সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে চার অক্ষর (অন্তিম পর্ব)

রাজপুত্রের গল্প

শেষ অধ্যায়

– “হাঁ করে বসে থেকো না উটকো মানুষ, ফ্রালহাস কে দেখো। গতবার ঝাঁপ দেবার চেষ্টা করেছিল। বোকা ফ্রালহাস। আর কেউ বেশী নড়াচড়া করবে না ঝড় থামা অব্দি।“
রাজপুত্রের দিকে আদেশ ছুঁড়ে দু দিকের ডানা ঝমঝম করে কাঁপিয়ে নিলো টানুকা একবার। আড়চোখে তেচোখা বেড়াল টার দিকে তাকাল রাজপুত্র। মনে হচ্ছে ভয় পেয়েছে। তবে ফ্রালহাসের খুব বেশী ইচ্ছেও নেই নড়া চড়া করবার। লেজ পায়ের কাছে গুটিয়ে রাখা। তিনটে চোখ গোল করে গুহার দেওয়াল আর মেঝের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। তাকিয়ে না থেকেও উপায় নেই। টেবিলের চারপাশে যে চৌকো বুদবুদটার ভেতরে রাজপুত্ররা রয়েছে সেটার গোটা তিনশো ষাট ডিগ্রি জুড়ে খালি সাদা আর গোলাপি ক্রিস্টাল ক্রমাগত জমে যাচ্ছে। গোটা গুহার গায়ে ফুসকুড়ি থেকে ফোঁড়ার মতন চকচকে স্বচ্ছ সাদা গোলাপি স্ফটিক এত দ্রুত বাড়ছে যে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। চারিদিক জুড়ে ছোট ছোট হালকা রামধনু ঝিলিক দিচ্ছে। রাজপুত্র কেমন বেবাক হয়ে পড়লো।
ওদিকে টানুকা শকুন টেবিলে ঝুঁকে নখ দিয়ে অদৃশ্য আঁচড় কাটছে। পেছন থেকে এক ঝলক দেখলে মনে হবে কালো পালকের একটা ঝোপ দুলছে ধীরে। চৌকো বুদবুদের ভেতরে থাকবার জন্যই হয়ত বাইরে থেকে কোনো শব্দ আসছে না। আসছে শুধু কাঁচ কাটা আলো। চোখ বন্ধ করলেও চোখের পাতার ওপর আলোর ওজন টের পাচ্ছে রাজপুত্র।
-“ব্যাস আর কিছুক্ষণ বাদেই ঝড় থামলো বলে। কিন্তু তোমার আকাশযানে কতটা জ্বালানী আছে সেটাই এখন প্রশ্ন।“ রাজপুত্রকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললেও কথাটা অনেকটা স্বগতোক্তির মতন শোনালো।
-“আপনার এটাকে ঝড় মনে হচ্ছে?” চোখ বন্ধ করেই টানুকাকে পাল্টা প্রশ্ন করলো রাজপুত্র।
– “নিতান্ত সীমিত বুদ্ধির জীব তোমরা উটকো মানুষ, তোমাদের ধ্যান ধারণার বাইরের কিছু হলেই তোমাদের স্বভাব হচ্ছে প্রথমেই অস্বীকার করা। তুমি জানতে চাইছিলে আমি কিভাবে বন্দী হলাম। এই যে জায়গাটা দেখছো এটা কোনো জায়গাই নয় আদপে। আমরা একটা অবস্থায় আটকে রয়েছি। অণু পরমাণুর আত্মার ভেতরে। কোয়ান্টাম লেভেলে। আমরা কত জাঁদরেল শত্রু কে পোকামাকড় বানিয়ে রেখেছি দিনের পর দিন। হারামজাদা তেইশ আমাদের কায়দা রপ্ত করে আমাকেই এখানে আটকে রেখেছে কিন্তু আর পারবে না ”
টানুকা শকুনের কথার মাথা মুণ্ডু রাজপুত্রের ঘিলুর ভেতর ঠিক মতন না ঢুকলেও রাজপুত্র বুদ্বুদের ভেতর থেকেই খেয়াল করলো চারপাশের আলোর দাপট একটু যেন ফিকে হচ্ছে। বুদ্বুদের দেওয়ালে স্পষ্ট হচ্ছে নীলচে আভা। চোখ খুলে রাখতে এখন আর অসুবিধা হচ্ছে না অতটা। চারপাশের দৃশ্যপট দ্রুত বদলাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুদবুদের বাইরে সবকিছুই ঘোলাটে ঠেকতে শুরু করল আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কোথা থেকে তীব্র নীল আলোর স্নান শুরু হল বুদবুদের ভেতর। ঠিক যেন একমুঠো নীল রং কেউ পরিষ্কার জলের ভেতর হঠাৎ গুলে দিয়েছে। রাজপুত্র খেয়াল করলো এই বেখাপ্পা নীল আলোটা আসছে বুদবুদের দেওয়াল থেকেই। অস্বাভাবিক রকম বরফ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে রাজপুত্রের হাত পা। ঠিক যেমনটা হয়েছিল টানুকা শকুনের আস্তানায় আসবার সময়। বুদবুদের ভেতরের জমাটি ঠাণ্ডায় ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতেই রাজপুত্র দেখতে পেল নিজের প্রাণাধিক প্রিয় গোলাপি স্পেসশিপটাকে। দেখতে পাওয়া ঠিক নয়, গোলাপি স্পেসশিপ যেন নিজের থেকেই প্রকট হল রাজপুত্রের সামনে। দুবার চোখ কচলে মনের ভুল কিনা যাচাই করে নিলো রাজপুত্র। ভুল যে রাজপুত্র দেখছে না সে ধারণা আরও দৃঢ় হল গোলাপি স্পেস শিপের দিকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাওয়া টানুকা শকুন এবং তার অবধারিত রকম পিছু নেওয়া তেচোখা বেড়ালটাকে দেখে। একা বোকা পোকার মতন দাঁড়িয়ে থাকা স্পেসশিপটা যেন আদি অনন্ত কাল ধরে অপেক্ষায়। টেবিল থেকে এক লাফে নেমে স্পেস শিপের দিকে হনহন করে হাঁটা দিল রাজপুত্র। টানুকা শকুন বেড়ালসহ ততক্ষণে স্পেসশিপের সিঁড়ির কাছে। পেছনের আকাশে শনির কুয়াশা মাখানো বেল্ট ঝকমক করছে। তার মানে মিমাসে এখন কাকভোর। নাহ, চারপাশে কোথাও কোনো বাকু নেই। চারপাশ দেখে নিয়ে নিশ্চিন্ত হল রাজপুত্র।
মিমাসের বায়ুমণ্ডল ছাড়বার পর ককপিটে বসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও রাজপুত্রের বিশ্বাস হচ্ছিল না গোটা ঘটনাটা। এত অবলীলায় মিমাস থেকে যে পালানো যাবে এটা একেবারে স্বপ্নের মতন ঠেকছে। পাশেই টানুকা শকুন বসে ঘাড় নিচু করে ঝিমোচ্ছে। ফ্রালহাস শুঁকে শুঁকে দেখছে সবগুলো কোণা। শনি এখন অনেকটাই পেছনে, ছোট লাট্টুর মতন হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত রাজপুত্র শনির থেকে চোখ সরালো না।

শেষ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।