অনন্তের অভিযাত্রী
তারপর মানুষ নিজের কাছে ফেরে। অনেক অনেক দিন পেরিয়ে, বছর পেরিয়ে, শত্রু- মিত্র ভেঙে ফেরে। সময় তাকে অনেক কিছু দেয়। অনেককিছু নেয় সে সময়ের কাছ থেকে। ধার করে। পরে ফেরত দেবে ভাবে। জল-ঝড়-বাতাসের ঝাপট। খোলা মাঠ; বদ্ধ দরজা। রোমাঞ্চ, শিহরণ। মান-অপমান। সময় কেড়েও নেয় প্রচুর। ওইযে ছিল নির্মল একটা মন; ভালোলাগার একটা পৃথিবী; রোমাঞ্চ মণ্ডিত একটা চিলেকোঠা— হারিয়ে যাওয়া সেই চাবি। কাকে বলবে এইসব গাল-গল্প! কাকে শোনাবে একঘেঁয়েমির চিত্র! সবাই যে আজ একরকম, প্রৌঢ়ত্বের মন নিয়ে হাঁটছে। অনেক কিছু জেনে গেছে এই অজানার চেতনা। তার কাছে যে আজ, আলো বাতাসের সবটুকু রিদম জানা। সান্দ্র বিকেলের হাওয়ায় ততক্ষণে শ্রান্ত অবসন্ন সেই মন, হৃদয়। অথচ, নির্জন হয়েছে সে; শক্ত হয়েছে আরও। ঝুরো ঝুরো বালির প্রাচীরে লেগেছে যেন সিমেন্টের ধারালো প্রলেপ। কিন্তু সে নিঃসঙ্গ, একাকী। সমস্ত অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে শহরের দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে– এই শহর আবিষ্কারের নয়; নতুনের নয়; নাকি রোমাঞ্চকর শিহরণকারী। তখন সে হয়ে পড়ে আরও বিধ্বস্ত। একা। নির্জন। পৃথিবীর এই নিঃসঙ্গতম মানুষটি কী ভাবে তখন! আলো অন্ধকার ডিঙিয়ে কীভাবে তুলে আনা যাবে আলোচনার পর্ব! কীভাবে নিজেকে ভাসানো যাবে আবার সেই নতুনের স্রোতে! একে একে খুলে রাখা বর্ম পরে নিয়ে আবার যদি ঝাঁপ দিতে পারা যেত মারিয়ানার খাদে! যদি এই দমবন্ধ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ার আগে খোলা আকাশের স্পর্শ আবার আরেকবার পাওয়া যেত যদি! আর তখনই সে খুঁজতে বসে নিজেকে। যুদ্ধ করে। প্রাণপণে ফিরিয়ে আনতে চায় সেই দুনিয়াটিকে। আর তখন আবার আলো-বাতাসের সঙ্গে কথা বলে। অন্ধকার এবং ভ্যাপসা গন্ধের সঙ্গে ভাব জমায়। জানলার ফাঁক দিয়ে খোঁজে নীলনদের বিস্তৃত উপত্যকা।
“The man spoke little. This is the way of those who live alone, but one felt that
he was sure of himself, and confident in his assurance. That was unexpected in
this barren country. He lived, not in a cabin, but in a real house built of stone
that bore plain evidence of how his own efforts had reclaimed the ruin he had
found there on his arrival. His roof was strong and sound. The wind on its tiles
made the sound of the sea upon its shore”
ঠিক এরকমই, জাঁ গিয়োনো ফ্রাঁস লেরক নিজেকে খুঁজেছিলেন। তার আগের সেই জীবন্ত পৃথিবী– যে তাকে বাঁচতে শিখিয়েছিল, জল-ক্ষুধা-আশ্রয় দিয়েছিল। মেষ পালকের গানে ভরে উঠেছিল জীবন। তার বহুবছর পরে, যুদ্ধ হিংস্র পৃথিবী ভেঙে একটা নিঃসঙ্গ লোক প্রান্তর ডিঙিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ওই আশ্রয়ের খোঁজে। শান্তির আশ্রয়ে। নির্জনতার আশ্রয়ে। যেখানে সে মুখোমুখি হবে নিজের। কথা বলবে। নিজের সঙ্গে নিজেকে মেলাবে। আর এই আত্মপরীক্ষনটি চলে নির্জনে। অন্ধকারের ভিতর আত্মসমীক্ষার মাধ্যমে। তখনই লেখক বসেন, পুরনো অক্ষরের কাছে। তেমন সীমিত অক্ষরমালা তাঁকে এতদিন ভ্রান্ত একটি পথের সন্ধান দিয়েছে। আর সারা টি জীবন তিনি সেই সীমিত অক্ষরের পেছন পেছন ছুটেছেন। সৃষ্টির নেশায়। আবিষ্কারের নেশায়। দিস্তার পর দিস্তা কাগজে সেই সীমিত অক্ষর নিয়ে খেলা করেছেন। নেড়েচেড়ে দেখেছেন। সাজিয়েছেন। ভেবেছেন, দারুণ একটা আবিষ্কার! সারা পৃথিবী আশ্চর্য হয়ে দেখবে এই অক্ষরের ঝলকানি। কিন্তু আজ যখন সময় হয়েছে, সেই অক্ষরের কাছে ফিরে দেখেন যে আত্ম গর্বীমন খুঁজে পায় একঘেয়েমি, বিড়ম্বনা। সবকিছুই তখন ফ্যাকাশে। বহু ব্যবহৃত।
” আসলে সবই আদ্যিকালের। পৃথিবীও বদ্যিবুড়ি। শুধু কচিকাঁচারা, তরুণ-তরুণীরা প্রথম প্রথম দেখছে বলে, স্বাদ নিচ্ছে বলে তাদের চোখে জিভে সব আশ্চর্য ঠেকে। সতেরো বছরের ছেলেটি কলকাতা শহরে এসে যে রোমাঞ্চ অনুভব করবে আমি টোকিও, লন্ডন, নিউইয়র্কে গিয়ে তার এক কণাও পাব না। কলকাতাই আমাকে দীর্ঘ দিন ধরে তার সহোদরা নগরীদের সম্পর্কে অভিজ্ঞ করে তুলেছে, তালিম দিয়েছে। “
( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
নতুন সিলেবাস। পাঠ্যসূচি। নতুন বই। ভাবি, কি না কী লুকানো আছে তার অন্তরে। মলাট খোলার পর দেখা গেল, চর্বিতচর্বন। বুঝতে পারলাম, এই পর্বের পরে আসবে অন্য একটি পর্ব। ঠিক যেটা আমি জানি, সেও জানে। লেখকও জানেন হয়ত সেটুকু। তারপর পাঠক হিসেবে তাকে আর খোলার প্রয়োজন অনুভব করি না। কেননা, রোমাঞ্চের অভাব মানুষকে উৎসাহী করে তোলে যেমন, রোমাঞ্চের পরে পৌঁছে দেয় একটি স্থিরতায়। তখন সে তার পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে বসে, বর্তমান রোমাঞ্চকর অবস্থানটিকে। তাই আমরা বাস্তবে যখন কারো সঙ্গে কথা বলি, নতুন অপরিচিত ব্যক্তিটি আশ্চর্যতম অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হন আমাদের সামনে। তারপর যখন দু-চারটি কথার পরে বুঝতে পারি, আসলে আমার পূর্বে জানা ব্যক্তিটির সঙ্গে সাদৃশ্য আছে বর্তমান ব্যক্তিটির। তখন আমরা যত না ওই অচেনা ব্যক্তিটির মধ্যে নতুনত্বের খোঁজ করি তার অধিক মেলাতে বসি পূর্বে চেনা ব্যক্তিটির সঙ্গে। আর তখনই আমরা হাঁপিয়ে পড়ি। ক্লান্ত হই।
তা বলে কিন্তু পৃথিবীতে বৈচিত্র্যের অভাব নেই! শুধু দৃষ্টি পাল্টেছে আমার। আমি-ই পুরনো হচ্ছি পৃথিবীর কাছে। জাবালির মতো। অসহায়তার চোখ নিয়ে কোথায় খুঁজবো রোমান্সের শরীর? মন? বয়েসে না, মনে এসে ছায়াপাত করে বার্ধক্য। মনে হয় এতদিন কী করলাম! শুধুমাত্র কিছু ডিগ্রির কাগজ। অ্যাডমিশন ফি। কলেজ। ক্যাম্পাস থেকে বেরোতেই পারলেই যেন বাঁচি তখন। দমবন্ধ লাগে। হাঁপ এসে যায়। স্কুল লাইফের বন্ধুরা নেই। প্রিয় শিক্ষকেরা এখন বহুদূরের। ছাড়তে ছাড়তে হারাতে হারাতে এই বিরাট কোলাহলে। সম্বল মাত্র কয়েকটি অক্ষর। শব্দ। আর এই পুরনো অভ্যেস, মনখারাপ নিয়ে কী আর কলম চলে? “এই অবস্থায় এসে কি আর লেখালিখি করা যায়!” ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় অভিজ্ঞতা। অনন্তের পৃথিবী। সময় ভেঙে মেশে মহাকালের স্রোতে। আনন্দের গতিধারা আবার বইতে শুরু করে। একে একে উঠে আসে, দেশের বাড়ি। জানলা-ভাঙা নিগমানন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছুট ছুট করে কবাডির মাঠ। প্রথম চোখের ইশারা। হেরে যাওয়া নয়, পূর্ণ ব্যাগের ভারে আমি নতুন হই। সামনের দিকে তাকাই। আবার হাঁটে মানুষের আকাঙ্খার পথ।
” আমি এখন কালস্রোতের কোথায় আছি? কত মাইল উত্তরে, কত মাইল দক্ষিণে? আমার ডানদিকে কত আলোকবর্ষ? আর বাঁয়েই বা কত? অঙ্কটা বেশি জানলে বা ধারণাশক্তি বেশি থাকলে হিসেবটা কিভাবে করা যেত জানি না। আপাতত আমার ছোটো হিসেবে, আমি এই ১৯৮৮ তে, পৃথিবীতে কলকাতায় আছি। আমি পেরিয়ে এসেছি অনন্ত কাল+ ষাট বছর। আর এখনো যেতে হবে হয়তো বছর পাঁচেক+ অনন্ত কাল।” আর তখনই ঝুমঝুম করে বেজে উঠল জাদুগরের ম্যাজিক বাক্স। অনন্ত শব্দটাতেই বিশাল বড় একটা পৃথিবী যেন খুলে গেল তার রঙবেরঙের ওড়না উড়িয়ে। তখনই আবার এসে বসল কবিতার খাতা। অক্ষরের পংক্তি। ” এই দৃশ্যমান এবং বেদনীয় জগৎই কবিতার বিষয়– আধার এবং আধেয়। এতদিন আমি ওই জগতের কথা ভেবেই কাটিয়েছি। অনন্তকালকে দুইপাশে রেখে এবার সাহস করে অন্যভাবে দেখা যাক। এই প্রকাশিত জগতের ওপিঠে বা অন্তরালে নিশ্চয়ই রয়েছে অপ্রকাশিত জগৎ। যেমন চাঁদের দেখা-পিঠের আড়ালে রয়েছে তার অদেখা-পিঠ। যেমন গাছের পাতার আলো-পড়া পিঠের অন্যদিকে রয়েছে তার অন্ধকার-জমা পিঠ। এমন কি বিন্দুরও, যদি অবস্থিতি থাকে, তারও সূচিমুখের আড়ালে আছে অজানা আঘাত।” ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
আর এখানেই মণীন্দ্র গুপ্ত খুঁজে দেন একটি অন্ধকার জগতের সকাল। যাতে অন্ধকার রাজ্যেও ভেসে উঠছে সন্ধের ইমন। তৈরি হচ্ছে অসংখ্য রাগ-রাগিনী। এতদিন মনে রাখা অন্ধকার আসলে অন্ধকার নয়। বরং আশ্চর্য রহস্যময় একটা কবিতা। যার পরতে পরতে আবিষ্কারের কাপড়। ঘোমটার আড়ালে আশ্চর্য সেই রূপের ঝলক। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের ছবির রহস্যময়ী অবগুণ্ঠন। নির্জন অন্ধকার তাঁকে দিয়েছিল আলোর মহিমা- দ্যুতি। আর তখনই অনুভব করি, আবহমানের ধারা। নিজেকে স্নান করাই। শুদ্ধ হই।
প্রকৃতি আমাদের সত্ত্বা। আমাদের বিকাশ। আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া পথের পথপ্রদর্শক। আর প্রকৃতির আপন ধারার পথই হচ্ছে নিয়ম। রীতি। ধর্ম। অনুশাসন। আধার এবং আধেয়। আর সমস্ত প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে খুঁজে ফেরাটাই সাধনা। প্রকৃতির সঙ্গে মেলানোর প্রচেষ্টাই ধর্ম। অজস্র ধুলোর বিন্দুর মাঝে নিজের আমিকে খোঁজা।অনন্তের খোঁজ বিপুলের খোঁজ। সেই খোঁজাটাই যখন দুর্বার হয়ে ওঠে তখনই আমরা সৃষ্টি আনন্দের খোঁজ পাই। ছুঁতে পারি তার এক দুটি আলোক স্ফুলিঙ্গ। ধন্য হই। আসলে সমস্তটাই প্রকৃতিতে বর্তমান। সমস্ত জিনিসই সাজানো আছে প্রকৃতির ঘরে। তার অতীত নেই, ভবিষ্যৎ নেই। নিত্য সঙ্গে অনিত্য মিশে গেছে প্রবহমান কালে। ‘একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি’ (কঠোপনিষদ (২:২:১২))। শুধু তোমার প্রয়োজন মতো খুঁজে নাও তাকে। সাজিয়ে নাও ব্যবহার যোগ্য করে। ক্ষুদ্র আমি তখনই মেলে বিরাট আমি’র সঙ্গে। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, স্পর্শের মধ্য দিয়ে এই anticlimax পথের সূচনা। বিস্তারিত দৃশ্যের মধ্য থেকে প্রসারিত হবে এইসব রোমাঞ্চকর পথের অনুভব । বোধ। জ্ঞান। এতদিন যা যা সংগ্রহ করেছ তা থেকে বানিয়ে নিতে হবে সংযোজন। তাই কবিতা বিজ্ঞানীর কথায়,
” কবির খুব প্রয়োজনীয় নিকট বন্ধু হতে পারেন নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব, সমুদ্রতত্ত্বের লোকেরা; ভূবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও জ্যোতিবিদ্যার লোকেরা– যাবতীয় অনুসন্ধিৎসু মানুষের দল। আড্ডা মারতে হয় তো এঁদের সঙ্গে। যেমন ভাব তেমনি লাভ। প্রথমোক্তদের মানুষ-ঘেঁষা পেশা ক্রমশ তাঁদের মূঢ়মতি ও হীনবুদ্ধি করতে থাকে। মনুষ্য সংশ্রব মনুষ্যত্বের পক্ষে সর্বথা ভালো নাও হতে পারে। দ্বিতীয়োক্তেরা ঠিক উলটো– মহাপ্রকৃতির মধ্যে ঘুরে ঘুরে, খুঁজে খুঁজে তাঁদের চেতনা উদ্ভাসিত হতে থাকে। তাঁরা খুঁজে খুঁজে যাকে পান সে তো অভিজ্ঞতা বটেই, তাছাড়া যেপথে খোঁজেন সে পথও অভিজ্ঞতায় ছাওয়া। এই অভিজ্ঞতাগুলি কবির জগতের ভূমি, আকাশ, আবহাওয়া ও স্বপ্নের মৌল।” ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
তাই অসীমের পথে যাত্রী হতে পারেন কবিরাই। আলোকের ঝরণা ছেড়ে সহজেই নেমে যেতে পারেন মারিয়ানার গভীর খাদে। কেউ নেই। অনুসরণ অনুকরণের কোনও ধারা ততটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় না তাঁর কাছে। তিনি খোঁজেন এবং খোঁজেন। তিনি দেখেন এবং বোঝেন। উপলব্ধি ও অনুভবের মধ্য থেকে ছেঁকে তোলেন শব্দ। ধনী থেকে দরিদ্র সবাই তাঁর বন্ধু। আবার কেউ না বন্ধু নন। তাদের উপলব্ধির অভিজ্ঞতাটুকুই বন্ধু তাঁর। সৎসঙ্গের ব্যাখ্যাটা তাই এখানে যোজন বিস্তৃত। শিশুটিও তাকে দিতে পারে তার শিশুদের সন্ধান, ষোড়শী যুবতী দিতে পারে প্রথম প্রেমের ইশারা আবার মৃত্যুমুখে পতিত বৃদ্ধটি দিতে পারেন রহস্যময় পরাবাস্তবের ইঙ্গিত।
“কবিতা যার একদিক অনির্দেশ্য অনির্বচনীয়কে স্পর্শ করে আছে, সে কেমন হবে, কেমন হওয়া তার উচিত, এমন কোনও ফরমান জারি করা করা আমার পক্ষে ধৃষ্টতা। তবু প্রারম্ভিকভাবে এটুকু বলা যায়, কম্পিউটার, গাইগার কাউন্টার, পরমাণবিক বোমা, মঙ্গল চাঁদ শুকতারায় যাবার হাউই ও জাহাজ যে সূক্ষ্ম, নিপুণ, সংবেদনশীল, নির্ভুল, প্রলয়বীর্য, অনন্তভেদী, অমোঘলক্ষ্য ধ্যানের ফল, আমাদের কবিতাকেও যেতে হবে সেই পথে। এ কথার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আমি কবিতার মধ্যে কিছু সফিস্টিকেটেড যন্ত্রপাতির লোহালক্কড় বা নাড়িভুঁড়ি বা কিছু বৈজ্ঞানিক সমীকরণ ভরে দিয়ে তাকে এক মহাপন্ডিত রোবট বানাতে চাইছি। আমি চাইছি তার আত্মা হোক অনন্তসম্ভব, আর সেই অনুযায়ী তার দেহ হোক নিখুঁতগঠন।’ ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
এই নির্বিকার যাপনের শেষে ঘরে তুলতে পারবো শব্দের মালাকে! সাজাতে পারবো! প্রকৃতির দিকে মুখ করে বলতে পারি যদি- দেখো, তোমার ঘর থেকে জিনিস এনে কীভাবে সাজিয়ে তুলেছি, অন্দরসজ্জা। “আর কবিতার শেষে, ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছানো বা অভাবিত মোচড় দিয়ে থামা বা এতক্ষণের সারা শরীর ভরা চাপকে অকস্মাৎ মুক্ত করে দেওয়া এইভাবে শেষ করার অর্থ নাটকীয়তা, প্রকটতা, বাদ্যকারের তেহাই মারার লোভ”। তখনই ভেঙে যাচ্ছে নিরহংকার সাধনা। লোভ আসছে; প্রতিহিংসা পরায়ন মন আসছে। পুরস্কারের লোভে নিজের স্বতন্ত্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রকৃত কবি। তখন ভ্রান্ত পথ তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে না, ” ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
আমরা যেখানে আছি, যেখানে ছিলাম, যেখানে থাকব তার একদিকে অনাদি, অন্যদিকে অশেষ। সব কবিতা, সব গল্প, সব জীবনেরই শুরু যেমন স্রোতের মাঝখান থেকে ধরে নিতে হয় তেমনি তার শেষও ছেড়ে দিয়ে যেতে হয় মাঝখানেই।” তবে এই যে আমি রোজ প্রত্যহ নিয়ম করে খোলা খাতার সামনে বসে থাকছি। ধরতে চাইছি অখন্ডের নিত্যতাকে! কী হবে? শুধু শুধু হাপিত্যেশ করে বসে থাকা অনন্তের দিকে মুখ করে? কিছু পাওয়া নেই? অনন্ত আমাকে ফিরিয়ে নেবে স্রোতে? আর আমি ভেসে যাবো খড়কুটোর মতো? না; তা নয়। তোমার চাওয়াটা ঠিক। পাওয়াটা নয় হয়ত। এইযে তুমি পাওয়ার জন্য চাইতে বসেছ তখনই তোমার মধ্যে অস্থিরতা আসছে। অসন্তোষ আসছে। তুমি ধ্যানমগ্ন হতে পারছ না তোমার সৃষ্টির কাছে। বাইরের কোলাহল তোমাকে ভ্রমের লোভে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে ভোগের দিকে। আর তুমি তোমার ফেলে রাখা কাজ ছেড়ে উঠে যাচ্ছ শুঁড়ি মাতালের ঠেকে। ওখানে গিয়েও শান্তি নেই। তোমার ফেলে রাখা কাজ তোমাকে কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। কিছুতেই থাকতে দিচ্ছে না এই নেশার পৃথিবীতে। অথচ, যেতেও পারো না তুমি। এই অস্থিরতা যখন তোমাকে ফিরিয়ে আনলো তোমার দায়বদ্ধতার কাছে, সৃষ্টির সমীপে; তখন মনে হচ্ছে শিকল লাগল পায়ে। তুমি চাইলে মুক্তি। আকাশের দিকে। পাখির মতো করে। কিংবা হয়ত যখন ফিরে এলে ফেলে রাখা কাজের কাছে, ততক্ষণে অভিমান বশত চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে সেও। আর এই হল ” অ্যান্টিক্ল্যাইম্যাক্স। কি হবে কি হবে ভেবে মন ক্রমাগত উত্তেজিত ও আকুল হতে থাকে, এবং তারপর হয়তো কিছুই ঘটে না। পাঠক শূন্যে ঝুলে থাকেন, আর তাঁর কল্পনা কাজ করতে থাকে গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়ে”। ( চাঁদের ওপিঠে, মণীন্দ্র গুপ্ত)
আমারও আর ফেরা হয়না। সব ছেড়ে যাওয়া-রা চেয়ে চেয়ে দেখে শুধু। সামনে এসে দাঁড়ায় আরও দৃশ্য। আর আমিও প্রতিটি দৃশ্যমানের কাছে তুলে ধরি আমার কবিতা; শব্দ; অক্ষর। মিলেমিশে তৈরি হয় কবিতা ভাবনা। সাদা কাগজের সামনে এসে বসি। একপাশে কোলাহল করে হেঁটে যায়, আমার বাস্তব; অন্যদিকে মৌন সাধনায় রত আমার যাপন। কোনও দ্বন্দ্ব নেই, রেশ নেই। শুধু হেঁটে যেতে হবে ভেবে হেঁটে যাওয়া। বসত গড়ি। মনের মধ্যে লালন বাজে। রবীন্দ্রনাথ বাজে। সুমন এসে মেশে মাঝের স্রোতে। দেখি ততক্ষণে জমে ওঠা-রা মিলিয়ে গেছে শূন্যে। আর তখনই অসংখ্য খোঁজের মধ্যে তৈরি হয় প্রবহমানের ধারা। যেন এটাই মোক্ষ নয়, এখানেই শেষ নয়। বরং অন্তিম ভেবে শুরুর খোঁজ শুরু হয় এখান থেকেই। এখান থেকেই মহাকাব্যের চলন। যুধিষ্ঠির হেঁটে যাচ্ছেন। চারপাশে শীতল অতীত। সামনে অপার সৌন্দর্য। হাতছানি দিচ্ছে। সত্য বলে কিছু কী আদৌ! বরং এতদিনের জেনে আসা প্রিয় সত্য-রা, পদে পদে ভুল বলে প্রমাণিত হচ্ছে। মৃত্যু ঘটছে। তখনই তিনি অনুভব করেন, সত্য মানে তখন এগোনো। চিরন্তন। এগোও, এগোও। এগিয়ে যাও। চরৈবতি…চরৈবতি। আমিও হাঁটি। আর ভাবি, ” একবার খুলে দে মা চোখের ঠুলি, দেখি শ্রীপদ মনের মতো”( রামপ্রসাদ সেন)। আর আমি চোখ খুলে নত হই, নতুন হই দৃশ্যের কাছে। এইযে অন্তিম লাইন বলে ভেবে এসেছি এতদিন, সেখানেই সংযোজিত হয় আবিষ্কারের পথ। আলোক বিন্দু। যে আমাকে পথ দেখাবে শুধু। থেমে থাকা, স্থিরতা থেকে মুক্তি দিয়ে মেলাবে অনন্ত আবহমানতার স্রোতে।