প্রতিটি মানুষের মনের মধ্যে একটা অ্যাডভেঞ্চার পিপাষু মন লুকিয়ে থাকে।যে মন বলে কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা..।সেই মনটার তাগিদে সে কখনো হানা দেয় তেপান্তর পেড়িয়ে রূপকথার পরীর দেশে,কখনো সমুদ্র উথাল-পাতাল করে তুলে আনে মুক্ত আবার কখনো শঙ্করের মত বহু বাঁধা বিপত্তি পদে পদে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের মোকাবিলা করে পৌঁছে যায় চাঁদের পাহাড়।
অ্যাডভেঞ্চারের নেশাতেই বিভিন্ন সময় মানুষ এক দেশের সীমানা থেকে আরেক দেশ আবিষ্কারের নেশায় মাতে।এভাবেই একদিন আবিষ্কৃত হয়েছিল আমেরিকা।কলম্বাস ভারত আসার জন্য বেরিয়ে পৌঁছে গেছিলেন রেড ইন্ডিয়ানদের দেশে।তারপর তাদেরকে উচ্ছেদ করে গড়ে উঠল আজকের আমেরিকা।
তবে এ গল্প আমেরিকা আবিষ্কার কিভাবে হল তার নয়।এ গল্প প্রতিটি শিশু মনে লুকিয়ে থাকা অ্যাডভেঞ্চারের।বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো তা খানিক স্থিমিত হয়,হয়তো ধামাচাপা দিয়ে রাখতে রাখতে একদিন প্রেসার কুকারের সিটির মতো বেজে ওঠে।
আবার কেউ কেউ এসবের পরোয়া না করে নিজের মত ফন্দী আঁটে।
আমিও তেমনই এক বাচ্চা ছিলাম।আমার এই অভিযান চলত মা রান্না ঘরে, কিংবা বাথরুমে অথবা ছাদে গেলে,মোট কথা মা ব্যস্ত আর দরজাটুকু একটু খানি খোলা পেলেই। কারণ দরজার ছিটকিনি খুলে চার দেওয়ালের বাইরের বিশ্বকে দেখার মত বয়স আমার তখনো হয়নি।
মায়ের মুখে শুনেছি আমার এমনই এক দুঃসাহসিক অভিযান ছিল যখন আমার বয়স আড়াই।
আমাদের ইজ্জত কলোনী পাড়াটা চৌকো আকৃতির। বড় রাস্তা ছেড়ে সোজা পাড়ায় ঢুকে ডানদিকের শেষ বাড়িটায় থাকতাম আমরা।সেখান থেকে রাস্তা ডানদিকে বেঁকে গেছে।ডানদিকের শেষ বাড়িটার একতলায় থাকতেন ব্যানার্জি জ্যেঠু জ্যেঠিমা। আর চারদাদা।তাদের যেহেতু কোনো বোন ছিল না আমিই ছিলাম তাদের বোন।বাবা ছুটির দিনগুলোতে সকাল বেলায় তাদের বাড়ি চা খেতে যেতেন।এমনই এক ছুটির দিন বাবা কোথাও বেরিয়ে ছিলেন।দরজাটা খোলা ছিল।আমি মায়ের চোখ এড়িয়ে সদর দরজা অতিক্রম করে রাস্তায় নেমে পড়লাম।তারপর গুটি গুটি পায়ে জ্যেঠুর বাড়ি।সেখানে জ্যেঠিমা পরোটা ভাজছিলেন।আমাকে দেখে আমার হাতেও একটা পরোটা দিলেন।বাবাকে সেখানে না দেখতে পেয়ে পরোটা নিয়ে আমি আবার জ্যেঠিমার দৃষ্টি এড়িয়ে রাস্তায়। এবার পড়লাম মুশকিলে।হাতে পরোটা থাকায় মাথার উপর অজস্র কাকের ঘুরপাক আর রাস্তায় কুকুরের দল। দুইয়েরই সেই পরোটা চাই।আমি পড়লাম চক্রবুহ্যের মধ্যে।
এদিকে মা আমাকে দেখতে না পেয়ে বাইরে এসে দেখে আমি দু দলকেই তাড়াবার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, ততবার তারা দু’পক্ষই আমাকে আক্রমণ করছে।মা দৌড়ে এসে আমাকে কোলে তুলে রক্ষা করলেন।
রক্ষা তো হল,কিন্তু এরপর মা আমাকে জানলায় বেঁধে রাখতে শুরু করলেন।যাতে পালিয়ে যেতে না পারি।কিন্তু ওই যে আমার দুঃসাহসিক মন।জানলায় জড়ো হতে লাগল যত ফেরিওয়ালা, মুচি,মেথর,বাসনওয়ালা,পাড়ার বেপাড়ার দাদা,কাকা,পিসি,মাসি…আসলে আমি রাস্তা দিয়ে যেই যেত তাকেই ডেকে বকবক করতে শুরু করে দিতাম।তখন আমি অমল।সকলের কাছেই পথের খবর জানতে চাই।
এবার মা পড়ল আরেক ফ্যাসাদে। কেউ মাকে বলে,বৌদি এমন সুন্দর বাচ্চাকে কেউ বেঁধে রাখে!আপনি কেমন মা!আবার কেউ বলে,বৌমা এমন করে মেয়েকে সকলের সঙ্গে গল্প করতে দিও না।চারদিকে ছেলেধরা ঘুরে বেড়ায়। কে লজেন্স দিয়ে ভুলিয়ে নিয়ে চলে যাবে শেষে…।
আমি শুনে ভাবতাম হয়তো এই বন্দী জীবনের থেকে ছেলে ধরা ধরে নিয়ে গেলে অনেক ভালো।অন্তত বাড়ির বাইরে তো ঘোরা যাবে।তাই এতদিন যাবত যারা লজেন্স দিত না,খালি গল্প করত,তাদেরকে বলতাম আমার লজেন্স চাই।
নিরুপায় হ’য়ে মা জানলার বাঁধন থেকে আমাকে মুক্তি দিল।তার বদলে ছেলে ধরার গল্প শুরু হল।ইয়া বড় থলে নিয়ে সে আসবে, আমাকে তার মধ্যে ভরে নিয়ে চলে যাবে,আর কোনোদিন মাকে দেখতে পাব না।
আমি নাকি জানতে চাইতাম, আর বোনকে?
মা বলত,না।
তখন আমি দ্বিধায় পড়তাম।বোনটা তো আমাকে খুব ভালোবাসে।আর আমিও। তাহলে কি করব!
আর একটু বড় হয়ে এই বোন হয়ে উঠল আমার যাবতীয় অভিযানের প্রধান সহকারী। আমি যদি ব্যোমকেশ বা ফেলুদা হই সে তাহলে অজিত বা তোপসে।
ফলে আমাদের দ্বৈত অভিযান চলল কখনো বাড়ির পিছনের চৌবাচ্চার সব জল ফেলে দিয়ে,কখনো ভাঙা পাঁচিলের ফোকল গলে পেছনের পাড়ায় ঢুকে,কখনো পেয়ারা গাছে,কখনো কুয়ো লাফিয়ে পাড় হয়ে।
আর আমার মায়ের প্রেসার,হার্ট বিট তত বাড়তে লাগল।বিনিময়ে আমাদের কপালে জুটল কখনো হাত পাখার বারি,কখনো স্কেলের বারি,কখনো বা হাত পা বেঁধে রান্নাঘরের সামনে বসিয়ে রাখা।
কিন্তু যে নাবিক একবার জলের স্বাদ পায়,যে পথিক পথের আর যে গোয়েন্দা রহস্যের তাকে কোন শক্তি বেঁধে রাখতে পারে ঘরের কোনে!
আমরাও নতুন নতুন পন্থা আবিস্কার করলাম পালাবার।
এভাবেই প্রেমে পড়ার পর একদিন আজিমগঞ্জের বাড়ি থেকে পালিয়ে বহরমপুর হবু শ্বশুর বাড়ি।ভাগ্য খারাপ। তুমুল বৃষ্টিতে আটকে পড়লাম।পরদিন ভোরে বাড়ি ফিরে বাবার মার খাবার কথা জীবনেও ভুলিনি।তখন আমি আঠেরো।হয়তো নিজের অজান্তেই সেদিনই লেখা হল আমার ভাগ্য। যার ফলশ্রুতিতে দ্রুত বিয়ের পিঁড়িতে।
এত কিছুর পরেও সেই পালাবার নেশা পিছু ছাড়েনি।কখনো তারাপীঠ কখনো রামকৃষ্ণ মহাশ্মশান কখনো দক্ষিণেশ্বর কখনো অজানা কোনো গ্রাম…
মাঝে মাঝে মনে হয় আসলে আমি একটা অভিযানের মধ্যেই আছি,যেকোনো দিন বেরিয়ে পড়লেই হল।তারপর পৌঁছে যাব হাঁটতে হাঁটতে ঠিক চাঁদের পাহাড় কিংবা সাত সাগরের ফেনায় ফেনায় ভেসে পরীর দেশের বন্ধ দুয়ারটা একদিন ঠিক খুলে ফেলব।খালি সঠিক সুযোগ আর সময়ের অপেক্ষায়।