T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় বিমান মৈত্র

বয়ঃসন্ধির উপত্যকা
এক
“…. এই না বলে…” (মেরুকুমারী তাকিয়ে থাকে। বিমূঢ় বিস্ময়ে।) ডান দিকে পাশ ফিরে শুয়ে ছিল সে। হঠাৎ টের পেল। কি ভাবে? উত্তর নেই। শুধু জল পড়ে আর মাথা নড়ে। সমস্ত বিছানা ভেজা। মনে হলো, দুটি ঢেউয়ের কোলে শুয়ে আছে, যেন জলের তরীটি তাকে কোলে নিয়ে ভেসে চলেছে অকূল পাথারের নিরুদ্দিষ্ট উজান বেয়ে। দিন নেই, রাত নেই, চলেছে আর চলেছে। মাথাটা একটু ঘোরানোর চেষ্টা করে। মাথা আর ডান হাত এক টুকরো ঘাড় দিয়ে জোড়া। কোথায় গেল আর সব প্রত্যঙ্গেরা? চিৎকার করে উঠতে চায়। পারে না। মনেহয় গলায় কিছু আটকে আছে। বন্ধ হয়ে আসছে দুয়ার….
আহুতি ঠেলা মারে। এই কি হলো, এমন জ্বরো রুগীর মত কাঁপছো কেন? ধড়ফড় করে উঠে বসে অরিন্দম। চোখেমুখে বিভীষিকা। এদিকে মেয়েটাও উঠে বসেছে। বলছে বাবা, “এই না বলে-“, “এই না বলে-” তারপর কি?
প্রায়ই এমন হচ্ছে আজকাল। ঘুম ও জাগরণের ভিতর যে অর্ধচেতন উপত্যকা সেখানে রকমারি সব আপাত অর্থহীন ঘটনা ঘটে। দ্রষ্টা সেখানে চরিত্র হিসেবে কাজ করতে পারে, নাও করতে পারে। কিন্তু ওর ক্ষেত্রে ওকে কেন্দ্র করেই সব আবর্তিত হয়। ফলে ওর পাশে যারা থাকে তারা ঘাবড়ে যায়। একবার হাত দুটো উপরে তুলে গলা টিপে ধরার ভংগিতে হাতের থাবার আঙুলগুলোকে একে অপরের সাথে আংটা করে এমনি চেপে ধরে যে, তালুর উল্টোদিকে নখের দাগ বসে যায়। সেবার চিৎকার করে বলে উঠেছিল, মেরেই ফেলবো। এই ঘটনায় আহুতি ভয় পেয়েছিল। অরিন্দমকে ঠেলে তুলে দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল, কাকে মারবে তুমি। খানিকক্ষণ আহুতির দিকে তাকিয়ে অরিন্দম তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে, আমি জানি না, কিছুই জানি না।
মেয়ের কথা শুনতে পেয়েছিল অরিন্দম । সম্বিত ফিরে পেতে আবার একটু আগে থেকে শুরু করে…ওই যে, যখন মেরুকুমারীর সম্পুর্ণ দেহটা সোনা হয়ে গেল, বাকি রইল শুধু মাথা, ওই যে যখন মেরুকুমারী শুধু তার ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে বলতে পারল, পশ্চিম পাহাড়ের পিছনে যে বাউরি-কুয়োটা রয়েছে, তার ভেতর সোনার পাঁক মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছে একটা সোনাব্যাঙ- তার ঘুম ভাঙ্গিয়ে পেটটা কেটে নাড়িভুঁড়ি বার করতে পারলে তবে আমার সোনা-মুক্তি ঘটবে। নইলে ওই যে শিয়রের কাছে ঢাকা চাপা দেয়া হাঁড়িটা, ওর ভেতর আছে একটা কচুর লতি, মুখ খুললেই সেটা একটা লোটে সাপ হয়ে তোমার চোখ দুটোতে ছোবল মারবে আর আমিও পুরোপুরি সোনার মেরুকুমারী হয়ে যাব। এই ভাবে সোনার লোভ দেখিয়ে কত মেয়েদের যে সোনার মেরুকুমারীতে পরিণত করেছে ওই দৈত্যাকার সোনাব্যাঙ, তার ইয়ত্তা নেই। আমি কিন্তু ধরে ফেলেছি ওর চালাকি। ও মেয়েদের সোনা দিয়ে মুড়িয়ে রাখার লোভ দেখিয়ে সোনায় পরিণত করে। এই কথা শোনামাত্র মেরুকুমার ভয়ংকর রেগে গেল। ” এখুনি আমি চললাম বাউরি-কুয়োর সোনাব্যাঙ মারতে।”
“…এই না বলে” — মেরুকুমার বার করলে তার আলোর তলোয়ার, ছোটালে হাওয়াই ঘোড়া, তারপর কুয়োর মধ্যে লাফিয়ে পড়ে সোনাব্যাঙের পেট থেকে নাড়িভুঁড়ি বার করে মেরুকুমারীকে সোনার বাঁধন থেকে ছাড়িয়ে আনলে।
একটা লম্বা যুদ্ধ হলোনা, অথচ সোনাব্যাঙ দিব্যি হেরে গেল, এমনটা কখনো হয় নাকি? অদিতির মনটা খারাপ হয়ে গেল। সে বলল, এ কি, যুদ্ধ হল’না! যুদ্ধ কোথায় গেল, যুদ্ধ? অরিন্দম কোন উত্তর দেয়না। সত্যি সবাই যুদ্ধ চায়। এই একরত্তি মেয়েটাও। ওরও শান্তি নয়, যুদ্ধ চাই! বাবাকে চুপ থাকতে দেখে অদিতি হঠাৎ বলে উঠল আচ্ছা বাবা, মা চাইতে না চাইতেই যে তুমি এত সোনার গয়না গড়িয়ে দাও, মা ও কি তবে একদিন গয়না-মা হয়ে যাবে। আহুতির কান আগেই খাড়া হয়ে ছিলো “মা ও সোনা” শব্দ দুটো শুনে, এবার গলা চড়িয়ে বলে উঠল, এই ওতি, আমি গয়না চাইতেই তোর বাবা গয়না গড়িয়ে দেয়? তুই কি করে জানলি রে? বড্ড পাকা হয়েছো না তুমি! এইবার সত্যিই ‘শান্তি নয় যুদ্ধ চাই’– ঘটতে চলেছে বুঝে অরিন্দম বলল, আমার ঘুম পেয়েছে। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল সে।
দুই
বেশ কিছুক্ষণ ধরে জানলায় একটা আওয়াজ হচ্ছে। চোখ বুজে ছিল সে। তাকিয়ে দেখে অচেনা এক পাখি। বক্সগ্রীলের টবের কানাচিতে বসে তীক্ষ্ণ ও বাঁকা ঠোঁট দিয়ে কাঁচের জানালায় ঠক্ ঠক্ করে চলেছে। আবছায়া রঙের পিঠ, পেটটা একেবারে ডিমের খোলার মত। বিকেল হয়ে গেছে। জামগাছের ছায়ায় উঠোন ঢাকা। গেটের বাইরেই মাঠ। তখনও ফুটবল খেলা বন্ধ হয়নি। আসলে জানলার দিকে তাকিয়ে ছিল অরিন্দম, কিন্তু তন্দ্রার ভাবটা তখনও কাটেনি। ন’মাসী এসে চিমটি কেটে বললো, কি রে এখনো ঘুমোচ্ছিস! চল্, আমার সাথে এক জায়গায় যাবি। চমকে উঠে অরিন্দম ঘুরে দেখতে দেখতেই বুল্টি বিছানায় বসে পড়ল। একেবারে পিঠোপিঠি ওরা, বুল্টি সদ্য হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে কলেজের ফর্ম ভরছে, অরিন্দম দশ ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায় না থেকে মায়ের সাথে রাঁচি বেড়াতে এসেছে। এই প্রথম বাড়ি থেকে দূরের কোন আত্মীয়ের বাড়িতে আসা। সম্পর্কে বুল্টি মাসী হলেও অনেকটা দূরের, তাই অরিন্দম বুল্টিদি বলেই ডাকত। জানলা থেকে নতুন পাখিটা উড়ে গেছে। অরিন্দমের চোখ থেকে ঘুমের ঘোর কাটেনি, এমন অবস্থায় বুল্টিকে দেখে ফুলের বোকে থেকে মুখ বার করা একটা পাখির মতো মনে হল তাঁকে। জানো বুল্টিদি, তোমাকে যে পাখিটার মত লাগছে তার নাম পরী দিলাম। অরিন্দমের কিন্তু এটা জানা নেই সত্যিই পরী নামের কোন পাখি আছে কিনা। বুল্টি ওর গায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠ্ তাড়াতাড়ি; ডেঁপোমি হচ্ছে ! খুব একটা সাদামাটা প্রিন্টেড শাড়ি পরেছে বুল্টি, হালকা হলুদ রঙের জমির ওপর নীলচে সবুজ ছোপ। ঠোঁটে ভ্যাসলিন,গায়ে পাউডার, কপালে টিপ। তোমাকে দেখতে কিন্তু দারুন! বলেই ফেলল। আবার…! চারদিন হয়নি এসেছিস, এর মধ্যে… দাঁড়া, দিদিকে বলছি।
একটা পার্কে এসেছিল ওরা। কয়েকটা বেঞ্চ, দুটো দোলনা, একটা স্লিপার। বুল্টি ওকে একটা বেঞ্চে বসিয়ে দূরে অন্য একটায় গিয়ে বসল। কিছু পরে পাশে এসে বসল আর একটা লোক। আলো কমে গেছে, ভালো করে দেখতে পেল না। তবে লোকটার কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল ওরা। এদিকে অরিন্দম কি করবে ভেবে না পেয়ে উসখুস করছে দেখে লোকটা একবার এসে ওর সাথে খানিক গল্প করে একটা বাদাম ভাজার প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল এটা নে, আর চারপাশটা ঘুরে দেখ, ভালো লাগবে। অরিন্দম আনমনে হাঁটতে থাকে। মনে পড়ছিল হাওড়া রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেসের কথা। সারারাত ঘুমোয়নি সে। ভোরের দিকে পাহাড়ী উপত্যকা চিরে গাড়ি চলছিল। এই আধো আধো অন্ধকারে তেমনি একটি সবুজ ঢালের কাছাকাছি চলে এল অরিন্দম। খুব ছোট ছোট ঘাসে ভরা এক উপত্যকা। যেন পিউবিক ভ্যালি, বয়ঃসন্ধির উপত্যকা। অরিন্দম বসে পড়ল। তালু দিয়ে ম্যাসাজ করার ভংগিতে ঘাসের ওপর হাত বোলাতে লাগলো।
রাতে মেঝেতে লম্বা বিছানা পড়েছিল। শুয়েছিল ওরা এইভাবে: মা, বাবা, বুল্টির বাবা, অরিন্দম, বুল্টি ও বুল্টির মা। যখন সবাই গভীর ঘুমে, বৃষ্টি এলো ঘরে। দুজনের কাছে দুজনের পৃথিবী যেন আলোকিত হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ পর বুল্টি বাইরে থেকে ঘুরে এসে মায়ের দিকে ফিরে শুয়ে পড়ল। চোখ পিটপিট করে অরিন্দম সব দেখল। রীতিমত ঘামছিল সে। জোড়ে জোড়ে শ্বাস পড়ছিল তার। বাকি যে ক’দিন ছিল ওরা কেউ কারও মুখের দিকে তাকাতে পারেনি।
ধড়ফড় করে উঠে বসলো অরিন্দম। অদিতি ডেকে তুললো তার বাবাকে। এমন করে কাঁপছ কেন বাবা। ওর শোবার ঘর থেকে দেখা যায় ঠাকুর ঘর। সেখানে বসে পুজোর যোগাড় করছিল বুল্টি। পরনে সাদা কাপড়। দশ বছর আগে ওর স্বামী মারা গেছে। সেই থেকে কোথাও বেরোয়নি সে। এবার অদিতির বিয়েতে প্রথম রাঁচি থেকে বেরিয়েছে। অদিতির চিৎকারে মা ও দিদামাসি দুজনেই ছুটে আসে। কি হলো, কি হলো তোমার অরিন্দম! বুল্টির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। বুল্টি তার মাথাটা পরম স্নেহে বুকে চেপে ধরে। অরিন্দম ছলছল চোখে বললো, আর বৃষ্টি হয়না বুল্টিদি, আমরা এখন খরা কবলিত এলাকা। আহুতি বলল, জানো মাসীমণি, আজকাল প্রায়ই ঘুমের মধ্যে এইরকম হয়। আমার মনে যে কি চিন্তা হয়! বুল্টির চোখের কোণও ভেজা।