বাকুদের সান্নিধ্যে আসার পর থেকেই রাজপুত্রের বেপরোয়া ব্যপারটা বেশ চেগে উঠেছে। “কি আর হবে খুব বেশী? মরে গেলে …… যাবো।“ টানুকা শকুনের হুংকারে বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না রাজপুত্র।
রাজপুত্রের পায়ের তলাটা ক্রমশ ভূমিকম্পের বদলে সুরসুর করে উঠলো। চার পাশে কিছুর একটা পরিবর্তন হচ্ছে। টানুকা শকুন রাজপুত্রের দিকে না তাকিয়ে ডানার ঝাপটা মেরে টেবিলের কাছে দ্রুত সরে গেল। গুহার সারা মেঝে জুড়ে কাঁচের মতন কি যেন বেরোচ্ছে। প্রথমে পেনের ডগার মতন তারপর সেখান থেকে অজস্র ছোট্ট ছোট্ট ছুঁচের মতন ক্রিস্টালের শুঁড়। গুহার দেওয়ালের অবস্থাও মেঝের মতন। দেখতে দেখতে গোটা গুহা চকমক করতে লাগলো। উঁচুনিচু হয়ে যাওয়া মেঝের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হচ্ছিল রাজপুত্রের। টানুকা শকুন ততক্ষণে টেবিলের ওপর উঠে পড়েছে। ধীরে ধীরে চারপাশের কাঁপুনি কমল। মাথা গরম থাকলেও গুহার এই আচমকা ভোল বদলে রাজপুত্র হকচকিয়ে গেল। দেওয়াল আর মেঝের দিকে রাজপুত্রের এই হাঁ করে তাকিয়ে থাকাটা আরও অনেকক্ষণ চলতে পারতো, তাল কাটলো টানুকা শকুনের খোনা গলার আওয়াজে।
“উটকো মানুষ বেঁচে থাকবার ইচ্ছে থাকলে, ওখানে ছাগলের মতন দাঁড়িয়ে থেকো না। এখানে উঠে এসো”
টানুকা শকুনের বলার ভঙ্গিমায় কিছু একটা ছিল, রাজপুত্র তাই টানুকার কথা অমান্য করতে সাহস করলো না, ল্যাগব্যাগ করতে করতে টেবিলের একটা ধারে উঠে পড়ল রাজপুত্র। টেবিলের আরেকধারে তেচোখা বেড়ালটা অস্থির ভাবে পায়চারি করছে। হাব ভাব বিরক্তির।
“উটকো মানুষ, তুমি একটা অবাধ্য জানোয়ার। তেইশ-ও অবাধ্য কিন্তু তোমার মতন হাঁদা নয়। অযথা তর্ক কোরো না, এখন এখান থেকে বেরোনোর সময় এসে গিয়েছে।“
“সময় এসে গেছে মানে?”
“উটকো মানুষ মুখটা বন্ধ কর, আর একটু পিছিয়ে এসো” রাজপুত্রের দিকে না তাকিয়ে টেবিলের ওপর পায়ের নখ দিয়ে আঁচড় কাটতে কাটতে টানুকা শকুন বিড়বিড় করে উঠলো। রাজপুত্র দেখলো টেবিলের চারপাশ থেকে গরম আলো বেরোতে শুরু হয়েছে। তেচোখা বেড়ালটা পায়চারি থামিয়ে তড়াক করে টেবিলের ধার থেকে মাঝখানে চলে আসলো। গরম আলো থেকেই টেবিলের ধার ঘেঁষে একটা বুদবুদ তৈরি হচ্ছে। খুব স্বচ্ছ নয় কিন্তু গোটা টেবিল ঢেকে ফেলা বুদবুদের ভেতর থেকে ভালোই বোঝা যাচ্ছে বাইরের ক্রিস্টাল গুলোর দ্যুতি।
“ তুমি কি মনে করো উটকো মানুষ? গোটা ব্রহ্মাণ্ডে এই কটা বাকু আমাকে আটকে রাখতে পারবে? হাহ!” টেবিলের দিকে করে থাকা নীচু ঘাড় স্প্রিঙের মতন সোজা করে রাজপুত্রের দিকে তাকালো টানুকা।
-“ আমি মনে করবার কেউ নই। আপনাকে কেন বন্দী করে রেখেছে বাকুরা সেটাও জানিনা আর সবচেয়ে বড়কথা হচ্ছে—–“
-“বাকুরা নয়, উটকো মানুষ, বাকুটা। তেইশ নম্বর বাকু হারামজাদাটা । বিশ্বাসঘাতক বেল্লিক বেইমানটা। তুমি দেখেছো আর গাধার মতন নাচতে নাচতে বিশ্বাস করে এসেছ তেইশ নম্বরের সাজানো বাগান। তোমার মোটা মাথাতে আসে নি সত্যিটা। আসবে কি করে? তোমাদের অপগণ্ড ঘিলুর অত জোর থাকলে তো হয়েই যেত”
“মানেহ?”
“মানে আবার কি? আমরা পঞ্চাশ পিস তৈরি করেছিলাম। এই এক পিস শুধু বেঁচে আছে। বাকি যে সব বাকু দেখছ, সেগুলো হচ্ছে তেইশ এর নিজের কপি। হাহ! টানুকারা এত বছর ধরে মাত্র পঞ্চাশ পিস বানিয়েছিল বলে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে সবার কি হাসা হাসি তখন। যারা হাসা হাসি করেছিল তারা ঘুণাক্ষরেও তখন বুঝতে পারেনি বেল্লিকগুলোকে আমরা কি জিনিস দিয়ে তৈরি করেছি। একটা বাকু থেকে হাজার হাজার বাকু তৈরি হবে। একটা গাছ থেকে তৈরি হবে অনন্ত জঙ্গল। হাহ।“
রাজপুত্রের ঘিলুর ভেতরে কেউ যেন ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে দিল। তাহলে এই জন্য শুধুমাত্র বাকু মোড়লের গায়ের রং নীল আর বাকিদের আলাদা। এই জন্য বাকু মোড়ল একমাত্র সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলতে পারে আর বাকিরা গাম্বাটের মতন আধো আধো করে ? তাহলে বিজান্টারের কবলে জাহাজ ভর্তি বাকু নয়, শুধু বাকু মোড়ল পড়েছিল। বাকিসব ঢপ?