T3 ।। কবিতা পার্বণ ।। বিশেষ সংখ্যায় বিমান পাত্র

মৃত বিবেকের রোজনামচা
এইমাত্র রাস্তার পাশে পড়ে থাকা
যে ব্যক্তির লাশ পুলিশ তুলে নিয়ে গেলো ,
একটু আগেও সে আঁধারঘন চোখে
এক খণ্ড আলোর খোঁজে শূন্যে পেতেছিল হাত ৷
তারই পাশ দিয়ে হিমসাগর আম কিনে
অফিস থেকে ঘরে ফিরে গেছে কেউ ৷
গোলাপের গন্ধ মেখে প্রজাপতি হয়ে
উড়ে গেছে কত শত স্বপ্নভরা রক্তিম হৃদয় ৷
তবু কেউ ফিরেও দেখেনি –
পাশে পড়ে থাকা লোকটির ক্ষুদ্র সঞ্চয়-
ছিটকে গিয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে
হিমশীতল বিবেক ৷
কেউ কান পেতে শুনেনি-
তার হৃদয়ের শেষ শব্দের অস্পষ্ট অক্ষরগুলোয়
জমাট ছিল প্রতারিত বিশ্বাস অনেক !
তখনও বড় রাস্তার মোড়ে
কল্পতরু নেতার ভাষণ
সস্তাদরে কুড়িয়ে নিচ্ছে
স্তাবকের করতালি I
মিডিয়াও টি.আর.পি মেপে
চামটা দিয়ে তুলে নেয় চোখা চোখা খবর খালি I
অজ্ঞাত পরিচয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা
শীতঘুমের সাপের মতোই গুটিসুটি মেরে
পড়ে থাকবে আগামী দৈনিকের উপেক্ষিত কোণে ৷
ভোট কাছে নেই বলে মৃতদেহও
পরবে না বাঁধা কোন আনুষ্ঠানিক ঋণে ।
শুধু ফিরে পেতে প্রাপ্য অধিকার-
বেশ কিছু হাওয়াই চটি ক্ষয়ে যেতে যেতে
রাজপথে লিখে যাবে বিবেকহীন সভ্যতার
উলঙ্গ ইতিহাস !
তবু তারপর মাতলার তীর থেকে
শ্বাপদের হাতে হাতে ফেরি হবে
ষোড়শীর গোলপাতা যৌবন ৷
আঁচড়ে কামড়ে ধূর্ত শেয়াল
মিটে গেলে শরীরের আশ
খুঁজে নেবে আরামের নিরাপদ গহ্বর ।
নিভে যাওয়ার আগে বিবর্ণ শুকতারা
ম্লান চোখে পড়ে নেবে
মানুষ নামের বিবেকহীন জীবের লেখা
নীলবিষ কাব্যের রক্তাক্ত অক্ষর !
হয়তো তখনই দেখতে পাবে-
রেলপথে পড়ে আছে তরুণের
দ্বিখণ্ডিত দেহ ৷ কেউ চেয়ে দেখবে না-
সেঁতানো দেশলাই বাক্সের মতো
চেনকাটা ব্যাগের থেকে ছড়িয়ে পড়া
শিশিরভেজা মার্কশীটে মিশে আছে
রোদে পোড়া যন্ত্রণার কত ঘর্মাক্ত নিঃশ্বাস !
তবুও গ্যালন গ্যালন কালির অপচয়ে
লেখা হয় কর্মসংস্থানের গালভরা আশ্বাস ।
টাকার অঙ্কে খিড়কি দোরে বিকোয় চাকরি ৷
উন্নয়নের মোড়কে ঢাকা রঙচঙে সড়কে
পড়ে থাকে বিবেকের রক্তহীন লাশ !
তখনও ঘুমের ঘোরে মিলনের অভিনয়ে
কোন উষ্ণ বিছানায় ধর্ষিত হবে অনাথ বিশ্বাস ৷
ত্যাগের মাঝে খুঁজবে না কেউ
ভালোবাসার গভীরতা ৷
প্রাপ্তি আর তৃপ্তির নিলাজ হিসেবে
করবে না কেউ কাউকে এক কণা মাফ ৷
তবুও সকালের গরম চায়ে দেহ ভ’রে
হাজার আলোকবর্ষের দূরত্ব নিয়ে
পাশাপাশি বসে থাকবে উষ্ণ দুটি কাপ ।
বাউল কোকিল শীতের রাতেও দেবে শিষ-
নির্দয় সময় নীরবে লিখে নেবে
বিবেকহীন জীবননাট্যের আর্ত নেমেসিস !
তবুও রথের রশি হাতে রাজার কন্ঠে
কত শত রূপকথার বাহারি পশরা ৷
মুখোশের অন্তরালে ষড়রিপু খুঁজে নেবে
গোপন ডেরা ৷ সুযোগ পেলেই দেবে ঝাঁপ-
হাড়-মাস ছিঁড়ে খাবে সততা-মূল্যবোধ
আর বিবেকের নির্বোধ অভিধান ৷
এমন করেই হয়তো মুছে যাবে
আহ্নিক গতির সহজিয়া গান ৷
সবুজের ঘ্রাণ গিলে খাবে অদ্ভুত আঁধার ৷
সে দিনও ফুটবে জল , জমাট রক্তের রঙে
ধূমায়িত হবে সকালের চা ৷
সে দিনও আমারই মতো কোন কবি
রক্তহীন হাতে লিখে যাবে
মৃত বিবেকের এক রোজনামচা !