ক্যাফে ধারাবাহিকে বিতস্তা ঘোষাল (পর্ব – ৪৮)
কু ঝিক ঝিক দিন
বাবা আমি তোমার মতো বিখ্যাত হতে চাই।কি করে সেলিব্রিটি হওয়া যায়?
মেয়ের মুখে কথাটা শুনে অনেকক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল বাবা।একটা সিগারেট ধরালো আরাম করে।তারপর বলল-
সেলিব্রিটি কাকে বলে?
কেন!তোমাকে। মেয়ে একেবারেই চিন্তা না করে উত্তর দিল।
কি করে বুঝলে আমি সেলিব্রিটি?
যেখানেই তুমি যাও লোকে ঘিরে ধরে।বড় বড় বিখ্যাত লোকেরা তোমার কথা মন দিয়ে শোনে।ছবি তোলে,অটোগ্রাফ নেয়। সকলে বলে তোর বাবা সেলিব্রিটি।
বাবা হাসল।ঠোঁটের কোনায় সিগারেট। মেয়ে ভাবে, বাবার মতো সুন্দর মানুষ সেলিব্রিটি হবে নাতো কে হবে!
বাবা বলল,সেলিব্রিটি শব্দটার অর্থ কি?
মেয়েটি বলল- বিখ্যাত,জনপ্রিয়।
বেশ।তাহলে তোর চোখে কারা কারা সেলিব্রিটি?
তুমি,উত্তম কুমার,নেতাজী, রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, সারদা মা।
তুই তো এমন সবের নাম বললি যাদের সঙ্গে আমার কোনও মিল নেই। ধর আমার সামনে উত্তম কুমার। লোকে কিন্তু তাকে ঘিরেই ভিড় করবে।
কিন্তু উত্তমকুমার তো মারা গেছেন।সে আর আসবে কি করে?
কিন্তু তুই তার নাম করলি।তার মানে একজন মানুষ যখন নেই তখনো সমান জনপ্রিয়। এমন তো আমি নই।
কিন্তু বাবা আমি যাদের নাম করলাম কেউই তো বেঁচে নেই।
ঠিক।তেমনি এনারা সারা পৃথিবী বিখ্যাত। আমার নাম কিন্তু সাধারণ জনগন কেউ জানে না।কয়েকজন মানুষ যারা অল্প বিস্তর পড়াশোনা করেন,তারাই জানেন।
আবার দেখ,আজ যাদেরকে নিয়ে মানুষ নাচানাচি করছেন,কাল তার বদলে অন্য কাউকে নিয়ে মেতে যাচ্ছে। আসলে সেলিব্রিটি বলে কিছু হয় না।জনগণ, মিডিয়া, সবাই মিলে কাউকে সেলিব্রিটি বানান।কালের স্রোতে তারপর একদিন সব ভেসে যায়।কিন্তু… বলে বাবা থামলো।আরেকটা সিগারেট ধরালো।তাপর বলল,কিন্তু তুই উত্তম কুমার বাদে যাদের কথা বললি,তাঁরা কিন্তু সত্যি সেলিব্রিটি। যখন তাঁরা ছিলেন তখন হয়তো এত পপুলার ছিলেন না,কিন্তু আজ পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাবি কেউ না কেউ এদের নাম জানেন।আবার এনাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত কে বলতো?
মেয়ে চুপ করে রইল।
বাবা বলল,রামকৃষ্ণ। কেন বলতো?
মেয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে বাবার দিকে।
পৃথিবীতে যত কলহ বাড়বে,অশান্তি বাড়বে,সমস্যা বাড়বে, তত মানুষ শান্তি খুঁজবে সেই সব মানুষের কাছে যারা কোনও কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয়নি।রামকৃষ্ণ ঠিক তেমন একজন মানুষ। তাই যত দিন যাবে তাঁকে নিয়ে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।বলতে পারিস তিনি কর্পোরেট হয়ে উঠবেন।
এসব কর্পোরেট বলতে কি বোঝাতে চাইল বাবা মুনাই বুঝতে পারল না।সে বলল- বাবা তাহলে কি আমি কখনো সেলিব্রিটি হব না?
না মা,তুমি তোমার কাজ করো।যা হবার তাই হবে। গীতায় বলেছে- কর্ম করে যাও,ফলের আশা কোরো না।
মুনাই আর তারা বাবার এসব কথোপকথন চলতেই থাকত যতক্ষণ না বাবা বলত,অনেক রাত হল,এবার শুতে যা, নইলে মা বকবে।
যদিও মুনাই এসবের পরোয়া করে না।সে সেলিব্রিটি হবার জন্য বাড়ি থেকে পালাবার পরিকল্পনা করল। পরদিন বন্ধ ঘোষণা করল সরকার।
তার পালানো হল না।কিন্তু সে সেদিনই ঠিক করে নিল যে সরকার বন্ধ ঘোষণা করে,ধর্মঘট করে তারা যতই বলুক না কেন তারা হাতুড়ি কাস্তে / ভোট দিন বাঁচতে… তাদের সে কখনো ভোট দেবে না।তার পালাবার পথে,সেলিব্রিটি হবার সবচেয়ে বাধা এরাই।