একটা মেয়ে, নাম গৌরী, উঠোনের মধ্যে খেলছে আমার সঙ্গে। আর ক্রমাগত বলে চলছে, আনি মানি জানি না,পরের মেয়ে , পরের নাতনি মানি না,লেগে গেলে জানি না..কাউকে মানি না..খেলতে খেলতে সে আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে আর আমি পড়ে যাচ্ছি উঠোনে।
সেই উঠোনটা আমাদের পাশের ঘরের দিদার কোনো আত্মীয়র।দিদা আমাকে সেখানে বিকালে নিয়ে যেত। তখন আমি বেশ ছোটো।পাঁচ ছয় বছর হব হয়তো।
সেই সময় আমাদের চারপাশটা ছিল মুক্ত দুনিয়া। কেউ কারোর বাড়ি গেলে কথা না বলে টিভি চালিয়ে বসা হত না।
আর আমি ছিলাম সেই মুক্ত দুনিয়ার একছত্র রাজা।যেখানে খুশি যখন খুশি চলে যেতাম কোনো পরোয়া না করে।কেন যেতাম জানি না,এতবার সেখানে গেলেই হাঁটু ছড়ে যেত ধাক্কা খেয়ে তারপরেও যেতাম কেন!
নাড়ুর লোভে?হ্যাঁ, যতবার পড়তাম সেই বাড়ির দিদা নাড়ু আর ঝুড়িভাজা দিতেন আমার হাতে।আর উঠোন থেকে টেনে নিয়ে এসে বসিয়ে দিতেন নিজেদের মাঝে।
দিদাদের গায়ে একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ থাকে।তাতে পান জর্দা নুন হলুদ সবের অদ্ভুত এক মিশ্রণ।
আমি বোধ হয় সেই ঘ্রাণটা পাবার জন্য যেতাম।নইলে কেন!
বাড়িটা ছিল কালি বাড়ির ঠিক উল্টো দিকে।কালি বাড়ির মাঠে আমরা দুর্গা পুজোর অঞ্জলি দিতাম।সেই মাঠেই ব্রতচারী শিখতাম,লেফট রাইট লেফট রাইট,ডাইনে মোর,পিছে মোর…
আবার সেখানেই পর্দা টানিয়ে দেখেছিলাম ঘ্যাচাং ফুঃ খাবো তোকে…।অন্ধকারে উপলব্ধি করছিলাম একটা ভয়ের পরিবেশ আমাদের মতো বাচ্চাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে। পর্দা জুড়ে এক রোগা মতো লোক হাতে একটা খাঁড়া নিয়ে নেচে চলেছে নুন দিয়ে ঝাল দিয়ে খাব তোকে..
আমার হঠাৎ কেমন যেন মনে হল মা কালির হাতে খাঁড়া থাকে।বিশে ডাকাতের গল্প তখন পড়ে ফেলেছি।দিদা এও বলত, ডাকাতেরা বাচ্চা মেয়ে দেখলেই বলি দেয় মায়ের কাছে।
কোন মা?
কেন মা কালি!
আমি নিশ্চিত ছিলাম এখানে আমরা যারা বসে আছি তাদের মধ্যেই কোনো বাচ্চার আজ বলি হবে,তারই প্রস্তুতি চলছে ওই পর্দার পিছনে। মায়ের গা ঘেঁষে বসে এসব ভাবছিলাম। কিন্তু রোগা লোকের গায়ে কি এত শক্তি! শুনেছি তাদের গায়ে খুব জোর। হাতে লাঠি,কানে তাদের জবা ফুল গোঁজা থাকে,চওড়া গোঁফ, ধুতি আর শার্ট পরে তারা,আর কোমড়ে বাঁধা থাকে গামছা।ওই গামছা দিয়েই তারা হাত চোখ বেঁধে রাখে যাকে ধরে তার।
পর্দায় গান চলে আর আমি বীরপুরুষের খোকা হয়ে যাই।নিজের মনে আওড়াই কদিন আগেই মায়ের কাছে শেখা কবিতার লাইন।কালিতলার সেই মাঠ আমার কাছে জোরাদিঘির মাঠ হয়ে যায়।মনে হয় ওই তো আরেকটু এগোলেই মরা নদীর সোঁতা।আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আসছি আমি এখনি রণাঙ্গনে।
সেই রণাঙ্গনে তখন চলল মেয়ে ….
“চললো মেয়ে রণে চললো!
বাজে না ডম্বরু অস্ত্র ঝনঝন করে না জানলো না কেউ তা
চললো মেয়ে রণে চললো!
পেশীর দৃঢ় ব্যথা, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে
চললো মেয়ে রণে চললো!”
না, শঙ্খ ঘোষের ‘যমুনাবতী’ তখন আমার পড়ার সেই রূপকথার দুনিয়ায় ঢুকে পড়ে নি। ১৯৫২ সালে যখন এই কবিতা লেখা হয় তখন আমি নিশ্চয়ই অন্য কোনো জন্মে ছিলাম।তবে কি সে জন্মে আমি তাঁর পরিচিত ছিলাম!এভাবেই তো আমি যুদ্ধ ক্ষেত্রে যেতে চাইছিলাম বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে, আশির দশকে।
সেই মুহূর্তে সেই নিশুতি রাতে কালিতলার মাঠে আমি একাই লড়াই করলাম, অস্ত্র ঝনঝন করে উঠল। কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে, কত লোকের মাথা পড়ল কাটা…।
অবশেষে যুদ্ধ গেল থেমে।পর্দায় নেমে এল অন্ধকার। আমরা সরু গলি দিয়ে বাড়ি মুখো হলাম।
ধীরে ধীরে ভ্যানিস হয়ে গেল সেই দিন গুলো।কালিতলার সেই যুদ্ধ ক্ষেত্রে বহুতল আবাসন,উল্টো দিকের সেই উন্মুক্ত উঠোন ভেঙে সেখানেও মা অন্নপূর্ণা ভান্ডার।
ক্রমে অঞ্জলি দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল।নিজের মায়ের মধ্যেই তখন আবিস্কার করে ফেলেছি দুর্গা কালি সরস্বতী… মা ই মহামায়া…।
তবু কোনো কোনো গভীর রাতে সেই উঠোন বাড়ির এক ছেলে অরিজিতের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ করেই আনি মানি জানি না-র ছবিগুলো সামনে এসে দাঁড়ায়।রিওয়াইন্ড করতে করতে ছুটে চলি… কানের সামনে, পিছনে হুইসেল বাজে -এক দো এক দো এক দো…আমি সামনে এগুতে গিয়ে টার্ন নিয়ে পিছনে হেঁটে চলি নিজের মনে বলি, এক দো…. এক দো……সে চলা আসলে নিজেকে কিংবা একটা সময়কে খুঁজে চলার জন্য অবিরাম হাঁটা…।