত্যের ভান্ডারে। প্রথাগত লিখিত সাহিত্য সীমাবদ্ধ ছিল খুব ছোট ভৌগলিক অঞ্চলে, যা কিনা সাব-সাহারান কালচারের অঙ্গ এবং এর উৎপত্তি আবার মেডিটেরেনিয়ান কালচার থেকে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, উত্তর নাইজিরিয়া ও সোমালির পন্ডিতরা হওসা এবং আরবি ভাষায় প্রথাগত সাহিত্য সৃষ্টি করেছিলেন। এছাড়াও ইথিওপিয়া অঞ্চলের দুটি ভাষা, গি’জ ও অ্যামহারিক-এ লেখা হয়েছিল কিছু সাহিত্য। প্রসঙ্গত, ইথিওপিয়া অনেক আগে থেকেই খ্রীস্টান সভ্যতার ছোঁয়া পেয়েছিল। বিংশ শতক থেকে ইউরোপিয়ান ভাষায় আফ্রিকায় সাহিত্যের কাজ শুরু হয়। প্রথাগত মৌখিক ও লিখিত সাহিত্য এবং আধুনিক মৌখিক ও লিখিত সাহিত্যের মধ্যে সেতু তৈরি করতে গেলে এখন আমাদের যোজন দুরত্ব হাঁটা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। এই সম্পর্কের জটিলতা ভেদ করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয় মোটেই।
প্রথমেই আসি মৌখিক প্রথার কথায়। কথকের ভূমিকাই এখানে প্রধান। তিনি বলবেন, সময় থমকে যাবে, আর শ্রোতারা পৌঁছে যাবে ইতিহাসে। যে বর্তমান আমাদের সামনে উপস্থিত, সেই বাস্তবকে তিনি পিছিয়ে নিয়ে যাবেন অতীতে। সময় যেন মুখোশ পরে নেবে তাঁর কথায়। তিনি ও শ্রোতারা তখন সেই ইতিহাসের পাতায় চলে গেছেন। কথক তাঁর কথা-শিল্প দিয়ে, তাঁর বর্ণিত রহস্য, অনুষঙ্গ, উপমা দিয়ে সেই সময়কে এমন ভাবে বর্ণনা করতেন যে, শ্রোতাদের অবচেতনে সেই ইতিহাস প্রবেশ করে যেত। তারা তখন ক’পাতা ইতিহাস মুখস্থ করছে না, তারা তখন সেই ইতিহাসের সাক্ষী ও ইতিহাসের চরিত্র। এইভাবে দীর্ঘদিন স্মৃতিতে বহন করা হত ইতিহাস বা অন্য বিষয়গুলি। যা আধুনিক তথ্য নির্ভর জ্ঞানের থেকে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ছিল।
সেই কথকতা ছিল জীবন্ত এক প্রক্রিয়া, যা সময়কে কঠিন হতে দিত না। গল্পগুলো সাময়িক ভাবে সমাহিতও হয়ে যায় না, সবসময়ে বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, কিন্তু সেই চলন থাকে সময়হীনতার সাজে। এই কারণে এই গল্প বলা শুধুমাত্র স্মৃতিনির্ভর হয়ে থাকে না। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তায় ক্রমাগত বাস্তব ও অতিবাস্তবের সঙ্গে মিশে যায় এই গল্পগুলো। বক্তা বর্তমান থেকে ছবি নিয়ে সেই ছবিগুলি বেঁধে দেয় অতীতের সঙ্গে। ফলে শ্রোতার চোখে অতীতের ছবিগুলো নিত্যনতুন আকারে তাদের বর্তমানের অভিজ্ঞতায় নতুন হয়ে ধরা দেয়। বক্তারা সবসময়ে মানুষের সুখ, দুঃখ, সমাজ, পৃথিবী, আচার-আচরণের খোঁজখবর রাখতেন। এবার সেই বক্তার শিল্পী সত্ত্বা সুতো তৈরি করতেন, গল্পকার সুতোটা বেঁধে দিতেন। আর এই বাঁধন ছিল অতীত ও বর্তমানের, মানুষের সঙ্গে তার ঈশ্বরের, তার নেতা, তার সংসার, তার ভালোবাসা, তার আশা ও আশা ভঙ্গের ভয়ের, তার সমাজের নিত্য প্রয়োজনীয়তা ও বিশ্বাসের।
বক্তা গল্প বলার সময়ে কিছু ছবি, কিছু ছবির স্কেচ, হাতের কাছে রাখতেন। এছাড়া যখন যেমন দরকার নিজের গলা বদলে অভিনয় করতেন। তাঁর স্মৃতিতে থাকত অতীত এবং সামনে থাকত শ্রোতাদের বর্তমান মানসিক অবস্থান। যে গল্পটি বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে শ্রোতাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, কল্পনা ও কথকের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার মিশ্রণে যে নতুন গল্প তৈরি হত, সময়ের কাছে তা হয়ে দাঁড়াত এক নতুন সময়ের অভিজ্ঞান। কথক কখনই তাঁর গল্পটিকে পুরোপুরি আঁকতেন না, কিছুটা তৈরি করে ছেড়ে দিতেন পূর্বোক্ত ঘটনার ওপরে। ফলে সেই গল্প কখনই ইতিহাস হত না, ইতিহাসের ছায়া নিয়ে, বর্তমান ও কল্পনার বুনোনে এক নিত্য নতুন গল্পের সৃষ্টিধারা বয়ে চলত। এক রূপক বা মেটাফোর-এর জন্ম হত। মিথ-এর ধারণাও থাকত এবং প্রায় প্রত্যেক গল্পেই ঈশ্বরকে প্রধান ভূমিকায় রাখা হত প্রথমটায়। এরপরে পরিবর্তন ঘটে চলত নিত্য নতুন ভাবে। যুদ্ধের গল্পে যেমন হিরো থাকত একজন, পরে ক্রমশ বদলে যেত পাত্র-পাত্রীর ভূমিকা। প্রত্যেক মৌখিক প্রক্রিয়াগুলি ইতিহাসের ছায়ায়, এক কল্পিত দৃশ্যের ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করত এক একটি রূপক বা মেটাফোর। আফ্রিকান স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা নির্ভর এই সংস্কৃতি থেকেই উঠে এসেছিল এক আন্তর্জাতিক শিল্পের রূপ।

হেঁয়ালি 

     এবার হেঁয়ালির কথায় আসি। হেঁয়ালি বা রিডল-এর দুটি উদাহরণ দিই আগে।
               মুখ নেই তবুও কলস – (একটি ডিম)
              যে লোকটা নিজের পেট নিজেই টানছে – (ছুঁচ-সুতো)
  • হেঁয়ালিগুলোতে সাধারণত দুটি অসম বা প্রায় অসম বস্তুর তুলনা করা হত। এক্ষেত্রে একটি জিজ্ঞাসা বা সমস্যা তৈরি করা হত এবং সব শেষে তার সমাধান বা উত্তরও খুঁজে পাওয়া যেত। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এটাই যে দুটি করে হেঁয়ালি থাকত এবং উত্তর খোঁজার সময়ে একটির উপাদান অন্যটির দিকে নিয়ে যাওয়া হত। অবশ্যই এই হেঁয়ালিগুলোয় কোন কাব্যিক ব্যাপার থাকত না, সমস্তটাই ছিল বুদ্ধির খেলা মাত্র। এই দুটি হেঁয়ালি তৈরির সময়ে কল্পনা ও উদ্বেগগুলোর সঙ্গে শ্রোতার কল্পনা ও উদ্বেগ মিশে যেত। হেঁয়ালির উত্তর খুঁজতে তারা যত চেষ্টা করত, ততই তারা একে একে নিজেরাই সেই হেঁয়ালির অংশ হয়ে উঠত। ফলে এখানেও সেই রূপকের মাধ্যমে পরিবর্তন বা  মেটাফোরিকাল ট্র্যান্সফরমেশন সৃষ্টি হয়ে যেত। যদিও এই হেঁয়ালিগুলো খুব একটা জটিল ছিল না, তবুও এগুলোর দুটি দশা – আক্ষরিক ও আলংকারিক-এর মধ্যে একটা সৃষ্টিশীল সম্পর্ক স্থাপন হত। ফলে এই রূপককে যত সহজ ভাবা যাচ্ছে, আদপে দেখা গেছে এরা ঠিক অত সহজও নয়।

লিরিক বা গান 

আফ্রিকান গানগুলি সাধারণত কবিতার মধ্যে রূপকের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করে থাকে। তাই ওই হেঁয়ালিগুলোকে এই লিরিকের মোটর বলা যেতে পারে। লিরিকে একজন গায়ক যদি এক গুচ্ছ হেঁয়ালিকে এক কবিতার বয়ানে আনেন, তো তার কৃতিত্ব কিন্তু ওই হেঁয়ালি বা রিডলেরও কম নয়। গায়ক প্রত্যেকটা রূপককে একে একে সাজিয়ে সেই কবিতায় পূর্ণতা আনে, এরপর শ্রোতার আবেগকে জড়ো করে ও ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ করে এই পদ্ধতিতে। তখন আর একটাও হেঁয়ালিকে আলাদা করে খুঁজে পাওয়া যায় না। হেঁয়ালির অর্থ লিরিকের ভেতরে ভেতরে বিক্রিয়া ঘটায়, ঘনীভূত হয় ক্রমশ। আর তখনই গায়ক শ্রোতাদের মনে কবিতার নিহিত অর্থটিকে গেঁথে দিতে সক্ষম হন। এরপরেও কবিতার ছন্দের অনুপ্রাস, কবির বর্ণিত চিত্রকল্প, হেঁয়ালির সংগঠিত হওয়া এবং গায়কের কন্ঠ, তার শরীরের ভাষা আবিষ্কার বাকি থেকে যায়। রিডলের মত এই লিরিকও মেটাফোর বা রূপকের দিকে ঝুঁকে থাকে।

প্রবাদ 

মাটি নরম থাকতে থাকতে ঘড়া বানাও।
জ্ঞান জ্ঞানীকে খুন করে।
আফ্রিকান প্রবাদগুলো প্রাথমিক ভাবে বস্তাপচা অনুভূতিকে প্রকাশ করে থাকে, কিছু মামুলি শব্দ বারবার ব্যবহারে যতক্ষণ না ক্ষয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রবাদগুলোও কর্মক্ষম, আর রূপকও বটে। ফলে এগুলোর কাজ আর রূপক একসঙ্গে মিলে ক্ষমতা পেয়ে যায়। এক দিক থেকে দেখতে গেলে এই প্রবাদগুলো অনেকটা হেঁয়াল ও গানের মত এবং অন্য এক অর্থে এগুলোর ভেতরে ভবিষ্যৎ উপন্যাসের বীজ পাওয়া যাবে। প্রবাদগুলো আসলে রূপকের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের শ্রোতাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে।

গল্প 

হেঁয়ালি, গান আর প্রবাদ এই সবগুলোর উপাদানই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে থাকে। হেঁয়ালির মধ্যে রূপকের যে সম্ভাবনা থাকে, প্রবাদ সেগুলোর ব্যাখ্যা করে রূপকের ধারণাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। গল্পের ছবিতে তখন ধরা দেয় গানের ছন্দ ও সুর। আর এই ছবিতে থাকে দুটি ধারা। একটি হল প্রচলিত অর্থাৎ বাস্তবিক পটভূমিকা আর একটি হল প্রাচীন ঐতিহ্য অর্থাৎ কাল্পনিক জগত। এই দুটি বিপরীত ধারাকে গল্পকার একসঙ্গে ছন্দে বেঁধে দিয়ে বলতে থাকেন। কাল্পনিক চিত্রের সঙ্গে শ্রোতারা নিজেদের আবেগ মিশিয়ে ফেলতে পারতেন, আর এই আবেগই হল একটি রূপকের সৃষ্টির কাঁচা উপাদান। ফলে এই গল্প তৈরির জটিল প্রক্রিয়ায় অনেকগুলো সরল উপাদান ও বাস্তবের মেলবন্ধন হত। একটি গল্প তৈরির প্রথমে এক আদর্শ সৃষ্টি করা হত। এবং তারপর একের পর এক উপাদান মিলিয়ে গল্পটি সম্পূর্ণ হত।
জটিল গল্পের ক্ষেত্রে গল্পকার দুটি চরিত্রকে তিনটি বিভিন্ন রকমের জগতে ছড়িয়ে দেন। ফলে বিভিন্ন দৃশ্য, বিভিন্ন ঘটনা, ভিন্ন ভিন্ন রূপকের মাধ্যমে সুরে বাঁধা হতে থাকে। গল্পটির চরিত্র গুলো আর সরল থাকে না, একে অপরের সঙ্গে আলাদা আলাদা সুতোয় জড়িয়ে থাকে। আর সেটাও হয় রূপকের মধ্য দিয়ে।  এভাবেই এক মহাকাব্যর সম্ভাবনা রয়ে যায় সরল গল্পের মধ্যে আর জটিলের মধ্যে থেকে যায় উপন্যাসের আখ্যান।

বীর গাথা 

বীরগাথা বা স্তুতি (panegyric) –তেও গান আর দৃশ্য একসঙ্গে মিশেছে। যেমন হেঁয়ালি, প্রবাদ, গল্প ও গানে রূপক এসেছে, এখানেও রূপকের কাঠামো থেকে যাচ্ছে। এখানে একজন বীর বা হিরো থাকেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে, যাকে ঘিরে যাবতীয় কল্পনা, গান বা কাল্পনিক আবহ তৈরি হয়। এটিও এক দ্বৈত প্রক্রিয়া। ইতিহাসকে নতুন করে বর্ণনা করা হচ্ছে একদিকে, অন্যদিকে বর্তমানের অভিজ্ঞতা মিশে যাচ্ছে এই বর্ণনায়।

মহাকাব্য

মহাকাব্য বা এপিক তৈরি হয় বিভিন্ন অসম্পর্কিত গল্প, নানান রকম রূপক, হেঁয়ালির নিয়ন্ত্রণ মূলক গঠন এবং গান, প্রবাদ ও বীরগাথার সংমিশ্রণে। এখানেও কেন্দ্রীয় চরিত্রে একজন বীর থাকেন। কিন্তু যত কাহিনী এগোতে থাকে, এই বীর নানা ভাবে সমস্যার মুখোমুখি হন, যেভাবে একটি জীবনে মানুষ নানা দিক পার করে আসে, সেভাবেই। এই বীরকে কখনো ধ্বংসের মুখে পড়তে হয়, মানসিক বা শারীরিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হয়, দুঃখ, দৈন্য, দুর্দশার মধ্যে এক সংগ্রাম পূর্ণ জীবন কাটিয়ে তিনি আবার নতুন ভাবে বেঁচে ওঠেন, নতুন জ্ঞান লাভের মধ্যে দিয়ে তাঁর নতুন জীবন কাহিনী শুরু হয়। এই অতি-পরিবর্তন বা মিথিকাল ট্রান্সফর্মেশন সম্ভব হয় সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের হাতেই। এই মহাকাব্যে ইতিহাস থাকে, স্থান,কাল, পাত্রের ভূমিকা থাকে, তারপরেও এক সংঘর্ষ মূলক কাহিনী থেকে যায়। এই কাহিনী গুলো ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক জগতের মেলবন্ধন ঘটায়। এক কথায় বলা যায় – গল্প, বীরগাথা, ইতিহাস ও মিথ একযোগে মিলে এক মহাকাব্যের সৃষ্টি করে। কেন্দ্রীয় চরিত্রটি ইতিহাস নির্ভর হলেও তার মানসিক অবস্থান বিশ্লেষণ করা হয়, অর্থাৎ ইতিহাসকে সমসাময়িক দৃষ্টভঙ্গী দিয়ে, মানবিক রূপ দিয়ে দেখা হয়। আর বর্ণনার সময়ে রূপকের ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী হয়ে থাকে।
মৌখিক ও লিখিত কথকতার ঐতিহ্য কিন্তু পাশাপাশি চলেছে। এবং একে অপরের ওপর প্রভাবও ফেলেছে। প্রাচীন মিশরীয় লিপি বা প্রথমদিকের হওসা ও সোয়াহিলি ভাষার সমসাময়িক স্মৃতিধর ও বর্ণনাকারী জনপ্রিয় উপন্যাস লেখকরাই মৌখিক সাহিত্যের ধারা থেকে লিখিত ধারায় সাহিত্যের পট পরিবর্তন করেন। এরপরে ধীরে ধীরে উত্তর ঘানার ফুলানি, সেনেগালের গুয়াং, ওলফ-এর তুকুলর প্রজাতিরা এবং সোমালিয়া ও মাদাগাসকরেও লিখিত সাহিত্যের অনুপ্রবেশ ঘটে। লিখিত ও মৌখিক সাহিত্যের মাঝে এক মিশ্র সাহিত্যের সূত্রের খোঁজ পাওয়া যায়। যেমন – লিটারেচার, নাইজিরিয়ার অনিতশা মারকেট লিটারেচার, আক্রা ঘানার জনপ্রিয় কল্পিত কাহিনী, নাইরোবির জনপ্রিয় প্রেম ও গোয়ান্দা গল্প গুলো, কেপ টাউনের দোকানে পাওয়া যেত। তবে এই সূত্রে জনপ্রিয় লেখার পাশাপাশি কিছু জটিল ও সিরিয়াস লেখারও খোঁজ পাওয়া গেছে। আর এও মানতে হবে আফ্রিকান কোলোনি গঠন হওয়ার পরেই ক্রিশ্চিয়ান ও মুসলিম ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটে, ফলে আরবি, ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ ও পর্তুগীজ সাহিত্যের আধুনিকতার প্রভাব আফ্রিকার সাহিত্যকে আরও উন্নত করে তোলে। আর সব থেকে বড় কথা এই যে, আফ্রিকার সাহিত্যিকরা কারুর অন্ধ অনুকরণ করেন নি, বরং উল্লিখিত সমস্ত ভাষার সাহিত্যকর্মকে নিজেদের ঐতিহ্য অনুসারে নিজেদের ফ্রেমে ফেলে লিখেছেন।

হিস্ট্রি ও মিথ 

মৌখিক সাহিত্যের মতই লিখিত সাহিত্যেও বাস্তব ও কল্পনার জগতের মিশেল ছিল। একদিকে যেমন সমসাময়িক জীবন ও ইতিহাস, অন্য দিকে তেমন মিথ ও হিরো – আর রূপকের মাধ্যমে এই দুই জগতের মিশ্রন ঘটেছে এখানেও। এখানেও লেখক ইতিহাসের ঘটনাকে বাস্তবের সঙ্গে মিশিয়ে নতুন এক ইতিহাস রচনা করছেন এবং নিজেও সেই ইতিহাসের এক অঙ্গ হয়ে উঠছেন।
সিরিয়াস সাহিত্যেও দেখা গেছে কাল্পনিক চরিত্রগুলো মৌখিক সাহিত্যের যুগ থকে আনা হচ্ছে। শেখ হামিদাউ-র ‘কেন’স অ্যামবিগাস অ্যাডভেঞ্চার’ (১৯৬১)-এ যেমন বোকার চরিত্র আনা হয়েছে, নুউগি ওয়া থিওং-এর ‘এ গ্রেন অফ হুইট’(১৯৬৭)-এ যেমন আনা হয়েছে কিহিকার চরিত্র, যে আসলে এক মিথিকাল মুগো, ড্যান অ্যান্ড সেলোকে আনা হয়েছে বেসি হেড-এর ‘এ কোয়েশ্চেন অফ পাওয়ার (১৯৭৩)-এ। আল-তাইব সালিহ-র ‘সিজন অফ মাইগ্রেশন টু দ্য নর্থ’(১৯৬৬)-এ যেমন আনা হয়েছে মুস্তাফার চরিত্র।
    বিংশ শতাব্দীতে মৌখিক ঐতিহ্য বহনকারী যে কজন আফ্রিকান সাহিত্যিকের নাম মনে রাখতেই হবে তাঁদের মধ্যে নাইজিরিয়ার অ্যামোস টুটুওলা, ইওরুবার ডি ও ফাগুনোয়া, জুলুর ভায়োলেট ডুবে, হওসা-র এস ই কে ম্যাকহাই, পরতুগীজের মারিও আন্তোনিও উল্লেখযোগ্য।
ইথিওপিয়ান সাহিত্যে বেশ কিছু ভাষায় রচনা হয়েছে, যেমন গিজ্‌, অ্যামহারিক, টিগ্রিনিয়া, টিগের, ওরোমো, হারারি প্রভৃতি। বেশিওভাগ অবশ্য গিজ্‌ আর অ্যামহারিক-এ। গিজ্‌ এক ক্লাসিক ভাষা, যার ব্যবহার সাধারণ মানুষ কম করেছে। সাধারণ চলিত ভাষা হিসেবে তাই অ্যামহারিকের ব্যবহার বেড়েছে। ১৩শ শতাব্দীর সময়ে গিজ্‌-এর প্রচলন ছিল সাহিত্যের ভাষা হিসেবে। শেবা-র রাণী মাকাদা ও সলোমনের পুত্র মেনেলিক-এর জন্ম ও ইথিওপিয়ার রাজা হওয়ার কাহিনী ‘দ্য কেব্রা নাগাস্ত’ (গ্লোরি অফ কিং) লেখা হয়েছিল ১৩১৪ থেকে ১৩২২ সালের মধ্যে, একদম প্রথম দিকের গিজ্‌ ভাষায়। এই ভাষায় কিছু ধর্ম নিরপেক্ষ কবিতা লেখা হলেও বেশির ভাগ কাহিনী ছিল ধর্ম ভিত্তিক ও রাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী বার্তা মাত্র। ১৫-র শতকে ‘তা’আম্রা মারিয়াম’ (মিরাকেলস অফ মেরি) লেখা হয়েছিল, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল। আরবিক থেকে কিছু অনুবাদও হয়েছে এই সময়ে।
১৯শতকের শেষে মিশনারিরা প্রিন্টিং প্রেস নিয়ে আসে ইথিওপিয়ায়। ১৯১০-১১ সালে অ্যামহারিকে ‘দ্য মিস্ট্রি অফ ট্রিনিটি’ প্রকাশিত হয়। ১৯২৪-এ খবরের কাগজ ছাপা হয়, আর ১৯২৫ থেকে ইউরোপিয়ান সাহিত্যকর্ম অনুবাদ শুরু হয়, যার মধ্যে জন বুনিয়ান-এর ‘দ্য পিলগ্রিম’স প্রগরেস’ অ্যামহারিকে অনুবাদ করেন গাব্রা গিওরজিস তেরফে। এই অনুবাদ পরবর্তী কালে অনেক অ্যামহারিক সাহিত্যয় প্রভাব রেখে গেছে। দুজন লেখক অ্যামহারিক লিটারারি ফাউন্ডেসন তৈরি করেন। প্রথম অ্যামহারিক উপন্যাস হল ‘লিব-ওয়াল্ড তারিক (১৯০৮, অ্যান ইমাজিনড্‌ স্টোরি), লেখক – আফাওয়ারক গাব্রা ইয়াসুস। Tekle Hawaryat Tekle Maryam( 1911), Yoftahe Niguse, and Menghistu Lemma নাটক লিখেছেন সমসাময়িক ইস্যুর ওপর ভিত্তি করে। ইথিওপীয়ার সম্রাটকে তুষ্ট করে কবিতা লেখা হয়েছে কিছু এসময়ে। Gabra Egzi’abeher যদিও জীবনের কথা লিখেছিলেন কবিতায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যামহারিক লেখকের উত্থান হয়। Mekonnin Indalkachew-এর ‘ Silsawi Dawit (1949–50); “David III”), Ye-dem zemen(1954–1955; “Era of Blood”),  T’aytu Bit’ul (1957–58) – ছিল ঐতিহাসিক উপন্যাস। Girmachew Tekle Hawaryat লিখেছিলেন ‘আর্য’(1948–49), যে উপন্যাসে এখানকার বাসিন্দা আর্যরা ইউরোপে গিয়ে কেমন ভাবে টিকেছিলেন, এদেশে আদৌ ফিরবেন নাকি ওখানেই থেকে যাবেন ওঁরা এই দোলাচল নিয়ে লেখা হয়েছিল এই জনপ্রিয় উপন্যাস। দুই প্রজন্মের অন্তর্গত দ্বন্দ্বও ছিল এই কাহিনীতে।  Asras Asfa Wasan ঐতিহাসিক ঘটনার ভিত্তিতে উপন্যাস ও কবিতা লিখেছিলেন, যখন ১৯৬০সালে ডিসেম্বরে সম্রাট Haile Selassie I-এর বিরুদ্ধে মিলিটারিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।
হওসায় প্রথম উপন্যাস লেখা হয়েছিল ১৯৩৩-এ, যখন উত্তর নাইজিরিয়ার ট্র্যান্সলেশন ব্যুরো এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। এক বছর বাদে এই ব্যুরো মহম্মদ বেলো-র লেখা গান্ডোকি নামের উপন্যাসটি প্রকাশ করেন, এখানে গান্ডোকি ছিল নায়ক যে ব্রিটিশদের অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। বেলোর এই উপন্যাসটি ছিল যেমন মৌখিক সাহিত্যর বীরগাথার অনুষঙ্গে লিখিত সাহিত্যে প্রবেশ, তেমনই ইসলামিক ইতিহাসের এক নব যুগের সূচনাও।
শোনা ভাষায় প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৫৬সালে, সলোমন এম মুতসারিওর ‘ফেসো’ – এটিও ছিল এক ঐতিহাসিক কাহিনী। এই লেখক দ্বিতীয় উপন্যাস লেখেন ১৯৫৯-এ, মুরাম্বিয়া গরেডেমা নামে। এই উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদও হয়েছিল। এই উপন্যাসে আফ্রিকান ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্য ও ক্রিশ্চিয়ান সভ্যতার যে প্রভাব, বৈপরীত্য ও সংঘাত- তাই নিয়েই বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। এই বইটি শোনা ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল বলা যেতে পারে। বিংশ শতকের প্রধান ঔপন্যাসিকদের মধ্যে প্যাট্রিক চাকাপিয়া ১৯৫৮-এ লেখেন Karikoga gumiremiseve , কারিকোগা ও তাঁর দশটি তির – এখানে শোনা মৌখিক ঐতিহ্য অনুসারে কল্পনা এবং ইতিহাসের মিলন হয়েছে। ১৯৫৮সালে লিখিত হারবার্ট ডব্লিউ চিটেপো-র কবিতা Soko risina musoro (দ্য টেল উইদাউট এ হেড)–ই প্রথম প্রকাশিত শোনা কবিতা, যেখানে এক আফ্রিকান ব্যক্তির দ্বিধাকে প্রকাশ করেছেন কবি। মানুষটি যেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে – নিজের ঐতিহ্যের অনুসরণ করবেন নাকি নতুন দিশার দিকে এগিয়ে যাবেন। উইলসন চিভুরা কবিতা লিখেছিলেন, যা Madetembedzo (১৯৬৯)-এ প্রকাশিত হয়।
সোমালি ভাষায় ‘হিকমন্দ সোমালি(সোমালি জ্ঞান)’ এক ঐতিহ্যবাদী গল্পের সংকলন যা এক জায়গায় এনেছিলেন Muuse Xaaji Ismaaciil Galaal, ১৯৫৬সালে। Shire Jaamac Axmed সোমালি মৌখিক রীতি থেকে এক সংকলন প্রকাশ করেন ১৯৬৫ সালে ‘Gabayo, maahmaah, iyo sheekooyin yaryar ‘ (কবিতা, প্রবাদ ও ছোট গল্প) নামে। তিনি ‘Iftiinka aqoonta’ (শিক্ষার আলো) নামে এক প্রবন্ধ ও দুটি ছোট উপন্যাস লেখেন ১৯৭৩সালে ‘Halgankiii nolosha ‘( জীবন যুদ্ধ) ও ‘ Rooxaan ‘ (আত্মা) নামে। সোমালি মৌখিক রীতিতে কবিতা হল ভাব প্রকাশের মুখ্য উপাদান। কবিতার মধ্যে ‘gabay’ হল এক ছন্দময় রূপ, ‘jiffto’ –ও ছান্দিক কিন্তু একটু খেয়ালি প্রকৃতির, ‘geeraar’আবার ছোট ছোট যুদ্ধ বিষয়ক কবিতা, ‘buraambur’ কবিতার আরেক রূপ যা মহিলারাই লিখতেন, ‘heello’ বা ‘balwo’ হল ছোট প্রেমের কবিতা এবং ‘hees’ হল জনপ্রিয় কবিতার রূপ। Farah Nuur, Qamaan Bulhan, এবং Salaan Arrabey – এঁরা কবি হিসেবে খুব পরিচিত নাম ছিল সেই সময়ে। নাটকও সোমালি সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। ১৯৬৮সালে Hassan Shekh Mumin লেখেন ’ Shabeelnaagood ‘ নামের এই নাটকটি যেখানে নারী-পুরুষের বিবাহ এবং তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছিলেন। Axmed Cartan Xaange সোমালি ভাষায় প্রথম নাটক লেখেন। ‘Samawada’ (১৯৬৮) শীর্ষক এই নাটকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মেয়েদের স্বাধীনতা ও অধিকার বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
দক্ষিণ সোথো ভাষার প্রথম লেখক Azariele M. Sekese। ইনি ১৮৯৩সালে সোথো ভাষার মৌখিক ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যের উপাদানগুলি জড়ো করে এক জায়গায় করেন ‘Mekhoa ea Basotho le maele le litsomo ‘ – এই নামে, যার অর্থ সোথোর নিয়মরীতি ও গল্প। তিনি পশুপাখিদের নিয়ে এক জনপ্রিয় গল্পও লেখেন ‘Bukana ea tsomo tsa pitso ea linonyana, le tseko ea Sefofu le Seritsa ‘ ১৯২৮সালে। দক্ষিণ সোথো সাহিত্যের অন্যতম নাম থমাস মোকোপু মোফোলো। এঁর তিনটি উপন্যাস যথাক্রমে ‘Moeti oa bochabela ‘(পূবের যাত্রী) লেখা হয়েছিল ১৯০৭-এ। দ্বিতীয়টি ‘ Pitseng ‘ (ইন দ্য পট) লিখেছিলেন ১৯১০-এ। তৃতিয়টির নাম ‘chaka’ (এক ঐতিহাসিক প্রেম) লেখা হয়েছিল ১৯২৫-এ।  এই ভাষাতেও যথারীতি নিজেদের ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্যের মিশ্রণের ফলে সংঘাত এসেছে, যার রূপ রয়েছে বেশ কিছু সাহিত্যকর্মে। Everitt Lechesa Segoete-এর উপন্যাস ‘ Monono ke moholi ke mouoane  ‘, Albert Nqheku-র উপন্যাস Arola naheng ea Maburu  দুটি ছাড়াও আরও অনেক কাজ হয়েছে যেখানে সাদার কালোর ওপর অবদমন, ঐতিহ্য এবং আধুনিক সংস্কৃতির চাপান-উতোর, এই বিষয়গুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
সোয়াহিলি ভাষার সাহিত্যও যথারীতি ক্লাসিকাল ও সমসাময়িক দু ভাগে বিভক্ত। ১৩শ থেকে ১৯শ শতকের ঐতিহাসিক কাজগুলি, যেমন ‘Tarekhe ya Pate ‘ এক জায়গায় করেছেন ১৯শ শতকের পন্ডিত Fumo Omar al-Nabhani। আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ ‘, Khabari za Lamu ‘ যেখানে ১৮শ ও ১৯শ শতককে ধরে রাখা আছে। Shaaban Robert ছিলেন একজন মূল্যবান সমসাময়িক কবি, গদ্যকার ও প্রবাদ নির্মাতা। তাঁর ১৯৬০-এর কবিতার বই ‘Almasi za Afrika ‘, তাঁর ইউটোপিয়ান উপন্যাস সিরিজ Kusadikika, nchi iliyo angani (১৯৫১), ‘Adili na nduguze (১৯৫২) ‘ , এবং Kufikirika (১৯৪৬), যা কিনা ১৯৬৭সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। Muhammad Saleh Abdulla Farsy ১৯৬০সালে জাঞ্জিবাড়ি গ্রামের আদিবাসীদের জীবন নিয়ে উপন্যাস লেখেন ‘Kurwa and Doto: maelezo ya makazi katika kijiji cha Unguja yaani Zanzibar ‘ নামে। বিংশ শতকে সংবাদ পত্রে প্রকাশিত ধারাবাহিক কাহিনী গুলো ছিল সাহিত্যের প্রধান উৎস। Baraza and Taifa Weekly –তে প্রকাশিত A.T. Banzi (“Lazima nimwoe nitulize moyo” -১৯৭০ এবং  Bob N. Okoth (“Rashidi akasikia busu kali lamvuta ulimi” -১৯৬৯। ১৯৮০তে যেমন  Ben R. Mtobwa and Rashidi Ali Akwilombe-এর সাহিত্য জনপ্রিয় হয়।
১৯শ শতকে হওসা ভাষায় প্রথম লিখিত হয় এক শ্লোক। ১৮২০ থেকে ১৮৫৯ সালের মধ্যে বাইবেলের অনুবাদ করা হয়। লন্ডন মিশনারি ১৯শ শতকে লাভডেল প্রেস প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৩৭-এ ওয়েসলিয়ান্স ‘Umshumayeli Indaba ‘ –নামে এক প্রবন্ধ প্রকাশ করে। হওসা লেখালেখির মূল ভিত্তি ছিল লাভডেল ও স্কট মিশন। যেসব আফ্রিকান বিদ্রোহগুলো মিশনারিরা প্রকাশ করে নি, পরে সেগুলো কোন না কোন নিবন্ধে প্রচারিত হয়েছে। সাউথ আফ্রিকার যুদ্ধের সময়ে ‘Imvo Zabantsundu ‘ মিলিটারিরা ব্যান করে দেয়। Gqoba এবং William Wawuchope রাজনীতি বিষয়ক কবিতা গুলো সংবাদপত্রে প্রকাশ করতেন। কবিদের মধ্যে Henry Masila Ndawo ও S.E.K. Mqhayi প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন যাতে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গরা কালোদের নিয়মিত সুবিধেগুলো কেড়ে না নিতে পারে ও কালোদের অধিকার রক্ষা হয়। হওসা ভাষার সবথেকে বড় প্রাপ্তি যাকে আফ্রিকার এক উল্লেখযোগ্য উপন্যাসও বলা হয় তার নাম ‘Ingqumbo yeminyanya ‘ লিখেছিলেন এ সি জর্ডন  ১৯৪০-এ। এই উপন্যাসেরও মূল কাহিনী আফ্রিকার ঐতিহ্য ও পশ্চিম থেকে আসা আধুনিক উপাদান ও তার অনুষঙ্গে ঐতিহ্যের বিনাশ বা দ্বন্দ্ব- এই ব্যাপারটিই প্রাধান্য পেয়েছে। জর্ডনের পরে P.M. Lutshete লিখেছেন ‘Unyana wolahleko (১৯৬৫) এবং  Peter M. Mtuze  লিখেছেন ‘ uDingezweni ‘(১৯৬৬)। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন D.Z. Dyafta -র ‘Ikamva lethu ‘ (১৯৫৩), E.S.M. Dlova-র ‘ Umvuzo wesono ‘ (১৯৫৪) , Aaron Mazambana Mmango, Marcus A.P. Ngani,  Bertrand Bomela,  Godfrey Mzamane,  D.M. Lupuwana, এবংMinazana Dana।
ইয়োরুবা ভাষার এক গল্পে একটি ছেলে বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে গেছিল। এখানে একটি শেয়াল ছিল কথকের ভূমিকায়, যার সাহায্যে ছেলেটি রাজার চ্যালেঞ্জ জিতে নিয়েছিল। আর এই শেয়ালের বক্তব্যে উপার্জন করেছিল প্রভূত জ্ঞান, যার ফলে সে ক্রমে বালক থেকে এক পুরুষে পরিণত হয়। এই গল্পটি শুনে আমার ঈশপের গল্পের কথা মনে পড়ে স্বাভাবিক ভাবেই। ফাগুনওয়া-র দ্বারা লিখিত ‘Ogboju ode ninu igbo irunmale ‘(১৯৩৮)- এই কল্প গল্পটিতে কল্পনা ও বাস্তবের চরিত্রের মিশেল হয়েছিল চমৎকার ভাবে। এই ধরণের আরও কিছু কাহিনী রচিত হয়েছিল সেই সময়ে – ‘Igbo olodumare ‘ (১৯৪৯), ‘ Ireke-Onibudo ‘(১৯৪৯), ও ‘ Irinkerindo ninu Igbo Elegbeje ‘(১৯৫৪);  যেখানে ইয়ুরুবা সংস্কৃতির ওপরে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছিল। ফাগুনওয়া-র পরের উপন্যাস  ‘Adiitu olodumare ‘(১৯৬১)- এখানে অবশ্য সমসাময়িক যুগের গল্পের মধ্যে তাঁর চিরাচরিত ফ্যান্টাসির ছোঁয়া ছিল। বাস্তবাদী লেখা শুরু করেন Adekanmi Oyedele, যাঁর উপন্যাস ‘Aiye re! ‘ (১৯৪৭)-এ ইয়ুরুবা-র ঐতিহ্যের কথা এসেছে, আইসাক ওলিউওলে ডেনালো-র ‘Aiye d’aiye oyinbo ‘(১৯৫৫)-এ এসেছে সেই সময়ের আসা ইউরোপিয়ানদের কথা। বিংশ শতকের মাঝামাঝি নাটকের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। গ্রীক ট্র্যাজেডির ওপর ভিত্তি করে ১৯৬৫ ও ১৯৬৬ তে Olanipekun Esan-র নাটক রচনা করেন। অন্যান্য বিখ্যাত নাট্যকারদের মধ্যে Faleti, Olabimtan, Hubert Ogunde, ও Duro Ladipo উল্লেখযোগ্য নাম।
অন্যান্য আফ্রিকান ভাষার মত ১৯শ এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে জুলু ভাষাতেও দুটি নির্দিষ্ট ধারা লক্ষ্য করা গেছে। এক হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জীবন রীতি নিয়ে, অন্যটি হল ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটির প্রভাব। এই দুই ধারা একযোগে মিলে ১৯৩০ সাল নাগাদ এক কল্পিত সাহিত্য ধারার জন্ম নেয় যা কিনা দক্ষিণ আফ্রিকার লেখকদের দীর্ঘ যুগ ধরে আদিম সভ্যতার ওপর ক্রিশ্চান জাতির প্রভাব, দেশীয় ধারার সঙ্গে পাশ্চাত্য সভ্যতার মিশ্রণ, আফ্রিকার গ্রাম্য জীবনের অতীত ধারার মধ্যে এক সংঘাত সৃষ্টি করে চলেছিল। প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৯শ শতকের মাঝামাঝি ক্রিশ্চান লিপির অনুবাদ করা হয় জুলু ভাষায়। ১৮৬৮ ও ১৮৯৫ সালে বুনিয়ান-এর পিলগ্রিমস প্রগরেস দুটি অংশে অনুবাদ করা হয়। ১৯২২ সালে ). Magema kaMagwaza Fuze-র ‘Abantu abamnyama lapha bavela ngakhona’  প্রকাশিত হয়, কালো মানুষদের উৎপত্তি নিয়ে খোঁজ ছিল এই বইয়ে। জুলু ভাষায় নিজেদের ঐতিহ্য নিয়ে এরপর Petros Lamula লেখেন ‘ Isabelo sikaZulu’ (১৯৩৬), T.Z. Masondo লেখেন ‘Amasiko esiZulu ‘ (১৯৪০) এবং  R.H. Thembuএর গল্পের বই ‘ uMamazane’(১৯৪৭)। বেশ কিছু ঔপন্যাসিকের লেখায় তখন ঐতিহ্য ও ক্রিশ্চান সভ্যতার ভেতরের সংঘর্ষ ফুটে ওঠে। এদের মধ্যে – James N. Gumbi-এর ‘ Baba ngixolele ‘ (১৯৬৬) তে দেখা যায় ফিকিলে নামের একটিমেয়ে কীভাবে এই দুই পৃথিবীর মধ্যে নিজেকে মেলাতে গিয়ে বিধ্বস্ত হচ্ছে। . S.V.H. Mdluli-র উপন্যাস ‘ uBhekizwe namadodana akhe’(১৯৬৬), J.M. Zama-র উপন্যাস ‘ novel Nigabe ngani ‘ (১৯৪৮) দুটি উপন্যাসেই দেখা গেছে কারুর ছেলে মন্দ চরিত্রের তৈরি হচ্ছে, কোন সৎ মা তার সন্তানদের বদ মতলবে ব্যবহার করছে, মোটের ওপর ক্রিশ্চান সভ্যতাকেই খলনায়ক বানিয়ে এই উপন্যাসগুলো লেখা হয়েছিল। জুলু কবিতা কিন্তু বৈচিত্রে ভরপুর। উল্লেখযোগ্য কবিতা সংকলন হিসেবে Nxumal-র ‘ Ikhwezi ‘ (১৯৬৫) ও ‘Umzwangedwa ‘ (১৯৬৮) – এই দুটি সংকলনের নাম করতেই হবে।
যুগ বদলের সঙ্গে সঙ্গে আফ্রিকার মানুষ ক্রমশ পাশ্চাত্য ধারার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। উপনিবেশ সৃষ্টিকারী যে সব জাতিরা এসেছে, তাদের ভাষাকে আপন করে নিয়েছে। যেভাবে দেখা গেছে ইংরেজিতে আফ্রিকায়, বিশেষ করে নাইজিরিয়ায় অনেক সাহিত্যকর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এভাবেই ফ্রেঞ্চ, অ্যারবিক ভাষা গুলিতেও আফ্রিকার মানুষরা সড়গড় হয়ে গেছে। এর মধ্যে ডাচ ভাষার প্রভাবের কথা উল্লেখ না করলেই নয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘদিন ডাচদের বসবাস। ফলে এমন অবস্থা হয়েছিল যে সাদা মানুষদের ভাষা হিসেবে ডাচ কৌলীন্য আদায় করে নিয়েছিল, ফলে স্থানীয় আফ্রিকান ভাষা গুলি ব্রাত্য হয়ে পড়ে। এরই প্রভাবে ১৮৭৫ সালে প্রথম আফ্রিকান ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। স্টিফেনাস জ্যাকোবাস দু টয়েট এবং অন্যান্যদের নেতৃত্বে আফ্রিকান ভাষা গুলিকে ডাচ ভাষার থেকে পৃথক করার দাবী জানানো হয়। ১৯২৫ সালে পার্লামেন্ট আফ্রিকান ভাষাকে সরকারী মর্যাদা দেয়। এর মধ্যে যত দিন গড়িয়েছে আফ্রিকার ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে স্বাভাবিক ভাবেই। যেভাবে আমাদের বাংলা ভাষার সাধু যুগ থেকে ক্রমে কথ্য ভাষায় লেখার রীতি চালু হয়েছিল, সেভাবেই। একঝাঁক অগ্রদূত কবির উদ্দীপনায় শুরু হয় দ্বিতীয় আফ্রিকান ভাষা আন্দোলন। এঁদের মধ্যে Leipoldt, Marais, Celliers, Jakob Daniel du Toit (Totius), Daniel François Malherbe, and Toon van den Heever ছিলেন অগ্রগণ্য। Leipoldt কে আবার একসময়ে আফ্রিকানরা বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়েছিলেন তাঁর ডাচ ভাষা প্রীতির জন্য! পরবর্তীকালে কবিতার পাশাপাশি ছোট গল্প, উপন্যাস, নাটকেও আফ্রিকান ভাষায় আধুনিকতা ও বিশেষ এক ধারা দেখতে পাওয়া গেছে। ১৯১৩-১৯১৪-র আফ্রিকান বিদ্রোহের পরে গদ্যরীতিতে পরিবর্তন আসে।
এরপর থেকে এখন পর্যন্ত আফ্রিকার সাহিত্যে অনেক জল বয়ে গেছে। এই বিষয়ে আমার বক্তব্যকে অযথা দীর্ঘ করব না। ব্যক্তিগত ভাবে আমি বিশ্বাস করি, যে কোন ভাষার সাহিত্যের রস খুঁজতে গেলে তার উৎস মুখে যেতে হয়। শেকড় থেকেই না জল পৌঁছয় পাতায়! ফলে শুরুর দিকটা আমার জানা হল, যা কিনা নেহাতই এক ইতিহাসের খন্ড চিত্র। মূল সাহিত্যের ভাব বুঝতে গেলে এখনও অনেক ভেতরে, অনেক গভীরে যেতে হবে। তবে যদি আফ্রিকান সাহিত্যের কিছুটা হলেও ধ্যানধারণা পাওয়া যায়। এই সন্ধানের যাত্রায় এবার যাবো। এও চাঁদের পাহাড় আবিষ্কারের থেকে কম অ্যাডভেঞ্চারাস কিছু না!
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!